ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক
Fact-check report on coordinated hate speech and propaganda targeting Bangladeshi content creator and actress Karina Kaiser after news spread that she was on life support following liver failure.

প্রেক্ষাপট জুলাই গণ-অভ্যুত্থান

লাইফ সাপোর্টে কারিনা কায়সার, সামাজিক মাধ্যমে চলছে বিদ্বেষের প্রচার

ডিসমিসল্যাব

অফিসিয়াল ডেস্ক

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও অভিনেত্রী কারিনা কায়সার লাইফ সাপোর্টে আছেন। তার বাবা ও জাতীয় দলের সাবেক ফুটবলার কায়সার হামিদ গত ৯ মে এ খবর নিশ্চিত করেছেন। লিভার সংক্রান্ত জটিলতায় হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন কারিনা, পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হয়ে লিভার ফেইলিউর হলে গত ৮ মে, শুক্রবার রাতে তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। তার সুস্থতা কামনায় দোয়া চেয়েছেন পরিবার ও সহকর্মীরা। সামাজিক মাধ্যমে আরও অনেকেই তার আরোগ্য কামনা করে পোস্ট দিয়েছে।

তবে এর মাঝেই সামাজিক মাধ্যমে চলছে কারিনা কায়সারকে ঘিরে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের সংঘবদ্ধ প্রচারণা। ডিসমিসল্যাব ফেসবুক এবং এক্স-এ অন্তত ৫৩টি পোস্ট খুঁজে পেয়েছে, যেখানে তার অসুস্থতার খবরকে লক্ষ্য করে কারিনা কায়সার এবং তার পরিবারকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানো হয়েছে।

Fact-check report on coordinated hate speech and propaganda targeting Bangladeshi content creator and actress Karina Kaiser after news spread that she was on life support following liver failure.
কারিনা কায়সারকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের সংঘবদ্ধ প্রচারণা চালানো একাধিক পোস্টের স্ক্রিনশট।

কারিনা কায়সারের অসুস্থতার খবর ট্রেন্ড হওয়ার পর ডিসমিসল্যাবের সামনে নেতিবাচক একটি পোস্ট আসে, যেখানে তাকে “গণভবন লুটপাটকারী” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট কি-ওয়ার্ড সার্চ দিলে ডিসমিসল্যাবের সামনে ফেসবুকে পোস্ট হওয়া ৪৭টি পোস্ট এবং এক্সে পোস্ট করা ৬টি পোস্ট আসে। যে ব্যক্তিগত প্রোফাইল এবং পেজ থেকে পোস্টগুলো করা হয়েছে, সেগুলো যাচাইয়ে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টগুলোর সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দল আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া যায়। এক্সেও যে অ্যাকাউন্টগুলো থেকে পোস্ট করা হয়েছে, সে অ্যাকাউন্টগুলোতেও আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিভিন্ন পোস্ট পাওয়া যায়। 

ফেসবুকে সার্চের টুল, “হু পোস্টেড হোয়াট”-এ কিওয়ার্ড সার্চ দিলে দেখা যায়, কারিনা কায়সারকে নিয়ে সর্বপ্রথম এ ধরনের পোস্টটি করা হয়েছিল ফেসবুকে গত ৯ মে বিকেল পৌনে ৬টায়। একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে কারিনা কায়সারের তিনটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “গণভবনে লুটপাট কারী এই কারিনা কায়সার আর তার মা। অথচ এই মেয়ে আপার সাথেও দেখা করে এসেছিল, কথা বলে এসেছিল একটা প্রোগ্রামে। সামান্য কয়টা ডলারের লোভে জুলাই সন্ত্রাসীদের সাথে আন্দোলনে যোগদান করে। তারপর ৫ আগস্ট গণভবনে লুটপাট চালায়। দেশদ্রোহী, লুটপাটকারী, চিটার এরা।” এ প্রোফাইলটির সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়। 

  • Fact-check report on coordinated hate speech and propaganda targeting Bangladeshi content creator and actress Karina Kaiser after news spread that she was on life support following liver failure.
  • Fact-check report on coordinated hate speech and propaganda targeting Bangladeshi content creator and actress Karina Kaiser after news spread that she was on life support following liver failure.

