
একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক দাবিতে বলা হচ্ছে, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে। তবে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে এ বিষয়গুলো বাতিলের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
৯ জুন সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকের একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫, ৬) ব্যক্তিগত প্রোফাইল, পেজ এবং গ্রুপ থেকে পোস্ট করে লেখা হয়, “বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে।” এছাড়া একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫) চাকরি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতি সংক্রান্ত গ্রুপেও দাবিটি পোস্ট হতে দেখা যায়। শঙ্কা প্রকাশ করে একটি গ্রুপে পোস্ট করা হয়, “বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে! বিষয়টি কিভাবে দেখছেন? আর যারা এইসব ডিপার্টমেন্ট এ নতুন ভর্তি হয়েছে(২০২৫-২৬ সিজন) তাদের কি হবে?।”

রাজনৈতিক আঙ্গিকেও পোস্ট হতে দেখা গেছে এ বিষয়ে। “পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর ন্যায় বাঙালি জাতিকে পঙ্গু করতে অনার্সে বাংলা সাবজেক্ট বাতিল করা হচ্ছে” – এমন দাবিতেও একাধিক (১, ২, ৩, ৪) পোস্ট দেখা গিয়েছে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে।
এ দাবির উৎস যাচাইয়ে দেখা যায়, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে- এ মর্মে একাধিক গণমাধ্যম থেকে প্রকাশিত প্রতিবেদনসমূহ সামাজিক মাধ্যমে এমন দাবি ছড়ানোয় ভূমিকা রেখেছে। ৯ জুন “বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স বাতিল হচ্ছে” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক ইত্তেফাক।
এ প্রতিবেদনে লেখা হয়, “দেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী করতে শিক্ষা কাঠামোতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ৬ বিষয়ের অনার্স কোর্স বাতিল করা হচ্ছে। এসব বিষয় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।” শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গতকাল ইত্তেফাককে এসব তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সকলের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে লেখা হয়, “শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী বাতিল করা হচ্ছে বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ৬ বিষয়ের অনার্স কোর্স। এসব বিষয় অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।”

“বাতিল হচ্ছে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনের অনার্স কোর্স” শীর্ষক শিরোনামে দেশ রূপান্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “দেশের উচ্চশিক্ষাকে কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি খসড়া মডেলে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ প্রায় ৬টি বিষয়ে অনার্স কোর্স বাতিল বা রূপান্তরের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিষয়টি এখনো একেবারে প্রাথমিক আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
টিভি মাধ্যম আরটিভির প্রতিবেদনেও একই বক্তব্য তুলে ধরে লেখা হয়, “দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক করতে বড় ধরনের সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন খসড়া মডেল অনুযায়ী বাংলা, ইতিহাস, দর্শনসহ প্রায় ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স পুনর্গঠন বা বাতিল করে সেগুলো অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে খবর দিয়েছে একাধিক গণমাধ্যম।”
এছাড়াও, একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫) গণমাধ্যমেও একই বক্তব্যে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেখা যায়।
সামাজিক মাধ্যমে কোর্স বাতিলের সংবাদে বিভ্রান্তি ছড়ালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক সংবাদ মাধ্যমকে জানান, এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে সচিব বলেছেন, “অনার্স (স্নাতক সম্মান) পর্যায় থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয় তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। তবে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা একটি সভায় সেটি নিয়ে প্রাথমিকভাবে আলোচনা করেছিলেন। সেটা তো আর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলা যায় না।”
এ দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেছেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো অনার্স কোর্স বন্ধের ব্যাপারে সরকার কিংবা আমাদের কোন সিদ্ধান্ত নেই। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন একটি সংবাদ।
এছাড়াও, একই প্রতিবেদনে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের মন্তব্য দেখা যায়, “বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ প্রায় ৬টি বিষয়ের অনার্স (সম্মান) কোর্স বাতিল করা হতে পারে বলে সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ বিষয়ে আমি নিউজ হিসেবে দেখেছি। সরকারের পক্ষ থেকে অফিসিয়াল জানানোর আগ পর্যন্ত বিষয়টি গুরুত্ব না দেওয়ার জন্য বলছি।” প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেছেন, “এসব বিষয়ে অনার্স থাকবে না, আমি মনে করি না। তবে আমরা কতগুলো জায়গায় রাখব, কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে, সে আলাপ হতে পারে।”

এ ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন শিক্ষামন্ত্রী। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে, আজ ৯ জুন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেছেন, “বাংলা, দর্শন, ইতিহাস বাদ পড়বে এমন কোনো আলোচনা হয়নি, আমরা কোথাও শুনিনি এবং আমরাও কোথাও করিনি। বাংলা আমাদের মাতৃভাষা—এটা কি বাদ দেয়া যেতে পারে? এমন কোনো আলোচনা হয়নি, আমার জ্ঞাতসারে নেই। আমি জানি না এ সংবাদ কোথা থেকে আসলো।” তিনি আরও বলেন, “আমরা কারিগরি-আইসিটিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। বাজারে যেসব বিষয়ের চাহিদা রয়েছে, সেগুলোকে আমরা দেখছি, সেটা তো প্রতিনিয়তই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু বাংলা, দর্শন, ইতিহাস বাদ পড়বে—এই আলোচনা আমরা কোথাও শুনিনি।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষামন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর একাধিক (১, ২, ৩, ৪) গণমাধ্যম, কোর্সগুলো বাতিল হওয়ার সংবাদকে ভিত্তিহীন জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। যুগান্তরের প্রকাশিত প্রতিবেদনে লেখা হয়, “অনার্স কোর্স থেকে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিষয় তুলে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।” প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “৯ জুন শিক্ষামন্ত্রীর একান্ত কর্মকর্তা নূরুল আফসার দীপু গণমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বাংলা, ইতিহাস ও দর্শন বিভাগ বা বিষয় বাতিলের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়।”
অর্থাৎ, অনার্সে বাংলা, ইতিহাস ও দর্শনসহ ৬ বিষয় বাদ দেওয়ার কোনো সিদ্ধান্ত শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নেওয়া হয়নি।