মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
gangrape survivor news social media trial

গণমাধ্যম যেভাবে ধর্ষণের ভুক্তভোগীকে সামাজিক ও অনলাইন হয়রানির লক্ষ্যবস্তু করে তুলল

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

আহমেদ ইয়াসীর আবরার

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

এই লেখায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যবহৃত কিছু গালি ও অবমাননাকর শব্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এটি করা হয়েছে গবেষণার প্রেক্ষিতে অনলাইন সহিংসতার ভাষা ও প্রকৃতি সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য, যাতে প্রেক্ষিত ও অর্থ বিকৃত না হয়।


হাতে স্যালাইনের ক্যানুলা। সামনে একাধিক ক্যামেরা। হাসপাতালের নীল চেয়ারে বসা মেয়েটি বারবার ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকার চেষ্টা করছে। একটি গোডাউন থেকে মাত্র কয়েকঘণ্টা আগেই উদ্ধার করা হয়েছে তাকে। সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ করায় ক্যামেরার সামনে সে ঘটনার বর্ণনা দিতে বলছিলেন সাংবাদিকেরা। পরিবার ও সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সাক্ষাৎকার শুরুর আগে এক সাংবাদিকের কোনো রসিকতায় মুহূর্তের জন্য হেসে ফেলে সে। এই মুহূর্তটি বক্তব্যের ভেতরের কোনো দৃশ্য ছিল না। 

কিন্তু বাংলাদেশি সম্প্রচার মাধ্যম ‘বাংলা টিভি’ পাঁচ মিনিট দৈর্ঘ্যের এক ভিডিও প্রতিবেদনে দৃশ্যটি তিনবার ব্যবহার করে। এর মধ্যে একবার ভুক্তভোগীর মুখ ক্লোজআপ শটেও দেখানো হয়। পরদিন আরেকটি সংবাদমাধ্যম ‘এশিয়ান টেলিভিশন’ একই বিষয় নিয়ে ফেসবুকে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পোস্ট করে। ক্যাপশনে লেখে— “ধ*র্ষ*ণের বর্ণনা দিতেই হেসে দিলেন কিশোরী।” এই প্রতিবেদনেও ব্যবহার হয়েছে একই হাসির দৃশ্য। ধর্ষণের শিকার হওয়ার পর এমনভাবে হাসার ঘটনা বিরল, এমন মতামতও দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে যুক্ত ভয়েজ ওভারে।

এই দুই প্রতিবেদনের হাত ধরেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি বার্তা— কিশোরী হাসতে হাসতে ধর্ষণের বর্ণনা দিয়েছে। শুরু হয় সাইবার বুলিং, ট্রলিং আর ভিক্টিম ব্লেমিং। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, থ্রেডস ও ইউটিউব মিলিয়ে এমন ২০০-র বেশি পাবলিক পোস্ট ও ভিডিওর সন্ধান পেয়েছে ডিসমিসল্যাব। পোস্টগুলোতে হাসির সেই ফুটেজ, স্ক্রিনশট, ক্যাপশন কিংবা সংশ্লিষ্ট ছবি ঘুরেফিরে ব্যবহার হয়েছে। হাজার হাজার মন্তব্যে লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ভুক্তভোগী কিশোরী। পরিবার ডিসমিসল্যাবকে জানিয়েছে, এলাকাবাসীর চাপে বাসা ছাড়তে হয়েছে তাদের। পরে ভাড়া বাসায় উঠেও রেহাই মেলেনি— সেখানেও একই ধরনের চাপের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। 

দুটি সংবাদমাধ্যম কীভাবে একজন ধর্ষণের ভুক্তভোগীর হাসিকে প্রসঙ্গের বাইরে নিয়ে উপস্থাপন করল, কীভাবে তাতে পরিচয় প্রকাশ সংক্রান্ত আইনি বিধিনিষেধ লঙ্ঘিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো, এবং এভাবে উপস্থাপন কীভাবে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে অনলাইন হয়রানি এবং সামাজিক চাপের মুখে ঠেলে দিল— এই বিষয়গুলো খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে ডিসমিসল্যাবের এই প্রতিবেদনে।

হাসপাতালের সাক্ষাৎকার থেকে ভিডিও প্রতিবেদন

একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, হাসপাতালে উপস্থিত থাকা একাধিক সাংবাদিকের বক্তব্য এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সঙ্গে কথোপকথনের মাধ্যমে ঘটনাটির বিস্তারিত জানার চেষ্টা করেছে ডিসমিসল্যাব।

