নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
সমালোচনার আড়ালে জেবা আমিনকে ঘিরে যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্য প্রচার

সমালোচনার আড়ালে জেবা আমিনকে ঘিরে যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্য প্রচার

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

এই লেখায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের উদ্দেশ্য করে ব্যবহৃত কিছু গালি ও অবমাননাকর শব্দ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। এটি করা হয়েছে অনলাইন সহিংসতার ভাষা ও প্রকৃতি সঠিকভাবে উপস্থাপন করার জন্য, যাতে প্রেক্ষিত ও অর্থ বিকৃত না হয়।


জাতীয় সংসদ অধিবেশনে গত ১৬ জুন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য জেবা আমিন খান সড়কের বেহাল অবস্থার জন্য দুর্নীতিকে দায়ী করে বক্তব্য দেন। তার বক্তব্যে বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়, হাসিঠাট্টাও হয়েছে এ নিয়ে। 

তবে ভাষা নিয়ে ট্রলের একপাশে সামাজিক মাধ্যমে জেবা আমিনকে ঘিরে চলছে অবমাননাকর ও যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্যের প্রচারণা। গবেষণা বলছে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এ ধরনের প্রচারণা বিরুদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ কঠিন করে তোলে।

সংসদ সদস্য জেবা আমিনের বক্তব্যটি ট্রেন্ড হওয়ার পর ডিসমিসল্যাবের সামনে নেতিবাচক একটি পোস্ট আসে, যেখানে তার পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করা হয়। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড সার্চ দিলে ডিসমিসল্যাবের সামনে ফেসবুকের অসংখ্য ছবি, পোস্ট আসে। সার্চের প্রথম ২০টি পোস্ট বিশ্লেষণ করা হয় এ প্রতিবেদনে।

ফেসবুকে এমএক্স নামের একটি পেজ থেকে গত ১৬ জুন জেবা আমিনের একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “সংসদ সদস্য জেবা আমিনের ৫৫ বছর বয়সেও দু|ধু গুলো দাঁড়িয়ে আছে।” আরেকটি ব্যক্তিগত প্রোফাইলে তার একটি ছবি পোস্ট পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “বিএনপির সংসদ সদস্য জেবা আমিনের ৫৫ বছর বয়সেও দু|ধু গুলো দাঁড়িয়ে আছে। সংসদে ব্রা ছাড়া কেমনে গেছে। এজন্যই তো বলি জামাতের মহিলাদের হিজাব খুলতে বলে কেন।” একই ক্যাপশনে একাধিক (,,,) পোস্ট পাওয়া যায়, যেখানে জেবা আমিনের ছবি ব্যবহার করে এ ধরনের অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে।  

পোস্টগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ পোস্টে জেবা আমিনের দুর্নীতি নিয়ে বক্তব্যতে বাংলা এবং ইংরেজির মিশ্রণ নিয়ে নয়, তার পোশাক নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে। গত ১৭ জুন একটি পোস্টের ক্যাপশনের এক অংশে লেখা হয়, “জেবা আমিন ভুল বাল বাংলা ইংরেজি বলবা বলো তুমি আমাদের  দেখাইলা কি?।” গত ১৬ জুন একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “ভুল করে কারো বেডরুমে ঢুকে গেলাম নাকি ?।” 

সমালোচনার আড়ালে জেবা আমিনকে ঘিরে যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্য প্রচার
ট্রলের একপাশে সামাজিক মাধ্যমে জেবা আমিনকে ঘিরে চলছে অবমাননাকর ও যৌন হয়রানিমূলক বক্তব্যের প্রচারণা।

“সত্যের সন্ধানে২১” নামের একটি পেজ থেকে ১ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “খোলামেলা পোশাকে।ভুলভাল ইংলিশ অধিবেশনে,।সোশ্যাল মিডিয়ায় তুলকালাম।” এছাড়াও একাধিক (,,,) পোস্টে জেবা আমিনের পোশাক নিয়ে অবমাননাকর বক্তব্য তুলে ধরা হয়। 

মমতাজ ও জেবা আমিনের তুলনা 

সামাজিক মাধ্যমে আরেকটি ট্রেন্ড দেখা যায়, যেখানে সাবেক সংসদ সদস্য ও লোকসংগীতশিল্পী মমতাজ বেগমের সঙ্গে তুলনায় করা হয়েছে জেবা আমিনের। সেখানেও আলোচনার বিষয় ছিল বর্তমান সাংসদের পোশাক।

