
সদ্যসমাপ্ত পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। তৃণমূল কংগ্রেসকে দেড় দশক ক্ষমতায় দেখা রাজ্যটিতে এবারই প্রথম ক্ষমতায় এসেছে ভারতের বর্তমান শাসক দলটি। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটির প্রচারণা কেবল ভারতের ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, জড়ানো হয়েছে সীমান্তের এপারের বাংলাদেশকেও।
পশ্চিমবঙ্গসহ চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের বিধানসভা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় গত ১৫ মার্চ। এর আগে গত ৫ জানুয়ারি দিল্লিতে বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। এই প্রতিবেদনে ৫ জানুয়ারির বৈঠক থেকে নির্বাচনের শেষ ধাপের ভোট গ্রহণের একদিন আগ (২৮ এপ্রিল) পর্যন্ত বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ তাদের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে “বাংলাদেশ” শব্দটি উল্লেখ করে যত পোস্ট দিয়েছে, তা পর্যালোচনা করা হয়েছে। ৩ মাস ২৩ দিন সময়সীমায় বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের অফিসিয়াল এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া সব পোস্টের মধ্যে প্রায় অর্ধশত (৪৯) পোস্টে ‘বাংলাদেশ’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুইটি পোস্টের মাধ্যমে অপতথ্য প্রচারিত হয়েছে, যেগুলো নিয়ে আগেই ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
এছাড়াও, বাংলাদেশের এক ঘটনার ছবি-ভিডিও ছড়ানো হয়েছে ভিন্ন ঘটনার দাবিতে, কখনো আবার দুর্ঘটনা কিংবা বিভিন্ন অপরাধ সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে প্রচার করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে। এভাবে নির্বাচনের আগে বাংলাদেশের একের পর এক ঘটনার সাম্প্রদায়িক উপস্থাপনের মাধ্যমে এর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের শাসনামলের নানা ঘটনার। বাংলাদেশকে ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক মেরূকরণ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য একটি প্রতীকী “ঝুঁকি” ও “রাজনৈতিক সতর্কবার্তা” হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাদের বার্তা— পশ্চিমবঙ্গকে “পশ্চিম বাংলাদেশ” হওয়া থেকে বাঁচাতে ভোট দিতে হবে বিজেপিকে। আর এই প্রায় চার মাসে বিজেপির পোস্টে “পশ্চিম বাংলাদেশ” শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে ২০ বার।
বিজেপির প্রচারণায় বাংলাদেশকে ঘিরে অপতথ্য
পশ্চিমবঙ্গে দ্বিতীয় ও শেষ ধাপের ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া চলে গত ২৯ এপ্রিল। এর আগের দিনই বিজেপির ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ৪৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, বাংলাদেশ পুলিশ জোরপূর্বক একজনকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। পরের দৃশ্যেই দেখা যায় আগুন জ্বলছে। ক্যাপশনে লেখা, “বাংলাদেশে ইসলামপন্থী জনতার হাতে দীপু দাসকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। একইভাবে মুর্শিদাবাদে শুধুমাত্র হিন্দু হওয়ার কারণে হরগোবিন্দ দাস এবং চন্দন দাসকে ইসলামপন্থী জনতা পিটিয়ে হত্যা করেছে। বাঙালি হিসেবে আমাদের জেগে ওঠার এটাই উপযুক্ত সময় কারণ পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশে পরিণত করার জন্য তৃণমূলের একটি অশুভ পরিকল্পনা রয়েছে।” অথচ ভিডিওর প্রথম ২৭ সেকেন্ড ভিন্ন স্থানের, ভিন্ন ঘটনার এবং দিপু চন্দ্র দাসের হত্যাকান্ডের এক মাস আগের।