গত ১৩ জুন রাতে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার কালিতলা বাজার এলাকায় তিন যুবকের হাতে ভুক্তভোগী ধর্ষণের শিকার হয় বলে অভিযোগ ওঠে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে সামাজিক মাধ্যমে তামিম নামের এক যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল কিশোরীর।

ঘটনার রাতে আনুমানিক ১১টার দিকে তামিম তাকে কালিতলা বাজারের কাছের একটি গোডাউনে নিয়ে যায়। যেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিল তামিমের দুই বন্ধু। রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তারা টহলরত পুলিশের চোখে পড়ে। আটক করা হয় তিন যুবককেই। ১৪ জুন ভোররাতে গোডাউন থেকে উদ্ধার হওয়া কিশোরীকে ঠাকুরগাঁও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

একই দিনের দুপুর নাগাদ, আনুমানিক ২টার দিকে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিশোরীর সাক্ষাৎকার নেন অন্তত তিনটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি— ‘আরটিভি’, ‘ডিবিসি নিউজ’ ও ‘এখন টেলিভিশন’।

এদের মধ্যে আরটিভি একটি লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে তাদের ওয়েবসাইটে। অন্যদিকে ‘এখন টেলিভিশন’ এই ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বলে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে ডিবিসি নিউজ সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে কাপড়ে মুখ ঢাকা অবস্থায় বক্তব্য দিতে দেখা যায় কিশোরীকে। এছাড়া, প্রতিবেদনে থাকা পরিবারের দুই সদস্যের মুখও ঝাপসা করে দেওয়া হয়।

দুই টিভি প্রতিবেদনে যেভাবে উঠে এলো হাসির দৃশ্য

গত ১৪ জুন রাতে ‘বাংলা টিভি’ তাদের ইউটিউব চ্যানেল ও ফেসবুক পেজে পাঁচ মিনিট ১৬ সেকেন্ড দৈর্ঘ্যের একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। শিরোনাম দেওয়া হয়, “বন্ধুদের সাথে বা’জি ধরে মেয়ে বান্ধবীকে একটানা ৩ ঘণ্টা গ/ণ/ধ/র্ষ/ণ, অতঃপর…।”

ফুটেজটি বাংলা টিভি অন্য কোনো সূত্র থেকে সংগ্রহ করেছিল নিশ্চিত হওয়া যায়। কারণ, হাসপাতালে উপস্থিত তিন সাংবাদিকই ডিসমিসল্যাবকে জানান, কিশোরীর বক্তব্য ধারণের সময় বাংলা টিভির কোনো প্রতিনিধিই সেখানে ছিলেন না।

ভিডিওর শুরুতে মুখ ঝাপসা না করেই হাসপাতালের চেয়ারে বসে থাকা কিশোরীকে দেখানো হয়। বারবার হাত ও ওড়না দিয়ে নিজের মুখ ঢাকার চেষ্টা করছিল সে। ভিডিওর ৮ থেকে ১২ সেকেন্ডে পেছন থেকে কিছু কথা বলতে শোনা যায়। এ সময় নিজের মুখ হাত দিয়ে ঢেকে অপ্রস্তুতভাবে হেসে ফেলে সেই কিশোরী। সংবাদমাধ্যম বাংলা টিভি ভুক্তভোগীর হাসির দৃশ্যটি সম্পাদনা করে বাদ তো দেয়ই-নি, বরং ৫ মিনিটের প্রতিবেদনে মোট তিনবার এই দৃশ্যটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রচার করেছে। প্রথমবার ভিডিওর শুরুতে, দ্বিতীয়বার ২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে এবং তৃতীয়বার ৩ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের সময়। তৃতীয়বারে ভুক্তভোগীর মুখমণ্ডল ক্লোজআপ শটে দেখানো হয়েছে।

বাংলা টিভির প্রতিবেদনে সাংবাদিকের নেপথ্য কণ্ঠ, ভুক্তভোগী, তার বাবা, এক আত্মীয় এবং সদর থানার ওসির সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে পুরো ঘটনার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ভিডিওতে ভুক্তভোগীর পরিবারের দুই সদস্যকেও দেখানো হয়েছে কোনো পরিচয় না ঢেকেই।

গত ১৮ জুনে ভিডিওটি সরিয়ে ফেলার আগ পর্যন্ত ইউটিউবে ১৫ লাখেরও বেশি বের দেখা হয়েছে। এছাড়া ১৬ হাজারেরও বেশি লাইক ছিল, মন্তব্য এসেছে সাড়ে ৬ হাজারেরও বেশি। অধিকাংশ মন্তব্যই ছিল কিশোরীকে আক্রমণ করে।

গত ১৫ জুন এশিয়ান টেলিভিশনও একই বিষয় নিয়ে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পোস্ট করে ফেসবুকে। শিরোনামে লেখা হয়, “ধ*র্ষ*ণের বর্ণনা দিতেই হেসে দিলেন কিশোরী।”

২ মিনিট ২৫ সেকেন্ডের এই প্রতিবেদনেও হাসির দৃশ্যটি ফিরে আসে তিনবার— ১ মিনিট ৩ সেকেন্ডে, এরপর ১ মিনিট ৮ সেকেন্ডে ও ১ মিনিট ২০ সেকেন্ডে।

ভয়েস ওভারে ঘটনার বিবরণ দেওয়ার পাশাপাশি উপস্থাপক বলেন, হাসপাতালে বর্ণনা দেওয়ার সময় হাসছিলেন কিশোরী। ভয়েস ওভারের এক জায়গায় বলা হয়, “এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলছেন, এ মেয়ের লজ্জা নেই, ধর্ষণের পরও হাসছে। আবার কেউ কেউ তার হাসি মুখ দেখে বলছেন, তারও সম্মতি ছিল এই ধর্ষণে। যদিও তরুণী এ অপরাধের সুষ্ঠু বিচার চেয়েছেন।”

বাংলাদেশের ১২টি টেলিভিশন চ্যানেলের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল বিশ্লেষণ করেছে ডিসমিসল্যাব। এর মধ্যে যমুনা টিভি, একাত্তর টেলিভিশন চ্যানেল ২৪ ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও কোথাও হাসির দৃশ্য দেখা যায়নি। এমন কোনো ফুটেজও যুক্ত করা হয়নি, যাতে কিশোরীর পরিচয় ফাঁস হয়।

সাক্ষাৎকারের অংশ ছিল না আলোচিত হাসির দৃশ্য

ভুক্তভোগীর বোনের স্বামী পরে ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় দাবি করেন, কিশোরীর এই হাসি সাক্ষাৎকারের অংশ নয়, বরং আগের মুহূর্তের। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপস্থিত এক সাংবাদিকের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ঘটনার সূত্রপাত তৈরি হয়, যা প্রতিবেদনে ব্যবহার করা হয়েছে।

এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে এবং মূল ফুটেজে হাসির দৃশ্যটি ঠিক কোথায় ছিল, তা নিশ্চিত হতে পরিবার ও ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে ডিসমিসল্যাব।

ভুক্তভোগীর বোনের স্বামী জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর কিশোরী তখনো শারীরিকভাবে অসুস্থ, কথা বলার মতো অবস্থাতেই ছিল না। স্যালাইন দেওয়ার পর ধীরে ধীরে কথা বলতে শুরু করে। তার বর্ণনা অনুযায়ী, পরিচিত এক সাংবাদিক রসিকতার সুরে কিছু একটা বলার পর উপস্থিত কয়েকজন হেসে ওঠেন, আর তাদের দেখে হেসে ফেলেন কিশোরীও। একাধিক ক্যামেরার সামনে কথা বলার লজ্জাও হাসির আরেকটি কারণ বলে জানান তিনি।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত দুই সাংবাদিকদের বক্তব্যেও এই বিবরণের সত্যতা মেলে। সাংবাদিকরা ডিসমিসল্যাবকে জানান, তাদের মধ্যে এক সাংবাদিকের ঠাট্টার ছলে করা মন্তব্যের কারণেই ভুক্তভোগী হেসেছে।

নিশ্চিত হতে সাক্ষাৎকারের সময় উপস্থিত তিন সাংবাদিককেই কিশোরীর বক্তব্যের এবং তার আগে-পরের মূল ফুটেজ পাঠানোর অনুরোধ জানায় ডিসমিসল্যাব। তাদের পাঠানো একটি ভিডিওতেই স্পষ্ট হয়— সাক্ষাৎকার শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে হেসেছিলেন কিশোরী। ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় কিশোরীকে হাসতে দেখা যায়নি।

পরিবারের বর্ণনা, উপস্থিত সাংবাদিকদের বক্তব্য আর হাতে পাওয়া মূল ফুটেজ— সবকিছু মিলিয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়: হাসির দৃশ্যটি সাক্ষাৎকারের ভেতরের অংশ ছিল না। বরং একজন সাংবাদিক যখন ক্যামেরার সামনে কিশোরীকে কিছুটা স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনকার মুহূর্ত এটি।

