মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে

জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

বাংলাদেশে মেয়েদের জোরপূর্বক বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এমন দাবিতে কিছু ভিডিও ২০২৫ সাল থেকে বার বার সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। মূলত ভারতীয় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে ঘুরেফিরে ভিডিওগুলো প্রচার করা হলেও এর ব্যাপ্তি আরও বেশি। দেশি-বিদেশি একাধিক তথ্যযাচাইকারী সংস্থা ভিডিওগুলো স্ক্রিপ্টেড বা সাজানো বলে জানালেও থামেনি এমন প্রচার। অন্যদিকে, এসব ভিডিওর উৎস হিসেবে যে চ্যানেলগুলো ব্যবহৃত হতে দেখা যাচ্ছে, সেগুলো ক্রমাগত প্রচার করছে একই ধরনের নাটক। সেসব নাটকের বিভিন্ন অংশ কেটে ক্যাপশনে মিথ্যা ও বানোয়াট দাবি রটানো হয় সামাজিক মাধ্যমে। 

ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত চারটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া গেছে, যেগুলো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের সামাজিক মাধ্যম পরিসরে বিভ্রান্তিকর দাবিতে একাধিকবার প্রচারিত হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভিডিওগুলো পোস্ট করা হয়েছে বাংলাদেশের জোরপূর্বক বিয়ের ঘটনা বলে। কিছু ক্ষেত্রে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে হাস্যরসের উৎস হিসেবেও ভিডিওগুলো পোস্ট করেছেন কেউ কেউ।

ভিডিওগুলোর গল্প প্রায় একইরকম। বরের চরিত্রে বয়স্ক কোনো ব্যক্তি। আর কনের চরিত্রে অপেক্ষাকৃত তরুণ কোনো নারী। প্রতিটি ভিডিওতেই বয়সের ব্যবধানে আপত্তি জানানো মেয়েটিকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। বৃদ্ধ ব্যক্তির সঙ্গে বিয়েতে রাজি না হলে অভিভাবকদের শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হন পাত্রী। চারটি ভিডিওতেই ঘটনা প্রায় একইরকম থাকলেও পাত্র-পাত্রী ভিন্ন।

তবে এই দৃশ্যগুলোর কোনোটিই প্রকৃত ঘটনার নয়। ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত কিছু সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে অভিনেতাদের একটি দল এই সাজানো নাটকগুলো বিনোদনমূলক কনটেন্ট হিসেবে প্রচার করছে। আর এসব কনটেন্টের বিভিন্ন অংশ কেটে তা বিভ্রান্তিকর দাবিতে অন্যান্য দেশের সামাজিক মাধ্যম পরিসরে ছড়ানো হচ্ছে।

শুরুটা করেছেন এক মুক্তচিন্তক

২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারিতে পাকিস্তানি অ্যাক্টিভিস্ট ইমতিয়াজ মাহমুদ, যিনি নিজেকে নাস্তিক ও মুক্তচিন্তক হিসেবে পরিচয় দেন, সামাজিক মাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করেন। ক্যাপশনে লেখা, “বাংলাদেশে পারিবারিকভাবে ঠিক করা এক বিয়েতে, মেয়েটি তার হবু স্বামীকে দেখে জ্ঞান হারায়” (অনুবাদকৃত)। ভিডিওতে দেখা যায়, এক বৃদ্ধ ব্যক্তি জামাইয়ের বেশে বসে আছেন, পাশে বিয়ের পাত্রীর সাজে রয়েছেন একজন নারী। ঘোমটা খুলে বৃদ্ধকে দেখতেই ওই নারী জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। ইমতিয়াজ মাহমুদের ভিডিওটি এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ৩৫ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। রিপোস্ট হয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি।

এছাড়াও, এক্সে ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসকে সময়সীমা রেখে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড লিখে সার্চ দিলে, এখনো ভারত-ভিত্তিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে এই পোস্টের একাধিক রিপোস্ট সামনে আসে (, , , , )।

ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
ইমতিয়াজ মাহমুদের এক্স পোস্টের স্ক্রিনশট।

তবে পাঠকদের আলোচনার ভিত্তিতে পোস্টটিতে ব্যবহারকারীরা একটি প্রেক্ষাপট যুক্ত করে দিয়েছে, যেখানে এটিকে ‘সাজানো (স্ক্রিপ্টেড) কনটেন্ট’ বলে উল্লেখ আছে।

এছাড়া, ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পরেই ভারতীয় তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ‘ডিজিটাল ফরেনসিক, রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালেটিকস সেন্টার (ডি-এফআরএসি)’ ও সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়া টু ডে’ এটি নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমর স্ক্যানার থেকে একই ভিডিও যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভিডিওটি আসল নয়, বরং একটি সাজানো কনটেন্টের অংশ। যা ‘ওয়েডিং স্টুডিও’ নামের একটি পেজ থেকে প্রকাশ করা হয়েছিল।

তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মাহমুদ ভিডিওটি নিজের অ্যাকাউন্ট থেকে সরাননি। বরং, ২০২৫ সালের ২০ জুলাই তিনি পুনরায় ভিডিওটি একই ক্যাপশন দিয়ে প্রচার করেন। মাহমুদের প্রথম পোস্টটির তুলনায় দ্বিতীয়টি আরও বেশি ব্যবহারকারীদের নজরে আসে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি পঞ্চাশ লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে ও দেড় হাজারের বেশি রিপোস্ট হয়েছে।

কেবল ভারতের সামাজিক মাধ্যম পরিসরে নয়, ভিডিওটি একই মাসেভিন্ন দাবিতে পৌঁছে গিয়েছে আরও কয়েকটি দেশের ইন্টারনেট পরিসরে। যেমন, ‘কাইস হাসান’ নামে কেনিয়া থেকে পরিচালিত একটি পেজ থেকে ভিডিওটি ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পোস্ট করা হয়। ফেসবুক পোস্টটির বাংলা অনুবাদ দাঁড়ায়, “বন্ধুরা, আমাকে ফলো করুন। বিয়ে করতে যাওয়া এক সোমালি বৃদ্ধকে দেখে এক ভারতীয় মেয়ে অজ্ঞান হলো।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি শেয়ার হয়েছিল ৬০০-এর বেশি। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে ছয় হাজারের বেশি। যদিও পোস্টটি ফেসবুক মিথ্যা তথ্য জানিয়ে চিহ্নিত করে দিয়েছে, ‘কাইস হাসান’ পেজ থেকে সেটি এখনো সরানো হয়নি।  তুরস্কভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান টেইট- এর প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনেও ভিডিওটি স্ক্রিপটেড বা সাজানো নাটকের অংশ বলে জানানো হয়।

আবার মিশরভিত্তিক একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একই ভিডিও পোস্ট করা হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি। তবে সেখানে ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত কিছু বলা নেই। ভিডিওর ভেতরে আরবি ভাষায় লেখা, “বিয়ে হলো কপাল এবং নসিবের খেলা।” অন্যদিকে আল-মাশহাদ নামের একটি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম পোস্টটি উল্লেখ করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যেখানে ঘটনাটি ভারতের বলে জানানো হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আরও একটি সংবাদমাধ্যম আল-মারসাদ থেকেও ভিডিওটি প্রকাশ করতে দেখা গেছে। 

ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
ভিডিওটি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যমেড় প্রতিবেদন।

পাকিস্তান থেকে পরিচালিত একটি ফেসবুক পেজ ‘মিডিয়া বাইটস’, যারা নিজেদের সংবাদমাধ্যম বলে দাবি করে, একই ভিডিও গত বছরের জুলাই মাসে পোস্ট করেছে। পূর্ব আফ্রিকার দেশ তানজানিয়া থেকে পরিচালিত ফেসবুক পেজেও একই ভিডিও পোস্ট হতে দেখা গেছে। তবে এই পোস্টে কোনো দাবি যুক্ত করা ছিল না।

