তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
প্রচার করা হচ্ছে মাহরাং বালুচ বলেছেন, “এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান। আমরা কখনো আমাদের শহীদদের ভুলব না।” বিশ্লেষণে দেখা যায় বেলুচের একটি দীর্ঘ বক্তৃতার দুটি ভিন্ন অংশকে জুড়ে দিয়ে বক্তব্যটি তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশ তার শহীদদের ভুলে গেছে এমন কোনো কথা বলেননি তিনি।

বাংলাদেশ নিয়ে আসলে যা বলেছিলেন মাহরাং বেলুচ

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

বেলুচিস্তানের মানবাধিকার কর্মী মাহরাং বেলুচের একটি ভাষণের ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান। আমরা কখনো আমাদের শহীদদের ভুলব না।” অনেকেই এটিকে বাংলাদেশিদের দেশপ্রেম নিয়ে বেলুচ নেত্রীর সমালোচনা হিসেবে দেখছেন। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংসের প্রেক্ষাপটে এমন বক্তব্য বলে প্রচার হচ্ছে। তবে ডিসমিসল্যাবের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিডিওটি পুরোনো ও খণ্ডিত এবং মূল ভাষণে মাহরাং বেলুচ এমন কোনো প্রেক্ষাপটে কথা বলেননি।

মাহরাং বেলুচ হলেন ‘বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি’র সংগঠক। এই সংগঠন ২০২০ সাল থেকে বেলুচ জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং জোরপূর্বক গুমের অবসানের দাবিতে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে আসছে। ২০২৫ সালের ২২ মার্চ কোয়েটায় একটি অবস্থান কর্মসূচি থেকে গ্রেপ্তার হন তিনি। ২০২৬ সালের ২২ জুন কোয়েটার একটি সন্ত্রাসবিরোধী আদালত তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়।

“ইয়ে বাঙাল নেহি হ্যায়, ইয়ে বেলুচিস্তান হ্যায়। হাম কাভি নেহি ভুলেঙ্গে আপনে শহীদোঁ কো।” (বাংলা অর্থ: “এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান। আমরা কখনো আমাদের শহীদদের ভুলব না”)— মাহরাং বেলুচের বক্তব্য হিসেবে এই উদ্ধৃতিটি একটি ভাষণের ভিডিওর সঙ্গে প্রচার করা হচ্ছে। ৫৫ সেকেন্ডের ভিডিওটি একই দাবিতে শতাধিক ফেসবুক (,,) পোস্টে প্রচার হয়েছে; ছড়িয়েছে ইনস্টাগ্রাম (,,) ও এক্সে

বেলুচের বক্তব্য পোস্ট করে একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “বাঙালির দেশপ্রেম নিয়া টিপ্পনী কাটছে বেলুচের নেত্রী মাহরাং বালোচ” (বানান অপরিবর্তিত)। বেশ কিছু ইনস্টাগ্রাম ও ডজনখানেক ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে বলা হচ্ছে, “বাংলাদেশকে লজ্জা দিলো বেলুচিস্তানের এক নারী।”

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে নানা ঘটনার প্রেক্ষাপটে মাহরাং বেলুচের এই বক্তব্যকে একটি বিশেষ বার্তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন কেউ কেউ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে বাঙালির আত্মত্যাগের বিষয়টি উল্লেখ করে একজন লিখেছেন, “দুর্ভাগ্য, ৫ আগষ্ট-২০২৪ এর পরে পরিবর্তিত বাংলাদেশের অকৃতজ্ঞ মানুষের কথা পৃথিবীর সকল দেশই জানে। তাইতো লক্ষ লক্ষ বেলুচিস্তানের মানুষের মুক্তির সমাবেশে বেলুচিস্তানের প্রাণের নেত্রী মাহরাং বেলুচ দীপ্ত কন্ঠে উচ্চারণ করে বলেছেন – আমরা আমাদের শহীদদের কখনো ভুলবো না।” আবার কেউ ভিডিওটি পোস্ট করে বলছেন, “বাংগালির মরে যাওয়া উচিত” (বানান অপরিবর্তিত)।

কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে ভিডিওটির সূত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালের ১১ মে পোস্ট করা ভিডিওতে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির প্রতিষ্ঠাতা ও নেত্রী মাহরাং বেলুচের পোশাক ও স্থানের সঙ্গে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি মিলে যায়।

