
আঙুলের টোকায় এক নারীকে পাঠানো হচ্ছে কাঁটাতারের ওপারে, সাইনবোর্ডে বলছে সেটা ‘বাংলাদেশ’। আবার, কোনো ভিডিওতে লাথি মেরে ফেলা হচ্ছে নদীতে, সেখানেও বাংলাদেশের পতাকা। অ্যানিমেশন ও এআই ভিডিওতে চিত্রায়িত ওই নারী আর কেউ নন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
গত ৪ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণার পর বাংলাদেশকে জড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ব্যঙ্গ করে এমন প্রচারণা দেখা যাচ্ছে। ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ভারত-ভিত্তিক অ্যাকাউন্ট থেকে এ ধরনের অন্তত চারটি ভিডিও ঘুরে-ফিরে প্রচারিত হচ্ছে।
গত ৪ মে ‘পামেলা গোস্বামী’ নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ২৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। টু-ডি অ্যানিমেশনের দৃশ্যে ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ইলেকশন’ লেখা একটি বিশাল হাত সাদা রঙের নীল পাড় দেওয়া শাড়ি পরিহিত এক নারীকে আঙুলের টোকায় উড়িয়ে দিচ্ছে। নারী শূন্যে ভেসে কাঁটাতারের বেড়া পার হয়ে অন্য পাশে গিয়ে পড়েন। কাঁটাতারের অপর পাশে ইংরেজিতে ‘বাংলাদেশ’ লেখা একটি সাইনবোর্ড রয়েছে। সেখানে টুপি ও পাঞ্জাবি পরিহিত কয়েকজন ব্যক্তি হাত তুলে উল্লাস প্রকাশ করেন। এ সময় ভিডিওর ওপরে ইংরেজিতে ‘বেঙ্গল ইলেকশন রেজাল্টস ২০২৬’ এবং ‘বাই বাই!!’ লেখা ভেসে ওঠে।

যদিও ভিডিওর শেষে ইংরেজিতে লেখা একটি ডিসক্লেইমার বা সতর্কবার্তা প্রদর্শিত হয়। এতে লেখা আছে, “‘বাংলার রায়’ একটি স্বাধীন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম, যা ভারতের সংবিধানের ১৯(১) (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরল বিশ্বাসে কনটেন্ট প্রকাশ করে। এখানে প্রকাশিত মতামতগুলো মূলত জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে প্রচার করা হয়। এর মাধ্যমে কোনো ধরনের সহিংসতা, বিদ্বেষ বা বেআইনি কার্যকলাপকে উসকে দেওয়া হয় না। এই কনটেন্টটি প্রকৃতিগতভাবে কাল্পনিক, রূপক এবং/অথবা প্রতীকী, যা মূলত জনসমক্ষে আলোচিত বিভিন্ন ঘটনা থেকে অনুপ্রাণিত। এটি কোনো বাস্তব ঘটনার প্রামাণ্য দলিল নয় এবং একে কোনো ব্যক্তি, সংগঠন বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে না। আমরা আশা করি, পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ স্বচ্ছতা ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বজায় রাখবে এবং একইসঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে জবাবদিহিতা চাওয়ার ক্ষেত্রে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে।”
‘পামেলা গোস্বামী’- এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারিত ভিডিওটি এখন পর্যন্ত ৭০০ বারের বেশি রিপোস্ট হয়েছে। তিন লাখের বেশিবার দেখা হয়েছে। অ্যাকাউন্টের বায়ো অনুযায়ী পামেলা গোস্বামী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)- এর নেত্রী। অ্যাকাউন্টের অ্যাবাউট সেকশন অনুযায়ী ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছে এটি। এর আগে গত ৪ মার্চ পামেলা গোস্বামী ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একই দৃশ্যের ভিডিও পোস্ট করেছিলেন। তবে সেখানে কোনো প্রকার ডিসক্লেইমার ছিল না। ফেসবুক পোস্টের ক্যাপশনে ইংরেজিতে লেখা ছিল, “এই নির্বাচনের ফলাফল দিদিকে প্রিয় গন্তব্যে মানুষের মাঝে পৌঁছে দেবে।” উল্লেখ্য, ভারতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ‘দিদি’ বলে সম্বোধন করা হয়।

