
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম এক্সে একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়, বাংলাদেশে একটি মসজিদের ইমাম অমুসলিম নারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন। একই ভিডিওটি শেয়ার করে আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, ‘যৌন প্রলোভন’ সৃষ্টি করতে পারে- এ শঙ্কায় বাংলাদেশে মেয়েদের মাথা ন্যাড়া করতে বাধ্য করার ভিডিও এটি। তবে ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, এটি মূলত নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় চুরির অভিযোগে তিনজন নারীকে বেঁধে মারধরের ঘটনার। তিন মাস আগের এই ঘটনায় মারধরের স্বীকার তিনজন নারীর কেউই অমুসলিম ছিলেন না।
মিডল ইস্ট টোয়েন্টিফোর নামের এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ১৭ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয় বাংলাদেশ সময় ৩ জুন ভোর ৬ টায়। ভিডিওতে টুপি-পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তিকে জোরপূর্বক একজন নারীর চুল কেটে দিতে দেখা যায়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “যৌন প্রলোভন সৃষ্টি করতে পারে—এই আশঙ্কায় বাংলাদেশে মেয়েদের মাথা ন্যাড়া করতে বাধ্য করা হয়েছে।” অ্যাবাউট সেকশনে গিয়ে দেখা যায়, গণমাধ্যম দাবি করা এই অ্যাকাউন্টটি পোল্যান্ড থেকে পরিচালিত।
এর ১ ঘণ্টা ৪৫ মিনিট পর একই ভিডিও প্রায় একই ক্যাপশনে মোসাদ কমেন্টারি নামের এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও পোস্ট করা হয়। ইসরায়েল থেকে পরিচালিত অ্যাকাউন্টটির এই পোস্ট এ পর্যন্ত ৩৭০ বার শেয়ার করা হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে ৬২ হাজার বারের বেশি। মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “খুবই দুঃখজনক… ভারতের জন্য এটি একটি সতর্কবার্তা। তারা যদি ক্ষমতায় আসে, তাহলে আমাদের সন্তানদের কোনো স্বাধীনতা থাকবে না।”। আরেকজন লিখেছেন, “এই মুসলিম পুরুষদের কোনো লজ্জা বা আত্মনিয়ন্ত্রণ নেই, এবং দুঃখজনকভাবে এই সংস্কৃতি যুক্তরাজ্যে আমদানি করা হচ্ছে।”
থাইল্যান্ড থেকে পরিচালিত ফারাজ পারভেজ নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ভিডিও পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “ভয়াবহ। বাংলাদেশে একটি মসজিদের একজন মুসলিম ইমাম অমুসলিম নারীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করছেন, তাদের রাস্তায় পশুর চেয়েও খারাপভাবে আচরণ করা হচ্ছে। এটাই প্রকৃত ইসলাম।” ফারাজ পারভেজ নামের হ্যান্ডলের পরিচয়ে লেখা, তিনি পাকিস্তানি এবং যিশু খৃস্টে বিশ্বাস করায় তার বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ করা হয়েছে। তার পোস্টটি আট হাজারের বেশিবার শেয়ার হয়েছে। ভিডিওটি দেখা হয়েছে দুই লাখের বেশিবার।
মন্তব্যে একজন লিখেছেন, “অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এবং এই তথাকথিত ‘ইসলামি বর্বরতা’ বন্ধ করার সময় এসেছে। ছোট ছোট প্রতিরোধ গোষ্ঠী গড়ে তুলুন এবং এই ‘মুসলিম বর্বরদের’ বিরুদ্ধে নিজেদের রক্ষা করুন।” আরেকজন বলছেন, “এটাই আমরা দেশে নিয়ে এসেছি! বাহ, ব্রিটিশ সরকারের আত্মঘাতী সহানুভূতি।”
ভিডিও থেকে কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন (১, ২) খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। প্রতিবেদনে থাকা ছবির ব্যক্তি ও পোশাক সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এর দৃশ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। ২০২৬ সালের ২ ও ৩ মার্চ প্রকাশিত এসব প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, স্বর্ণের চেইন চুরির অভিযোগ তুলে তিন নারীকে বেঁধে নির্যাতন ও মাথার চুল কেটে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ২ মার্চ সোমবার দুপুরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় নির্যাতনের স্বীকার তিনজনের পরিচয়ও খুঁজে পাওয়া যায়। তারা হলেন—সুমাইয়া আক্তার (৩২), ইতি আক্তার (২৮) ও শারমিন আক্তার (৩০)।

প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে এ ঘটনায় বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত একাধিক ভিডিও (১, ২, ৩) ও সংবাদ প্রতিবেদন (১, ২, ৩, ৪) পাওয়া যায়। এসব প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, যাকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে নারীর চুল কাটতে দেখা যায় তার নাম সেলিম মিয়া। রূপগঞ্জ উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের ডহরগাঁও গ্রামের বাসিন্দা সেলিম মিয়ার বাড়িতে স্বর্ণের চেইন চুরির অভিযোগে তিন নারীকে বেঁধে রাখা হয়। এ সময় সেলিম মিয়াসহ তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজন মিলে তিন নারীর চুল কেটে দিয়ে তাদের মারধরও করেন। পরবর্তীতে এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় পৃথক দুইটি মামলায় চুল কেটে দেওয়ার ঘটনায় অভিযুক্ত সেলিম ভুঁইয়া ও চুরির দায়ে অভিযুক্ত তিন নারীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অর্থাৎ, চুরির অভিযোগে নির্যাতনের তিন মাস পুরোনো ভিডিও সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন দেশ থেকে পরিচালিত এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে।