যৌন সহিংসতার খবর প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতা নির্দেশিকাগুলোয় বলা হয়েছে, ভাষার ব্যবহারে ভুক্তভোগী যেন সমাজে নতুন করে হেয় বা ট্রমার শিকার না হন।
ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশনের (ইউনেস্কো) রিপোর্টিং অন ভায়োলেন্স এগেইনস্ট উইমেন এন্ড গার্লস নামের নির্দেশিকায় উল্লেখ করা হয়েছে, ‘তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন’—এ ধরনের শব্দচয়ন পরিহার করতে হবে। কারণ, এভাবে বললে মনে হতে পারে, ওই ঘটনার জন্য ভুক্তভোগীর কোনো দায় রয়েছে। এর পরিবর্তে নিরপেক্ষ ভাষা ব্যবহার করতে হবে। যেমন, ‘ভুক্তভোগী জানিয়েছেন যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’ বা ‘তিনি বলেছেন যে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন’।
ইউনাইটেড নেশনস ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইউএনডিপি) বলছে, যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার ঘটনায় এমন শব্দচয়ন বা ভাষা ব্যবহার করতে হবে, যা অপরাধীর দায়কে স্পষ্টভাবে সামনে আনে।
ডার্ট সেন্টার ফর জার্নালিজম অ্যান্ড ট্রমার রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স নীতিমালায় বলা হয়েছে, ভুক্তভোগীকে যেন আর কোনো হেনস্তার মুখে পড়তে না হয় কিংবা সমাজে তার মর্যাদা যাতে ক্ষুণ্ণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সবকিছু করা সাংবাদিকদের দায়িত্ব।
ডার্ট সেন্টার ইউরোপের রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ইন কনফ্লিক্ট নীতিমালায় বলা হয়েছে, যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে চাঞ্চল্যকর বর্ণনা যেন করা না হয়। কারণ, একটি বিষয়বস্তুকে সংবাদমাধ্যম যেভাবে উপস্থাপন করে তা মানুষ কীভাবে সে বিষয়টি গ্রহণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তার ওপর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যৌন সহিংসতা নিয়ে প্রতিবেদনে শব্দ নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে কানাডাভিত্তিক গবেষণা ইউজ দ্য রাইট ওয়ার্ডস: মিডিয়া রিপোর্টিং অন সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স ইন কানাডা-তে। গবেষণাটিতে বলা হয়েছে, যৌন সহিংসতা নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সময় সঠিক শব্দ ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ভুল শব্দচয়ন অনিচ্ছাকৃতভাবে ভুক্তভোগীর কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। অনিচ্ছাকৃতভাবে ক্ষতির এই আশঙ্কার কারণেই সংবাদমাধ্যমগুলোর এমন সাংবাদিকতা-পদ্ধতি সম্পর্কে ভালোভাবে জানা থাকা জরুরি, যা ভুক্তভোগীদের লজ্জিত বা দোষী সাব্যস্ত করে না।
বাংলাদেশেও সংবাদমাধ্যমে জেন্ডার সংবেদনশীলতা মেনে চলার জন্য বেশ কিছু নীতিমালা বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (এমআরডিআই) থেকে প্রকাশিত “সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার দিগন্তে জেন্ডার” নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, ‘ধর্ষণের ভুক্তভোগী ব্যক্তির ক্ষেত্রে কী শব্দ ব্যবহার করবেন, সেটা খুব ভাবনাচিন্তার বিষয়। “ধর্ষিতা” শব্দটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সর্বশেষ সংশোধনীতে (২০২০) “ধর্ষণের শিকার” করা হয়েছে। অনেক সংবাদমাধ্যম অনেক আগে থেকেই এই শব্দবন্ধ ব্যবহার করছে।’
একই সঙ্গে নির্দেশিকাটি আরও একটি প্রশ্ন তুলেছে। “ধর্ষণের শিকার” ব্যবহার করলেও ব্যক্তি মূলত ভুক্তভোগী পরিচয়ের মধ্যেই আবদ্ধ থাকেন। অনেক ক্ষেত্রে “ভুক্তভোগী” শব্দটি তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ বিকল্প হতে পারে।
একই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত উইমেন অ্যান্ড হিজরাস ইন বাংলাদেশি নিউজ মিডিয়া গবেষণায়, “ধর্ষিতা” শব্দটিকে কটাক্ষরূপে ব্যবহৃত শব্দ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।