মোহাম্মদ আল মুকিত

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Nahid story

নাহিদ’স ওয়ার্ল্ডের নাম ভাঙিয়ে ফেসবুকে ইলিশ বিক্রির প্রতারণা

মোহাম্মদ আল মুকিত

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

“নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড” নামের একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকদের মাছ সরবরাহ করে। তাদের ফেসবুক পেজের বিবরণীতে লেখা,“আমরা কখনোই অগ্রিম টাকা চাই না। আমাদের নামে অগ্রিম টাকার যেকোনো অনুরোধ একটি প্রতারণা।’’ কিন্তু ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই প্ল্যাটফর্মের উদ্যোক্তা নাহিদ হাসানের নাম, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক ভুয়া পেজ। এসব ভুয়া পেজ থেকে চটকদার অফার, মূল্যছাড় ও ফ্রি হোম ডেলিভারির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে। এসব পেজের ফাঁদে পড়ে অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে ইতোমধ্যে অনেক ক্রেতা প্রতারিত হয়েছেন।

“Nahid’s World-নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড”-এর নাম ও কনটেন্ট ব্যবহার করে অনলাইনে ইলিশ বিক্রির প্রতারণার জাল কতটা বিস্তৃত- তা যাচাই করতে ৮ অক্টোবর মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড দিয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদক। এতে ১৮টি পেজের মোট ৭০টি বিজ্ঞাপন পাওয়া যায়। এই বিজ্ঞাপনগুলোতে “নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড”-এর লোগো, স্বত্বাধিকারী নাহিদ হাসানের ছবি এবং মূল পেজে প্রচারিত ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে। গত ১১ অক্টোবর পুনরায় অ্যাড লাইব্রেরি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, উক্ত ১৮টি পেজের মধ্যে ১৫টি পেজের ইলিশ বিক্রির বিজ্ঞাপন তখনও সচল ছিল। বাকি তিনটি পেজ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। 

এই পেজগুলো ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’-এর নাম, লোগো, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে প্রচার চালিয়েছে। বিজ্ঞাপনে ‘ধামাকা অফার’, ‘৬৫% ডিসকাউন্ট’, ‘ফ্রি ডেলিভারি’র মতো প্রলোভন দেখিয়ে ৫ থেকে ১০ কেজি ওজনের ইলিশের বিভিন্ন প্যাকেজ বাজারদরের চেয়ে দামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হয়। যেমন- ‘টাটকা পদ্মার ইলিশ’ পেজে ৫ কেজি ইলিশ ১,৫০০ টাকা, ১০ কেজি ৪,৯৯৯ টাকায় বিক্রির কথা বলা হয়েছে।

মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে ইলিশ বিক্রির বিজ্ঞাপন।

‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’ পেজে সম্পূর্ণ টাকা অগ্রিম পরিশোধ করলে তিন কেজি ইলিশের ডিম ফ্রি দেওয়ার অফার যুক্ত করা হয়েছে। ফ্রি ডেলিভারির কথা বলা হলেও অর্ডার চূড়ান্ত করতে ‘বরফ খরচ’, ‘বক্স ফি’, ‘শিপিং চার্জ’-এর কথা বলে গ্রাহকদের কাছ থেকে ৩৫০ থেকে ৬৫০ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম টাকা দাবি করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষায় বাংলাদেশে গত ৮ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। আগামী ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত বঙ্গোপসাগর ও নদ-নদীতে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ,পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ থাকবে।

নিষেধাজ্ঞার এই সময়েও ইলিশ বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া ১৫টি পেজের মধ্যে ১১টি পেজের সঙ্গে সরাসরি মোবাইল এবং হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে সক্ষম হয় ডিসমিসল্যাব। কথোপকথনে পেজগুলোর প্রত্যেকে দাবি করে, নিষেধাজ্ঞাতেও তারা দেশের যেকোনো প্রান্তে ইলিশ সরবরাহ করতে পারবে। তবে এ জন্য অগ্রিম টাকা দাবি করা হয়।

পেজগুলোতে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করা হলে তারা নিজেদের নাহিদের প্রতিনিধি, কর্মচারী ও ব্যবসায়িক সহযোগী হিসেবে পরিচয় দেয়। কিন্তু মূল ভেরিফাইড পেজে বলা রয়েছে ‘কোনো অগ্রিম টাকা নেওয়া হয় না।’ সেক্ষেত্রে নাহিদের নাম, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে কেন আলাদা পেজ খুলে অগ্রিম টাকা চাওয়া হচ্ছে এবং ভিডিও ব্যবহারের অনুমতি আছে কি না- এমন প্রশ্ন করা হলে কোনো পেজের প্রতিনিধি সদুত্তর দিতে পারেনি।