তিন সাংবাদিকের বক্তব্য থেকে আরও নিশ্চিত হওয়া যায়, হাসপাতালে সেদিন বাংলা টিভির প্রতিবেদক মামুনুর রশিদ উপস্থিতই ছিলেন না। উপস্থিত সাংবাদিকদের একজনের কাছ থেকেই মামুনুর রশিদ ফুটেজ সংগ্রহ করেন।

বাংলা টিভির প্রতিবেদকের ভাষ্য, ফুটেজ সামলেছে ডিজিটাল বিভাগ

ফুটেজটি কীভাবে সংগ্রহ করা হলো, তা জানতে বাংলা টিভির প্রতিবেদক মামুনুর রশিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। একাধিক প্রশ্নের জবাবে তিনি এর দায় সংবাদমাধ্যমের ডিজিটাল বিভাগের ওপর দিয়েছেন। তার দাবি, ভিডিওটি তিনি সরাসরি ধারণ করেননি, বরং ‘নিউজ’ পাঠিয়েছিলেন এবং অফিসের ডিজিটাল বিভাগ আলাদাভাবে ফুটেজ সংগ্রহ করে তা সম্পাদনা করেছে। “ডিজিটালে অনেক ফুটেজ সংগ্রহ করে তো অনেক সময়… কাটছাঁট তো ওরা করবে, কাটছাঁট তো আর আমরা করি না,” জানান তিনি।

পরবর্তীতে বাংলা টিভির ডিজিটাল বিভাগের ডেপুটি ইনচার্জ রাকিব উজ জামানের সঙ্গে কথা বলে ডিসমিসল্যাব। রাকিব উজ জামানের জানান, ফুটেজটি ঠাকুরগাঁও থেকে তাদের অভ্যন্তরীণ গ্রুপে পাঠানো হয়েছিল এবং কনটেন্ট রিভিউয়ের দায়িত্ব তার। তবে এই নির্দিষ্ট ক্লিপটি তার নজর এড়িয়ে গিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি, “এটা ওখান থেকেই আসছে, ঠাকুরগাঁও থেকেই আসছে, আমাদের গ্রুপেই দেওয়া হয়েছিল।”

কোনো সতর্কীকরণ বা ডিসক্লেইমার দেওয়া হয়েছিল কি না জিজ্ঞেস করলে রাকিব উজ জামান স্বীকার করে নেন যে, তা দেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে তিনি জানান, ভিডিওটি ততক্ষণে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, আর বিষয়টি নিয়ে শীঘ্রই একটি ব্যাখ্যামূলক কার্ড বা ভিডিও বার্তা প্রকাশের প্রতিশ্রুতিও দেন।

তবে ২৯ জুন পর্যন্ত বাংলা টিভির ফেসবুক বা ইউটিউব পেজে এমন কোনো ব্যাখ্যামূলক কার্ড বা ভিডিও বার্তা খুঁজে পায়নি ডিসমিসল্যাব। ঘটনাটি নিয়ে একটি ইউটিউব শর্টসও প্রকাশ করে বাংলা টিভি, তবে সেখানে হাসির দৃশ্যটি দেখা যায়নি।

এশিয়ান টেলিভিশনের সঙ্গেও যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব, হাসির দৃশ্যটিকে কেন এত গুরুত্ব দেওয়া হলো তা জানতে চাওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটির ডিজিটাল ইনচার্জ আমিনুল ইসলাম বলেন, কিশোরী পরিচিত কারও সঙ্গে বেরিয়েছিলেন বলে এবং ফুটেজটি নিউজরুমের কাছে “অস্বাভাবিক” ঠেকেছিল বলেই হাসির দৃশ্যে জুড়ে দেওয়া হয়।

তার ভাষ্যে, স্থানীয় সূত্র বলছে কিশোরী ও অভিযুক্তরা পরস্পরের বেশ ঘনিষ্ঠ ছিল, আর “এর মধ্যে ইচ্ছাকৃত কিছু একটা হয়েছে” বলেই তাদের মনে হয়েছে। তার কথায়, সাধারণত ধর্ষণের ভুক্তভোগীদের দৃশ্যত কষ্টে থাকতেই দেখা যায়। সেই তুলনায় এই ফুটেজ ছিল “ব্যতিক্রম”। আমিনুল ইসলাম বলেন “সাধারণত যা হয়… ভুক্তভোগীর সাধারণ একটি দৃশ্য আমাদের চোখে দেখি যেখানে একটা কষ্টের জায়গা থাকে। হ্যাঁ! কিন্তু আমরা যতটুকু ফুটেজ পেয়েছি সেই ফুটেজে ব্যতিক্রম কিছু ছিল।”