বাংলাদেশ (১, ২, ৩, ৪) ও ভারতভিত্তিক (১, ২) একাধিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান চার মাসেরও বেশি আগে ভিডিওটি ফ্যাক্টচেক করার পরও বিজেপি সম্প্রতি আবারও তাদের অ্যাকাউন্টে ভিডিওটি পোস্ট করে। পোস্টটি আট শতাধিকবার শেয়ার হয়েছে, ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১৭ হাজারের বেশিবার। একজন মন্তব্য করেছেন, “আমরা যদি ওদের মতো হতে না চাই, তবে এই ইসলামপন্থী সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে দিতে হবে।”
এর আগে এ বছরেরই ১৬ জানুয়ারি বাংলাদেশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর আক্রমণের দাবিতে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। একটি বাড়িতে অগ্নিকাণ্ডের দৃশ্য দেখা যায় ২৬ সেকেন্ডের এই ভিডিওতে। জানানো হয়, সিলেটের গোয়াইনঘাটে শিক্ষক বীরেন্দ্র কুমার দের বাড়িটি শুধু হিন্দু হওয়ার কারণেই পরিকল্পিতভাবে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের হিন্দুদের সাথে যা ঘটছে, তা পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যতের জন্য এক চরম সতর্কবার্তা বলে সাবধান করে দেওয়া হয় এই পোস্টে। বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর চলা নিপীড়ন দেখে পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি সনাতনীকে এখনই জেগে উঠতে হবে, নতুবা অনেক দেরি হয়ে যাবে বলে জানায় পশ্চিমবঙ্গ বিজেপি। ভিডিওটি দেখা হয়েছে ১৩ হাজারের বেশিবার।
আরেকটি পোস্টে একই ভিডিওর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে ২০২৫ সালের ওয়াকফ (সংশোধন) আইন বিরোধী আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের একাধিক ঘটনার দৃশ্যের। ক্যাপশনে লেখা, “বাঙালি হিন্দুরা ইসলামপন্থী উন্মত্ত জনতা এবং হিন্দু-বিরোধী প্রশাসনের রোষানলের শিকার হচ্ছে। বাংলাদেশ হোক কিংবা পশ্চিমবঙ্গ— সবখানেই চিত্রটা এক। ইসলামপন্থী জনতা অগ্নিসংযোগ এবং খুন করেও অনায়াসেই পার পেয়ে যাচ্ছে।” এই পোস্টটিও শতাধিকবার শেয়ার এবং হাজারখানেক বার দেখা হয়েছে।

এদিকে ১৯ তারিখ বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান দ্য ডিসেন্ট একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনে জানায়, এটি কোনো সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা নয়, বরং দুর্ঘটনা। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দ্য ডিসেন্ট বাড়ির মালিক প্রয়াত বীরেন্দ্র কুমার দেবের ছেলে বিকাশ রঞ্জন দেবের সাথে কথা বলে। তিনি বলেন, “আমরা বাড়িতে ছিলাম না ঘটনার সময়। আগুন লাগার পর গ্রামবাসীরা নিভিয়েছেন। ফায়ার সার্ভিসকেও তারাই ডেকে এনেছেন। আমাদেরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছেন। পরণের কাপড়টিও দিয়েছেন। আমাদের সাথে এখানকার কারো কোন সমস্যা নেই। কোন দাঙ্গা হাঙ্গামা নেই।”
পুলিশ তদন্ত করে জানিয়েছে, আগুন বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট থেকে লেগেছে। বিকাশ রঞ্জন আরও জানান, আগেও তার বাড়িতে শর্ট সার্কিটের ঘটনা ঘটেছিল। ১৫ জানুয়ারির এই ঘটনায় বিকাশ কোনো মামলা বা অভিযোগ দায়ের করেননি বলে জানা যায়। অথচ ভিডিওটি বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ-এর এক্স অ্যাকাউন্টে রয়ে গেছে। এখনো ভিডিওটি প্রচারিত হচ্ছে বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর উপর পরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে। এর মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের জন্য একটি কাল্পনিক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করে পরিত্রাণের উপায় হিসেবে ক্ষমতায় বসাতে বলা হয়েছে হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল বিজেপিকে।
অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সাম্প্রদায়িক উপস্থাপনা
“আমরা চোখে দেখেছি দিপু চন্দ্র দাসকে বাংলাদেশে গাছ থেকে ঝুলিয়ে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দেওয়া। আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গ ওরকম হোক? আমরা চাই পশ্চিমবঙ্গ ওরকম হোক? আমরা চাই না ওরকম পশ্চিমবঙ্গ হোক। আমরা ভারতীয় জনতা পার্টি সেই জন্য লড়াই করছি যে ওই বিধর্মের বাংলাদেশের মতো পরিস্থিতি আমরা পশ্চিমবঙ্গে তৈরি হতে দেব না। তার জন্য যদি ভারতীয় জনতা পার্টির কার্যকর্তাকে, নেতৃত্বকে যদি গুলি খেতে হয় আমরা গুলি খাব, যদি রক্ত দিতে হয় রক্ত দেব, তবুও পশ্চিমবঙ্গকে আমরা পশ্চিম বাংলাদেশ তৈরি হতে দেব না।”
কথাগুলো বলছিলেন বিজেপির রাজনীতিবিদ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও উত্তর-পূর্বাঞ্চল উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার। এই বক্তব্যের ভিডিওর সঙ্গে জুড়ে দেওয়া ক্যাপশনে লেখা, “দিপু চন্দ্র দাসকে মনে রাখুন, খোকন দাসকে মনে রাখুন, অমৃত মণ্ডলকে মনে রাখুন, লিটন ঘোষকে মনে রাখুন। এই বাঙালি হিন্দুদের বাংলাদেশে খুন করা হয়েছে। আমরা লাঠি ও গুলির মুখোমুখি হব, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গকে কোনোভাবেই ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’ হতে দেব না!”
২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত” দেওয়ার অভিযোগে ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলায় দিপু চন্দ্র দাস নামে এক পোশাক শ্রমিককে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়েছে। তবে তার সঙ্গে যে খোকন দাস,অমৃত মণ্ডল কিংবা লিটন ঘোষের নাম বলা হয়েছে, তাদের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি। গত ৩১ ডিসেম্বর রাতে শরীয়তপুরের ডামুড্যায় দুর্বৃত্তরা খোকন দাসের তলপেটে ছুরি মেরে তার কাছে থাকা নগদ টাকা ও একটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। ৩ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। পরবর্তীতে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ৩ আসামি আদালতে স্বীকারোক্তি দেন, ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে খোকনকে ছুরিকাঘাত ও পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।



গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায় গণপিটুনিতে হত্যা করা হয় অমৃত মন্ডলকে। সহকারী পুলিশ সুপার (পাংশা সার্কেল) দেবব্রত সরকার বলেন, নিহতের বিরুদ্ধে পাংশা থানায় একটি হত্যা মামলাসহ অন্তত দুটি মামলা ছিল।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সম্রাট একটি অপরাধী চক্র গড়ে তুলেছিলেন এবং দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও অন্যান্য অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। ভারতে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকার পর তিনি সম্প্রতি বাড়ি ফেরেন এবং গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সম্রাট ও তার দলের সদস্যরা চাঁদার টাকা নিতে শহিদুলের বাড়িতে গেলে বাড়ির লোকজন ‘ডাকাত’ বলে চিৎকার শুরু করলে স্থানীয়রা ছুটে এসে সম্রাটকে গণপিটুনি দেয়।
অন্যদিকে, কলার বাগান থেকে কলা চুরি হওয়া এবং হোটেলের কর্মচারীর সাথে তুচ্ছ কথা কাটাকাটির জেরে লিটন চন্দ্র ঘোষের হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ব্যবসায়ী লিটনের হোটেলে তল্লাশি চালিয়ে চুরি হওয়া কলা পাওয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে তর্কাতর্কি শুরু হয়। হোটেল মালিক লিটন পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে গেলে তাঁকে মারধর করা হয় এবং তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।

