নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
Fact-check on AI-generated Facebook images used to call for the destruction of a Ram idol and spread communal incitement in Bangladesh

ফেসবুকে রাম মূর্তি ভাঙার প্রচারণা, নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও পদক্ষেপ নিচ্ছে না মেটা

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ভাঙা মূর্তির উপর দাঁড়িয়ে আছেন যুবক। হাতে ধারালো অস্ত্র, পরনে টুপি-পাঞ্জাবি। সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে এআই নির্মিত এমন ছবি পোস্ট করে চলছে রাম মূর্তি ভাঙার প্রচারণা। বলা হচ্ছে, মুসলিমবঙ্গে প্রকাশ্যে কোনো মূর্তি থাকতে দেওয়া হবে না। কিছু পোস্টে এআই নির্মিত ছবিতে হাতুড়ি দিয়ে মূর্তি ভাঙার দৃশ্য দেখানো হচ্ছে। জানানো হচ্ছে মূর্তি গুড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান। কিছু পোস্টে মন্দিরের নিচে হাজার বছরের পুরোনো মসজিদ থাকার দাবিতে দেওয়া হচ্ছে মন্দির ভেঙে ফেলার ডাক। এক্ষেত্রেও পোস্টে ব্যবহার হচ্ছে এআই নির্মিত কাল্পনিক ছবি।

Fact-check on AI-generated Facebook images used to call for the destruction of a Ram idol and spread communal incitement in Bangladesh
এআই-তৈরি ছবি পোস্ট করে সামাজিক মাধ্যমে রামমূর্তি ভাঙার প্রচারণা চালানোর স্ক্রিনশট।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামে অবস্থিত শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির প্রাঙ্গণে নির্মাণাধীন রাম মূর্তি নিয়ে ফেসবুকে চলছে এমন প্রচার। সামাজিক মাধ্যমে বেশ কিছুদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। সম্প্রতি নির্মাণাধীন মূর্তিটি ভেঙে ফেলার আহবান ও প্রচারণা চলতে দেখা যাচ্ছে। এ ধরনের পোস্ট মেটার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হলেও, প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ৪ জুন থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সরাসরি মূর্তি ভাঙার আহ্বান জানানো হয়েছে, এমন ৩০৮টি স্বতন্ত্র ফেসবুক পোস্ট খুঁজে পেয়েছে ডিসমিসল্যাব।

মূর্তি ভাঙার প্রচারণা যেভাবে চলছে
গত ৭ জুন একটি ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, “রংপুরের যেই জমিতে মন্দির বানানো হচ্ছে তার নিচে হাজারো বছরের পুরনো মসজিদের চিহ্ন পাওয়া গেছে।” পোস্টের ছবিতে মাটির উপরে একটি নির্মাণাধীন রাম মন্দির এবং মাটির নিচে একটি মসজিদ দেখা যায়। ছবিটি এআই দিয়ে বানানো। ক্যাপশনে মন্দির বা মূর্তি ভেঙে মসজিদ পুনরায় স্থাপন করার দাবি জানানো হয়েছে। ডিসমিসল্যাব সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে একই ছবি এবং ক্যাপশনের ১২৩টি পোস্ট খুঁজে পেয়েছে।

Fact-check on AI-generated Facebook images used to call for the destruction of a Ram idol and spread communal incitement in Bangladesh
এআই-তৈরি ছবি ও প্রাসঙ্গিক ছবি পোস্ট করে সামাজিক মাধ্যমে রামমূর্তি ভাঙার প্রচারণা চালানোর একাধিক স্ক্রিনশট।

ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত গত ৫ জুন একটি পোস্ট করা হয়। সেখানে দেখা গেছে, একটি নির্মাণাধীন রামের মূর্তির উপর এক ব্যক্তি কালেমা খচিত সাদা পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবির ভেতরে লেখা, “এই মূর্তি অপসারন চাই।” পোস্টের বিবরণীতে বলা হয়েছে, “ভারতে বাবরি মসজিদ ভেঙ্গে যেই রাম মন্দির তৈরি করা হয়েছে, সেই রামদের এতবড় মূর্তি এদেশে হতে দেওয়া যাবে না।” সহিংসতার আহ্বান জানিয়ে আরও লেখা হয়েছে, “কুকুর পাইলে মারিস না। রামসেনা পাইলে ছাড়িস না।” সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ডিসমিসল্যাব হুবহু একই ছবির ৬৫টি পোস্ট পেয়েছে।

গত ৯ জুন আরেকটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট করা হয়, যেখানে ছবিতে মূর্তির মাথার অংশ মাটিতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। মূর্তির মাথার কাছে, এবং শরীরের উপর সাদা রঙের টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত একাধিক ব্যক্তিকে মূর্তিটি ভাঙতে দেখা যায়। ছবির নিচে ডান কোণে গুগলের এআই টুল জেমিনির লোগোও দৃশ্যমান রয়েছে। পোস্টগুলোর ক্যাপশনে লেখা, “চুপ করে বসে থাকলে হবে এভাবে উড়িয়ে দিতে হবে।” প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ডিসমিসল্যাব হুবহু একই ছবির ২০টি পোস্ট খুঁজে পেয়েছে।

প্রায় একই ধরনের আরেকটি ছবি যুক্ত পোস্ট দেখা যায়, যেখানে একইরকম টুপি পাঞ্জাবি পরিহিত দুই ব্যক্তির একজনকে হাতুড়ি হাতে মূর্তির ভাঙা মাথার উপর দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আরেকজন বসে আছে, যার বুকে সাদা কাপড়ে কালেমা লেখা এবং হাতে কালেমা খচিত কালো পতাকা। এ ছবিটিরও নিচে ডান কোনে জেমিনির লোগো দেখা যায়। গত ৭ জুনে প্রকাশিত পোস্টটির ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়েছে, “আওয়ামী ধর্মের মূর্তির মতো রামের মূর্তি কেও গুড়িয়ে দেব আমরা ইনশাআল্লাহ।” প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ডিসমিসল্যাব হুবহু একই ছবির ১৩টি ফেসবুক পোস্ট খুঁজে পেয়েছে।