সংবাদমাধ্যম থেকে সামাজিক মাধ্যম, আরেক দফা ছড়াল হাসির দৃশ্য

বাংলা টিভি ভিডিওটি সরানোর আগেই কিশোরীর হাসির দৃশ্য ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক মাধ্যমে।

শুধু বাংলা টিভির ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়েছে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এমন অন্তত ১৯০টি পোস্ট বিশ্লেষণ করে ডিসমিসল্যাব। প্রত্যেকটি পোস্টে বাংলাটিভির ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়। কোনো কোনো পোস্টে বাংলা টিভির ক্যাপশনের সঙ্গে ব্যবহারকারী নিজের বক্তব্যও যুক্ত করে। এই পোস্টগুলোর মধ্যে ১১৪টি পোস্ট ফেসবুকে, ৩৪টি ইনস্টাগ্রামে, ২৭ টি থ্রেডসে এবং ১৫টি ইউটিউবে। একই কিওয়ার্ড সার্চ করা না গেলেও, বিভিন্ন কিওয়ার্ড ব্যবহার করে টিকটকেরও ১৮টি ভিডিও পাওয়া যায় যেখানে ভুক্তভোগী কিশোরীর ভিডিও বা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।

এই পোস্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শেয়ার এবং রিয়েকশন দেখা যায় সিংড়া টাইমস নামের একটি পেজের পোস্টে। ক্যাটাগরিতে “পার্সোনাল ব্লগ” হিসেবে উল্লেখ করা হলেও পেজটিতে থেকে বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে সংবাদ পোস্ট করতে দেখা যায়। তাদের পোস্টে বাংলা টিভির ব্যবহৃত ক্যাপশনটি হুবহু দেওয়া এবং একটি ভিডিও যুক্ত করা। ভিডিওটিতে ভুক্তভোগীর হাসির দৃশ্য একাধিকবার দেখানো হয়। এই পোস্টে ১৮ হাজারেরও বেশি রিয়েকশন, তিন হাজারেরও বেশি কমেন্ট এবং ৩শরও বেশি শেয়ার হয়।

বাংলা টিভির ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হলেও পোস্টটি এখনও থেকে গেছে। প্রতিবেদনটি লেখার সময় পর্যন্ত সেই পোস্টে ৩ লক্ষেরও বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পোস্টটিতে মন্তব্যের সংখ্যা ৩৭ হাজারেরও বেশি এবং শেয়ার হয়েছে ৯ হাজারেরও বেশি।

বাংলা টিভির ক্যাপশন হুবহু না বসিয়েও শুধু হাসির দৃশ্যকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে বেশ কিছু পোস্ট। এমনই একটি ভিডিওতে হাসির দৃশ্যের একটি স্থিরচিত্র জুড়ে দিয়ে অশ্লীল ইঙ্গিতে ঘটনাটিকে ব্যঙ্গ করেন একজন ব্যবহারকারী। হাসির প্রসঙ্গ টেনে ইঙ্গিতও দেন, কিশোরীর বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। ২৯ জুন পর্যন্ত এই পোস্টটি শেয়ার হয়েছে ১০০ বারেরও বেশি। মন্তব্য হয়েছে ২০০-র বেশি।

যমুনা টিভির গ্রাফিক্স হুবহু নকল করে বানানো “জাউরা টিভি” নামের এক প্যারোডি পেজও বাদ যায়নি এই ট্রেন্ড থেকে। হাসির দৃশ্যের ছবি বসিয়ে ব্যঙ্গাত্মক শিরোনাম দেওয়া হয়— “বন্ধুর হাতে ধর্ষিত হয়ে মহাখুশি বারো ব্যাটারি বান্ধবী”। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত, পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে ৩ হাজারের বেশি, মন্তব্য করা হয়েছে ১৯৬টি।