এভাবে ৪৯টি পোস্টের মধ্যে ১১টিতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অপরাধমূলক ঘটনার উল্লেখ করে একে সাম্প্রদায়িক আক্রমণ বা “কেবল হিন্দু হওয়ার কারণে” হত্যা, ধর্ষণ কিংবা অগ্নিকাণ্ড বলে উপস্থাপন করা হয়েছে। কোনো ধরনের তদন্ত বা প্রমাণ উপস্থাপন ছাড়াই ১৬টি মৃত্যু, ১টি “ধর্ষণ” ও ১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক হামলা বলে উপস্থাপন করা হয়েছে এসব পোস্টে। খোকন দাস, অমৃত মন্ডল কিংবা লিটন চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে এই মৃত্যুর তালিকায় রয়েছে বজেন্দ্র বিশ্বাস, রিপন সাহা, সমীর কুমার দাস, মনি চক্রবর্তী, প্রাণতোষ কর্মকার, প্রলয় চাকী, মিঠুন সরকার, চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিক, রানা প্রতাপ বৈরাগী, উৎপল সরকার, যোগেশ চন্দ্র রায় ও তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়।
দুর্ঘটনা কিংবা হামলা- সবকিছুতেই সাম্প্রদায়িকতার ছাপ
গত ২৯ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় একটি পোশাক কারখানায় সহকর্মীর শটগানের গুলিতে বজেন্দ্র বিশ্বাস (৪২) নামে এক আনসার সদস্য নিহত হন। অভিযুক্ত আনসার সদস্য নোমান মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ। ঘটনার সময় নোমান মিয়া দুষ্টুমির ছলে শটগান তাক করে বলেছিলেন, ‘দাদা গুলি করে দেই?’ এরপরই অসাবধানতাবশত গুলি বের হলে বজেন্দ্র বিশ্বাস বিদ্ধ হন।
অন্যদিকে, পাম্প থেকে তেল নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে যেতে চাইলে রিপন সাহা (৩০) নামের এক শ্রমিক গাড়ির সামনে গিয়ে বাধা প্রদান করলে তাকে চাপা দেয় চালক। হত্যার এ ঘটনায় গাড়িমালিক সাবেক বিএনপি নেতা ও চালককে আটক করেছে পুলিশ। ফেনীর দাগনভূঞায় সমীর কুমার দাস (২৮) নামে এক চালককে হত্যার পর তার অটোরিকশা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পুলিশ দুটি ঘটনায় কোনো সাম্প্রদায়িক যোগসূত্র খুঁজে না পেলেও তা এক্সে প্রচার করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে।

দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় নরসিংদীর পলাশে মুদি ব্যবসায়ী মনি চক্রবর্তী (৪০) কিংবা ফরিদপুরের সালথায় মাছ ব্যবসায়ী উৎপল সরকার (৩৫) নিহতের ঘটনাও কোনো তথ্য প্রমাণ ছাড়াই সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে প্রচার করা হয়েছে বারংবার। নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় প্রাণতোষ কর্মকার (৪২) নামে এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার ঘটনাও একইভাবে প্রচার করা হয়েছে। পাবনায় কারা হেফাজতে জেলা আওয়ামী লীগের নেতা প্রলয় চাকীর (৬০) মৃত্যুকেও প্রচার করা হয়েছে সাম্প্রদায়িক ইঙ্গিতে।

নওগাঁয় চোর সন্দেহ স্থানীয়দের ধাওয়া খেয়ে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে মিঠুন সরকার (২৫) নামের এক যুবক নিহত হয়েছেন। নরসিংদীতে গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা দোকানের শাটারে নিচে আগুন লাগিয়ে দিলে ঘুমন্ত চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিক (২৩) পুড়ে মারা যান। অপরদিকে, ঋণের ৮,০০০ টাকা পরিশোধ করার জন্য মুরসালিন নামে এক যুবক অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা যোগেশ চন্দ্র রায় (৭৫) এবং তাঁর স্ত্রী সুবর্ণা রায়কে (৬০) তাঁদের বাড়িতে ঢুকে হত্যা করেছে। দুটি ঘটনাকে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ প্রচার করে সাম্প্রদায়িক হামলা হিসেবে।

যশোরের মনিরামপুরে ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগী (৪০) হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ‘শুটার’কে অস্ত্র-গুলিসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। যশোর পুলিশের মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, “নিহত রানা প্রতাপ বৈরাগী ছিলেন বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির মনিরামপুরের আঞ্চলিক নেতা। অপর দিকে আটক ব্যক্তিরা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। দুটি নিষিদ্ধঘোষিত চরমপন্থী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।”