ওই ভিডিওতে তাকে উর্দুতে যা বলতে শোনা যায় তার বাংলা করলে দাঁড়ায়, “তারা প্রতিদিন আমাদের মারতে আসে। প্রতিদিন শিয়ালের মতো লুকিয়ে আঘাত করে। এখন আপনারা আমাদের ভয় দেখাতে পারবেন না। লাশ ফেলবেন? ফেলুন, আর কত লাশ ফেলবেন? লাশ পড়লে কি আমরা দুর্বল হয়ে যাব? আসুন, আপনারা কাকে কাকে মারবেন? আপনারা যত মারবেন, আমরা তত বেশি সংখ্যায় বেরিয়ে আসব। এবং আমাদের প্রতিটি প্রজন্ম আপনাদের বিরুদ্ধে কেবল প্রতিরোধের পথই বেছে নেবে। এখন বেলুচ জনগণ জেগে উঠেছে। আর এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান। আমরা আমাদের শহীদদের কখনো ভুলব না। আমরাই সেই গণকবরগুলোর উত্তরাধিকারী। আপনারা যাদের ফেলে দেন, সেই বেলুচদের কবর। বেলুচ বংশের কবর, বেলুচ জাতির কবর। বেলুচরাই তাদের শহীদদের উত্তরাধিকারী! বেলুচ কখনো তার শহীদদের ভুলবে না! আর আপনাদেরও কখনো ভুলতে দেবে না!”

এই ভিডিওটিই বাংলাদেশে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী প্রেক্ষাপটে সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়ছে। তবে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে ছড়ানো ৫৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে বেশ কিছু কাট নজরে আসে ডিসমিসল্যাবের। “এখন বেলুচ জনগণ জেগে উঠেছে। আর এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান।” ভাষণের এই অংশের আগে ২৬ সেকেন্ডে ও পরে ৩৪ সেকেন্ডে ভিডিওটি কাট হতে দেখা যায়। “এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান” এবং “আমরা আমাদের শহীদদের কখনো ভুলব না” — এই অংশ ভাষণের দুইটি ভিন্ন সময় থেকে কেটে যোগ করে ৫৫ সেকেন্ডের এই ভিডিওটি বানানো হয়েছে।

মাহরাং বেলুচের পুরো বক্তব্যটি পাওয়া যায় বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির ইউটিউব চ্যানেলে। ৪৪ মিনিট ২৮ সেকেন্ডের ভাষণটি ইউটিউবে আপলোড হয়েছে ২০২৪ সালের ৩০ জানুয়ারি— অর্থাৎ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রায় ৬ মাস আগে। আর ভাষণটি দেওয়া হয়েছিল ২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারি, কোয়েটার সাওয়ানী স্টেডিয়ামে বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির এক সম্মেলনে।

বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটির ইউটিউব পেজে থাকা মূল ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাহরাং বেলুচ তার এই ভাষণে বাঙালি বা বাংলাদেশিদের শহীদদের ভুলে যাওয়ার প্রসঙ্গে কিছু বলেননি। সাড়ে ৪৪ মিনিটের এই ভাষণের ১৬ মিনিট ৩২ সেকেন্ডে তিনি বলেছেন, “এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান”, অন্যদিকে ৪২ মিনিট ১২ সেকেন্ডে বলেন, “আমরা আমাদের শহীদদের কখনো ভুলব না।” ভাষণের এ দুটি ভিন্ন অংশ কেটে অন্য অংশে জুড়ে ভাইরাল ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

পুরো ভাষণের ১০ মিনিটের পর তিনি বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলনের ঘটনায় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণকে বেলুচ নারীদের অবমাননার সঙ্গে তুলনা করেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালি নারীদের ওপর নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে পাকিস্তানি বাহিনী সম্পর্কে বলেন, “এই জাতিকে দেখ, এই হতভাগা সেই একই জাতি যারা বাঙালিদের নারীদের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছিল। এরা আমাদের ক্ষমা করবে না, আমাদের ওপর দয়া করবে না; এরা আমাদের ওপর কখনো দয়া করতে পারে না।”

