
“আসসালামু আলাইকুম। স্বাগত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে। আমাদের ব্যাংক দিচ্ছে ৫০ হাজার থেকে ২০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত অনলাইন লোন এক থেকে পাঁচ বছরের জন্য। লাভের হার মাত্র ২.৪ শতাংশ। কত টাকা কত বছরের জন্য ঋণ নিতে চান, মেসেজ পাঠিয়ে আমাদের জানান। বিশ্ব ব্যাংকের সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।”
ডিজিটাল লোন সার্ভিস নামের একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট করা ১৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে এআই-নির্মিত দুই নারী এই দাবি করেন। জানানো হয়, বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে এই ঋণ দেওয়া হচ্ছে। মেসেঞ্জার ও ইনস্টাগ্রামসহ একাধিক মেটা প্ল্যাটফর্মে স্পন্সরড বিজ্ঞাপন হিসেবে একই ভিডিও ছড়িয়েছে।
ডিসমিসল্যাব–এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাংক এ ধরনের কোনো ঋণ প্রদান করে না। বরং গত দুই বছরে বৈশ্বিক এই ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে অন্তত দুইবার এ বিষয়ে সতর্কবার্তা দিয়েছে। তাদের নাম ব্যবহার করে পরিচালিত প্রতারণামূলক ঋণ প্রকল্প সম্পর্কে জনসাধারণকে সতর্ক করা হয়েছে এসব বিবৃতিতে।
এই প্রতারণায় শুধু বিশ্বব্যাংককেই ব্যবহার করা হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক, ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি), ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ও ব্যাংক অব আমেরিকার নাম ব্যবহার করেও অন্তত ২৬টি ফেসবুক পেজ থেকে ছড়ানো হয়েছে ক্ষুদ্র ঋণের বিজ্ঞাপন। আর্থিক সহায়তার আড়ালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ও পরিচয় অপব্যবহার করে এসব পেজ ব্যবহারকারীদের প্রতারণামূলক ঋণের ফাঁদে ফেলছে।
এ পেজগুলোর বেশিরভাগ কম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত হয়, আর কিছু পেজ কম্বোডিয়া ও বাংলাদেশ থেকে যৌথভাবে পরিচালিত। বিশ্লেষণে আরও দেখা গেছে, একাধিক ফেসবুক পেজ একই ধরনের বিজ্ঞাপন চালিয়েছে, যা সম্ভাব্য সমন্বিত অপারেশনের ইঙ্গিত দেয়।
প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের ঋণের জন্য সরাসরি পেজে যোগাযোগ করতে বলা হয়। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে ব্যবহারকারীরা পেজের মেসেঞ্জার ইনবক্সে চলে যায়, যেখানে পরিচালনাকারীরা জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, ফোন নম্বর, ছবি ইত্যাদি ব্যক্তিগত তথ্য চায় এবং ঋণ অনুমোদনের জন্য অগ্রিম অর্থ দাবি করে।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ডিসমিসল্যাব ১০টি ফেসবুক পেজের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এসব প্রতারণার কার্যপদ্ধতি নথিভুক্ত করার জন্য নির্দেশনা অনুসরণ করে অনুসন্ধান দল, তবে কোনো অর্থ প্রদান করেনি।
প্রতারণার স্পষ্ট ও পুনরাবৃত্ত ধরন থাকা সত্ত্বেও, অধিকাংশ বিজ্ঞাপন এখনো বিভিন্ন মেটা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। এসব কনটেন্ট মেটার প্রতারণা, জালিয়াতি ও বিভ্রান্তিকর কার্যক্রম সংক্রান্ত নীতিমালা লঙ্ঘন করে, তবুও নতুন পেজ তৈরি করে একই ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়া অব্যাহত রয়েছে।
প্রতারণামূলক পেজ থেকে প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন
২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল বিশ্বব্যাংকের লোগো প্রোফাইল ছবি হিসেবে ব্যবহার করে “সহজ শর্তে” ঋণের একটি ফেসবুক বিজ্ঞাপন সামনে আসার পর ডিসমিসল্যাব এই অনুসন্ধান শুরু করে। WB Small Loan BD নামের পেজটির ট্রান্সপারেন্সি (স্বচ্ছতা) অংশে দেখা যায়, এটি কম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত। এরপর ডিসমিসল্যাব “easy loan facility” এবং “loans on easy terms” কিওয়ার্ড ব্যবহার করে মেটার অ্যাড লাইব্রেরি অনুসন্ধান করে। এতে গবেষকেরা অন্তত আরও ২৫টি ফেসবুক পেজ শনাক্ত করেন, যেগুলো একই ধরনের বিজ্ঞাপন চালাচ্ছিল এবং সবগুলোই কম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত।