গত ১৭ জুন মমতাজ বেগম এবং জেবা আমিনের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “দুজনেই সংসদ সদস্য, ১ জন সাবেক, ১ জন বর্তমান। মমতাজ কন্ঠ শিল্পী হলেও তার বাহিরে বের হওয়ার শালীনতা টুকু সে বুঝে, কিভাবে নিজের পোশাকের শালীনতা বজায়ে বের হতে হবে। ওপর ১জন, জেবা আমিনের কি উচিৎ হয়েছে এমন একটি পোশাক পরে সংসদে যাওয়া। বর্তমান সংসদ একটি, হাসি,তামাশার জায়গা হয়ে উঠেছে।”

আরেকটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট করে লেখা হয়, “বিম্পির সমর্থক বলতো মমতাজ নর্তকী তাহলে জেবা  আমিন কি? মমতাজ নর্তকী হইলে জেবা আমিন নর্তকী দের শিষ্টাচার মমতাজ অশিক্ষিত  হলেও তার পোশাকে চলা ফেরায় ছিলো শালীনতা।” এরকম একাধিক (,,) পোস্ট পাওয়া যায় যেখানে মমতাজকে জড়িয়ে জেবা আমিনকে কটাক্ষ করে পোস্ট দেওয়া হয়েছে।  

কটাক্ষের শিকার মারদিয়া মমতাজও

জামায়াতের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মারদিয়া মমতাজকে জড়িয়েও একাধিক পোস্ট দেখা গেছে ফেসবুকে। ফেসবুকে একটি গ্রুপ থেকে মারদিয়া মমতাজ এবং জেবা আমিনের ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “একজন ইসলামী দল জামাতের মনোনীত সংসদ সদস্য ট্রাফি মমতাজ! আরেকজন বিএনপি মনোনীত সংসদ সদস্য  জেবা আমিন !! বিএনপির লোকজন জেবা আমিনের পোশাক নিয়ে সমালোচনা করলেও জান্নাতি দল জামাতের লোকজন ট্রফি আপার পমপম দেখে খুব খুশি !!।” একই ক্যাপশনে একাধিক (,,,,,,) পোস্ট দেখা যায়, যেখানে মমতাজ এবং জেবা আমিনের ছবি ব্যবহৃত হয়েছে। 

আরেকটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে পোস্ট করে লেখা হয়, “রাস্তাজ আর ভেরি ভেরি পিছলা। পাবলিকস আর সাফাররিং। ইন রিইনি সিজন পাবলিকস লেগ কাঁদার মধ্যে হান্দি যায় মাননীয় স্পিকার।”

সামাজিক মাধ্যমে নারী রাজনীতিবিদদের কতটা সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়, এ বিষয়ে কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক অ্যান রামুসেন এবং কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্রেগরি ইডির যৌথ গবেষণা, “জেন্ডারড পারসেপশনস অ্যান্ড দ্য কস্টস অফ পলিটিক্যাল টক্সিসিটি: এক্সপেরিমেন্টাল এভিডেন্স ফ্রম পলিটিশিয়ানস অ্যান্ড সিটিজেনস ইন ফোর ডেমোক্রেসিস” তে বলা হয়েছে,  “রাজনীতিতে নোংরা বা বিষাক্ত আচরণের মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে নারী রাজনীতিবিদদের ওপর একটা ‘দ্বিগুণ বোঝা’ বা দুই ধরনের চাপ এসে পড়ে। প্রথমত, তারা পুরুষদের চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে এই ধরনের খারাপ আচরণের শিকার হন।”

গবেষণায় এ ধরনের আক্রমণের পেছনের কারণও খুঁজে দেখা হয়েছে, “দ্বিতীয়ত, তাদের আরও একটি বাড়তি বোঝা বইতে হয়, যা এই খারাপ আচরণগুলোর ভয়াবহতা আরও বাড়িয়ে দেয়। আর তা হলো, নারীদের ওপর যখন এই রাজনৈতিক আক্রমণগুলো করা হয়, তখন বোঝা যায় যে আক্রমণকারীদের মনে একটা লিঙ্গ-বৈষম্যমূলক বা নারীবিদ্বেষী মানসিকতা কাজ করছে। তারা মূলত এই নোংরা পরিবেশ তৈরি করে, যাতে নারীরা রাজনীতিতে আসার সাহস হারিয়ে ফেলেন কিংবা রাজনীতি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।” 

আরো কিছু লেখা