নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ বাংলাদেশ অনলাইন হয়রানি

‘চোরের মতো বেঁচে আছি’

‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ বয়ানে ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ, হয়রানির শিকার ভুক্তভোগীরা

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ভুক্তভোগীদের ব্যক্তিগত তথ্য সম্বলিত পোস্টগুলোর লিংক এবং ছবি আমরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এড়িয়ে গেছি, যাতে এগুলো আরও ছড়িয়ে না পড়ে। এই অনুসন্ধান পরিচালনা এবং প্রকাশের সময় ডক্সিংয়ের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের গোপনীয়তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।


ফাতেমা (ছদ্মনাম) একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, ফেসবুকে তার ছবি, ফোন নম্বর এবং বাসার ঠিকানা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পোস্টগুলোতে তাকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে এক হিন্দু ছেলের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগে।

তার ক্ষতি করতে পারে, এমন মানুষের কাছেও ব্যক্তিগত তথ্য পৌঁছে গেছে, এ কথা ভেবে  তিনি নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে ভীত হয়ে পড়েন।

তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “আমি চোরের মতো বেঁচে আছি।”

অন্য ধর্মের একজনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগে ফেসবুকে যাঁদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, ফাতেমা তাঁদের একজন। পোস্টগুলোতে “ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ” ষড়যন্ত্র তত্ত্বের অবতারণা করা হয়, যেখানে অভিযোগ করা হয় যে, হিন্দু ছেলেরা বাংলাদেশি মুসলিম মেয়েদের ধর্মান্তরিত করার জন্য প্রেমের ফাঁদে ফেলে।

২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে, ডিসমিসল্যাব ২৩টি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ২৮৮টি পোস্ট শনাক্ত করে, যেগুলো এই বয়ানটি তুলে ধরে এবং মানুষের নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর বা সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইল প্রকাশ করে। কারও সম্মতি ছাড়া তার ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে তাকে হয়রানি, ভয়ভীতি বা অন্য ক্ষতির ঝুঁকিতে ফেলার বিষয়টি ডক্সিং (doxing) নামে পরিচিত। 

ডিসমিসল্যাব ডক্সিংয়ের শিকার এমন ১২ জন ভুক্তভোগীর সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যাদের ফোন নম্বর পোস্টগুলোতে প্রকাশ করা হয়েছিল। তারা সবাই পোস্টে তাঁদের সম্পর্কে করা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বলেছেন পোস্টগুলো প্রকাশের পর তারা হুমকি, হয়রানি এবং ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন। কয়েকজন জানিয়েছেন, সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার আশঙ্কা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগে তারা তাদের দৈনন্দিন কাজ এবং পড়াশোনা স্থগিত রেখেছেন। একজন আইন বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন যে, ডক্সিং মানুষকে আরও বেশি নির্যাতনের মুখে ফেলতে পারে।

‘ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ’ বয়ান কীভাবে ডক্সিংকে উসকে দেয়

ডক্সিং করা একাধিক ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

অল্ট নিউজের (Alt News) ২০২৩ সালের এক অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভারতে ‘লাভ জিহাদ’ বয়ানের পাল্টা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হিসেবে “ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ” আলোচনায় আসে। লাভ জিহাদে অভিযোগ করা হয়, মুসলিম পুরুষরা হিন্দু নারীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার জন্য প্রেমের ফাঁদে ফেলে। আর ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ তত্ত্ব সেই অভিযোগকে উল্টে দেয় এবং দাবি করে হিন্দু পুরুষরা মুসলিম নারীদের হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করার জন্য প্রেমের সম্পর্কের টোপ দিচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এই তত্ত্বটি বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে টেলিগ্রাম গ্রুপ এবং ডক্সিং ক্যাম্পেইনগুলো ভিন্ন ধর্মের সম্পর্কে জড়িত ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করতে শুরু করে।

ডিসমিসল্যাব ফেসবুকে বাংলায় “ভাগওয়া লাভ” কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করে এবং এই বিষয়ে পোস্ট প্রকাশ করছে এমন ৫৪টি পেজ শনাক্ত করে। এরপর গবেষকরা ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে ওই পেজগুলো থেকে পোস্ট সংগ্রহ করেন এবং ৩,৮২৮টি “ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ” সম্পর্কিত পোস্ট পান। পরবর্তীতে তারা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা পোস্টগুলো আলাদাভাবে পর্যালোচনা করেন।

সেই পর্যালোচনায় ২৩টি পেজ থেকে ২৮৮টি ডক্সিং পোস্ট পাওয়া যায়। পুনরাবৃত্তিমূলক পোস্টগুলো বাদ দেওয়ার পর, ১৯৪টি স্বতন্ত্র পোস্ট পাওয়া যায়। পোস্টগুলোতে কথিত সম্পর্কে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের এক বা একাধিক তথ্য প্রকাশ করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর, সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক এবং একটি ক্ষেত্রে একটি ইমেইল ঠিকানাও।

সবচেয়ে বেশি পোস্টে ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। পর্যালোচনা করা স্বতন্ত্র পোস্টগুলোর ৯৭ শতাংশে ছবি ছিল। ১০৭টি পোস্টে (৫৫%) নাম, ৫৮টি পোস্টে (৩০%) ঠিকানা, ৩১টি পোস্টে (১৬%) সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক এবং ১২টি পোস্টে (৬%) ফোন নম্বর প্রকাশ করা হয়। যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে একটি পোস্টে একাধিক ধরনের তথ্যও ছিল, তাই এই পরিসংখ্যানগুলো একটি আরেকটির সাথে মিলে যায়। ডিসমিসল্যাব স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করতে পারেনি যে প্রতিটি ছবিতেই সংশ্লিষ্ট পোস্টে যার নাম উল্লেখ বা যাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে, ছবিতে তিনিই ছিলেন।

১৯৪টি পোস্টের মধ্যে, ১০৩টিতে (৫৩%) একজন পুরুষ এবং একজন নারী উভয় লক্ষ্যবস্তুর নাম উল্লেখ করা হয় এবং তাদের ভিন্ন ধর্মের সম্পর্কের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। অন্যদিকে, ৩৫ শতাংশ পোস্টে শুধু একজন পুরুষ এবং ১২ শতাংশ পোস্টে শুধু একজন নারীকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।

ডিসমিসল্যাব বিভিন্ন ফেসবুক পেজ এবং গ্রুপে শেয়ার করা পোস্টগুলোতে একই রকম ক্যাপশনও পেয়েছে। একটি ক্যাপশনে বলা হয়েছে যে এক মুসলিম ছাত্রীকে হিন্দু পুরুষের সাথে পালিয়ে যাওয়ার পর “উদ্ধার” করা হয়েছে, এরপর পাঠকদের তাদের পরিবারের ওপর নজর রাখার আহ্বান জানানো হয়। আরেকটি পোস্টে একটি জুটিকে একসাথে পালিয়ে গেছে বলে বর্ণনা করা হয় এবং তাদের দেখলে যেন তাদের অবস্থান সম্পর্কে জানায়, সে অনুরোধ রাখা হয় পাঠকদের কাছে।

ডক্সিংয়ের পর হুমকি, ব্ল্যাকমেইল ও আতঙ্ক

“ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপের” ভুক্তভোগীদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ডক্সিং তাদের জীবনে কেমন প্রভাব ফেলেছে।

নথিবদ্ধ করা পোস্টগুলোতে যাদের ফোন নম্বর পাওয়া গেছে, ডিসমিসল্যাব এমন ১২ জনের সাথে কথা বলেছে। দুজন বলেছেন, পোস্টের দাবি বা সেখানে উল্লিখিত ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। বাকি ১০টি ক্ষেত্রে পোস্টে উল্লিখিত ব্যক্তিরাই ওই নম্বর ব্যবহার করছেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তারা।

ফোন নম্বর ছাড়াও, ডিসমিসল্যাব ৩১টি পোস্টে প্রকাশিত সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক যাচাই করেছে। এর মধ্যে ১৭টি প্রোফাইল আর খুঁজে পাওয়া যায়নি, অন্যদিকে বাকি ১৪টি প্রোফাইল তখনও সক্রিয় ছিল।

