
“ইন্ডিয়ায় যদি আর একটা মুসলিমের ওপর নির্যাতন হয়, আমরাও বাংলাদেশের মধ্যে সেভাবে একজন হিন্দুকে নির্যাতন করব।”— অবলীলায় এমন হুমকি দিচ্ছেন এক কনটেন্ট ক্রিয়েটর। বাংলাদেশি যুবকের বানানো এমন ভিডিওর খণ্ডিত অংশ সমন্বিতভাবে ছড়ানো হচ্ছে ফেসবুকে। কেউ ছড়াচ্ছেন সমর্থন জানিয়ে, কেউ আবার নিন্দা জানিয়ে।
গত এপ্রিলের শুরুতে বাংলাদেশ-ভিত্তিক একটি পেজ থেকে ভিডিওটি প্রথম পোস্ট করা হয়। ফেসবুক কিছুদিন পর তা সরিয়ে নেয়। এটুকুতে শেষ হতে পারত, হয়নি। গত ৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বেসরকারিভাবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয়ী হয়। এরপর, সমর্থন ও নিন্দা— দুই ভাষ্যেই পুনরায় বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট হতে থাকে ভিডিও। বিশেষ করে গত ৫ মে ‘হিন্দু নির্যাতন’কে উৎসাহিত করে নতুন করে সমন্বিতভাবে প্রচার শুরু হয়।
‘অন্যায়ের প্রতিবাদ ও যথাযথ কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণে’ এমন ভিডিও সৃষ্টির দাবি মূল কনটেন্ট ক্রিয়েটরের। যদিও ফেসবুকের নীতি অনুযায়ী সাম্প্রদায়িক বার্তা বা সহিংসতার উসকানি দেওয়া যায় না এই প্ল্যাটফর্মে। বাংলাদেশের সাইবার সুরক্ষা আইনেও এমন কাজ নিষিদ্ধ। তবে, ১৩ মে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক এসব পোস্ট ফেসবুক সরায়নি।
অনুসন্ধানে প্রচারণার ধরনে একটি সমন্বয় দেখতে পায় ডিসমিসল্যাব। ফেসবুকে অন্তত ৯টি স্বতন্ত্র পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়, যেখানে ভিডিওর সঙ্গে হুবহু একই ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, যুবকের এমন মন্তব্যের হুশিয়ারি ও নিন্দা জানিয়েও ভিডিওটি পোস্ট করেন বিভিন্ন ব্যবহারকারী।
গত ৫ মে ফেসবুকে ‘আল আবরার’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে এক যুবককে বলতে শোনা যায়, “ইন্ডিয়ায় যদি আর একটা মুসলিমের উপর নির্যাতন হয়, আমরাও বাংলাদেশের মধ্যে সেইভাবে একজন হিন্দুকে নির্যাতন করব। ইন্ডিয়ায় যেইভাবে মুসলিমদেরকে নির্যাতন করা হবে, আমরাও সেইভাবে এখন বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর নির্যাতন করব। বাংলাদেশে যে হিন্দুরা আছে তাদেরকে খৎনা করে মুসলমান বানামু, তাদেরকে কালিমা পড়ামু। যা হওয়ার পরে হবে। জেল খাটতে হইলে জেল খাটমু, মরতে হইলে মরমু সমস্যা নাই।”

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ‘আল আবারর’ প্রোফাইল থেকে পোস্ট হওয়া ভিডিওটি ৪০ বারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে ৫০০- এর অধিক। ৯০ টির বেশি মন্তব্য লক্ষ্য করা যায়। সেসব মন্তব্যে দেখা যায়, নির্যাতনের এমন প্রকাশ্য ঘোষণাকে সমর্থন জানাচ্ছেন অধিকাংশ ব্যবহারকারী। একজন লিখেছেন, “কথায় কাজে মিল রাখতে পারলে আপনাদের স্বাগতম, এই লড়াইয়ে আমি আপনার পাশে আছি।” আরেকজনের মন্তব্য, “ইন্ডিয়াতে একটি মুসলিম মারলে বাংলাদেশের হিন্দুদের শান্তিতে থাকতে দেওয়া যাবে না।” মন্তব্যে বিপরীত চিন্তা বা প্রতিবাদের সংখ্যা ছিল একেবারেই হাতেগোনা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, হুবহু একই ক্যাপশন ব্যবহার করে অন্তত আরও আটটি স্বতন্ত্র অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়েছে। সবগুলো পোস্টের ভিডিও ও ক্যাপশন হুবহু একইরকম। সবগুলোর ক্যাপশনে লেখা— “সোজা কথা ভারতে মুসলমানদের মা*রলে বাংলাদেশে হিন্দু মা*রা হবে… 💥☝️লাউড এন্ড ক্লিয়ার কথা।” ভিডিওর গ্রাফিক্সে ‘হিন্দুজ নিউজ’ নামের একটি লোগো। এছাড়া, গ্রাফিক্সে ভিডিওর উপরে লেখা, “বাংলাদেশের হিন্দুদের উপর হামলার হুমকি যুবকের।”
ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্ট থেকে হওয়া মোট নয়টি স্বতন্ত্র পোস্টের আটটিই গত ৫ মে আপলোড করা হয়েছে। তবে ভিডিওটি এই ক্যাপশনে আল আবরার নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকেই প্রথম ছড়াতে দেখা যায়। পরবর্তীকালে সেই ক্যাপশন অনুকরণে অন্যান্য অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়ে। অ্যাকাউন্টগুলো পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, এগুলো থেকে প্রায়ই একই ধরনের পোস্ট করা হয়, এবং একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের বয়ান ঘিরে এ পেজগুলোর সক্রিয়তা বেশি।

ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, অ্যাকাউন্টগুলো থেকে একাধিকবার সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে (১, ২, ৩)। যেগুলো নিয়ে বিভিন্ন তথ্যযাচাই সংস্থা ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। তবে পোস্টগুলো সরানো হয়নি।
গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি জয়লাভ করার পর, এই অ্যাকাউন্টগুলো থেকে ভারত ও সনাতনধর্মীদের বিরুদ্ধে এমন প্রচারণা বাড়তে দেখা যায়।
ভিডিওটি প্রথম প্রকাশের কিছুদিন পরেই গত এপ্রিলের শুরুতে সরিয়ে নেয় ফেসবুক। তবে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে দেখা যায়, মুছে ফেলার আগেও এটি বিভিন্নভাবে ভাইরাল হয়েছিল। এরপর তা আড়ালে চলে যায়। কিন্তু দৃশ্যপট বদলায় মে মাসের শুরুতে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের ঠিক একদিন পর ‘হিন্দুজ নিউজ’ নামের একটি বাংলাদেশ-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গত ৫ মে তাদের ফেসবুক পেজ থেকে কোনো বিস্তারিত প্রেক্ষাপট ছাড়াই ভিডিওটি পোস্ট করে।
ছড়ানো ভিডিওগুলোতে থাকা লোগোর সূত্র ধরে কিওয়ার্ড সার্চ করে হিন্দুজ নিউজের ফেসবুক পেজটি খুঁজে বের করে ডিসমিসল্যাব। দেখা যায়, গত ৫ মে ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর হামলার হুমকি মুসলিম যুবকের।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি এক হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়েছে। এতে প্রতিক্রিয়া পড়েছে সাত হাজারের ওপর। আর মন্তব্য এসেছে চার হাজারের বেশি। ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, মন্তব্যের ঘরে বেশির ভাগ মানুষই যুবকের ওই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।

তবে হিন্দুজ নিউজের পোস্টে ভিডিওর প্রেক্ষাপট নিয়ে কিছুই জানানো হয়নি। ভিডিওতে থাকা যুবকের পরিচয় বা ভিডিওর মূল সূত্রের বিষয়েও কিছু বলা নেই। সংবাদমাধ্যমটি কীভাবে ওই যুবকের ফুটেজ পেয়েছে তা জানতে চেয়ে পেজে থাকা মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তবে বারবার ‘কল ফরওয়ার্ড’ হচ্ছিল। হোয়াটসঅ্যাপেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে মেসেজ পাঠায় ডিসমিসল্যাব। উত্তরে তারা একটি ফেসবুক পোস্টের লিংক দিলেও, ভিডিওর প্রেক্ষাপট বা মূল সোর্স সম্বন্ধে কোনো কিছুই জানাতে পারেনি।
ভিডিওটির মূল উৎস কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একাধিক কিফ্রেম সার্চ করে ডিসমিসল্যাব।
