সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের সাজানো দৃশ্যকে আসল ভেবে সংবাদমাধ্যমে প্রচার

ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের সাজানো দৃশ্যকে আসল ভেবে সংবাদমাধ্যমে প্রচার

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব

ক্যানসার আক্রান্ত প্রেমিকা বেশিদিন বাঁচবেন না জেনে হাসপাতালে বিয়ে সারলেন প্রেমিক- এমন দাবিতে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেক বলছে, ভিডিওটি কোনো সত্য ঘটনা নয় বরং সাজানো কনটেন্ট-এর অংশ। যাচাইয়ে দেখা যায়, দৃশ্যের ব্যক্তিরা আসলে ভারতের দুইজন কনটেন্ট নির্মাতা। সামাজিক মাধ্যমে তাদের ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো মূলত একটি গল্পের সিরিজের দৃশ্য।

ক্যানসার আক্রান্ত প্রেমিকা সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি গত ২ জুন প্রকাশ করেছে গণমাধ্যম নিউজ টোয়েন্টিফোর, নিউজফ্ল্যাশ সেভেন্টিওয়ান, বাংলাটিভিসহ একাধিক অনলাইন মাধ্যম। সংবাদমাধ্যমের ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রতিবেদনগুলো প্রকাশিত হয়। নিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদনে দেখা যায়, হাসপাতালের বিছানায় রোগীর পোশাকে শুয়ে কাঁদছেন এক তরুণী। পাশে থাকা যুবক মেয়েটির গায়ে লাল ওড়না জড়িয়ে, সিঁদুর পরিয়ে হাসপাতালেই বিয়ে করে তাকে।

ফ্যাক্টচেক ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের সাজানো দৃশ্যকে আসল ভেবে সংবাদমাধ্যমে প্রচার
সাজানো কনটেন্টকে সংবাদমাধ্যমে আসল ঘটনা বলে প্রচার।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিলীপ আর অনামিকার ৪ বছর প্রেমের সম্পর্ক। কিন্তু হঠাৎ অনামিকার স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটলে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসকরা জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত এবং একদম শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। বাঁচার সম্ভাবনা তার নেই বললেই চলে। অনামিকার শেষ ইচ্ছে ছিল দিলীপের বধূ হওয়া। আর প্রেমিকার শেষ ইচ্ছাকে পূরণ করতে হাসপাতালের শয্যাকেই বিয়ের মণ্ডপ বানিয়ে দিলেন দিলীপ। কোনো জাঁকজমক আয়োজন বা সানাইয়ের সুর ছাড়াই, নিজে মন্ত্রপাঠ করে অনামিকাকে লাল চুন্দ্রী পরিয়ে, কপালে সিঁদুর এঁকে বিয়ে করলেন।

এই রিপোর্ট লেখার আগ পর্যন্ত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনটি ৩ লাখ ২৬ হাজারের বেশিবার দেখা হয়েছে এবং ৭৩০ বারের অধিক শেয়ার করা হয়েছে। বাকি সংবাদমাধ্যমেও একই তথ্য দেওয়া হয়েছে। তবে, এই প্রতিবেদন লেখার সময় বাংলা টিভির প্রতিবেদনটি সরিয়ে ফেলতে দেখা গেছে।

ভারতের একাধিক সামাজিক মাধ্যমেও (, , , , , ) একই দাবিতে ভিডিওটি এবং ভিডিওর স্ক্রিনশটগুলো প্রচার করা হয়েছে।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে জন্য ভিডিওর একাধিক কিফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। ডিসমিসল্যাবের সামনে প্রথমে আসে অনামিকা সিং নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে গত চলতি বছরের ২৮ মে পোস্ট করা একটি ভিডিও। ভিডিওর দৃশ্যপটের সঙ্গে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। পেজটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, তিনি ২৮ মে থেকে ৪ জুন পর্যন্ত একের পর এক একই দৃশ্যের ফলোআপ এবং একই পোশাক পরা বেশ কিছু ভিডিও আপলোড দিয়েছেন। 

অনামিকা সিংয়ের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও গত ২৭ মে থেকে একই দৃশ্যের কিছু ভিডিও পোস্ট হতে দেখা যায়। যাচাইয়ে দেখা যায়, এটি ভারত থেকে পরিচালিত একটি অ্যাকাউন্ট। অ্যাকাউন্টের বায়োতে লেখা, তিনি একজন অভিনেত্রী এবং মুহূর্তগুলোকে তিনি গল্পে পরিণত করেন।

  • ফ্যাক্টচেক ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের সাজানো দৃশ্যকে আসল ভেবে সংবাদমাধ্যমে প্রচার
  • ফ্যাক্টচেক ভারতীয় কনটেন্ট নির্মাতাদের সাজানো দৃশ্যকে আসল ভেবে সংবাদমাধ্যমে প্রচার

এই অভিনেত্রী তার একাধিক ভিডিওতে দিলীপ কুমার পাণ্ডে নামের এক ব্যক্তিকে ট্যাগ করেছেন। দিলীপ কুমার পাণ্ডের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গিয়ে দেখা যায় ইনি হলেন অনামিক সিংয়ের সঙ্গে থাকা হাসপাতালের সেই যুবক। দিলীপ কুমার পাণ্ডেও একজন অভিনেতা এবং কনটেন্ট নির্মাতা।

এই দুইজন কনটেন্ট নির্মাতার এর ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, তারা বিভিন্ন সময়ে একসঙ্গে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে অসংখ্য (, , , , , , , , ) ভিডিও দিয়ে নাটকের সিরিজটি তৈরি করছে।

অর্থাৎ, ক্যানসার আক্রান্ত প্রেমিকা বেশিদিন বাঁচবেন না জেনেও প্রেমিক তাকে বিয়ে করে নজির স্থাপন করেছেন এমন দাবিটি সঠিক নয়। দুইজন ভারতীয় অভিনেতা ও কনটেন্ট নির্মাতার তৈরি নাটকের সিরিজের দৃশ্য এটি।

ইতঃপূর্বেও, এমন কনটেন্ট নির্মাতাদের সাজানো দৃশ্যে বিভ্রান্ত হয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল যা ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে উঠে আসে।

আরো কিছু লেখা