এক ব্যক্তি (ভুক্তভোগী ১) ডিসমিসল্যাবকে বলেছেন, ডক্সিং তার পেশাগত ও পারিবারিক জীবনে প্রভাব ফেলেছে এবং তাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

“ইসলাম ইনসাইট” (Islam Insight) নামের একটি পেজের শেয়ার করা এক পোস্টে বলা হয়, “উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপের শিকার দেশের মুসলিম নারীরাঃ সচেতন হবার এখনি সময়। গত কয়েকবছর ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এদেশে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা আমাদের মুসলিম বোনদের টার্গেট করে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণ, ধর্ম পরিবর্তন এবং ভারতে পাচার করে পতিতাবৃত্তির পেশায় যুক্ত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।”

এই পেজ এবং গ্রুপগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে ভুক্তভোগী-১ বলেন, “আমি ঘাটাঘাটি করে দেখলাম এরকম অনেক গ্রুপ, পেজ আছে যাদের কাজই এইসব পোস্ট করা। এগুলো পুরোপুরি অর্গানাইজড ক্রাইম। কিছু পেজ আর গ্রুপ আছে যাদের কাজই হলো দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে ঘৃণা ছড়ানো। আমার হয়তো কোনো ব্যক্তিগত শত্রু ছিল না, কিন্তু ওই গ্রুপগুলোর একটা টার্গেট দরকার ছিল। তারা আমার ব্যক্তিগত জীবনটাকে বিক্রি করে নিজেদের পেজের রিচ আর লাইক বাড়িয়েছে।”

ডক্সিং কীভাবে দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করেছে তার বর্ণনা দিতে গিয়ে ডক্সিংয়ের আরেক শিকার (ভুক্তভোগী ৪) বলেন, “এইসব পোস্ট যখন হচ্ছিল তখন একদিন আমার আব্বুর ফোনে একটা অপরিচিত নম্বর থেকে কল এসেছিল। আমি ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম, ভেবেছিলাম কেউ হুমকি দিতে আব্বুকে কল দিচ্ছে, পরে দেখি কুরিয়ার থেকে ফোন। ট্রমাটা এতই বেশি যে যেখানে ভয়ের কিছু নাই সেখানেও ভয় পাই। চোরের মতো থাকি।”

হয়রানির শিকার হওয়ার পর তারা আইনি সহায়তা চেয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে ভুক্তভোগী ১ বলেন, “পুলিশের কাছে গিয়েছিলাম। ওনারা সাহায্য করার আশ্বাস দিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু সিস্টেমটা খুব স্লো। যে ড্যামেজটা হওয়ার, সেটা তো প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই হয়ে গেছে! হাজার হাজার মানুষ ওই মিথ্যাটাকে সত্যি বলে বিশ্বাস করে নিয়েছে।”

 ডক্সিং প্রসঙ্গে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) আইন বিশেষজ্ঞ মনীষা বিশ্বাস বলেন, “নারী ও মেয়েদের ক্ষেত্রে ডক্সিং আরও বেড়ে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা, যৌন হয়রানি, ব্ল্যাকমেইল বা সেক্সটর্শনে রূপ নিতে পারে। এটি পরিবারের সদস্যদেরও হুমকি ও হয়রানির মুখোমুখি করতে পারে এবং পরিচয় চুরি বা প্রতারণাকে সহজতর করতে পারে। অতএব, ডক্সিংকে কেবল গোপনীয়তা লঙ্ঘন হিসেবে নয়, বরং অনলাইন নিপীড়ন থেকে বাস্তব জীবনের ক্ষতির দিকে নিয়ে যাওয়ার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া উচিত।”

হাতে গোনা কয়েকটি ফেসবুক পেজেই অধিকাংশ পোস্ট ও ইন্টার‍্যাকশন

ভাগওয়া লাভের নামে ডক্সিং করা পোস্টগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, এই পোস্টগুলো মোট ১,০৯,৮১৫টি প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য এবং শেয়ার পেয়েছে। গড়ে প্রতি পোস্টে ৩৮১টি ইন্টার‍্যাকশন হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ২৫৪টি প্রতিক্রিয়া ছিল।