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় এক নারীকে (৪৪) ধর্ষণ ও গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগে মামলা হয়। ভুক্তভোগী নারী অভিযুক্ত একজন সম্পর্কে বলেন, “শাহীনের ভাইয়ের কাছ থেকে বাড়িসহ জমি কেনার পর থেকেই আমার পিছু লাগে সে। এখানে আসার পর থেকেই আমাকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছে। বিভিন্ন সময় আমার কাছে টাকাও দাবি করেছে শাহীন।” কোনো সংবাদ প্রতিবেদনে ওই নারীর নাম বা ধর্মীয় পরিচয় দেওয়া হয়নি। এই ঘটনাও বিজেপি প্রচার করেছে “হিন্দু” নারীকে ধর্ষণ হিসেবে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে। এই ঘটনার তুলনা করা হয় বহিষ্কৃত তৃণমূল কংগ্রেসের শাহজাহান শেখের সন্দেশখালির নারী নির্যাতনের কাণ্ডের সঙ্গে। লেখা হয়— “মমতার তোষণ রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গকে দ্রুত ‘পশ্চিম বাংলাদেশ’-এ রূপান্তরিত করছে!”
নির্বাচনী প্রচারণায় কৌশল: ভয় থেকে ভোট
হত্যা কিংবা ধর্ষণের অভিযোগ ছাড়াও মূর্তি ভাঙার ঘটনার দৃশ্যের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের তুলনা করা হয়েছে। ১৬ জানুয়ারির এক পোস্টে লেখা হয়েছে, “ইসলামিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ হোক বা মমতার হিন্দুবিদ্বেষী শাসন—উভয় জায়গাতেই আমরা এই ধরনের ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি। হিন্দুদের মাতৃভূমি পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের প্রকাশ্য প্রশাসনিক বৈষম্য আর কতদিন সহ্য করবেন বাঙালি হিন্দুরা?”

তবে, ২০২৫ সালের ৯ মার্চের সেই ঘটনার দিনই বসিরহাট পুলিশ এ বিষয়টি পরিষ্কার করে। তারা জানায়, “বসিরহাটে একটি কালী মন্দিরের একটি মূর্তি নষ্ট হওয়ার ঘটনা সম্পর্কে ভুল তথ্য এবং সাম্প্রদায়িক অশান্তি ছড়ানোর জন্য কিছু মহল থেকে চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রতিমা প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে এবং ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ওই ব্যক্তির মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে।” ঘটনার প্রায় ১০ মাস পরও এই ঘটনা প্রচার করা হয়েছে “মমতার হিন্দুবিদ্বেষী শাসন” হিসেবে।
আরেকটি পোস্টে অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাল নোট, সন্ত্রাসবাদ, চোরাচালান ইত্যাদির উৎস হিসেবে বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে। একইভাবে তৃণমূল কংগ্রেসকে এইসব কার্যকলাপের সঙ্গে পরোক্ষভাবে যুক্ত বা এগুলো নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এবং বোঝানো হয়েছে যে রাজনৈতিক কারণে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হতে দিচ্ছে দলটি। পাশাপাশি বাংলাদেশের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী–এর উত্থানকে দেখিয়ে এটিকে ভারতের পূর্ব সীমান্তের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে “ডাবল-ইঞ্জিন সরকার” (অর্থাৎ বিজেপি শাসন) প্রয়োজন বলে যুক্তি দেওয়া হয়েছে এবং অনুপ্রবেশ ও নিরাপত্তা ইস্যুকে রাজনৈতিকভাবে জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী দেশের ও রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে খেলছেন, এবং এই পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য রাজনৈতিক বদলের আহ্বান জানানো হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ও সাংস্কৃতিক চরিত্র বদলাতে চায় এবং এটি “ইসলামি সংস্কৃতি চাপিয়ে দিচ্ছে।”
নির্বাচনের শেষ ধাপের দুইদিন আগে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ তাদের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে এক বাক্যের একটি পোস্ট করে। তাতে লেখা—”পশ্চিমবঙ্গকে পশ্চিম বাংলাদেশ হওয়া থেকে রুখতেই এই নির্বাচন!” ক্ষমতায় এসে অবৈধ বাংলাদেশি এবং অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে পশ্চিমবঙ্গকে পুনরুদ্ধার করার দায়িত্ব পালন করবে বিজেপি। এর আগেও একাধিক পোস্টে বিজেপি প্রচার করেছে যে এই নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের জন্য নয়। বাঙালি হিন্দুদের পরিবার এবং বন্ধুদেরবাঁচাতে বিজেপি-কে ভোট দিতে হবে। বাঙালি হিন্দুদের ভাগ্য প্রতিদিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে দাবি করে বিজেপি আহ্বান জানায়, বেঁচে থাকার তাগিদেহিন্দু-বিরোধী তৃণমূল কংগ্রেস-কে গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতাচ্যুত করতে হবে। এভাবে বাঙালি হিন্দুদের ভাষা, সংস্কৃতি, জান-মালের নিরাপত্তা, এমনকি জাতীয় নিরাপত্তার হুমকি দেখানো হয়েছে বাংলাদেশকে জড়িয়ে। আর বিজেপিকে ভোট দেওয়াকেই পরিত্রাণের উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।