বিজেপি নেত্রী ‘পামেলা গোস্বামী’র নামে পরিচালিত অ্যাকাউন্টগুলো ছাড়াও ভিডিওটি একাধিক ভারত-ভিত্তিক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়েছে (১, ২, ৩)।
গত ৪ মে ‘ভয়েজ অব হিন্দুজ’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে আরেকটি ভিডিও থেকে পোস্ট করা হয়। আট সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, সাদা শাড়ি এবং বাংলাদেশের পতাকার নকশাযুক্ত চাদর বা ওড়না পরিহিত একজন নারীর চারপাশে কয়েকজন পুরুষ দাঁড়িয়ে আছেন। পুরুষগুলোর মুখে উজ্জ্বল কমলা রঙের দাড়ি এবং পরনে বাংলাদেশের পতাকার মতো লাল বৃত্তযুক্ত সবুজ লুঙ্গি। তাদের শরীরের উপরের দিক অনাবৃত। পেছনে গ্রামীণ পরিবেশের ঘরবাড়ি দেখা যায়। ভিডিওতে ‘ভয়েজ অব হিন্দুজ’ লেখা একটি জলছাপ রয়েছে। ভিডিওর অডিওতে হিন্দি ও ইংরেজি ভাষায় গালিগালাজ ব্যবহার করা হয়েছে।
ক্যাপশনে লেখা, “বাংলায় বসবাসরত রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্য একটি বার্তা।” এআই শনাক্তকারী টুল হাইভ মডারেশনের ফলাফল অনুযায়ী, ভিডিওটি এআই নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
ভয়েজ অব হিন্দুজ- এই এক্স অ্যাকাউন্টের অ্যাবাউট সেকশনে গিয়ে দেখা যায় এটি ভারত থেকে পরিচালিত হয়। এছাড়া, পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টটি থেকে নিয়মিত বিজেপির পক্ষে পোস্ট করা হয়।
এই ধরনের প্রচারণা নিয়ে ডিসমিসল্যাব কথা বলে গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের সঙ্গে। তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “এটি বিজেপির পুরোনো রাজনীতিরই বর্ধিত অংশ। ঐতিহাসিকভাবে মমতাকে অবৈধ বাংলাদেশিদের আশ্রয়দাতা হিসেবে দীর্ঘদিন ধরেই তুলে ধরতে চেয়েছে তারা। এর জন্যেই এ ধরনের প্রচারণাগুলো করছে।”
তিনি আরও মনে করেন, মমতার এখনো যে পরিমাণ জনসমর্থন রয়েছে, তাদের হুমকির মুখে রাখাও একটি উদ্দেশ্য হতে পারে। মূলত মমতাকে আরও কোণঠাসা করার চেষ্টা হিসেবে তিনি একে চিহ্নিত করছেন।

গত ৪ মে আপলোড হওয়া আরেকটি ৬ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, ঘাসযুক্ত উঁচু স্থান থেকে একটি বিশালাকার পা সাদা রঙের নীল পাড় দেওয়া শাড়ি পরিহিত এক নারীকে লাথি মারছে। নারীর পিঠে একটি কালো পায়ের ছাপ দৃশ্যমান। লাথির আঘাতে তিনি শূন্যে ভেসে গিয়ে সামনের নীল জলাশয়ে পড়ে যান। বাম পাশে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং ডানদিকে উপরে “@BHKslams” লেখা একটি জলছাপ।
টু-ডি অ্যানিমেশন ভিডিওটি আপলোড করা হয় বিএইচকে নামের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে। এটিও ভারত থেকে পরিচালিত। পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এই অ্যাকাউন্ট থেকেও নিয়মিত বিজেপির পক্ষে ও তৃনমূল কংগ্রেসের বিপক্ষে বিভিন্ন পোস্ট করা হয়।
ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে পাওয়া আরেকটি ভিডিও আপলোড করা হয় ইনস্টাগ্রামে। ভিডিওটির দৈর্ঘ্য ২০ সেকেন্ড। এতে দেখা যায়, ভারতের চার শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার অ্যানিমেটেড চরিত্র নিয়ে তৈরি একটি ব্যঙ্গাত্মক দৃশ্য, যার আবহে একটি হিন্দি গান বাজছে। একটি জনবহুল রাস্তায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঁদতে দেখা যায় এবং উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে জড়িয়ে ধরে আছেন। তাদের দুই পাশে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ দাঁড়িয়ে আছেন। এরপর মমতার অশ্রুসিক্ত মুখের একটি ক্লোজ-আপ শট দেখানো হয়। ভিডিওর শেষাংশে দেখা যায়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওই তিন নেতার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ‘ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ গেট’ লেখা একটি তোরণের দিকে হেঁটে যাচ্ছেন এবং বাকি তিন নেতা তার চলে যাওয়া দেখছেন।
ভিডিওটি ভারত-ভিত্তিক এক্স অ্যাকাউন্ট ‘জিন্নাত রানা’ থেকেও গত ৪ মে পোস্ট হতে দেখা যায়। অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এটি থেকে নিয়মিত বিজেপির পক্ষে বিভিন্ন পোস্ট করা হয়।

আলতাফ পারভেজ মনে করেন, আসাম থেকে ইতোমধ্যে নিয়মিতই বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মানুষকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। মমতাকে বাংলাদেশের সীমান্তে ছুঁড়ে মারার মাধ্যমে পশ্চিমবঙ্গ থেকেও একই ঘটনা ঘটানোর ইঙ্গিত দিয়ে থাকতে পারে। তিনি বলেন, “পশ্চিমবঙ্গে লক্ষাধিক মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছে, যাদের বেশিরভাগই মুসলিম। কিছু হিন্দু ও মতুয়াও আছে। এদের সবাইকে তো তারা ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ বলে। এ ধরনের পরিচয় যুক্ত করে তাদের বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দেবে দাবি করার সমূহ সম্ভাবনা আছে।” এ ধরনের প্রচারণা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
ওপেন সোর্স ইনভেস্টিগেটিভ প্লাটফর্ম বেলিংক্যাটের চলতি বছরের ৩১ মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, ভারতের আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিজেপি এআই জেনারেটেড ভিডিও ও ছবি ব্যবহার করে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়েছে। বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে এই প্রচারণা প্রধানত ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুকে সামনে আনতে চেয়েছে। বিভিন্ন ভিডিওতে দাড়ি-টুপি পরিহিত ব্যক্তিদের অবৈধ অভিবাসী বা বাংলাদেশি হিসেবে উপস্থাপনের নজিরও দেখা যায়।