মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
khalilur rahman unga factcheck

খলিলুর রহমানকে নিয়ে মিথ্যা দাবি ছড়ালেন অভিনেতা স্বাধীন খসরু

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, জাতিসংঘে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে ‘মিথ্যুক’ বলেছেন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, দাবিটি মিথ্যা। মূল ঘটনায় ওয়াল্টজকে মিথ্যুক বলেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রদ্রিগেস।

গত ২৮ অক্টোবর ফেসবুক পেজ নেশন ওয়ান (Nation One) ভিডিওটি পোস্ট করে। ভিডিওতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ কক্ষে কয়েকজন কূটনীতিককে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়াতে দেখা যায়। কয়েকজনকে চিৎকার করে ‘You are a liar’ বলতে শোনা যায়। ভিডিওতে বাংলায় লেখা, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ, জাতিসংঘের বর্তমান সভাপতি বাংলাদেশী ড. খলিলুর রহমানকে মিথ্যুক বলেছেন।” (বানান অপরিবর্তিত)

এ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত পোস্টটিতে ৩ হাজার ২০০-এর বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে। ভিডিওটি ৩০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে এবং ৭ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।

গত ২৮ অক্টোবর অভিনেতা স্বাধীন খসরুর (Shadhin Khasru) ভেরিফায়েড প্রোফাইল থেকে একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। পোস্টে লেখা হয়, “You are a Liar — জাতিঢংঘ অধিদপ্তরে রজার খলিলের একি অবস্থা!” (বানান অপরিবর্তিত)। পোস্টে দৃশ্যটিকে খলিলুর রহমানকে মিথ্যুক বলার ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

এ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত ভিডিওটিতে ৮ হাজার ২০০-এর বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে। এটি ২ হাজার বারের বেশি শেয়ার হয়েছে এবং ৩ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।

অনুসন্ধানে ডিসমিসল্যাব ভিডিওটির কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে। এতে ইউটিউবে একই ঘটনার একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটি গত ২৭ অক্টোবর কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MINREX) ইউটিউব চ্যানেল কিউবামিনরেক্স (Cubaminrex)-এ প্রকাশিত হয়। ভিডিওর শিরোনাম ছিল, ‘জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের বক্তব্য খণ্ডন করল কিউবা’। ভিডিওর বিবরণে লেখা, “কিউবার প্রতিনিধি দল মার্কিন প্রতিনিধির মিথ্যাচারের নিন্দা জানিয়েছে।”

এ ঘটনাটি নিয়ে ২৭ অক্টোবর একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম সিবারকিউবা (CiberCuba)। প্রতিবেদনে ভাইরাল ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে মিলে যাওয়া দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিওটির সূত্র হিসেবে সেখানে কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস পাররিইয়া এক্স পোস্টের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

কিউবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইউটিউব চ্যানেল কিউবামিনরেক্সে প্রকাশিত ভিডিও (বামে) এবং সংবাদমাধ্যম সিবারকিউবায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের (ডানে) স্ক্রিনশট

সিবারকিউবার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২৭ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবরোধ নিয়ে বার্ষিক বিতর্ক চলছিল। ওয়াল্টজ বক্তব্য দেওয়ার সময় রদ্রিগেস ও কিউবার প্রতিনিধি দলের সদস্যরা আসন ছেড়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান। তারা ওয়াল্টজের বক্তব্যে বাধা দেন।

খলিলুর রহমান গত ৮ সেপ্টেম্বর সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব নেন। ওই বিতর্কে তিনিই সভাপতিত্ব করছিলেন। সিবারকিউবার প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি কিছুক্ষণের জন্য অধিবেশন স্থগিত করেন। রদ্রিগেসকে তিনি বলেন, “অনুগ্রহ করে নিজ আসনে ফিরে যান।”