এতে রাব্বিল ইসলাম নামের একটি অ্যাকাউন্টে একই ভিডিও পাওয়া যায় ভিন্ন রূপে। গত ২ এপ্রিল পোস্ট হওয়া সে ভিডিও এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৯ হাজারের বেশি শেয়ার হয়েছে। প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে ৯০ হাজারের অধিক। পেজটি ভারতের মুর্শিদাবাদ থেকে পরিচালিত।

এই ভিডিওর সূত্র ধরে অনুসন্ধান করলে ভিডিওর মূল নির্মাতার পেজটি খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। পেজের নাম রিঅ্যাকশন ভিডিও। ভিডিওতে যে যুবককে নির্যাতনের হুমকি দিতে দেখা গিয়েছিল, এই পেজে একই চেহারার যুবকের বেশকিছু কনটেন্ট খুঁজে পাওয়া যায়। পেজে থাকা ছবির সঙ্গেও চেহারা মিলে যায়। তবে হিন্দু নির্যাতনের হুমকি দিয়ে বানানো আলোচিত ভিডিওটি এই পেজে পাওয়া যায়নি।
অধিকতর যাচাইয়ের স্বার্থে, পেজের অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। অ্যাডমিন স্বীকার করেন, ভিডিওতে থাকা যুবকটি তিনিই। তার দাবি, ফেসবুক কর্তৃপক্ষ তার ওই ভিডিওটি সরিয়ে নিয়েছে।
আলোচিত ভিডিওটি মেটা কবে সরিয়েছে— এমন প্রশ্নে তিনি নির্দিষ্ট তারিখ বলতে পারেননি। তবে জানান, আপলোডের কয়েকদিন পর, এপ্রিলের শুরুর দিকেই ফেসবুক এটি সরিয়ে নিয়েছিল। তবে ওই পেজে এমন আরও উসকানিমূলক একাধিক ভিডিও পাওয়া যায় (১, ২) । এর মধ্যে একটি ভিডিওতে তিনি বলেন, “এখন আপনারা কী চান? আপনারা কি চান আমরা বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু করে দিই? আপনারা এটাই বুঝাচ্ছেন, আপনারা এটাই বারবার আমাদেরকে বুঝাচ্ছেন আমরা কেন চুপ করে আছি, আমরা কেন হিন্দুদেরকে নিরাপত্তা দিচ্ছি, আরামে ঘুমাতে দিচ্ছি।”
নিজের মোবাইলে একটি ভিডিও দেখিয়ে তিনি আরও বলেন, “এই যে দেখেন আরেকজন মুরুব্বি, ওনাকে উগ্রবাদী হিন্দুরা কীভাবে মারধর করা দেখেন… দেখছেন? বলেন এগুলা কি মিথ্যা? এরকম আমার কাছে লক্ষ লক্ষ প্রমাণ আছে। অতএব যদি আপনারা এগুলা বন্ধ না করেন তাহলে আমরাও অ্যাকশন শুরু করে দেব ইন্ডিয়াতে… মানে বাংলাদেশে এই ধরনের অ্যাকশন শুরু করে দিব। আমাদেরকে বাধ্য করবেন না। মুসলিম ক্ষেপে না ক্ষেপে না, যদি একবার ক্ষেপে তাহলে নারায়ে তাকবীর বলবে আর গর্দান ফালান শুরু করে দিবে। মুসলিম ঠাণ্ডা থাকে নরমাল থাকে, কিন্তু যদি একবার ক্ষেপে যায় তাহলে সমস্যা আছে। অতএব যে হিন্দু ভাইরা আছেন, ভালো হিন্দু ভাইরা আছেন, তারা এগুলা প্রতিবাদ করুন, এগুলা বন্ধ করার জন্য চেষ্টা করেন।”

রিঅ্যাকশন ভিডিও পেজটির ট্রান্সপারেন্সি অংশে গিয়ে দেখা যায়, এটি ২০২৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর ক্রিয়েট করা হয়েছে। নাম পরিবর্তন করা হয়েছে তিন বার। পেজের অ্যাডমিন নিশ্চিত করেছেন, তিনি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি জেলায় (নিরাপত্তার স্বার্থে নাম উল্লেখ করা হচ্ছে না) বসবাস করেন।
সামাজিক মাধ্যমে কেন এমন ভয়াবহ উসকানি ছড়ালেন তিনি? এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি হচ্ছি খুব সাধারণ একজন মানুষ। আমার শিক্ষাও কোনো অত নেই। আমি আরবি লাইনে পড়াশোনা করেছি, মাদ্রাসা লাইনে পড়াশোনা করেছি। বাংলা ইংরেজি লাইনে আমার অত পড়াশোনা নেই। তবে আমার কাছে যেটা জুলুম বা অত্যাচার মনে হয় সেটা আমি সহ্য করতে পারি না।”