বেলুচদের ওপর পাকিস্তানি বাহিনীর অত্যাচারে প্রসঙ্গে ১৯৭১ সালে এই বাহিনীর পরাজয়ের কথা মনে করিয়ে দেন, “এটা সেই একই বাহিনী, যাদের প্যান্ট বাঙালিরা খুলে ছেড়েছিল।” বেলুচদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ১৫ মিনিটের পর তিনি বলেন, “এখন প্রত্যেক বেলুচকে নতুন করে কাতারবদ্ধ (ঐক্যবদ্ধ) হতে হবে।” 

তারপর ১৬ মিনিট ২৪ সেকেন্ড থেকে তিনি পাকিস্তানের শাসকদের সাবধান করে বলেন, “এটা ১৯৪৮ সাল নয়, এটা ২০২৩ সাল! আর এটা বাংলা নয়, এটা বেলুচিস্তান!” এখান থেকে ভাইরাল ভিডিওর একটি অংশ নেওয়া হয়।

ভাষণের ৩৫ মিনিট ১২ সেকেন্ডে তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সতর্ক করেন। এ সময় তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করেন। বলেন, “যখন পাকিস্তানের জুলুম, অন্যায় ও বর্বরতার পরিণতিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, তখন এর নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে পুরো বিশ্বের জাতিগুলো মোবারকবাদ (অভিনন্দন) জানিয়েছিল যে—‘মুজিবুর রহমান, তোমাকে অভিনন্দন যে তুমি পাকিস্তানের মতো একটি ফ্যাসিবাদী শক্তির হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছ।’ মুজিবুর রহমান তখন বলেছিলেন, ‘আমরা স্বাধীনতা তো অবশ্যই লাভ করেছি, কিন্তু এখন বাংলাদেশে একটিও কুমারী মেয়ে অবশিষ্ট নেই।’” 

এ পরিস্থিতির বর্ণনা করে তিনি বেলুচদের সতর্ক করেছেন। ‘বেলুচ গণহত্যা দিবস’ ঘোষণা করতে গিয়ে ভাষণের শেষের দিকে তিনি বলেন, “ওই মানুষদের স্মরণ করব, যাদের আপনারা আপনাদের টর্চার সেলে হত্যা করেছেন, যারা শহীদ হওয়ার সময় এই বিপ্লবের স্বপ্ন দেখেছিলেন যা আজ আমার সামনে উপস্থিত। আমরা মনে করিয়ে দিতে থাকব যে আমাদের কত প্রজন্মকে আপনাদের কামান দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছেন।” এ সময় তিনি আরও বলেন, “আমরা আপনাদের মনে করিয়ে দিতে থাকব যে আমরা আমাদের শহীদদের কখনো ভুলব না।” ভাইরাল ভিডিওতে বক্তব্যের ভিন্ন এই অংশকে আরেকটি অংশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়েছে।

মাহরাং বেলুচের বক্তব্যে বেলুচ জাতির সংগ্রাম এবং পাকিস্তান বাহিনীর অত্যাচারের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে একাধিকবার বাংলাদেশ এবং বাঙালীর কথা এসেছে। তবে বাংলাদেশ বা বাংলাদেশিরা তাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহীদদের ভুলে গেছে এমন কোনো কথা তার পূর্ণাঙ্গ বক্তব্যে উঠে আসেনি। মূলত বক্তব্যের ভিন্ন দুটি অংশকে জুড়ে দেওয়ার ফলে এই বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন (,) থেকে জানা যায়, ৩০ বছর বয়সী ডক্টর মাহরাং বেলুচের নেতৃত্বে বেলুচ আন্দোলনকারীরা তুর্বাত জেলা থেকে ১,৬০০ কিলোমিটার পথ পদযাত্রা করে ২০২৩ সালের ২২ ডিসেম্বর ইসলামাবাদে পৌঁছান। সে বছরের নভেম্বর মাসে প্রাদেশিক কাউন্টার-টেররিজম ডিপার্টমেন্টের হেফাজতে ২৪ বছর বয়সী তরুণ বালাচ বেলুচের হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই দীর্ঘ পদযাত্রার সূত্রপাত হয়। পদযাত্রা শেষে তারা রাজধানীতে মাসব্যাপী অবস্থান ধর্মঘট পালন করেন।  দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় এই প্রদেশে ফেরার পর কোয়েটার সাওয়ানী স্টেডিয়ামে এক সম্মেলনের ডাক দেয় বেলুচ ইয়াকজেহতি কমিটি। ২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারির এই সম্মেলনে ভাষণ দেন সংগঠনটির নেত্রী মাহরাং বেলুচ।

আরো কিছু লেখা