ফেসবুক ও এক্সের মতো ইনস্টাগ্রামথ্রেডসেও ভিডিওটি হাস্যরসাত্মকভাবে ছড়াতে দেখা গেছে। 

বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত পেজও থেমে থাকেনি

ওয়েডিং স্টুডিও পেজের আরেকটি ভিডিও বিভ্রান্তিকর দাবিতে প্রথম ছড়াতে দেখা যায় ২০২৫ সালের ১৮ মে। এবার ভিন্ন দেশ নয়, নিজেদের সংবাদমাধ্যম দাবি করা বাংলাদেশের ফেসবুক পেজ ‘দৈনিক নতুন দিগন্ত’ থেকে ৪ মিনিট ৩১ সেকেন্ডের ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, “আমি বুড়া বেডারে করতামনা বিয়া; কন্যার আহাজারি। ধামরাইয়ে জোর করে মেরে ধরে বিয়েতে বাধ্য করলেন মা।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি পেজের ফিচার পোস্ট হিসেবে আছে। ভিউ হয়েছে ১০ লাখের বেশি। শেয়ার হয়েছে চার হাজার বারের বেশি। প্রতিক্রিয়া ছিল ১৫ হাজারের অধিক। 

বাংলাদেশ-ভিত্তিক আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যম (, ) ও ইনস্টাগ্রামেও ভিডিওর দৃশ্য ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর দাবিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। 

ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে ওয়েডিং স্টুডিও পেজের ভিডিও।

২০২৫ সালের ৩০ মে তথ্য যাচাইকারী সংস্থা বুম বাংলাদেশ ভিডিওটির সত্যতা জানিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিরোনামে জানানো হয়, “জোর করে বিয়ে দেওয়ার এই ভিডিওটি বাস্তব নয় বরং স্ক্রিপ্টেড।” বুম বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকেও দেখা যায়, ভিডিওটি ফেসবুক পেজ ‘ওয়েডিং স্টুডিও’ ও এটির সঙ্গে সংযুক্ত অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে বিনোদনের লক্ষ্যে পোস্ট করা  হয়েছিল। পরে সেখান থেকে খণ্ডিত অংশ নিয়ে ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হয়েছে। 

সাম্প্রদায়িক উষ্কানিতেও ওয়েডিং স্টুডিও-এর ভিডিও

ওয়েডিং স্টুডিও থেকে ভিডিও ফুটেজ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিভ্রান্তিকর দাবিতে ছড়াতে দেখা যায় ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর। ‘হিন্দু ভয়েস’ নামের একটি ভারতভিত্তিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “নিকাহ হালালা হ্যাশট্যাগ বাংলাদেশ।”  ভিডিওতে দেখা যায়, এক বয়স্ক ব্যক্তি বরের সাজে রয়েছেন। কনের সাজে আছেন অপেক্ষাকৃত কম বয়সী এক নারী। তিনি বরকে “বুড়া (বৃদ্ধ)” সম্বোধন করে তার সঙ্গে যেতে অসম্মতি জানাচ্ছেন ও কান্নাকাটি করছেন। তবে বরের সাজে থাকা ব্যক্তি ও আশেপাশের লোকজন পাত্রীর হাত ধরে টানাটানি করছেন। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি তিন শর অধিক রিপোস্ট হয়েছে। 

