সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব
Fact-check of an Old photo of a theft case arrestee falsely shared as 11-year-old boy who killed sister’s rapist in Chandpur

চুরির মামলায় গ্রেফতারকৃতের ছবি ছড়াচ্ছে ধর্ষক হত্যাকারী শিশুর দাবিতে

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব

চাঁদপুরে বোনের ধর্ষককে গুলি করে হত্যা করেছে ১১ বছরের এক শিশু এবং এ অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে সম্প্রতি একাধিক ভিডিও, পোস্ট ও ছবি ছড়িয়ে এমনই এক দাবি প্রচার করা হচ্ছে। তবে, ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, দাবিটি সঠিক নয়। চাঁদপুরে ১১ বছরের কোনো শিশু বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় ধর্ষককে গুলি করে হত্যা করেছে, এমন তথ্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র বা গণমাধ্যমের প্রতিবেদনেও পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে যাচাইয়ে দেখা যায়, একাধিক দাবিতে গ্রেপ্তারকৃত হিসেবে যার ছবি ব্যবহৃত হয়েছে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকার খিলগাঁওয়ে মায়ের দায়ের করা মাদক ও চুরির মামলায় পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল সে।

ফেসবুকে গত ১২ এপ্রিল ‘ইনসাইড বাংলা’ নামের একটি পেজ থেকে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। কার্ডে দুইটি ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে। একটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, একটি পিস্তল এবং অন্য ছবিতে দেখা যাচ্ছে এক কিশোরকে হাতকরা পরিয়ে তিন পুলিশ ধরে নিয়ে যাচ্ছে। কার্ডের শিরোনামে লেখা, “১১ বছরের একটা শিশু; চারটি গুলি চালিয়েছে!”

Fact-check of an Old photo of a theft case arrestee falsely shared as 11-year-old boy who killed sister’s rapist in Chandpur
চাঁদপুরে ১১ বছরের শিশু কর্তৃক বোনের ধর্ষককে হত্যার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত ছবি ছড়ানো একাধিক ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট। 

ক্যাপশনের একটি অংশে লেখা, “মা বাবা বাড়িতে না থাকায় এক দূরসম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে আসে, একা পেয়ে মেয়েটিকে ধস্তাধস্তি করে। এক পর্যায়ে  জবরদস্তি করে ধ*র্ষণ করেছে, এমন অবস্থায় ১১ বছরের শিশু সাফওয়ান স্কুল থেকে এসে দেখতে পায় বোন র*ক্তাক্ত অবস্থায় গড়াগড়ি খাচ্ছে,  ছেলেটি ড্রইংরুমে গিয়ে বাবার লাইসেন্স করা পি*স্তল দিয়ে চার রাউন্ড গু*লি করে হ*ত্যা করে বোনের ধ*র্ষণের প্র*তিশোধ নেয়। শিশুটি পুলিশের কাছে সব শিকার উক্তি দিয়ে বলে – আমি স্কুল থেকে আসার পর দেখতে পাই আমার বোন র*ক্তাক্ত অবস্থায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, এবং ঐ ল*ম্পটকে বকাঝকা করছে। আমি সাথে সাথে ড্রইংরুমে গিয়ে আব্বুর লাইসেন্স করা পি*স্তল দিয়ে চারটি গু*লি চালিয়েছি। ছেলেটি আরো বলেন, আমি মনে মনে ভেবেছিলাম, এই সৎ কাজের জন্যে পুলিশ আমাকে ধন্যবাদ দিবে। এখন দেখি পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। ঘটনাটি ঘটেছে চাঁদপুর মতলব থানা রইচাপূর ইউনিয়নে” (লেখা অপরিবর্তিত)। পোস্টে দাবি করা হয়েছে, দৈনিক ইত্তেফাক থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

একই পোস্ট ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল (, ) ও পেজ থেকে করা হয়। ইনস্টাগ্রামেও একটি দাবির একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়।

অন্যদিকে, ফেসবুকে একটি পেজ থেকে একই দাবির আরেকটি ছবি পোস্ট করা হয়। ছবিতে দেখা যাচ্ছে একটি গাছের নিচে অনেক মানুষ জড়ো হয়ে আছে। ক্যাপশনে লেখা, “বোনের ধ/র্ষণ/কারীকে বাবার লাইসেন্স করা পি’স্তল দিয়ে গু/লি করে হ/ত্যা করেছে ১১ বছর বয়সি ভাই।” ফেসবুকের একাধিক গ্রুপ, পেজ ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল (, , , , ) থেকে একই দাবিতে পোস্টটি করা হয়।

গত ১৭ এপ্রিল ‘চ্যানেল ইউরোপ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও একই দাবিতে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, “চাঁদপুরে বোনের সম্ভ্রম রক্ষায় ১১ বছরের ভাইয়ের চরম পথ”। এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিওটি ৪৫ লাখের অধিক দেখা হয়েছে এবং ৪৯ হাজারের বেশি শেয়ার করা হয়েছে।

এই ভিডিওতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ১ লাখ ৮৪ হাজারের অধিক ব্যবহারকারী। মন্তব্য করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ২৬ হাজার। একাধিক ব্যবহারকারী ঘটনাটি সত্য ধরে নিয়ে তাদের মতামত জানিয়েছেন। একজন লিখেছেন ,“ছেলেটার জন্য নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত।” আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “এই ছেলেটি খুবই একটি ভালো কাজের মত কাজ করছে যেটা নাকি বাংলাদেশের পুলিশ পারেনি”। একই দাবিতে আরেকটি ভিডিও পোস্ট করা হয়।

