রাঙামাটির সাজেক এখন ‘জুম্ম লিবারেশন আর্মি’ বা জেএলএ (JLA) বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে, এমন দাবিতে ফেসবুকে অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের চারটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, মিয়ানমারভিত্তিক একটি ফেসবুক প্রোফাইলে ছবিগুলো আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রোফাইলের দাবি অনুযায়ী, ছবিগুলো দেশটির সামরিক জান্তাবিরো”ধী সশস্ত্র বাহিনী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) ।
গত ২৫ অক্টোবর ‘হ্যালো জুম্মো পিপলস’ (Hello Jummo People’s) নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে চারটি ছবি পোস্ট করা হয়। এতে দাবি করা হয়, সাজেকের পুরো এলাকা এখন জেএলএ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। পোস্টে পর্যটকদের সাজেকে প্রবেশ না করার আহ্বান জানানো হয়। আরও বলা হয়, জেএলএ বাহিনীর হাতে ধরা পড়লে জামিন পাওয়া যাবে না। এমনকি মুক্তিপণের বিনিময়েও কাউকে ছেড়ে দেওয়া হবে না। একই পোস্টে ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কথাও বলা হয়।

এই পোস্টটি শেয়ার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা (Fatima Tasnim Zuma) লিখেছেন, “এটা টেরর না। টেরর হইতো যদি তাদের নামের সাথে মো. বা ইসলাম থাকতো।”
একই পোস্ট অ্যাক্টিভিস্ট মোহাম্মদ ইশরাক (Mohammad Ishrak) ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আমান আজমীর (Abdullah Aman Azmi) প্রোফাইল থেকেও শেয়ার করা হয়।
এছাড়া ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস অ্যালায়েন্স অব বাংলাদেশ’ (Private University Students Alliance of Bangladesh – PUSAB) নামের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে পোস্টটি শেয়ার করা হয়। লেখা হয়, “যারা বলে পাহাড় থেকে সেনা সরাও ওদেরকে প্যাকেট করে এদের সাথে ছেড়ে দিয়ে আসা হোক।”
ছড়িয়ে পড়া ছবিগুলোর প্রথমটিতে পাহাড়ি একটি খোলা জায়গায় কয়েকজন ব্যক্তিকে দেখা যায়। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ছবিতে অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের পাথুরে ঢাল বেয়ে একটি জলধারার দিকে নামতে দেখা যায়। চতুর্থ ছবিতে গাছের সঙ্গে রাখা একাধিক আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়।
সত্যতা যাচাইয়ে ছবিগুলো রিভার্স সার্চ করা হলে ‘কিয়াও জেয়া’ (Kyaw Zayar) নামের ফেসবুক প্রোফাইলের একটি ভিডিওতে দুইটি ছবির দৃশ্য পাওয়া যায়। এই প্রোফাইলে গত ২৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত ভিডিওটিতে পাথুরে ঢাল বেয়ে অস্ত্রধারীদের জলধারায় নামতে দেখা যায়। তাদের পোশাক, অস্ত্র, অবস্থান এবং আশপাশের পাথর ও গাছপালার সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া দুটি ছবির দৃশ্য হুবহু মিল পাওয়া যায়।
ভিডিওটির বর্ণনা বার্মিজ ভাষায় লেখা। বাংলায় এর অর্থ দাঁড়ায়, “যত কঠিন পরিস্থিতিই আসুক না কেন, আমাদের একসঙ্গে তা কাটিয়ে উঠতে হবে।”
অধিকতর যাচাইয়ে প্রোফাইলটি পর্যবেক্ষণ করা হলে, ছড়িয়ে পড়া পোস্টের প্রথম ও চতুর্থ ছবিও খুঁজে পাওয়া যায়। প্রথম ছবিটি কিয়াও জেয়া প্রোফাইল থেকে ২০২৫ সালের ২০ আগস্টে এবং চতুর্থ ছবিটি চলতি বছরের ১২ জুলাই পোস্ট হয়। ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট পোস্ট হওয়া ছবির পোস্টে বার্মিজ ভাষায় লেখা আছে, “বাড়ি থেকে দূরে ছুটে আসার পর রোদটা যেন আরও তীব্র হয়ে উঠেছে। পথটাও যেন আরও দুর্গম হয়ে উঠেছে। কী ভীষণ ক্লান্ত লাগছে, মা!”