এই সবগুলো পোস্ট এসেছে ২৩টি ফেসবুক পেজ থেকে এবং এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই এসেছে মাত্র পাঁচটি পেজ থেকে: ৬২টি পোস্ট করেছে বিউটিফুল ইসলাম, ভয়েজ অফ উম্মাহর পোস্ট ছিল ৩৯টি, রুহের ডাক এবং অনার গার্ড বিডি উভয়েই ৩৬টি করে পোস্ট করেছে এবং মোঃ রাসেল ভালুকা ধীতপুর প্রকাশ করেছে ২১টি।

ডিসমিসল্যাবের নমুনায় সবচেয়ে বেশি এনগেজমেন্ট পাওয়া ডক্সিং পোস্টটি শুরু হয়েছিল দুটি শব্দ দিয়ে: “এক্সক্লুসিভ ভিডিও।” ২০২৬ সালের ২৮ জুলাই মোল্লার আলো পেজে প্রকাশিত এই পোস্টের ক্যাপশনে অভিযোগ করা হয়েছিল যে, মানিকগঞ্জে একটি চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন মুসলিম মেয়েদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে “ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ” ব্যবহার করছে। ২৩ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য এবং শেয়ার মিলিয়ে ১৫,২৮১টি ইন্টারঅ্যাকশন পেয়েছে, যা পর্যালোচনা করা ২৮৮টি পোস্টের মধ্যে সর্বোচ্চ।

মোল্লার আলোর ডক্সিং পোস্টগুলো সবচেয়ে বেশি ইন্টারঅ্যাকশন পেয়েছে। পেজটি ২০টি পোস্ট প্রকাশ করেছে কিন্তু মোট ইন্টার‍্যাকশনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ, অর্থাৎ ৩৮,১৮৬টি ইন্টার‍্যাকশন পেয়েছে। এর পোস্টগুলোতে গড়ে প্রায় ১,৯০০টি ইন্টার‍্যাকশন ছিল, যা সবগুলো ২৮৮টি পোস্টের গড়ের প্রায় পাঁচ গুণ। মোট এনগেজমেন্টের দিক থেকে মোল্লার আলোর পরে ছিল ভয়েজ অফ উম্মাহ, রুহের ডাক, ফাইট অ্যাগেইনস্ট হিন্দুত্ব এবং অনার গার্ড বিডি। মোট ইন্টার‍্যাকশনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ শীর্ষ পাঁচটি পেজই পেয়েছিল।

বিউটিফুল ইসলাম সবচেয়ে বেশি পোস্ট প্রকাশ করেছে, তবে পেজটি মোট ৫,২৭০টি ইন্টারঅ্যাকশন পেয়েছে।

ফেসবুকের বাইরেও ব্যক্তিগত তথ্যের তালিকা

একটি ফেসবুক পোস্টের সূত্র ধরে ডিসমিসল্যাব ‘সেভ মুসলিম গার্লস’ নামের একটি ওয়েবসাইটের সন্ধান পায়। বাংলা ভাষার এই সাইটটি মুসলিম নারী ও হিন্দু পুরুষদের মধ্যে কথিত সম্পর্ক নিয়ে নিবন্ধ, ভিডিও, সাক্ষাৎকার এবং পোস্ট প্রকাশ করে। এর কভারেজের বেশিরভাগ জুড়েই প্রতারণা, যৌন শোষণ, ধর্মান্তরকরণ এবং সহিংসতার দাবিগুলো বর্ণনা করা হয়, যা প্রায়শই “ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ” ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়। ডোমেইন রেকর্ড অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৪ আগস্ট ডোমেইনটি নিবন্ধিত হয়েছিল।