এবিসি নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, রদ্রিগেস মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলে ওয়াল্টজ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতিকে উদ্দেশ করে চিৎকার করে বলেন, ‘মিস্টার প্রেসিডেন্ট, এই ব্যক্তিকে এই মঞ্চ থেকে সরে যেতে হবে।’”

সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভিডিওতে ওয়াল্টজকে মিথ্যুক বলে চিৎকার দিতে শোনা যায়। ওয়াশিংটন টাইমসের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, রদ্রিগেস ওয়াল্টজকে মিথ্যুক বলেন এবং কার্যবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলেন। অধিবেশন আবার শুরু হলে সভাপতি রদ্রিগেসকে শুধু প্রক্রিয়াগত বিষয়ে বলার সুযোগ দেন। ওই সময়ও রদ্রিগেস ওয়াল্টজের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলার অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন।

সিএনএন এবং ওয়াশিংটন টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, রদ্রিগেস ওয়াল্টজকে মিথ্যুক বলেন

ওই দিন রদ্রিগেস এক্সে স্প্যানিশ ভাষায় একটি পোস্ট করেন। পোস্টে ওইদিনের ভিডিও যুক্ত করে লেখেন, “মার্কিন সরকার জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে রূঢ়ভাবে ও অবিরাম মিথ্যা বলছে।” (স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করা) পোস্টে মার্কিন স্থায়ী প্রতিনিধির দম্ভ ও অহংকারের সমালোচনা করা হয়েছে। এতে সাধারণ পরিষদের সভাপতি খলিলুর রহমানের কোপারিলিয়ানো উল্লেখ নেই।

ওয়াল্টজও ২৭ অক্টোবর এক্সে ঘটনার ভিডিওসহ একটি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি লেখেন, কিউবার ক্যাস্ট্রো সরকার জনগণের ক্ষতি করে বিলাসবহুল গাড়ি, দামি ঘড়ি ও ব্যক্তিগত দ্বীপ রিসোর্টের মাধ্যমে মুনাফা করেছে। তাঁর ভাষায়, “রেজিমের গুন্ডারা আমার বক্তব্যে বাধা দিতে মঞ্চে ছুটে আসে।” (ইংরেজি থেকে অনুবাদ করা) এ পোস্টেও খলিলুর রহমানের কোনো উল্লেখ নেই। 

বাংলাদেশের গণমাধ্যমেও এ ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ ২৮ অক্টোবর “জাতিসংঘ অধিবেশনে যুক্তরাষ্ট্র-কিউবা উত্তেজনা প্রশমিত করলেন খলিলুর রহমান” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

এবিসি নিউজের বরাতে তারা জানায়, ওয়াল্টজ ও কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাগ্‌বিতণ্ডার সময় খলিলুর রহমান হাতুড়ি ঠুকেও পরিস্থিতি শান্ত করতে পারেননি। পরে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য অধিবেশন স্থগিত করেন। 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ঘটনাটি গুরুত্ব পেয়েছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ২৮ অক্টোবরের প্রতিবেদনে লিখেছে, কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী উচ্চকণ্ঠে ওয়াল্টজের বক্তব্যে বাধা দেন। দুজনের মধ্যে চিৎকার-চেঁচামেচি হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র কিউবার এক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে। সিজিটিএনের প্রতিবেদনেও ওয়াল্টজ ও রদ্রিগেসের সংঘাত এবং সভাপতির অধিবেশন স্থগিতের কথা এসেছে। ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে কোনো গণমাধ্যমে ওয়াল্টজের খলিলুর রহমানকে মিথ্যুক বলার তথ্য পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, ২৭ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ওয়াল্টজকে মিথ্যুক বলেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেস পাররিইয়া, খলিলুর রহমানকে নয়। উল্লেখ্য, এর আগেও অভিনেতা স্বাধীন খসরুর প্রোফাইল থেকে ছড়ানো ভুয়া দাবি নিয়ে ডিসমিসল্যাব ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। 

আরো কিছু লেখা