গত ১২ জুলাই প্রকাশিত ছবির সঙ্গে লেখা ছিল, “একে একে সবাইকে মরিয়া হয়ে বিদেশে পালিয়ে যেতে দেখে বুকটা কষ্টে ভরে ওঠে। এই বিধ্বস্ত, পুরোনো মাতৃভূমিকে নিশ্চিন্তে রেখে যান। একদিন আমরা যখন দেশটাকে যথাসাধ্য ভালোভাবে মেরামত করে আবার গড়ে তুলব, তখন আপনারা ফিরে আসবেন তো, তাই না?”
‘কিয়াও জেয়া’ নামের ফেসবুক প্রোফাইলটির পরিচিতিতে মিয়ানমারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার একাধিক তথ্য পাওয়া যায়। প্রোফাইলের বিস্তারিত (Personal details) অংশে বর্তমান বসবাসের স্থান হিসেবে মাগওয়ে, মিয়ানমার (Magway, Myanmar) এবং নিজের আদি নিবাস হিসেবে “ম্যাইং, মাগওয়ে, বার্মা’ (Myaing, Magwe, Burma) উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি স্থানই মিয়ানমারের মাগওয়ে অঞ্চলের।
প্রোফাইলের বায়োতে লেখা রয়েছে ‘ইয়েবও ব্ল্যাক’ (Yebaw black) । বার্মিজ ‘ইয়েবও’ (Yebaw) শব্দের অর্থ সহযোদ্ধা বা সৈনিক। পরিচিতির আরেকটি অংশে বার্মিজ ভাষায় পাকোক্কু জেলার ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়নের নাম উল্লেখ রয়েছে। কর্মস্থলের ঘরেও একই ব্যাটালিয়নের পরিচয় দেওয়া হয়েছে।

২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ভয়েস অব স্প্রিংয়ের একটি প্রতিবেদনে মাগওয়ে অঞ্চলের পাকোক্কু জেলার ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়নের ‘অ্যাভেঞ্জার’ কোম্পানির প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছরের ১ জানুয়ারি প্রশিক্ষণ সমাপনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সংবাদমাধ্যমটি প্রতিবেদনটিকে পিডিএফ-সংশ্লিষ্ট সংবাদ হিসেবে প্রকাশ করে। এছাড়া একই বছরের ২০ জুন প্রকাশিত লুদু নওয়ে উ-এর আরেকটি প্রতিবেদনেও পাকোক্কু জেলার ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়নের উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়নকে অন্যান্য স্থানীয় প্রতিরোধ বাহিনীর সঙ্গে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে, ‘কিয়াও জেয়া’ প্রোফাইলটির ট্রান্সপারেন্সি’ (Profile transparency) অংশে দেখা যায়, এটি ২০২৩ সালের ৮ জুলাই তৈরি। সেখানে প্রোফাইল পরিচালনাকারীর অবস্থান হিসেবেও মিয়ানমার উল্লেখ রয়েছে।
এছাড়া, প্রোফাইলটির কভার ছবিতে সামরিক পোশাক পরা একদল ব্যক্তিকে দেখা যায়। তাদের পোশাকের বাহুতে লাল রঙের ব্যাজ এবং পেছনে সাদা তারাযুক্ত লাল পতাকা রয়েছে। ব্যাজ ও পতাকার প্রতীক যাচাই করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তাবিরোধী সশস্ত্র বাহিনী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) ব্যবহৃত বাহুব্যাজ ও পতাকার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। বিশেষ করে পোশাকের লাল ঢাল আকৃতির ব্যাজের সাদা কিনারা ও ভেতরের হলুদ প্রতীক এবং পতাকার লাল পটভূমিতে সাদা তারার নকশায় মিল রয়েছে। এসব প্রতীক এবং প্রোফাইলটির পরিচিতিতে পিডিএফের পাকোক্কু জেলার ১৪ নম্বর ব্যাটালিয়নের উল্লেখ মিয়ানমারের ওই বাহিনীর সঙ্গে প্রোফাইলটির সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দেয়।
অর্থাৎ, ‘জুম্ম লিবারেশন আর্মি’ বা জেএলএ (JLA) বাহিনী কর্তৃক সম্প্রতি সাজেক দখল হয়েছে দাবিতে ফেসবুকে অস্ত্রধারী ব্যক্তিদের যে চারটি ছবি ছড়িয়ে পড়েছে, সেগুলো মিয়ানমার ভিত্তিক পেজ থেকে প্রকাশিত সশস্ত্র বাহিনী পিপলস ডিফেন্স ফোর্সের (পিডিএফ) ছবি।