‘হিন্দু ভয়েস’-এর পোস্টটি বেশ কিছু এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করতে দেখা গেছে। একজন শেয়ার করে ক্যাপশনে হাহা ইমোজি যোগে লিখেছেন, “ইসলামে নারী ক্ষমতায়ন।” আরেকজন শেয়ার করে লিখেছেন, “এই ইসলামি গোষ্ঠীর ওপর ধিক্কার! অমানবিক, ঘৃণ্য জীব! এভাবেই ইসলাম নারীদের মুক্তি দিচ্ছে” (অনুবাদকৃত)। ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে আরও একাধিক ব্যবহারকারীকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ভিডিওটির সমালোচনা করতে দেখা গেছে। যেখানে তারা ভিডিওর দৃশ্য সত্য ধরে নিয়ে ইসলাম ধর্মের রীতিনীতি নিয়ে সমালোচনা করেছেন। পোস্টগুলো অন্তত চার মাস আগের, এবং এখনো সামাজিক মাধ্যমে ভেসে বেড়াচ্ছে। এই ভিডিও নিয়েও একাধিক ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট (, , , ) প্রকাশিত হয়েছে।

ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
সামাজিক মাধ্যম এক্সে ভারতভিত্তিক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ওয়েডিং স্টুডিওর ভিডিও পোস্ট করা হয়।

এছাড়া, ‘হিন্দু ভয়েস’ থেকে প্রকাশিত ভিডিওটি জাপানভিত্তিক একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও রিপোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “বাংলাদেশ। মনে হচ্ছে এখানে নিকাহ হালাল নামে একটি প্রথা আছে। ইসলামে, যদি কোনো স্বামী তিনবার তালাক দেয়, তাহলে তারা আবার বিয়ে করতে পারে না। একটিমাত্র ব্যতিক্রম আছে: নতুন স্বামীর সাথে যৌন সম্পর্কের পর তালাক দিলে, চতুর্থ বিয়ে করা সম্ভব হয়। দৃশ্যত, এই প্রথাটির অপব্যবহার করে নিজের স্ত্রীকে অন্য পুরুষের কাছে পাঠানো হয়। এক অদ্ভুত প্রথা।”

ভিডিওটি নিয়ে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমও বিভ্রান্তিকর প্রেক্ষাপট জানিয়ে খবর প্রকাশ করে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এপিবি নিউজ, ইন্ডিয়া ডট কম, পাঞ্জাব কেসারিডেইলি হান্ট একে বাস্তব ঘটনা বলে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

এপিবি নিউজের শিরোনাম অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “ভিডিও: বাবা যখন তার অল্পবয়সী মেয়েকে ৫০ বছর বয়সী এক বরের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছিলেন, তখন কনে কেঁদে ফেলল! ভিডিওটি দেখলে আপনার রক্ত ​​গরম হয়ে যাবে।” একইভাবে অন্যান্য শিরোনামেও ভিডিওটি পাঠকদের সঙ্গে বিভ্রান্তিকরভাবে পরিচয় করিয়ে দেয় সংবাদমাধ্যমগুলো।

  • ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
  • ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে

সত্যতা যাচাই করে এখন পর্যন্ত একাধিক ভারতীয় মিডিয়া ও তথ্য যাচাইকারী সংস্থা ভিডিওটি নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে (, , , )। তবে ‘হিন্দু ভয়েস’-এর এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিও যাচাই করে সর্বপ্রথম ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশ ভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমর স্ক্যানার। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, ডিসমিসল্যাব থেকেও একই ভিডিও যাচাই করে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ‘হিন্দু ভয়েস’ বা ভারতীয় সংবাদমাধ্যম কেউই বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনে প্রচারিত ভিডিওটি সংশোধন করেনি। 

পরবর্তীকালে ভিডিওটি ২০২৬ সালে আবারও বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে একাধিকবার একই দাবিতে প্রচারিত হয়েছে (, , , , )। এমনকি গত ২২ এপ্রিলেও ভিডিওটি একই দাবিতে প্রকাশ করা হয়েছে। 