কারিনা কায়সারকে নিয়ে করা পোস্টগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশ পোস্টে তাকে “গণভবন লুটপাটকারী,” “চোর”সহ একাধিক বিদ্বেষমূলক বক্তব্যে অভিহিত করা হয়েছে। “ডাল্টন সৌভাত হীরা” নামের ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ৯ মে একটি পোস্টে লেখা হয়, “আমি শিওর এই কারিনা কায়সার হাতীর নাঙ রা আওয়ামী লীগ থাকলে,প্রধান মন্ত্রীর ত্রান তহবিল থেকেই যাবতীয় টাকা পয়সা তুলে ফেলত। তারেক রহমান রে একটা বিশেষ ধন্যবাদ,উনি এইসব হাতী দের পিম্পদের আশে পাশে ঘেষতে দেন না।”

আরেকটি প্রোফাইল থেকে পোস্ট করা হয়, “মা গনভবনের নেত্রীর ব্যাগ চুরনী এবং বাবা গনভবনের ল্যাপটপ   চোর…..আর আজকে তাদের মেয়েকে আল্লাহ নিয়ে যাচ্ছে …..পাপের শাস্তি অবশ্যই ভোগ করতে হবে ইহকালে অথবা পরকালে ৷ আল্লাহ সাময়িক ছাড় দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না…..এটা আবারও প্রমানীত ৷ কারিনার বাবা কায়সার হামিদ গণভবনের ল্যাপটপ চোর, কারিনার মাও নেত্রীর ব্যাগ ও চিরুনি চুরি করেছিল সেদিন। এই সকল চোর গুলোর ধ্বংস নিশ্চিত আজ বা কাল ৷।”

ফেসবুকে “সাপোর্টার্স অব বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ” নামের একটি গ্রুপ থেকে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কারিনা কায়সারকে নিয়ে ৯ এবং ১০ মে ১৯টি পোস্ট করা হয়। একটি প্রোফাইল থেকে গ্রুপে পোস্ট করে লেখা হয়, “আ**রিকা থেকে কেও ডলার পাঠাও এই চুন্নী হাতিটার জন্য!😂জুলাইয়ের লাল বান্দর যে কয়টা আছে সবগুলারই এমন অপমৃত্যু হচ্ছে। কাহিনি কি?।” আরেকটি সদস্য লিখেছেন, “গনভবনের লুটকারী জুলাইয়ের চোর করিনা কায়সার লাইফ সাপোর্টে। আলহামদুলিল্লাহ।” 

আওয়ামী লীগপন্থী অ্যাক্টিভিস্ট নিঝুম মজুমদার এ বিষয়ে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখেন, “কারিনা কায়সার: গণভবনে চুরি, মৃত্যুর দিকে যাত্রা ও অন্যান্য।” তিনি এ ভিডিওর এক অংশে বলেন, “আজকে কারিনা কিন্তু প্রত্যেকের সহমর্মিতা, ভালোবাসা, আদর, স্নেহ পেতে পারত। সবাই মিলে কিন্তু আজকে কারিনাকে সাহায্য করত। কিন্তু দেখুন, এই নোংরা কাজটার কারণে বাংলাদেশের একটা বড় অংশ যারা মুক্তিযুদ্ধের, মুক্তবুদ্ধির, যারা বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে, যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসে, আমি আওয়ামী লীগ বাদ দিলাম, যারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের, তারা কিন্তু এই মেয়েটা থেকে সরে এসেছে। সে গণশত্রুতে পরিণত হয়েছে।” 

Fact-check report on coordinated hate speech and propaganda targeting Bangladeshi content creator and actress Karina Kaiser after news spread that she was on life support following liver failure.
আওয়ামী লীগ–সমর্থক অ্যাক্টিভিস্ট নিঝুম মজুমদার (বামে) ও ‘বিডি ফর নৌকা’ নামের এক্স অ্যাকাউন্টে কারিনা কায়সারকে ঘিরে ছড়ানো বিদ্বেষমূলক প্রচারণামূলক পোস্টের স্ক্রিনশট।