গত ৮ জুন ফেসবুকে “আলেম ওলামা ঐক্য পরিষদ” নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। ফটোকার্ডে একটি রামের মূর্তি, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছবি রয়েছে। ফটোকার্ডের ভেতরে এক অংশে লেখা, “বাংলাদেশে হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা লাগাতে চাই ভারত।” পোস্টের ক্যাপশনে এক অংশে লেখা, “বাংলাদেশের তাওহীদি জনতার উচিত অতি দ্রুত এই রাম মন্দিরের এই বিশালাকারের মূর্তি ভেঙে চুরমার করে দেওয়া।” প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে ডিসমিসল্যাব হুবহু একই ছবি ও বিবরণের আরও ৯টি পোস্ট পেয়েছে। 

ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ছবি পোস্ট করতে দেখা যায়, যেখানে হাতে ধারালো অস্ত্র, পরনে টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত এক ব্যক্তি একটি ভাঙা মূর্তির উপর দাঁড়িয়ে আছেন। ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “মুসলিমবঙ্গে প্রকাশ্যে কোন মূর্তি থাকতে দেয়া হবেনা। ইনশাআল্লাহ।” প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে নিজের ছবি সংযুক্ত করে হুবহু একই ক্যাপশনে আপলোড হওয়া প্রায় ৩০টি পোস্ট পাওয়া যায়। 

নির্মাণাধীন অন্য আরেকটি মূর্তির ছবি শেয়ার করে, গত ৮ জুন একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে মূর্তিটিকে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের পূর্বাভাষ হিসেবে উল্লেখ করে পোস্ট করা হয়। প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ দিয়ে হুবহু একই ক্যাপশনের এ ধরনের ৪৮টি পোস্ট পাওয়া গিয়েছে, যেখানে টাঙ্গাইলে নির্মাণাধীন বিষ্ণুর মূর্তি ভেঙে ফেলার আহবান দেওয়া হচ্ছে।

মেটার নীতি যা বলে

মেটার ভায়োলেন্স এবং ইনসাইটমেন্ট নীতিমালা অনুযায়ী, এমন কোনো কনটেন্ট পোস্ট করা যাবে না, যেখানে “অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার, কোনো স্থানে অস্ত্র নিয়ে যাওয়ার অথবা জোরপূর্বক কোনো স্থানে প্রবেশ করার হুমকি প্রদান করা (এই স্থানগুলোর মধ্যে উপাসনালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ভোটকেন্দ্র কিংবা ভোট গণনা ও নির্বাচন পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত স্থানসমূহ অন্তর্ভুক্ত হলেও, তা শুধু এগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়); অথবা এমন কোনো স্থানে প্রবেশের হুমকি দেওয়া, যেখানে সাময়িকভাবে সহিংসতার প্রবল ঝুঁকি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।” ‘মূর্তি ভাঙার’ বয়ান তৈরিতে যেসব ছবি ও ক্যাপশন ব্যবহার করা হয়েছে সেগুলো মেটার এই নীতিমালা লঙ্ঘন করছে।

গত ২ জুন ‘শ্রী হরিদাস চন্দ্র তরনী দাস’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট দিয়ে আর্থিক সহায়তা চাওয়ার পর আলোচনার সূত্রপাত হয়। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হরিদাস নামের ওই ব্যক্তি প্রতারণা মামলার আসামি। ভুয়া পরিচয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে ২০২২ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করেছিল (,,)।

হরিদাসের পোস্টের পর ৪ জুন একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করা হয় (,,,)। ‘আল-আবরার’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়, সীমান্তবর্তী এলাকায় এ মূর্তি নির্মাণ জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। একই অ্যাকাউন্ট থেকে এআই দিয়ে বানানো ভিডিওর মাধ্যমে নির্মাণাধীন মূর্তিটি ভেঙে পড়ার কাল্পনিক দৃশ্য পোস্ট করা হয়। আল- আবরার নামের অ্যাকাউন্টটি থেকে এর আগেও ফেসবুকে একাধিক সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক পোস্ট প্রচারের নজির রয়েছে, যা ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। 

এরপর থেকে সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বাড়তে থাকে। এতে যোগ দেন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য, যার ফেসবুকে ৩০ লাখের বেশি অনুসারী ও ইউটিউবে ৪০ লাখের বেশি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। গত ৫ জুন একটি পোস্টে তিনি ওই এলাকার হিন্দু জনসংখ্যার অনুপাত, স্থাপনার অর্থায়নের উৎস, এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং মন্দির উদ্বোধনে ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনারের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

অন্যদিকে উইকলি ব্লিটজের সম্পাদক সালেহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্টে জানানো হয়, প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে সেখানে রাম, কৃষ্ণ ও শিবের মূর্তিসহ মোট ১৪৪টি ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। এভাবেই ধর্মীয় স্থাপনা নির্মাণের বিষয়টি সামাজিক মাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়।

সামাজিক মাধ্যমে এমন আলোচনার মধ্যে গত ১০ জুন স্থানীয় পর্যায়ে মূর্তি নির্মাণ স্থগিত ও অপসারণের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনমানববন্ধন করা হয়েছে। একইদিনে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমাবেশও অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়। ১১ জুন আপাতত মূর্তি নির্মাণ কার্যক্রম স্থগিতের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।  

আরো কিছু লেখা