সাইটটির “এক্সপোজ লিস্ট”-এর শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, “মুসলিম নামের নষ্টাদের তালিকা”। পেজটি পুরুষদের যাচাই করে দেখতে বলে যে সম্ভাব্য কনে “বিনামুল্যেই কোনো অমুসলিমের দাসী” ছিল কি না এবং নারীদের এই তালিকায় যেন নাম না আসে সে বিষয়ে সতর্ক করে। এতে বলা হয়েছে যে তথ্যগুলো সামাজিক মাধ্যম থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং মুসলিম নারীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলে তারা যা দাবি করছে, সেই সম্পর্কিত উপাদানগুলো শেয়ার করার জন্য পাঠকদের অনুরোধ করা হয়। ওয়েবসাইটের ব্যবহৃত ভাষা ভিন্ন ধর্মের কথিত সম্পর্কে থাকা নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায় হেয় করে এবং ধর্মীয়ভাবে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিত্রিত করে।

সাইটটি এই অভিযোগগুলোর জন্য একটি ডেডিকেটেড ডিরেক্টরি তৈরি করেছে। এটি ৪০টি জেলা অনুসারে সেগুলো ফিল্টার করার সুযোগ দেয়, যেখানে “নাম-ঠিকানা বিহীন” নামে একটি পৃথক ক্যাটাগরিও রয়েছে। প্রতিটি তালিকায় একটি শিরোনাম এবং ছোট প্রিভিউ থাকে যা একটি দীর্ঘ পোস্টের সঙ্গে যুক্ত।

শিরোনামগুলো কথিত ভিন্ন ধর্মের সম্পর্ককে কয়েকটি উপায়ে ফ্রেমবন্দী করে: যৌন অসদাচরণ, ফাঁদে ফেলা বা ধর্মান্তরকরণ এবং জবরদস্তি বা নির্যাতন হিসেবে। কোনো ক্ষেত্রে কোনো নারীকে “চিনে রাখার” পরামর্শ দেয়; অন্যগুলো রেস্তোরাঁ, হোটেল বা রিসোর্টে কথিত সাক্ষাতের বর্ণনা দেয়। একটিতে এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রীর কথিত প্রেমের সম্পর্কের কারণে তাকে “হিন্দুর দাসী” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, আরেকটিতে বলা হয়েছে, “*** ইসকন নেতার *** কবলে ধর্মান্তরিত মুসলিম পরিবার” এবং আরও কয়েকটি পোস্টে যাদের নাম বা ঠিকানা উল্লেখ নেই, তাদের শনাক্ত করতে পাঠকদের সাহায্য চাওয়া হয়েছে।

ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে মেটার নীতিমালায় বিধিনিষেধ

মেটার কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডসের গোপনীয়তা লঙ্ঘনবিষয়ক নীতিমালা অনুযায়ী, ফোন নম্বর এবং ইমেইল ঠিকানাসহ অন্য মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগের তথ্য শেয়ার করা নিষিদ্ধ। সীমিত কিছু ব্যতিক্রমের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যেমন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দ্বারা জনসমক্ষে প্রকাশ করা তথ্য অথবা দাতব্য কাজের প্রচার, নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা কিংবা কোনো ব্যবসা বা সেবাদাতার সঙ্গে যোগাযোগের প্রয়োজনে শেয়ার করা তথ্য। মেটা ব্যক্তিগত বাসস্থানের তথ্য শেয়ার করা এবং অন্য কারও ব্যক্তিগত বাসস্থানের তথ্য জানতে চাওয়ার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

২৮৮টি পোস্টের মধ্যে, ডিসমিসল্যাব ১০৭টিতে ঠিকানা, ২৩টিতে ফোন নম্বর এবং একটিতে ইমেইল ঠিকানা পেয়েছে। কিছু পোস্টে একাধিক ধরনের ব্যক্তিগত তথ্য ছিল। পোস্টগুলোতে এমন কোনো ইঙ্গিত ছিল না যে যোগাযোগের ওই বিবরণগুলো গোপনীয়তা নীতিতে উল্লেখিত “ব্যতিক্রমের” মধ্যে পড়ে।