সংবাদ আকারে বাংলাদেশেও প্রচার ওয়েডিং স্টুডিওর ভিডিও

‘ওয়েডিং স্টুডিও’ থেকে ভিডিও নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবিতে প্রচারের চতুর্থ ঘটনা দেখা যায় সাম্প্রতিক সময়ে। এই ভিডিওটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভিত্তিক একাধিক পেজ থেকে বিভ্রন্তিকর দাবিতে ছড়াতে দেখা গেছে। নিজেদের সংবাদমাধ্যম দাবি করা পেজ ‘দ্য ডেইলি মেহেন্দীগঞ্জ’ থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “জোরপূর্বক বৃদ্ধ এর সাথে তরুণীকে বিয়ে। ভিডিও ভাইরাল।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি সাড়ে তিন লাখের বেশি ভিউ হয়েছে। শেয়ার হয়েছে, চার শর বেশি। এছাড়া ‘টাইমস বাংলা’ ও ‘নিউজ টাইমস টোয়েন্টিফোর’ নামের দুইটি ফেসবুক পেজ থেকেও ভিডিওটি প্রচার করা হয়। 

ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
বাংলাদেশ-ভিত্তিক একাধিক ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটিকে বিভ্রন্তিকর দাবিতে ছড়াতে দেখা গেছে।

গত ২৬ এপ্রিল ভিডিওটি যাচাই করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ডিসমিসল্যাব। ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি ওয়েডিং স্টুডিও-র সদ্য প্রকাশিত নাটকের একটি অংশ। যেখানে, ‘ওয়েডিং মিডিয়া’ সংশ্লিষ্ট আরেকটি ইউটিউব চ্যানেল ‘এনকে মিডিয়া’ বিশ্লেষণ করে ‘ডিসমিসল্যাব।’ এতে দেখা যায়, পাত্রের সাজে থাকা ব্যক্তি একেক কনটেন্টে একেক চরিত্রে অভিনয় করছেন।

‘ওয়েডিং স্টুডিও’ পেজের আদ্যোপান্ত

তথ্য যাচাইকারী সংস্থাগুলোর ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনগুলোতে যে নামটি বার বার এসেছে সেটি হলো, ফেসবুক পেজ ‘ওয়েডিং স্টুডিও।’ এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পেজটির ফলোয়ার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পেজটি থেকে নিয়মিত বিয়ে, গায়ে হলুদ ও বাসর ঘরের মিউজিক ভিডিও পোস্ট করা হয়। কিছু ভিডিও একাধিকবারও পোস্ট করতে দেখা যায়। 

ওয়েডিং স্টুডিও’ পেজটি তৈরি করা হয়েছে ২০২২ সালের ২৮ জুলাই। পেজটির নাম শুরুতে ‘ওয়েডিং স্টুডিও’ থাকলেও পরে পরিবর্তন করে রাখা হয়, ‘এএন মিডিয়া’। পরে আবারও নাম পরিবর্তন করে ‘ওয়েডিং স্টুডিও’ রাখা হয়। 

পেজের বায়োতে ইংরেজিতে লেখা, “দয়া করে আমাদের ভিডিওগুলোকে কেউ সিরিয়াসলি নেবেন না। আমাদের রিলগুলো শুধুমাত্র আপনাদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে এবং বাস্তবতার বা কোনো সত্য ঘটনার সাথে এর কোনো মিল নেই। আমরা কারও বিরুদ্ধে কোনো ভিডিও তৈরি করি না। দর্শকদের প্রতি অনুরোধ, দয়া করে কেউ কোনো ধরনের ধর্মীয় মন্তব্য করবেন না। আমরা সকল ধর্মকেই সম্মান করি।” উল্লেখ্য, ইংরেজিতে লেখা বায়োতে কয়েকটি শব্দ অসম্পূররণ ছিল, যা কোনো অর্থ তৈরি করে না। 

ওয়েডিং স্টুডিও’ পেজটির লোকেশনে সৌদি আরবের রিয়াদ উল্লেখ থাকলেও ট্রান্সপারেন্সি অংশে গিয়ে দেখা যায়, এটি বাংলাদেশ থেকে তিনজন অ্যাডমিন দ্বারা পরিচালিত। পেজটিতে সৌদি আরব-ভিত্তিক একটি মোবাইল নাম্বার যুক্ত আছে। এই নাম্বারে একটি হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টও পাওয়া যায়। তবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এছাড়া, পেজে মেসেজ করলেও কোনো সাড়া মেলেনি।

ফ্যাক্ট চেক জোরপূর্বক বিয়ের নাটক বাংলাদেশের, অপতথ্য ছড়াচ্ছে বিশ্বজুড়ে
ওয়েডিং স্টুডিও পেজের স্ক্রিনশট।

‘ওয়েডিং স্টুডিও’ পেজের কনটাক্ট ডিটেইলসে দুইটি ইউটিউব চ্যানেল ও একটি টিকটক অ্যাকাউন্টের লিংক সংযুক্ত থাকতে দেখা যায়। ইউটিউব চ্যানেল দুটির নাম ‘এএন মিডিয়া’ ও ‘এএন মিডিয়া ২৬।’ টিকটক অ্যাকাউন্টের নাম ‘এএন মিডিয়া ৩।’ আবার ‘এএন মিডিয়া’ নামের ইউটিউব চ্যানেলেও একাধিক সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টের লিংক যুক্ত থাকতে দেখা যায়। অ্যাকাউন্টগুলো থেকে একই ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করতে দেখা যায়। 

ডিসমিসল্যাব সবগুলো অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত লিংক ও অন্যান্য সম্পৃক্ততা বিশ্লেষণ করে ১০টি স্বতন্ত্র সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট খুঁজে পায়। এগুলোর মধ্যে চারটি ইউটিউব (, , , ), চারটি ফেসবুক (,,,), একটি টিকটক ও একটিইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট। সবগুলো অ্যাকাউন্ট থেকে একই ধরনের কনটেন্ট পোস্ট করা হয়। কখনো একটি বড় নাটক, আবার কখনো সেই নাটকের বিভিন্ন অংশ ছোট ছোট রিল আকারে পোস্ট করতে দেখা যায়।

ডিসমিসল্যাবের পাওয়া ১০টি অ্যাকাউন্টই একে অপরের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত। চারটি ফেসবুক পেজের মধ্যে তিনটিকেই দেখা যায় একটি মাত্র ফেসবুক ফেজ ‘এনকে মিডিয়া’- কে ফলো করতে। ‘এনকে মিডিয়া’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলও খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানে পূর্ণ দৈর্ঘ্যের নাটকগুলো আপলোড করা হয়। 

মূলত ওয়েডিং স্টুডিও পেজ ও এর সঙ্গে যুক্ত অ্যাকাউন্টগুলো থেকেই একই ধরনের গল্পের নাটক প্রচার করা হয়। যেখানে পাত্র হিসেবে থাকেন একজন বৃদ্ধ ব্যক্তি ও পাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেন তুলনামূলক কম বয়সী নারী। ঘুরেফিরে বার বার এই একই ধরনের কনটেন্ট অ্যাকাউন্টগুলো থেকে পোস্ট করতে দেখা যায়। আর তা থেকে ছোট ছোট অংশ কেটে বিভিন্ন দাবিতে দেশি-বিদেশি অ্যাকাউন্ট থেকে পুনরায় প্রচার করা হয়। ‘ওয়েডিং স্টুডিও’ পেজটি থেকে প্রকাশিত নতুন কনটেন্টের বিভিন্ন অংশ নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবিতে প্রচারিত হয় দেশি- বিদেশি সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো থেকে। 

‘ওয়েডিং স্টুডিও’ কেন বার বার একই গল্পের নাটক বিনোদনমূলক কনটেন্ট হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করছে? কারা আছেন এই পেজগুলোর পেছনে? এমন তথ্য জানাতে চেয়ে সবগুলো পেজে মেসেজ করে ডিসমিসল্যাব। তবে কোনো পেজ থেকেই কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পেজে থাকা যোগাযোগের নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টেও একাধিকবার মেসেজ ও কল দেওয়া হয়। তবে গত তিন মাসে এই অ্যাকাউন্ট থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। 

আরো কিছু লেখা