সামাজিক মাধ্যম এক্সের একাধিক (, , , , , ) পোস্টেও কারিনা কায়সারকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়াতে দেখা যায়। “বিডি ফর নৌকা” নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে ১০ মে পোস্ট করে লেখা হয়, “এরা মা-বাবা মেয়ে মিলে সেদিন (৫ আগস্ট জঙ্গি হামলার দিন) গণভবন লুট করেছিল, প্রিয় নেত্রীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালজ করেছিলো, আজ আমাদের কাছে দোয়া চাচ্ছে!।”

৯ মে এক্সের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে লেখা হয়, “কায়সার হামিদ পুরো পরিবার নিয়ে গেছিল গণভবন দখল করতে, শেখ হাসিনা থাকলে হয়তো বা কিছু সাহায্য করত, এখন যাক তারেক জিয়ার কাছে হাত পাতুক জমি না বিক্রি করে…… ষড়যন্ত্রকারী জুলাইয যোদ্ধাদের পরিণতি এটা হবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু জনগণের মাইর গুলি না খেয়ে আল্লাহর বিচারের সামনে দাঁড়ায় যাচ্ছে…. কেমনে কি!!!” (বানান অপরিবর্তিত)  

প্রায় একই ভাষ্যের এ ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য বা পোস্ট সামাজিক মাধ্যমে কেন করা হয়, তা উঠে এসেছে, স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ কোয়ার্টার্লি জার্নালে প্রকাশিত “কমান্ডিং দ্য ট্রেন্ড: সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাজ ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার” গবেষণাতে। এ গবেষণায় বলা হয়েছে, “প্রোপাগান্ডার অন্যতম প্রধান নীতি হলো, লক্ষ্যবস্তুর চিন্তাধারার সঙ্গে অবশ্যই বার্তার মিল থাকতে হবে। তাই যখন এমন কোনো তথ্য আপনার সামনে আসে যা আপনার বিদ্যমান বিশ্বাসের সাথে খাপ খায়, তখন আপনার পক্ষপাতিত্ব সহজেই সেই প্রোপাগান্ডা গ্রহণ করে। যদি তথ্যটি আপনার চিন্তাধারার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তবে শুরুতে হয়তো আপনি সেটি প্রত্যাখ্যান করবেন; কিন্তু বারবার একই কথা শোনার আপনার মনে একটি ‘অ্যাভেইল্যাবিলিটি হিউরিস্টিক’ (বা সহজলভ্য তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা) তৈরি করতে পারে। সময়ের সাথে সাথে সেই প্রোপাগান্ডা আপনার কাছে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে এবং এমনকি বিশ্বাসযোগ্যও মনে হতে থাকে।”

সামাজিক মাধ্যমের ট্রেন্ড ব্যবহার করে কীভাবে এ ধরনের বিদ্বেষমূলক বক্তব্য নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে ছড়ানো এবং বিশ্বাস করানো হয়, তারও ব্যাখ্যা পাওয়া যায় এই গবেষণায়। গবেষক জেরার্ড প্রায়ার লিখেছেন, “কোনো নির্দিষ্ট ট্রেন্ড নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে কোনো ন্যারেটিভকে একটি ছোট গণ্ডি থেকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে সামাজিক মাধ্যম। এটি মূলত চারটি ধাপে কাজ করে: ১. এমন একটি গল্প তা যত অবিশ্বাস্যই হোক, আগ থেকেই মানুষের মনে ছিল; ২. একদল অন্ধ বিশ্বাসী মানুষ, যারা আগ থেকেই এই গল্প বিশ্বাস করার জন্য মুখিয়ে আছে; ৩. একদল দক্ষ এজেন্ট বা সাইবার যোদ্ধা (আইটি সেল) এবং ৪. স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করা প্রচুর পরিমাণ ভুয়া বা ‘বট’ অ্যাকাউন্ট।” 

আরো কিছু লেখা