ডিসমিসল্যাবের পর্যালোচনা করা একটি পোস্টে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে: “সারাদেশের মুসলমান ভাইদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আপনাদের আশপাশে এই ছেলে মেয়ে কে পেলে আমাদেরকে সন্ধান দিন।” এতে মনে হচ্ছে, পোস্টটিতে থাকা ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যের ব্যক্তিগত বাসস্থানের তথ্য প্রকাশ বা তা চাওয়ার ওপর মেটার নীতিমালায় বিধিনিষেধ রয়েছে। 

ডিসমিসল্যাব যখন পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে, তখন সেগুলো ফেসবুকেই ছিল। মেটার স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম বা মডারেটররা সেগুলো শনাক্ত বা পর্যালোচনা করেছে কি না, তা ডিসমিসল্যাব বলতে পারেনি। সাক্ষাৎকার দেওয়া সব ভুক্তভোগীকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তারা পোস্টগুলোর বিরুদ্ধে ফেসবুকে রিপোর্ট করেছেন কি না, এবং কেউই করেননি। অনেকেই বলেছেন যে তারা পোস্টগুলোর সরাসরি লিংক পাননি। কয়েকজন রিপোর্ট করার পর পোস্টগুলো মুছে ফেলা হবে কি না তার জন্য অপেক্ষা না করে ফেসবুক ব্যবহার করাই বন্ধ করে দিয়েছেন।

গবেষণা পদ্ধতি: 

ডিসমিসল্যাব পেজগুলো শনাক্ত করতে ফেসবুকে “ভাগওয়া লাভ” লিখে সার্চ করে। সার্চে ৫৪টি পেজ শনাক্ত হয়। গবেষকরা ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ৩১ আগস্টের মধ্যে ওই পেজগুলোর প্রকাশিত ১০,৭৫৫টি পোস্ট সংগ্রহ করেন, তারপর “ভাগওয়া লাভ ট্র্যাপ” সম্পর্কিত ৩,৮২৮টি পোস্ট শনাক্ত করেন। ওই পোস্টগুলো ব্যক্তিগত তথ্যের জন্য পর্যালোচনা করা হয়। বাতুহান কুকুল এবং ডেভিড এম. ডগলাসের গবেষণায় ব্যবহৃত একটি ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করে কোনো পোস্টে যদি কোনো ব্যক্তির নাম, ছবি, ঠিকানা, ফোন নম্বর বা সামাজিক মাধ্যমের প্রোফাইলের লিংক প্রকাশ করা হয়, তবে তাকে ডক্সিং হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এই পর্যালোচনায় ২৩টি পেজের প্রকাশিত ২৮৮টি ডক্সিং পোস্ট শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক সার্চে আসা ফেসবুকের ব্যক্তিগত প্রোফাইল এবং গ্রুপের পোস্টগুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল। ডিসমিসল্যাব ডক্সিংয়ের শিকার ১২ জনের সাক্ষাৎকারও নিয়েছে, বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলেছে এবং ‘সেভ মুসলিম গার্লস’ ওয়েবসাইটটি পর্যালোচনা করেছে।

যেহেতু প্রোফাইল এবং গ্রুপ থেকে করা পোস্টগুলো বাদ দেওয়া হয়েছে, তাই প্রাপ্ত ফলাফলগুলো ফেসবুকের সব কার্যকলাপের প্রতিনিধিত্ব করে না। এনগেজমেন্টের পরিসংখ্যানগুলো সংগ্রহের সময় থাকা প্রতিক্রিয়া, মন্তব্য এবং শেয়ার রেকর্ড করেছে, কতজন মানুষ পোস্টগুলো দেখেছেন তা নয়। ডিসমিসল্যাব স্বাধীনভাবে প্রতিটি ছবি বা অভিযোগ যাচাই করতে পারেনি, পেজগুলো কারা পরিচালনা করত তা শনাক্ত করতে পারেনি, বা তারা সমন্বয় করে কাজ করেছে কি না তা নির্ধারণ করতে পারেনি।



ডেটা সর্টিং এবং অর্গানাইজিংয়ের কাজে সহায়তা করেছেন মোহাম্মদ আল মুকিত ও আহমেদ ইয়াসীর আবরার।

আরো কিছু লেখা