ভিডিওতে দেখা কিশোরীর চেহারার আদলে বানানো অন্তত দুটি এআই-জেনারেটেড ছবিও পাওয়া গেছে। একটি ফেসবুক পোস্টে বাংলা টিভির প্রতিবেদনের দৃশ্য দিয়ে এমন একটি ছবি তৈরি করেন একজন ব্যবহারকারী। ছবিতে দেখা যায় ভুক্তভোগী কিশোরীকে হাসপাতালে কাঁদছে এবং সেখানে ব্যবহারকারী নিজেকে হাজির করেছেন সান্ত্বনাদাতা হিসেবে। এআই দিয়ে বানানো আরেকটি ছবিতে কিশোরীর সম্পূর্ণ মুখ দেখা যায়। অথচ ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণ করা কোনো ভিডিওতেই ওড়না ছাড়া তার পুরো মুখ দেখা যায়নি। অর্থাৎ, ওই ছবি আসলে একটি কাল্পনিক মুখচ্ছবি।

কিছু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারী ভুক্তভোগীর এআই দিয়ে তৈরি ছবি শেয়ার করেছেন, যার সঙ্গে ছিল বিদ্রুপাত্মক ক্যাপশন এবং মন্তব্য।

হাসিই হয়ে উঠল অনলাইন আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু

বাংলা টিভির ফেসবুক পোস্টের ১০০টি মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৫১ শতাংশ মন্তব্যেই ব্যবহারকারীরা ভুক্তভোগীর হাসি নিয়ে আলোচনা করছে। ২৪টি মন্তব্যে হাসির কারণ হিসেবে “ভুক্তভোগী মজা পেয়েছে” বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ১২টি মন্তব্যে ব্যবহারকারীরা প্রশ্ন ছুড়েছে, ভুক্তভোগী হাসছে কেন। এগুলোর অধিকাংশতেই আবার হাসির ইমোজি যুক্ত করা। ১৪টি কমেন্টে ব্যবহারকারী বলছে, ভুক্তভোগী খুশি হয়েছে। অর্থাৎ, ভুক্তভোগীর হাসি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

এই প্রতিক্রিয়ার আঁচ পরিবারের জীবনেও পড়েছে বলে ডিসমিসল্যাবকে জানান কিশোরীর পরিবারের সদস্যরা। এলাকাবাসীর চাপে যে বাসায় তারা থাকতেন, তা ছাড়তে বাধ্য হন। পরে একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন ঠিকই, কিন্তু সেখানেও পিছু ছাড়েনি বাসা-ছাড়ার চাপ।

ডিসমিসল্যাবকে ভুক্তভোগীর বোনের স্বামী বলেন, “যে বাসায় থাকতেন তাদের সেখান থেকে বের করে দিয়েছে গ্রামবাসীরা। এখন তারা শহরে একটা ভাড়া বাসায় থাকছেন। বিষয়টা ভাইরাল হওয়ার কারণে, সেই হাসি, আর কথাবার্তায় একটা গোলমাল হওয়ার কারণেও— সে আরও বেশি ট্রলিংয়ের শিকার হয়েছে।”

পরবর্তীতে ২১ জুন কিশোরীর বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, শহরের সেই ভাড়া বাসা থেকেও তাদের বের করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল একবার। পুলিশ সুপার হস্তক্ষেপ করার কারণে সেটি আর হয়ে উঠেনি। 

হাসি দিয়ে যাচাই হয় না অভিযোগের সত্যতা

ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনা করা অনলাইন হয়রানির বড় অংশজুড়েই ছিল কিশোরীর সেই হাসি। কারও কাছে হাসি ভুক্তভোগীর বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অজুহাত, কারও কাছে দোষারোপের হাতিয়ার।

অথচ ট্রমা নিয়ে হওয়া গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। হাসিমুখ, শান্ত থাকা কিংবা দৃশ্যত কষ্টের অনুপস্থিতি, এসবের কোনোটিই কোনো অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের মাপকাঠি হতে পারে না।

‘এন্ড ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রকাশিত ভিকটিম রেসপন্সেস ডিউরিং সেক্সুয়াল অ্যাসল্ট শীর্ষক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ঘটনার পর, এমনকি সেই ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময়েও ভুক্তভোগী হেসে ফেলতে পারেন। গবেষকদের ভাষায়, হাসি বা “স্বাভাবিক” থাকাকে বিশ্বাসযোগ্যতা বিচারের মানদণ্ড ধরাটা ভুল।

সাইকোলজি টুডে-তে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণ বলছে, ট্রমা বর্ণনার সময় হেসে ফেলার ঘটনা লজ্জা বা অস্বস্তির প্রতিক্রিয়া হতে পারে, বা এটি হতে পারে ট্রমার তীব্রতাকে নিজের কাছে ছোট করে দেখানোর একটি অবচেতন কৌশল। হাসি যন্ত্রণাকে খুব কাছে ঘেঁষতে না দেওয়ার চেষ্টাও হতে পারে।

‘ডার্ট সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমা’ সাংবাদিকদের পরামর্শ দিচ্ছে, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে সব রকম প্রতিক্রিয়া দেখতে প্রস্তুত থাকতে হবে। কেউ হয়তো শান্ত ও স্থির থাকবেন, আবার কেউ আবেগপ্রবণ হয়ে উঠতে পারেন, ক্রুদ্ধ কিংবা নির্বাকও হয়ে যেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে এমন উপস্থাপন বাড়িয়েছে ক্ষতি, ভেঙেছে নীতিও

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর মতে, ধর্ষণের শারীরিক আঘাতের চেয়েও মানসিক ক্ষতি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে— যার প্রভাব গিয়ে পড়তে পারে ভুক্তভোগীর পরিবার, সামাজিক জীবন এমনকি ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ওপরও।

কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, “মেয়েটি ইতিমধ্যে এসবের কিছু প্রভাব ভোগ করছে— যেমন সমাজ থেকে বয়কট হওয়া, বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়া এবং মিথ্যা অভিযোগ করার অপবাদ পাওয়া।”

মিডিয়ার উপস্থাপনা এতে ক্ষতির আরেকটি স্তর যোগ করেছে। তিনি বলেন, “বিচার প্রক্রিয়া শুরুর আগেই তাকে যেভাবে মিডিয়া ট্রায়ালের মুখোমুখি করা হয়েছে, তা তার জন্য অবমাননাকর, আর এটি তার মূল ট্রমার ওপর নতুন ট্রমা যোগ করতে পারে।”

যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদন করার সময়, বিশেষত ভুক্তভোগী যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে সাংবাদিকদের বাড়তি সতর্কতা দরকার বলে মনে করেন অধ্যাপক কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরি। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থাতে কিশোরীর সাক্ষাৎকার নেওয়ার সিদ্ধান্তকেই তিনি যথাযথ মনে করেন না। তিনি বলেন, “পাঠকসংখ্যা বাড়ানোর তাড়নায় গণমাধ্যম নীতিগত বিবেচনাকে পাশ কাটিয়েছে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুনও এই উপস্থাপনার সমালোচনা করে একে শিকারি সাংবাদিকতার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। 

আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার নীতিমালাও যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে সতর্কতার কথা বলে। সোসাইটি অব প্রফেশনাল জার্নালিস্ট-এর কোড অব ইথিকস অনুযায়ী, সাংবাদিকদের উচিত ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা, উপস্থাপনার ফলে প্রভাবিত হতে পারে এমন মানুষদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া, আর কিশোর-কিশোরী কিংবা যৌন অপরাধের ভুক্তভোগীদের ক্ষেত্রে বাড়তি সংবেদনশীলতা দেখানো।

দ্য রেইপ, অ্যাবিউজ অ্যান্ড ইনসেস্ট ন্যাশনাল নেটওয়ার্কের গাইড টু রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স-এ বলা হয়েছে, একান্ত প্রয়োজন না হলে যৌন নির্যাতনের শিকার শিশুদের সাক্ষাৎকার না নেওয়াই ভালো। এতে আরও সতর্ক করা হয়েছে, এমন কিছু যেন না লেখা হয় যাতে ভুক্তভোগীর পরিচয় ফাঁস হয়ে যায়, আর ঘটনাকে চাঞ্চল্যকর করে তোলার বদলে জোর দিতে বলা হয়েছে অভিযোগ ও জনস্বার্থের বিষয়টিতে।

শুধু সাংবাদিকতার নীতি নয়, প্রশ্ন উঠেছে আইনি লঙ্ঘনেরও

বাংলা টিভি ও এশিয়ান টেলিভিশনের প্রতিবেদন কেবল নৈতিকতার প্রশ্নেই আটকে নেই, আইনি প্রশ্নও তুলেছে সমান জোরে। অধ্যাপক মামুনের ভাষ্যে, “অপ্রাপ্তবয়স্ক কারও সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আরও বেশি সংবেদনশীল হতে হয়। সাংবাদিকতার নীতি অনুযায়ী ভুক্তভোগীর ভিডিও প্রকাশই করা উচিত নয়। এমনকি অডিও প্রকাশ করলেও সেখানে কণ্ঠস্বর পরিবর্তন করা উচিত।”