১১ থেকে ১৫ এপ্রিলের মধ্যে এসব পেজে অন্তত ৩৭টি সক্রিয় বিজ্ঞাপন নথিভুক্ত করা হয়। অনেক বিজ্ঞাপনে একই ভিডিও, ছবি ও ক্যাপশন বিভিন্ন পেজে পুনঃব্যবহার করা হয়েছে। এসব ভিডিওতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের নাম ও অফিশিয়াল লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ঋণ দেওয়ার দাবি করা হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের নাম ও লোগোর অপব্যবহার ছিল সবচেয়ে বেশি। অন্তত ১৫টি পেজ থেকে চালানো ২২টি বিজ্ঞাপনে দাবি করা হয়েছে যে ঋণটি বিশ্বব্যাংক থেকে দেওয়া হচ্ছে। অন্য বিজ্ঞাপনগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক; ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি); ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ; এবং ব্যাংক অব আমেরিকার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি) এবং যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ফার্স্ট হোরাইজন ব্যাংকের নামও ব্যবহার করা হয়েছে।
অন্তত ১৯টি ফেসবুক পেজ গুগলের এআই ভিডিও তৈরির টুল ভিও (Veo) ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে। এসব ভিডিওর নিচের ডান কোণে “Veo” ওয়াটারমার্ক দেখা যায়। হাইভ মডারেশন নামের একটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল ব্যবহার করে বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এসব বিজ্ঞাপনের ভিজ্যুয়াল ও অডিও প্রায় শতভাগ এআই-সৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প নামের একটি পেজ কৃষক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ দেওয়ার বিজ্ঞাপনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একটি ছবি ব্যবহার করেছে। একই পেজ ১০ বছর মেয়াদে ৫০ হাজার থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আইএফএডি-অর্থায়িত ঋণের বিজ্ঞাপনও দিয়েছে। পেজটির প্রোফাইল ছবিতে আইএফএডি-এর লোগো ব্যবহার করা হয়েছে।
আরেকটি ক্ষেত্রে “আইসিসি-বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ঋণ প্রজেক্ট” প্রচারের বিজ্ঞাপনে সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি এআই-নির্মিত ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
MicrofinanceBD নামের একটি পেজ তাদের বিজ্ঞাপনে এটিএন বাংলার তিন বছর আগের একটি ভিডিও প্রতিবেদনের প্রথম ১৩ সেকেন্ড ব্যবহার করেছে। ওই ক্লিপে সংবাদ উপস্থাপক বলেন, “প্রথমবারের মতো মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ঋণ পাচ্ছেন কর্মজীবীরা। কাগজপত্র ছাড়াই ই-ঋণ অ্যাপের মাধ্যমে আবেদনের পর অনলাইনে যাচাই বাছাই শেষে ১৫ মিনিটে ঋণের টাকা গ্রাহকের ব্যাংক হিসেবে জমা হচ্ছে।”
পেজটির প্রোফাইল ছবিতে বাংলাদেশ সরকারের অফিসিয়াল লোগো রয়েছে। এরপর আরেকজন ব্যক্তি দাবি করেন, ঋণগুলো বিশ্বব্যাংক থেকে দেওয়া হচ্ছে। পরে আরেকটি কণ্ঠ যোগ হয়: “হ্যাঁ বন্ধুরা, তোমরা ঠিকই শুনেছ। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক শুধু তোমাদেরকে লোন দিচ্ছে না, দিচ্ছে সাহস, স্বপ্ন এবং পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক থেকে তোমরা পাচ্ছ ব্যবসায়িক লোন, কৃষি লোন, প্রবাসী লোন, জরুরি লোন, নারী উদ্যোক্তা লোন, শিক্ষা লোন, এছাড়া আরও অনেক লোন তো থাকছেই। তো বন্ধুরা দেরি কেন? আজই ঝামেলা ছাড়া সহজে লোন নিতে এখনই ঘরে বসে আবেদন করুন আমাদের ওয়ার্ল্ড ব্যাংকে। এখনই ভিজিট করুন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক অথবা মেসেজ করুন আমাদের ফেসবুক পেজে।”
তবে ২০২২ সালের ডিসেম্বরে এটিএন বাংলাতে প্রচারিত মূল প্রতিবেদনে বলা হয়, ই-লোন উদ্যোগটি বাংলাদেশের একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রহণ করেছে। সেখানে বলা হয়, “বাংলাদেশ ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদনের পর ঢাকা ব্যাংক আগামী বছরের শুরু থেকে তাদের ই-লোন সেবার মাধ্যমে ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ বিতরণের লক্ষ্য নিয়েছে।” প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনে মূল সম্প্রচারের এই অংশ বাদ দিয়ে বিশ্বব্যাংকের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

একই ভিডিও, একই বার্তা: উৎস অনুসন্ধান
বিজ্ঞাপন বিশ্লেষণে দেখা যায়, একই ভিডিও এবং বার্তা একাধিক ফেসবুক পেজে ব্যবহার করা হয়েছে। দুইজন নারী বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণ দেওয়ার দাবি করছেন- এরকম একটি এআই-নির্মিত ভিডিও অন্তত ১০টি পেজে বিজ্ঞাপন হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। এসব বিজ্ঞাপনে একই দাবি করা হয়েছে— বিশ্বব্যাংক ৫০ হাজার থেকে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অনলাইন ঋণ দিচ্ছে, মেয়াদ সর্বোচ্চ পাঁচ বছর এবং সুদের হার মাত্র ২.৪ শতাংশ।

অন্তত চারটি পেজ থেকে হুবহু একই বার্তার বিজ্ঞাপন দিতে দেখা যায়। তাতে লেখা: “আপনি এখন খুব সহজে ঘরে বসে ৫০ হাজার থেকে ৩০ লক্ষ টাকা ঋণ নিতে পারবেন। আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে আপনি ব্যবসায়িক ঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, প্রবাসী ঋণসহ সকল ধরণের ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবেন।”
বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে প্রবাসী শ্রমিক ও বিদেশে চাকরি প্রত্যাশীদের লক্ষ্য করে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাংক প্রবাসীদের জন্য স্বল্পসুদে সহজ ঋণ সুবিধা চালু করেছে। একটি বার্তায় বলা হয়েছে, “ওয়ার্ল্ড ব্যাংক নিয়ে এসেছে প্রবাসীদের জন্য স্বল্প সুদে সহজ ঋণের ব্যবস্থা। এমনকি অনলাইনের মাধ্যমে সহজ আবেদনে প্রবাসে থাকা অবস্থায় জরুরি প্রয়োজনেও লোন নিতে পারবেন আমাদের কাছ থেকে।”
প্রায় সব পেজেই সুদের হার, ঋণের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ পরিমাণ ও পরিশোধের মেয়াদ প্রায় একই। প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীদের সরাসরি পেজে যোগাযোগ করতে বলা হয় এবং বিজ্ঞাপনে ক্লিক করলে মেসেঞ্জারের ইনবক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
ফেসবুকের ট্রান্সপারেন্সি অংশ অনুযায়ী, ২৬টি পেজের মধ্যে ২৩টি কম্বোডিয়া থেকে পরিচালিত এবং বাকি তিনটি বাংলাদেশ ও কম্বোডিয়া থেকে যৌথভাবে পরিচালিত। এসব পেজের মধ্যে ১১টি ২০২৬ সালে, ১৩টি ২০২৫ সালে এবং দুটি ২০২৪ সালে তৈরি হয়েছে।
অনেক পেজই ঘন ঘন নাম পরিবর্তন করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের ২০ জুন তৈরি একটি পেজ প্রথমে Ajker Taja Khobor 24/7 নামে চালু হয় এবং মাত্র আট দিন পর এর নাম পরিবর্তন করে জনকল্যাণ সংস্থা করা হয়। BD Loan Service.01 এবং Digital Loan Service নামের আরও দুটি পেজও একাধিকবার নাম পরিবর্তন করেছে।
এই ২৬টি পেজের সম্মিলিত অনুসারী সংখ্যা শুধু ফেসবুকেই ১ লাখের বেশি। তাদের ভুয়া ঋণের বিজ্ঞাপন হাজার হাজার বার শেয়ার হয়েছে এবং অনলাইনে লাখ খানেক বার দেখা হয়েছে। মন্তব্যে অনেক ব্যবহারকারী (১, ২, ৩) জরুরি ব্যক্তিগত বা আর্থিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করে ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন।
ঋণের ফাঁদ
এই কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হয় তা বোঝার জন্য ডিসমিসল্যাব ১০টি ফেসবুক পেজের সঙ্গে যোগাযোগ করে। এর মধ্যে সাতটি পেজ থেকে ঋণসংক্রান্ত প্রশ্ন বা আবেদন এর জন্য হোয়াটসঅ্যাপ, ইমু কিংবা মেসেঞ্জার লিংকের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলা হয়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র লোন প্রকল্প ও বিডি লোন সার্ভিস ১ নামের দুটি পেজের দেওয়া হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে যোগাযোগ করা হলে, এক ব্যক্তি ফোন ধরেন এবং নিজেকে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি বলে দাবি করেন। বাংলা ভাষায় কথা বলা ওই ব্যক্তি বলেন, বাংলাদেশ সরকার বিশ্বব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র ঋণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
তিনি আরও দাবি করেন, এই কর্মসূচির আওতায় ব্যবসা ঋণ, বেতন ঋণ, কৃষি ঋণ, গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ, প্রবাসী ঋণ, নির্মাণ ঋণ ও গাড়ি ঋণসহ বিভিন্ন ধরনের ঋণ দেওয়া হয়। এরপর তিনি গবেষকদের কাছে জানতে চান কী ধরনের ঋণ, কত টাকা এবং কত সময়ের জন্য প্রয়োজন।
পরবর্তী ধাপে ঋণ অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের একটি তালিকা পাঠানো হয়। এতে আবেদনকারীর ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি, মোবাইল নম্বর, বিদ্যুৎ বিলের কপি, মনোনীত ব্যক্তির (নমিনি) তথ্য ও সম্পর্ক, মনোনীত ব্যক্তির ছবি, তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ও মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়।
এই অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ডিসমিসল্যাব দল দুটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি জমা দেয়, তবে অন্যান্য কাগজপত্র জমা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এই দুটি ভুয়া পরিচয়পত্র ছাড়া আর কোনো তথ্য না দেওয়া সত্ত্বেও, ঐ ব্যক্তি ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে আপত্তি করেননি। এরপর অর্থ পাওয়ার জন্য তিনি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের চেকবইয়ের ফটোকপি অথবা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর চান। তিনি আরও বলেন, যাচাই শেষে ঋণ নিশ্চিত করতে “সঞ্চয়” হিসেবে ৬ হাজার টাকা জমা দিতে হবে।

পরবর্তীতে ডিসমিসল্যাব দলকে বারবার যোগাযোগ করে টাকা জমা দিতে বলা হয়। ৬ হাজার টাকা বেশি হয়ে যায় বলা হলে তিনি জানান, ৫ হাজার টাকা দিলেও চলবে। তিনি আরও দাবি করেন, “সঞ্চয়” জমা দেওয়ার দিনই ঋণ দেওয়া হবে।
ডিসমিসল্যাব যোগাযোগ বন্ধ করার পরও তিনি বারবার ফোন ও ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে যোগাযোগ করতে বলেন। তিনি একটি নম্বরও দেন। একে তিনি ব্যাংক এজেন্টের বিকাশ অ্যাকাউন্ট বলে দাবি করেন এবং ৫,৫০০ টাকা পাঠাতে বলেন। তবে ডিসমিসল্যাব কোনো অর্থ পাঠায়নি।
২০২৬ সালের মার্চে কম্বোডিয়ার সেন সক জেলায় একটি সন্দেহভাজন প্রতারণা কেন্দ্রে অভিযানে ছয়জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে ফনম পেন পুলিশ। খামির টাইমস-এর তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্তরা ভুয়া নথি ব্যবহার করে ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জন করত এবং ঋণ অনুমোদনের শর্ত হিসেবে অগ্রিম “সার্ভিস ফি” দাবি করত। ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানেও একই ধরনের প্যাটার্ন দেখা গেছে।
খামির টাইমস জানায়, এই নেটওয়ার্কের মূল লক্ষ্য ছিল কম্বোডিয়াকে ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে বাংলাদেশে প্রতারণা চালানো।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের মে মাসে ইউনাইটেড স্টেটস ইনস্টিটিউট অব পিস (ইউএসআইপি) জানায়, কম্বোডিয়ায় সাইবার প্রতারণা ও অনলাইন জালিয়াতি থেকে বছরে আনুমানিক ১২.৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হয়, যা দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় অর্ধেক।
আগেও দুইবার সতর্ক করেছিল বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংকের নাম ব্যবহার করে ভুয়া ঋণ দেওয়ার প্রতারণা নতুন নয়। ২০২৫ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় বিশ্বব্যাংকের অফিস একটি বিবৃতি দেয়, যেখানে বলা হয়: “বিশ্বব্যাংক সবাইকে অনলাইনে প্রতারণামূলক স্কিম বা বিনিয়োগ কার্যক্রমের ব্যাপারে সতর্ক করছে। প্রতারক বিশ্বব্যাংকের নাম ও লোগোর অপব্যবহার করে, ফি এর বিনিময়ে ব্যক্তিদের ঋণ প্রদানের প্রলোভন দেখায়। বিশ্বব্যাংক সরাসরি কাউকে ঋণ প্রদান করে না।”
এ বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি একই ফেসবুক পেজে “সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি” পোস্টে আরও বলা হয়: “প্রতারকেরা প্রায়ই বিশ্বব্যাংকের মতো বিশ্বস্ত সংস্থাগুলোর নাম ও লোগো ব্যবহার করে, যাতে মানুষ বিশ্বাস করে যে তারা একটি বৈধ উৎসের সঙ্গে লেনদেন করছে। এ ধরনের প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড- যেগুলোকে কখনো কখনো ‘অ্যাডভান্স ফি ফ্রড’ বা ‘অগ্রিম ফি প্রতারণা’ বলা হয়- যেখানে প্রতারণা করে অর্থ কিংবা ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্য হাতিয়ে নিতে চেষ্টা করে।”

বিশ্বব্যাংক আরও জানায়, এসব প্রতারক ব্যক্তিগত তথ্য চায়, অগ্রিম অর্থ দাবি করে বা ভুয়া নথি ব্যবহার করে নিজেদের বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করে।
জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল ফান্ড ফর এগ্রিকালচারাল ডেভেলপমেন্ট (আইএফএডি)-এর ওয়েবসাইটের বাংলাদেশ পেজেও অনুরূপ সতর্কবার্তা রয়েছে: “ইফাদ কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিকে ঋণ প্রদান করে না এবং ঋণ, অনুদান, কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, দরপত্রে অংশগ্রহণ বা প্রকল্পে সম্পৃক্ততার বিনিময়ে অর্থ বা ব্যক্তিগত তথ্য চায় না।”
মেটা নীতিমালা লঙ্ঘন
এসব প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন স্পষ্টভাবে মেটার নীতিমালা লঙ্ঘন করে। মেটার প্রতারণা, জালিয়াতি ও বিভ্রান্তিকর কার্যক্রম সংক্রান্ত নীতিতে বলা হয়েছে, ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ দাবি করে ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদিত নয়।
তবুও এ ধরনের বিজ্ঞাপন মেটা প্ল্যাটফর্মে চলমান রয়েছে। এগুলো একই ধাঁচ অনুসরণ করে— বিশ্বব্যাংক ও আইএফএডি-এর মতো প্রতিষ্ঠানের নাম ও লোগো ব্যবহার এবং ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ব্যক্তিগত তথ্য ও অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ।
২০২৫ সালের মে মাসে দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায়, মেটা প্ল্যাটফর্ম ইন্টারনেটভিত্তিক প্রতারণা অর্থনীতির একটি প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একই বছরে টেক ট্রান্সপারেন্সি প্রজেক্ট-এর অনুসন্ধানে ৬৩টি প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপনদাতা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার বিজ্ঞাপন চালিয়েছে বলে জানা যায়।
২২ এপ্রিল কনজিউমার ফেডারেশন অব আমেরিকা (সিএফএ) মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে, যেখানে অভিযোগ করা হয়— বিজ্ঞাপন আয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা সম্পর্কে ব্যবহারকারীদের বিভ্রান্ত করা হচ্ছে।