Fact-check of an Old photo of a theft case arrestee falsely shared as 11-year-old boy who killed sister’s rapist in Chandpur
চাঁদপুরে ১১ বছরের শিশু কর্তৃক বোনের ধর্ষককে হত্যার দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত একটি ভিডিও ছড়ানো একাধিক ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট। 

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে প্রথমেই দৈনিক ইত্তেফাকের ফটোকার্ড ও পোস্টগুলো যাচাই করে দেখে ডিসমিসল্যাব। তবে বোনের ধর্ষককে পিস্তল দিয়ে হত্যা করা হয়েছে- এমন ধরনের কোনো প্রতিবেদন বা ফটোকার্ড সংবাদমাধ্যমটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ কিংবা ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়নি।

আরও বিস্তারিত জানতে ফটোকার্ডের কিশোরের ছবিটির রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। যাচাইয়ে ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর পোস্ট করা একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ক্যাপশনে লেখা, “মায়ের মা*মলায় ছেলে কা*রাগারে।” ১৮ ডিসেম্বর ওই ব্যক্তি আগের পোস্টের ফলোআপ হিসেবে একই কিশোরের ছবি দিয়ে একটি লিখিত পোস্ট করেন।

Fact-check of an Old photo of a theft case arrestee falsely shared as 11-year-old boy who killed sister’s rapist in Chandpur
আসল ভিডিওটি প্রকাশ করা ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

ওই পোস্টের ক্যাপশন অনুযায়ী, গ্রেপ্তার হওয়া ছেলেটির নাম মো.বিজয়, তার বয়স ১৮ বছর। তার মায়ের করা অভিযোগ অনুযায়ী, বিজয় খারাপ ছেলেদের সঙ্গে চলাফেরা করত এবং দীর্ঘ দিন ধরে নেশা করত। ১৫ নভেম্বর নেশা করার জন্য মায়ের কাছে ২০ হাজার টাকা চায় সে। টাকা না পেয়ে মাকে মারধর করে বিজয়। একপর্যায়ে ঘরের শোকেস ভেঙে ড্রয়ার থেকে ২৫ হাজার টাকা চুরি করে। এতে তিনি নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ছেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। মা জাহানারা বেগম দণ্ডবিধির ৩২৩, ৩৮০, ৪২৭ ও ৫০৬ ধারায় ১৭ নভেম্বর আদালতে মামলা করেন।

এ ব্যাপারে আরও জানতে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করলে দেখা যায় একাধিক সংবাদমাধ্যম (, , ) সে ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

Fact-check of an Old photo of a theft case arrestee falsely shared as 11-year-old boy who killed sister’s rapist in Chandpur
মূল ঘটনা নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

প্রতিবেদনে থাকা ছেলেটির সঙ্গে প্রচারিত ছবির ছেলেটির অনেকটা সাদৃশ্য রয়েছে। তার মুখ, পোশাক, পেছনের দৃশ্যপট, পুলিশের অবস্থান সবকিছু সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টের ব্যক্তির মিল পাওয়া যায়। আগেও একই ছবিটি ব্যবহার করে ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হলে, একাধিক তথ্যযাচাইকারী সংস্থা এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। 

অর্থাৎ, খিলগাঁওয়ে মাদক ও চুরির মামলায় আটক হওয়া ছেলের পুরোনো ছবি, চাঁদপুরে বোনের ধর্ষককে হত্যায় গ্রেপ্তার হওয়া শিশুর দাবিতে ছড়াচ্ছে, যা সঠিক নয়।

এদিকে চাঁদপুরে ১১ বছর বয়সী সাফওয়ান নামের কোনো শিশু বাবার পিস্তল দিয়ে বোনের ধর্ষককে গুলি করে হত্যা করেছে- এ শিরোনামে কোনো তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র বা গণমাধ্যমের বরাতে জানা যায় না। প্রচারিত দাবিতে ব্যবহৃত গাছের নিচে লোকজনের ছবিটির উৎস যাচাইয়ে সেটিকে রিভার্স ইমেজ সার্চ দেওয়া হয়। সার্চে একটি ইউটিউব চ্যানেল থেকে ২০১৮ সালের ২৬ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ভিডিওর শিরোনামে লেখা, “তিন পায়ে হাঁটা দেখলে আপনিও অবাক হয়ে যাবেন ইকো পার্ক,গাংনী,মেহেরপুর।” ভিডিওর দৃশ্যপটের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া পোস্টের ছবিটি হুবহু মিলে যায়।

Fact-check of an Old photo of a theft case arrestee falsely shared as 11-year-old boy who killed sister’s rapist in Chandpur
রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে খুঁজে পাওয়া ২০১৮ সালের মেহেরপুর ইকো পার্কের আসল ভিডিওটির স্ক্রিনশট।

অর্থাৎ, পুরোনো অপ্রাসঙ্গিক ভিডিও থেকে ছবি নিয়ে তা ভুয়া দাবিতে ব্যবহার করে বিভ্রান্ত করা হচ্ছে। এর আগেও ভিন্ন ঘটনার ছবি বা ভিডিও চাঞ্চল্যকর দাবিতে ছড়ালে, এ নিয়ে ফ্যাক্টচেক করেছে ডিসমিসল্যাব।

আরো কিছু লেখা