
এই লেখায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত কিছু গালি ও অবমাননাকর শব্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এটি করা হয়েছে অনলাইন সহিংসতার ভাষা ও প্রকৃতি সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য, যাতে প্রেক্ষিত ও অর্থ বিকৃত না হয়।
পড়াশোনা চালিয়ে যেতে এবং বিয়ে ঠেকাতে পুলিশের আশ্রয় চায় এক এসএসসি পরীক্ষার্থী। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে বিয়ে ঠেকানো গেলেও অনলাইন হয়রানি ঠেকানো যায়নি। ফেসবুকের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের এই ঘটনা সংক্রান্ত ১৩টি পোস্টের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অধিকাংশ মন্তব্যেই সেই শিক্ষার্থীকে বিভিন্নভাবে আক্রমণাত্মক এবং নেতিবাচক মন্তব্য করেছে ব্যবহারকারীরা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষয়টি শুধু বাল্যবিবাহে আটকে নেই। এটি মূলত ক্ষমতায়নের প্রশ্ন। কোনো ঘটনায় নারীর ক্ষমতায়ন হতে দেখলে তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে হয়। এছাড়া গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অনলাইনে এমন কার্যকলাপের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর মানসিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত নয় আক্রমণকারীরা। ফলে তার দ্বারা সৃষ্ট কষ্টের বিষয়টিও উপলব্ধির জায়গাটি তৈরি হয় না।

গত ১৮ এপ্রিলে বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে পিরোজপুরের একটি ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। কোনো কোনো গণমাধ্যম তাদের ফেসবুক পেজেও খবরটি প্রকাশ করে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলায় এক এসএসসি পরীক্ষার্থী নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকাতে থানায় আশ্রয় নেয়। ইন্দুরকানী সদর ইউনিয়নের এই শিক্ষার্থী বাল্যবিবাহ বন্ধে দুই দফা থানায় সহায়তা চায়। পরবর্তীতে পুলিশ সেই শিক্ষার্থীর অভিভাবককে থানায় ডেকে বাল্যবিবাহ না দেওয়ার বিষয়ে মুচলেকা নিয়ে তাকে তাদের জিম্মায় দেয়।
এই ভূমিকার জন্য সেই শিক্ষার্থীকে “নারী সাহসিকতা” সম্মাননাও প্রদান করেন পিরোজপুর জেলা প্রশাসক আবু সাঈদ। আমার দেশের প্রতিবেদনে বলা হয়, “সম্মাননা প্রদানকালে জেলা প্রশাসক বলেন, বাল্যবিয়ে একটি সামাজিক ব্যাধি, যা নির্মূলে সকলকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর অবস্থান গ্রহণের অনুরোধ করেন এবং বাল্যবিয়ের বিষয়ে অভিভাবকদের সতর্ক করেন।”
কিন্তু বিয়ে ঠেকাতে আইনের আশ্রয় নেওয়ার ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমের ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে দেখা যায় পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র। নানা ধরনের আরোপিত ধারণা এবং গালি দিয়ে মন্তব্য করেছে অসংখ্য ব্যবহারকারী। কোনো কোনো ব্যবহারকারী স্বতপ্রনোদিত হয়ে একাধিক পোস্টে গিয়ে শিক্ষার্থীকে নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন। ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৩টি ফেসবুক পোস্টের মোট মন্তব্যের প্রায় ৬০ শতাংশই নেতিবাচক মন্তব্য।
ধারণাপ্রসূত বিভিন্ন নেতিবাচক মন্তব্য করতে দেখা গেছে ব্যবহারকারীদের। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশিত একটি পোস্টে একাধিক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “খোঁজ নিয়ে দেখের এই মেয়ে কয়েক ডজন বয়ফ্রেন্ড পালে।” আরেক ব্যবহারকারী মন্তব্য করেছেন, “দুইদিন পরে দেখা যাবে প্রেমিকের লগে পালাইছে।” অসংখ্য ব্যবহারকারীকে মেয়েটির প্রেমিক আছে বলে মন্তব্য করতে দেখা যায়। কোনো কোনো মন্তব্যকারী “লাঙ” আছে বলেও মন্তব্য করেন। এক ব্যবহারকারী দুটি ভিন্ন পোস্টে মেয়েটির লাঙ আছে বলে মন্তব্য করেন।
অনেক ব্যবহারকারী বলছেন, মেয়েটি তার প্রেমিক অথবা “লাঙ” এর বুদ্ধিতে থানায় আশ্রয় নেওয়ার কাজটি করেছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “এটা লং এর বুদ্ধি কিন্তু 😁😁।” আরেকজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ছাপড়ি বয়ফ্রেন্ডের বুদ্ধি কাজ করছে তাহলে।” অন্য এক ব্যবহারকারী লেখেন, “খোজ নিয়া দেখেন এই বুদ্ধি ওর লাঙ্গে দিছে। যেই লাঙ্গের লগে কয়দিন পরে ভাগবে।”
এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্যের কারণ বুঝতে ডিসমিসল্যাব কথা বলে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের ব্যবস্থাপক (নারী অধিকার ও লিঙ্গভিত্তিক সমতা) মরিয়ম নেছার সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমরা এখনো সামাজিকভাবে নারীদেরকে ক্ষমতায়িত দেখতে অভ্যস্ত না। আপনি নিজেই আপনার অধিকার আদায় করবেন, আপনি আপনার অধিকারের জন্য দাঁড়াবেন— ওইরকম শক্ত অবস্থানে আমরা নারীদেরকে দেখে অভ্যস্ত না। ফলে যখন কোনো নারী বা মেয়ে শিশু তার অধিকারের জন্য কথা বলে, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয় যে এটা নিশ্চয়ই অন্য কেউ শিখিয়েছে।” এছাড়া, এটিকে চরিত্রহননেরও একটি ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। মরিয়ম নেছা আরও বলেন, কেউ কিন্তু বলছে না যে তাকে তার বড় ভাই এটি শিখিয়ে দিয়েছে। বরং প্রেমিকের কথা বলছে, কারণ বিষয়টি সমাজে এখনো নেতিবাচক কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ফলে সেভাবেই ঘটনাটিকে তুলে ধরতে চাইছে।
অনেক ব্যবহারকারী মেয়েটির চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কেউ কেউ লিখেছেন, মেয়েটির কয়েকদিন পর “লিংক ভাইরাল” হবে। কোনো কোনো ব্যবহারকারী মেয়েটির কোনো অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলেও ইঙ্গিত করে। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আরেক পোলার লগে ডলাডলি করে এই জন্য পরিবারের পছন্দ বিয়ে করবে না৷” আরেকজন একটি পোস্টে মন্তব্য করেছেন, “বিবাহ করার দরকার নেই,, পাট খেতে গিয়ে ফা** করে বসে থাকো”।” এ ধরনের বেশকিছু মন্তব্য করতে দেখা গেছে একাধিক ব্যবহারকারীকে। বি. হাশেমি নামের একজন ব্যবহারকারী চারটি ভিন্ন পোস্টে গিয়ে মন্তব্য করেন, যার প্রত্যেকটিই ছিল একই ধরনের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ।
মেয়েটির বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিয়ে করে নেওয়া উচিত ছিল বলে অসংখ্য ব্যবহারকারীকে একমত হতে দেখা যায়। কেউ কেউ মতামত দেয়, মেয়েটির উচিত ছিল বাবা-মায়ের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া। অনেকেই তাকে দোষারোপ করে বিয়ে না করে আইনের আশ্রয় নেওয়ার কারণে। একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, “এই মেয়ে এত বেশি বোঝে কেন মা ও বাবা সব সময় সন্তান দের মঙ্গল কামনা করে।” আরেকজন ব্যবহারকারী বলেন, “এই মেয়ে গুলোই দিন শেষে অনৈতিক কর্মকান্ডে জড়িত হয়।”
প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের পরিচালক (ইনফ্লুয়েন্সিং, ক্যাম্পেইন ও কমিউনিকেশন) নিশাত সুলতানার মতে, বাল্যবিবাহের বিষয়ে আমাদের সমাজে জনমত তৈরি হয়ে আছে। যখন কোনো বিষয়ে জনমত তৈরি হয়, কেউ জনমতের বিরুদ্ধে গেলেই তাকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়।
নিশাত সুলতানা মনে করেন, এটি নারীর ক্ষমতায়নেরও প্রশ্ন, “জনমত যখন তৈরি হয়, তখন জনমতের বিরুদ্ধে কেউ যদি যায়, তাকে টার্গেট করা হয়। কারণ চাইল্ড ম্যারেজের সাথে আসলে এটা তো বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় না, চাইল্ড ম্যারেজের সাথে একটা মেয়ের ওই এমপাওয়ারমেন্টের (ক্ষমতায়ন) সম্পর্ক থাকে। কাজেই যে ব্যক্তি বা যে মেয়েটি এটি ঠেকাতে যাচ্ছে, তিনি অন্য সকলের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। কারণ, এইটা শুধুমাত্র ঠেকানো না, এটা হচ্ছে এক ধরনের সাহস না মেয়েটার? এক ধরনের সাহস, এক ধরনের শক্তি, যেটা আরও দশজনকে ইন্সপায়ার (অনুপ্রাণিত) করে। কাজেই এই ধরনের মানুষগুলোকে টার্গেট করা হয় বেশি।”
মরিয়ম নেছার মতে, এ ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য ভুক্তভোগীর মধ্যে মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে। এমন ঘটনার সম্মুখীন হয়ে ভুক্তভোগী মানসিক ট্রমা থেকে নিজেকে অনলাইন থেকে পুরোপুরি সরিয়েও নিতে পারে।
নিশাত সুলতানা মনে করেন, এ ধরনের ঘটনা নারীর ক্ষমতায়নে রাষ্ট্রের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে। তিনি বলেন, বেশিরভাগ বাবা-মা জানেন, বাল্যবিবাহ দেওয়া ঠিক না। কিন্তু বিয়ে দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো ভালো বিকল্পও তাদের সামনে নেই। রাষ্ট্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না, শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা এবং সামাজিক চাপের ফলে বাল্যবিবাহকেই সহজ মনে হয়।
স্টাভরোস কিরিয়াকিদিস এবং আন্দ্রোনিকি কাভোরা-এর ২০১০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হচ্ছে, অনলাইন হয়রানি বা সাইবার বুলিং প্রথাগত বুলিং বা উত্ত্যক্তকরণের চেয়ে ভিন্ন হয়। অনলাইনে হয়রানিমূলক কথা বলা ব্যক্তিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বেনামি এবং তাদের আচরণের কারণে সৃষ্ট দুর্দশা এবং ভুক্তভোগীর মানসিক প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তারা অবগত থাকে না। ফলে অনলাইনে উত্ত্যক্তকারীরা তাদের দ্বারা সৃষ্ট কষ্টের বিষয়টি কখনো বুঝতেই পারে না।