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০-এর ধারা ১৪তে সংবাদ মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর পরিচয় প্রকাশের ব্যাপারে বাধা-নিষেধের পরিষ্কার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। ধারা ১৪(১) তে বলা হয়েছে: “এই আইনে বর্ণিত অপরাধের শিকার হইয়াছেন এইরূপ নারী বা শিশুর ব্যাপারে সংঘটিত অপরাধ বা তত্সম্পর্কিত আইনগত কার্যধারার সংবাদ বা তথ্য বা নাম-ঠিকানা [বা ছবি] বা অন্যবিধ তথ্য কোন সংবাদ পত্রে বা অন্য কোন সংবাদ মাধ্যমে [বা অনলাইনে বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে] এমনভাবে প্রকাশ বা পরিবেশন করা যাইবে যাহাতে উক্ত নারী বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ না পায়।”

এই আইন মানতে ব্যর্থ হলে ধারা ১৪(২) অনুযায়ী, দায়ী ব্যক্তি অনধিক দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ডেই সাজা পেতে পারেন।

অথচ দুটি প্রতিবেদনেই বাড়তি কোনো মাস্কিং বা ব্লার ছাড়াই, শুধু তার নিজের ওড়না দিয়ে মুখ ঢাকার ওপরই ভরসা রেখে কিশোরীর বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদেরও মুখ না ঢেকে প্রকাশ করা হয়েছে, যা তাদের পরিচয় প্রকাশের শঙ্কা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুনের মতে, দুটি সংবাদমাধ্যম কিশোরীর পরিস্থিতিকে বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করে তার সংকটকেই আরও গভীর করে তুলেছে। তিনি বলেন, “এই দুটি মিডিয়া হাউজ ভুক্তভোগীর অসহায়ত্বকে বিকৃত করেছে, বিভ্রান্তিকরভাবে উপস্থাপন করেছে এবং এটি নিয়ে বাণিজ্য করেছে।”

গবেষণা পদ্ধতি

গত ১৪ থেকে ১৮ জুনের মধ্যে ঠাকুরগাঁও ধর্ষণ মামলা সংক্রান্ত সামাজিক মাধ্যমের পোস্ট, ভিডিও প্রতিবেদন ও স্ক্রিনশট পর্যালোচনা করেছে ডিসমিসল্যাব। সামাজিক মাধ্যম বিশ্লেষণের জন্য ফেসবুক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডস জুড়ে মূল সার্চ মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়েছে বাংলা টিভির ক্যাপশনটিকে। টিকটকে অবশ্য একই কিওয়ার্ড অনুসন্ধান করা যায়নি বলে সেখানে সংশ্লিষ্ট বাংলা কিওয়ার্ড ও ভিজ্যুয়াল মিলিয়ে খুঁজে বের করা হয়েছে কিশোরীর ছবি বা ফুটেজ ব্যবহার হওয়া ভিডিওগুলো।

প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য, শেয়ার ও ভিউ— সবকিছুর হিসাব ২৯ জুন পর্যন্ত রাখা হয়েছে। মন্তব্য বিশ্লেষণের জন্য বাংলা টিভির ফেসবুক পোস্টে দৃশ্যমান প্রথম ১০০টি মন্তব্য বেছে নেওয়া হয়েছে। কোন মন্তব্য কিশোরীর হাসি নিয়ে, কোনটি অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, কোনটি তাকে দোষারোপ করে, কোনটি ব্যঙ্গাত্মক, আর কোনটিতে সমর্থনের সুর ছিল- তা এই ভাগেই উঠে এসেছে।

এই ঘটনায় বাংলাদেশের ১২টি সম্প্রচার সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে কিনা যাচাই করেছে ডিসমিসল্যাব। প্রকাশিত হলে সেখানে হাসির দৃশ্য এসেছিল কি না, কিংবা কিশোরী বা তার পরিবারের পরিচয় প্রকাশ পেয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হয়েছে। এর পাশাপাশি কিশোরীর পরিবার, হাসপাতালে সাক্ষাৎকারের সময় উপস্থিত সাংবাদিক এবং বাংলা টিভি ও এশিয়ান টেলিভিশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলা হয়েছে। হাসির দৃশ্যটি ঠিক কখন ঘটেছিল, তা নিশ্চিত হতে পর্যালোচনা করা হয়েছে সাংবাদিকদের পাঠানো মূল ফুটেজও।

আরো কিছু লেখা