‘ইলিশে ঘাট চাঁদপুর’ নামের পেজে যোগাযোগ করলে প্রথমে একজন নিজেকে নাহিদের কর্মচারী দাবি করেন। পরে আরেকজন নিজেকে সরাসরি ‘নাহিদ’ বলে পরিচয় দেন। পেজের সত্যতার প্রসঙ্গে গালিগালাজ করে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন তিনি। 

‘ইলিশের বাড়ি’ পেজ নিজেকে নাহিদের ব্যবসায়িক অংশীদার দাবি করেন। মূল পেজ রেখে নতুন পেজ কেন ব্যবহার করা হচ্ছে, জানতে চাইলে বিশেষ অফার দেওয়ার জন্য এই পেজ ব্যবহারের কথা বলেন। প্রমাণ হিসেবে চাঁদপুর পৌরসভা কার্যালয় থেকে ইস্যুকৃত একটি ট্রেড লাইসেন্সের ছবিও পাঠায়, যেখানে স্বত্বাধিকারী হিসেবে মোঃ নাহিদ হোসেনের নাম উল্লেখ ছিল।

নথির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ডিসমিসল্যাব ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’-এর হটলাইনে যোগাযোগ করে। প্রতিষ্ঠানটি নিশ্চিত করে, এটি ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স। তারা আরও জানায়, চাঁদপুরে তাদের কোনো শাখা বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই।

‘চাঁদপুর ইলিশ ঘাট’ নিজেদের নাহিদের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে জানায়, তাদের অন্তত ৩ থেকে ৪টি পেজ সক্রিয় রয়েছে। তবে মূল পেজের ভিডিও ব্যবহারের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে জবাব না দিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

‘চাঁদপুর ফিশ ভ্যালি’ পেজের প্রতিনিধির কাছে অনুমতি ছাড়া নাহিদের কনটেন্ট চালানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি উল্টো প্রশ্ন করেন, “তো কী করব?”

সতর্কতার পরও প্রতারিত হচ্ছে মানুষ

অনলাইনে কনটেন্ট চুরি ঠেকানো ও ক্রেতাদের সুরক্ষায় ভুয়া পেজ চিহ্নিত করে নিয়মিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তথ্য প্রচার করে ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’। গত ২৪ এপ্রিল তাদের পেজে জানানো হয়, ২৫টি ভুয়া পেজের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করা হয়েছে এবং এসব পেজের অ্যাড প্রমোশনে সহায়তাকারী এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

এমন সতর্কতার পরও নাহিদ হাসানের নাম ও ছবি ব্যবহার করা এসব পেজের ফাঁদে পড়ে অনেকে প্রতারিত হয়েছেন, প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফেসবুকে।

নিউইয়র্কপ্রবাসী মনজুর আলম বাদল গত ১৭ জুন ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে জানান, ঈদ উপলক্ষ্যে দেশে থাকা বোনের জন্য ‘চাঁদপুর ইলিশ’ নামের একটি ফেসবুক পেজে প্রচারিত বিজ্ঞাপন দেখে ৩৭ হাজার টাকার মাছ অর্ডার করেন। অর্ডারের পুরো টাকা তিনি অগ্রিম বিকাশে পরিশোধ করেন। তবে টাকা পাওয়ার পর পেজের প্রতিনিধি নির্দিষ্ট ঠিকানায় কোনো মাছ ডেলিভারি দেয়নি। পরবর্তীতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে পেজের সংশ্লিষ্টরা তার ফোন নম্বর ব্লক করে দেয়। মনজুর আলম তার পোস্টে পেজটির স্ক্রিনশট ও যোগাযোগের নম্বর প্রকাশ করেন। 