যুবক আরও বলেন, “আমি চাচ্ছি অন্যায়ের বিপক্ষে কথা বলার জন্য। আমি যে কন্টেন্ট বা টাকা পাওয়ার জন্য, করি তা না। আমারে ফেসবুক কিন্তু ইস্যু দিয়ে রাখছে, পাঁচদিন আমাকে ফেসবুকে ঢুকতে দেয় নাই, আমার কন্টেন্ট সব বন্ধ করে রেখেছে। তারপরও যখন আবার ফেরত পাইছি, ফেসবুক আমাকে এগুলা সম্পূর্ণ করতে নিষেধ করে রেখেছে, তারপরও আমি করে যাচ্ছি। কারণ আমার ওই যে টাকা পাব, ওই আশা রাখি না মাথায়।”
‘রিঅ্যাকশন ভিডিও’-তে ফেসবুকের মনিটাইজেশন আছে বলে জানিয়েছেন পেজ অ্যাডমিন, “কয়েকটা কন্টেন্টে আমি বলে রেখেছি, আমার ফেসবুক থেকে আর্নিং যদি কখনো হয়, সেগুলো আমি ফিলিস্তিনের জন্য দান করে দিব। ইনশাআল্লাহ আমি কয়েকবার দিয়েও দিয়েছি লাইভের মধ্যে এসে। পাঁচ হাজার দিয়েছি। কত, ১২০০ থেকে ১৩০০ টাকার মতো পাইছিলাম, কিন্তু ৫০০০ টাকার মতো ফিলিস্তিনের জন্য দিয়ে দিছি।”
তবে পেজটিতে শুধু সনাতনধর্মীদের উদ্দেশ্যে বিদ্বেষই নয়, এর আগে ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়েও ভুয়া তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, “এটা আসলে আমি বুঝতে পারিনি। হয়তো ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।”
ভারতে মুসলিম নির্যাতনের বদলা হিসেবে বাংলাদেশে ‘হিন্দু নির্যাতন’ করা কি কোনো যৌক্তিক সমাধান? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “না, এটা কোনো সমাধান না। আমরা তো এই ধরনের কাজ কখনো করিই নাই, এটা আমরা অ্যাকসেপ্টও করি না।”
তাহলে কেন দিলেন এমন প্রকাশ্য হুমকি? তার দাবি, ভারতে মুসলিমদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে বাংলাদেশের আলেম সমাজ বা সরকার নীরব। তাই তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতেই এই উসকানির আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বলেন, “কেউ কথা না বলার কারণে আমি হিটমূলক এগুলা বলেছি, যেন আমার কথাগুলো তাদের কাছে পৌঁছায়। আমার টার্গেট ছিল এটা।”
ভবিষ্যতে এ ধরনের কনটেন্ট বানাবেন কি না, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমি যতকাল জীবিত থাকব, আমি অন্যায় যেটা থাকবে সেটার বিপক্ষে কথা বলে যাব।”
তবে ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর নির্যাতনে আহবান জানিয়ে আবার কনটেন্ট বানানোর পরিকল্পনা রয়েছে কি না জানতে চাইলে বলেন, “না না না। এটা আমি ওই ভিডিওতে বলার পরে দেখেছি যে সমস্যা হচ্ছে। আমি নিজের থেকেও দুই একটা ভিডিও কেটে দিয়েছি এবং কয়েকটি ভিডিওতে আমি বলেছি যে— এটা আমাদের ঠিক না, আমার ভুল বক্তব্য। আমরা মিলেমিশে সবাই থাকার জন্য চেষ্টা করব। আলোচনায় আসার জন্য।”
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি কয়েকটি ভিডিওতে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও হাইকমিশনারের কাছে দুই দেশের সম্প্রীতি রক্ষার আবেদন জানিয়েছেন। যেন বাংলাদেশে হিন্দু এবং ভারতে মুসলিমরা নিরাপদে থাকেন।
অনলাইনে এ ধরনের প্রচারণা সমাজে প্রভাব ফেলে কি না জানতে চেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা-র সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি বলেন, “সামাজিক মাধ্যম আমাদের এক ধরনের আয়না হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটা দিয়ে দেশ চলছে- এরকম একটা জনমতও দেখা গেছে বেশ কিছুদিন আগে। সুতরাং সামাজিক মাধ্যমে এ ধরণের প্রচারণা সমাজকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। আমরা গত একুশ মাসে বাংলাদেশের অনেক জায়গায় বিভিন্ন ঘটনা দেখেছি। একটা অত্যন্ত ভয়াবহ ঘটনা কিছুদিন আগেই ঘটে গেছে। একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী যুবককে পিটিয়ে, গাছে ঝুলিয়ে, পুড়িয়ে মারা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “সামাজিক মাধ্যমে সবার মতামত দেওয়ার ক্ষমতা আছে, যেটা পত্রিকায় বা নিউজে উপায় নেই। সমাজে স্ব-শরীরে যখন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা হয় তখন সেখানে সামাজিক প্রতিষ্ঠান থাকে, পরিবার থাকে, ক্ষমতা কাঠামো থাকে। এগুলো নানাভাবে নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য বজায় রাখে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে তো আসলে কোনো নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নাই। এখানে কোনো পাড়া-মহল্লা নাই। এখানে যে যা খুশি তাই বলতে পারে। মিথ্যা কথা বললেও সেটার কোনো প্রতিকার নাই, প্রতিবিধান নাই। এটা এ ধরনের অপরাধ বা এ ধরনের কাজ করতে মানুষকে অনেক বেশি উৎসাহিত করে।”
মেটার হেটফুল কনডাক্ট নীতিমালার আওতায় ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, যৌন অভিমুখিতা, প্রতিবন্ধীত্ব বা গুরুতর রোগের মতো সংরক্ষিত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে কাউকে আক্রমণ বা অপমান করা যাবে না। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ সব পোস্ট এই নীতির বিরুদ্ধে যায়।
একইভাবে, ভায়োলেন্স এবং ইনসাইটমেন্ট নীতিমালা অনুযায়ী, এমন কোনো কনটেন্ট পোস্ট করা যাবে না সহিংসতার হুমকি দেয়, সহিংসতা ঘটাতে পারে বা কাউকে আঘাত করার আহ্বান জানায়। ‘হিন্দু নির্যাতনের’ বয়ান তৈরিতে যে ভিডিও ও ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো সরাসরি সহিংসতার আহবান জানাচ্ছে।
ফেসবুক আলোচিত ভিডিওর মূল সংস্করণ গত এপ্রিলের শুরুতে সরিয়ে নিলেও, একই পেজে থাকা এ ধরনের আরও অন্তত দুইটি ভিডিও (১, ২) এখনো দেখা গেছে যা সরানো হয়নি। এছাড়া, নতুন করে অন্য পেজ থেকে গত ৫ মে থেকে সাম্প্রদায়িক সহিংসতামূলক বয়ানে মূল ভিডিওটি পোস্ট করা হলেও সেগুলো এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ফেসবুকে দেখা যাচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ অনুসারে, “যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে বা ছদ্ম পরিচয়ে নিজের বা অন্যের আইডিতে অবৈধ প্রবেশ করে এমন কোনো কিছু সাইবার স্পেসে প্রকাশ বা প্রচার করেন বা করান, যা ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণামূলক বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং যা সহিংসতা তৈরি বা উদ্বেগ সৃষ্টি করে বা বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা করে, তাহলে এরুপ কাজ হবে একটি অপরাধ। অপরাধী ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ২ বছর পর্যন্ত জেল বা ১০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, বা উভয় শাস্তি দেওয়া হতে পারে।”
প্রসঙ্গত, সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক উসকানি বা সহিংসতা নিয়ে এর আগেও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব। এতে দেখা যায়, ফেসবুক ও টুইটারে টিএমডি (#TMD) হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে চরম ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতার ডাক দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতে।