সাভারে সাত বছর বয়সী এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ধর্ষণের শিকার হওয়ার ঘটনায় সংবাদ প্রকাশ করেছে দেশের একাধিক গণমাধ্যম। এসব প্রতিবেদনে কোথাও প্রতীকী ছবি, কোথাও সাভার থানার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে দৈনিক ইনকিলাব তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে সরাসরি দেখিয়েছে ভুক্তভোগী শিশুকে। শুধু তাই নয়, ভিডিওতে শিশুটিকে দিয়ে নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনাও করানো হয়েছে।
ঢাকার সাভারে ওই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে মাদ্রাসার চার শিক্ষক ও ছয় শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে গত ২৬ আগস্ট সাভার মডেল থানায় মামলা করেন শিশুটির বাবা।
গত ৩১ আগস্ট দৈনিক ইনকিলাবের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এ ঘটনা নিয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “৭ বছরের মাদ্রাসাছাত্রকে ব’লা’ৎকারের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে।”

প্রায় পুরো ভিডিওজুড়েই বিছানায় শুয়ে থাকা শিশুটির মুখ দেখানো হয়। শিশুটিকে ক্যামেরার সামনে নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিতে দেখা যায়। ভিডিওর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তার পরিচয় গোপন করার মতো কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি।
এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ইনকিলাবের ভিডিওটি ৮০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে এবং ৭৬ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে। ভিডিওটিতে ৩ হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া পড়েছে এবং মন্তব্য করা হয়েছে ৬০০ বারের বেশি।
সাংবাদিকতার নীতিমালা ও আইন যা বলে
শিশু ও যৌন অপরাধের ভুক্তভোগীদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও ক্ষতির ঝুঁকি বিবেচনা করার ওপর জোর দেওয়া হয় সাংবাদিকতার বিভিন্ন নীতিমালায়। ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষেত্রে, তিনি শিশু হোন বা প্রাপ্তবয়স্ক, পরিচয় প্রকাশ না করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষ করে সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্ট-এর নীতিমালায় শিশু ও যৌন অপরাধের ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সংবেদনশীলতার কথা বলা হয়েছে। এতে সংবাদ প্রকাশের সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করতে এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে বলা হয়েছে।
সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে ইউনিসেফের নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুর পাশাপাশি একই অপরাধে অপরাধী শিশু, এইচআইভি আক্রান্ত শিশু এবং দোষী প্রমাণিত হয়েছে এমন শিশুর ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তন করতে হবে এবং দৃশ্যমান পরিচয় অস্পষ্ট করে দিতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ধারা ১৪-তে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর পরিচয় প্রকাশে নিষেধাজ্ঞার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। ধারা ১৪(১) তে বলা হয়েছে: “এই আইনে বর্ণিত অপরাধের শিকার হইয়াছেন এইরূপ নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা তত্সম্পর্কিত আইনগত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা [বা ছবি] বা অন্যবিধ তথ্য কোন সংবাদ পত্রে বা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমে [বা অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে] এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাইবে যাহাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।”
এই আইন মানতে ব্যর্থ হলে ধারা ১৪(২) অনুযায়ী, দায়ী ব্যক্তি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডেই সাজা পেতে পারেন।
ইনকিলাবের ভিডিওতে ভুক্তভোগী শিশুর মুখ স্পষ্টভাবে দেখানোর পাশাপাশি তাকে দিয়ে নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা করানো হয়েছে। ফলে ভিডিওটি শিশুটির পরিচয় এবং তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা প্রকাশের ঝুঁকি তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এমন সংবেদনশীল ঘটনায় শিশুটিকে ক্যামেরার সামনে এনে তার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করানো নিয়েও সাংবাদিকতার নীতিমালার দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্ন ওঠে।
এই ভিডিওর বিষয়ে দৈনিক ইনকিলাব ডিজিটালের নিউজ এডিটর (মাল্টিমিডিয়া ইনচার্জ) তানভীর খন্দকারের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে জানান, ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি স্বীকার করেন, ভিডিওটি সাংবাদিকতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং ভুলবশত এভাবে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
ডিসমিসল্যাবের পক্ষ থেকে বিষয়টি জানানোর পরই ইনকিলাব ভিডিওটি সরিয়ে নেয়। বর্তমানে ভিডিওটি তাদের ফেসবুক পেজে আর পাওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশের ঘটনা নতুন নয়। গত জুলাইয়ে ডিসমিসল্যাবের একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঠাকুরগাঁওয়ের একটি ধর্ষণের ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যম ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করেছিল এবং ঘটনাটি উপস্থাপনের ক্ষেত্রেও নীতিমালা অনুসরণ করেনি।