কাওসার ইসলাম ফাহিম নামের এক ব্যক্তি গত ২৬ আগস্ট ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’-এর অফিশিয়াল পেজকে অবহিত করে ফেসবুকে জানান, নাহিদের নাম ব্যবহার করা একটি পেজের মাধ্যমে তার এক আত্মীয় ৪ হাজার টাকা হারিয়েছেন। কাওসার ইসলাম জানান, তার আত্মীয় ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’-এর ছবি ও কনটেন্টযুক্ত একটি ভুয়া পেজকে আসল মনে করে ইলিশের অর্ডার দেন এবং ৪ হাজার টাকা অগ্রিম পেমেন্ট করেন। টাকা পাওয়ার পর ভুয়া পেজের প্রতিনিধিরা মেসেঞ্জারের আগের কথোপকথন মুছে দিয়ে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ফেসবুকে দুই ভুক্তভোগীর দেওয়া পোস্টের স্ক্রিনশট।

পরবর্তী সময়ে ৮ সেপ্টেম্বরের এক পোস্টে নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড পেজ থেকে জানানো হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে নড়াইল কেন্দ্রিক এক চক্রের ৩ জনসহ এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ থেকে ৪০ জন ভুয়া পেজ পরিচালনাকারীকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে।

নাহিদের নাম-পরিচয় ব্যবহার করে প্রতারণার বিরুদ্ধে একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবরও প্রকাশিত হয়েছে। গত ১২ অক্টোবর ‘স্টার নিউজ’-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ‘নাহিদস ওয়ার্ল্ড’ ও ‘চাঁদপুরের ইলিশ ঘাট’ নামের ভুয়া পেজ থেকে গ্রাহকদের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর ‘এশিয়া পোস্ট’-এর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নাহিদ ওয়ার্ড’, ‘ইলিশ ভাইয়া চাঁদপুর’ ও ‘ইলিশের বাড়ি চাঁদপুর’-সহ বিভিন্ন নামে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে ইলিশ বিক্রির কথা বলে প্রতারণা করছিল একটি চক্র। পরে অভিযান চালিয়ে নড়াইলের লোহাগড়া থেকে চক্রটির মূলহোতাসহ ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

স্টার নিউজ ও এশিয়া পোস্টের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

অনলাইনে নিজের নাম, ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করে চালানো এমন প্রতারণার বিষয়ে জানতে ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’-এর প্রতিষ্ঠাতা নাহিদ হাসানের সঙ্গে কথা বলে ডিসমিসল্যাব। তিনি জানান, তাদের অফিশিয়াল পেজ একটিই, যার অনুসারী ১৬ লাখ। ফেসবুকে অন্য কোনো পেজ থেকে মাছের ব্যবসা পরিচালনা করা হয় না। ভিন্ন পণ্যের জন্য আরেকটি পেজ থাকলেও মৌসুম ছাড়া সেটি সচরাচর সক্রিয় থাকে না।

গ্রাহকদের বিভ্রান্ত হওয়ার বিষয়ে নাহিদ হাসান বলেন, “আমাদের অফিশিয়াল নম্বরের বাইরে অন্য কোনো বিকাশ বা নগদ নম্বরে টাকা নেওয়া হয় না। এমনকি আমাদের প্রতিষ্ঠানে অগ্রিম টাকা নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। গ্রাহকরা চাইলে ভিডিও কলে কথা বলে কিংবা অফিশিয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে লেনদেন করতে পারেন।”

প্রতারক পেজের প্রতিনিধিরা নিজেদের ‘নাহিদ’স ওয়ার্ল্ড’-এর কর্মী দাবি করার বিষয়ে তিনি বলেন, “গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জন করতেই তারা এমন মিথ্যা দাবি করে। আমরা দেখেছি, আমাদের বর্তমান বা সাবেক কোনো কর্মী এই জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত নয়।”

তিনি আরও জানান, জালিয়াতি রুখতে তাদের আইটি টিম নিয়মিত কাজ করছে। এ পর্যন্ত বিভিন্ন থানায় ৬ থেকে ৭টি জিডি এবং ২টি মামলা করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপে বেশ কয়েকজন প্রতারককে আটক করা সম্ভব হয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া পেজ ও বিজ্ঞাপনের বিষয়ে মেটার ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাহিদ হাসান জানান, “ফেসবুক কর্তৃপক্ষের কাছে আমরা প্রতিনিয়ত রিপোর্ট করছি এবং শত শত ভুয়া পেজ নামানো হচ্ছে। কিন্তু একটি পেজ বন্ধ হলে প্রতারকরা নিমেষে আরেকটি নতুন পেজ খুলে ফেলে। বহু বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে মেটাতে রিপোর্ট করার পরও তারা সেগুলো সরায়নি, যার স্ক্রিনশট আমাদের কাছে আছে।”

আরো কিছু লেখা