নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্ট চেক পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও ছড়াচ্ছে তিন ভুয়া দাবিতে

পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও বিশ্ব ভ্রমণ করছে নানান দাবিতে 

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর সেটেলাররা ইসরায়েল ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এমন দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে একাধিক সামাজিক মাধ্যমে। সেখানে দেখা যায়, রাস্তায় অসংখ্য মানুষ ও গাড়ি একদিকে যাচ্ছে। সত্যতা যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। দেখা যায়, কোনো প্রতিবেদন ভিডিওটিকে ভারতের একটি পদযাত্রার ঘটনা বলছে, কোনো প্রতিবেদন আবার তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দৃশ্য হিসেবে দাবি করছে।

দাবিগুলোকে সত্য ধরে নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। বিভিন্ন সময়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি আসলে কোন ঘটনার দৃশ্য, তা যাচাই করতে গেলে ডিসমিসল্যাব দেখতে পায়, প্রচলিত কোনো দাবিই সত্য নয়। বরং ঘটনাটি ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের দৃশ্য। 

প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দৃশ্যের দাবি 

জনসমাগমের দৃশ্যটিকে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দৃশ্য হিসেবে দাবি করা হয়েছে সামাজিক মাধ্যম এক্সের একাধিক (, , , , ) পোস্টে। পোস্টগুলোতে অভিন্ন ক্যাপশন লিখে দাবি করা হয়, “তুরস্কে এরদোয়ানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অব্যাহত রয়েছে।” ২০২৫ সালের ২০ মার্চ অর্থাৎ একই দিনে এ পোস্টগুলো করা হয়েছিল। এছাড়া পোল্যান্ড-ভিত্তিক বিনোদন ওয়েবসাইট ডেমোটিওয়াটোরিতে ভিডিওটি এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলের দৃশ্য বলা হয়।

ফ্যাক্ট চেক পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও ছড়াচ্ছে তিন ভুয়া দাবিতে
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের দৃশ্য বলে দাবি।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ তুরস্কের প্রধান বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদ ইমামোগলুকে আটক করা হয়। সেদিন থেকেই বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের পদত্যাগের দাবি জানাচ্ছেন। সে সময়ের চলমান বিক্ষোভের দৃশ্য হিসেবে ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে প্রচলিত হতে শুরু করে, যা এখনো সামাজিক মাধ্যমে রয়ে গেছে।

ভিডিওটি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সঙ্গে সম্পৃক্ত না, এ বিষয়ে ২০২৫ সালে একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করে সিএনএন। 

মুম্বাইয়ের তিরাঙ্গা সংবিধান র‍্যালির দৃশ্যের দাবি

ভিডিওটি সর্বাধিকভাবে প্রচলিত হয়েছে ভারতের প্রেক্ষাপটে। দাবি করা হয়েছে, এটি বিজেপির এমএলএ নিতেশ রানে এবং ধর্মগুরু রামগিরি মহারাজের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের সাবেক সংসদ সদস্য ইমতিয়াজ জলিলের নেতৃত্বে “তিরাঙ্গা সংবিধান র‍্যালি” নামে পদযাত্রার দৃশ্য। এ দাবিতে ছড়িয়ে পড়া একাধিক (, , , , ) প্রতিবেদন এবং পোস্ট পাওয়া যায় ভারতের গণমাধ্যমে। ভারতের সংবাদমাধ্যম লোকসত্তার ২০২৪ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “এআইএমআইএ নেতা ইমতিয়াজ জলিলের নেতৃত্বে ছত্রপতি সম্ভাজীনগর থেকে মুম্বাই অভিমুখে শুরু হওয়া “তিরাঙ্গা সংবিধান র‍্যালি” মুম্বাইয়ের প্রবেশপথে পৌঁছেছে। মুলুন্দ টোল প্লাজায় পুলিশ এই পদযাত্রাটি আটকে দেয়।” 

একই দাবিতে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তথ্য যাচাইকারী সংস্থা রিউমর স্ক্যানার এ বিষয়ে ফ্যাক্ট চেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে একাধিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি ভুল দাবিতে প্রচারিত হবার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।

  • ফ্যাক্ট চেক পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও ছড়াচ্ছে তিন ভুয়া দাবিতে
  • ফ্যাক্ট চেক পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও ছড়াচ্ছে তিন ভুয়া দাবিতে

মূলত ২০২৪ সালে বিজেপির এমএলএ নিতেশ রানে এবং ধর্মগুরু রামগিরি মহারাজের বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের প্রতিবাদে অল ইন্ডিয়া মজলিস-এ-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন দলের সাবেক সংসদ সদস্য ইমতিয়াজ জলিলের নেতৃত্বে “তিরাঙ্গা সংবিধান র‍্যালি” নামে পদযাত্রা করে মুম্বাইয়ের অভিমুখে। ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ইমতিয়াজ জলিল এই পদযাত্রার ডাক দেন নিজের ফেসবুক পেজে পোস্ট দিয়ে। প্রায় ১২ হাজার মুসলিম এই পদযাত্রায় অংশ নেন। এ বিষয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে একাধিক (, ) আন্তর্জাতিক তথ্য যাচাইকারী সংস্থা। 

সাম্প্রতিক দাবি ইসরায়েলের সেটেলারদের জড়িয়ে

সম্প্রতি ভিডিওটি সামাজিক মাধ্যমে পুনরায় ছড়াতে দেখা যাচ্ছে, তবে এবার ভিন্ন দাবিতে। একাধিক সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র শান্তি আলোচনা ব্যর্থ হবার পরে ইসরায়েল ছেড়ে সেটেলারদের অন্যত্র চলে যাওয়ার দৃশ্য। এ দাবিতে একাধিক পোস্ট দেখা গেছে সামাজিক মাধ্যম এক্সে (, , , , ), ফেসবুকে (, , ) এবং ইনস্টাগ্রামেও। বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীরাও পোস্টগুলোতে ক্যাপশনে লিখছেন, “(মার্কিন-ইরানি) আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইসরায়েলি ভূখণ্ড থেকে লক্ষ লক্ষ বসতি স্থাপনকারীর এই দেশত্যাগ এক প্রকৃত আতঙ্কের প্রতিফলন। সবাই চরম উৎকণ্ঠায় রয়েছে, এবং জায়নবাদী সত্তা এমন এক বড় ধরনের সং*ঘাতের ভ*য়ে স্থবির হয়ে পড়েছে যা সে সহ্য করতে পারবে না। যু*দ্ধ শুরু হওয়ার আগেই সত্তাটি ভেতর থেকে ভেঙে পড়ছে” (বানান অপরিবর্তিত)। 

ফ্যাক্ট চেক পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও ছড়াচ্ছে তিন ভুয়া দাবিতে
‘ইসরায়েল ছেড়ে সেটেলারদের অন্যত্র চলে যাওয়ার দৃশ্য’ বলেও ছড়িয়েছে ভিডিওটি।

ভিডিওটির প্রকৃত উৎস কী

একেক সময়ে একেক দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির প্রকৃত উৎস যাচাই করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর ভ্রমণের দৃশ্য এটি। ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “পূর্ব তিমুরের ইতিহাসে এর আগে এমন কিছু কখনও দেখা যায়নি। আর সম্ভবত ভবিষ্যতেও কখনও দেখা যাবে না। এটি ছিল সর্বকালের বৃহত্তম জনসমাবেশ। ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের সময়, দেশটির রাজধানী দিলির তাসি তোলু-তে আয়োজিত পোপের প্রার্থনা সভায় অংশ নেওয়া এই বিশাল জনতা নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিলেন।”

ফেসবুকের একাধিক (, ) পোস্ট এবং এক্সেও পোপের সফর নিয়ে পোস্ট পাওয়া যায়। প্রতিটি পোস্টেই একই ভিডিও পাওয়া যায় এবং ভিডিওর ১৩ থেকে ১৬ সেকেন্ডের মধ্যে পোপ ফ্রান্সিসের ছবি সম্বলিত দুটি বিলবোর্ড দেখতে পাওয়া যায়। উল্লেখ্য, প্রচলিত সব দাবিতে এ বিলবোর্ডটি ঘোলা করে দেওয়া হয়েছিল।

ইউটিউবে ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের চ্যানেলে একটি ভিডিও পাওয়া যায়, যেখানে পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। এই ভিডিওটির শুরুর ২ সেকেন্ডে পোপ ফ্রান্সিসের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড দুটি দেখা যায়।

ফ্যাক্ট চেক পোপ ফ্রান্সিসের পূর্ব তিমুর সফরের ভিডিও ছড়াচ্ছে তিন ভুয়া দাবিতে
মূল ঘটনা নিয়ে ফেসবুক পোস্ট এবং ইউটিউব ভিডিওর স্ক্রিনশট।

এছাড়াও, পোপ ফ্রান্সিসের তিমুর সফরের দাবিতে প্রচলিত ভিডিওটি অন্যান্য সব দাবির অনেক আগে থেকেই সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে পাওয়া যায়।

কোনো পুরোনো তথ্য বারবার বিভিন্ন মিথ্যা দাবিতে ফিরে আসাকে গবেষকরা “জম্বি ফ্যাক্টস” হিসেবে অভিহিত করেছেন। ব্লুমবার্গের সাংবাদিক লেসলি প্যাটন “জম্বি ফ্যাক্টস” কথাটি উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ হলো এমন কিছু ভুল তথ্য যা ডিবাংক বা মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ার পরেও আমাদের চেতনায় টিকে থাকে। এর কারণ হতে পারে, আমরা হয়তো সংশোধনীগুলো দেখিনি অথবা প্রাথমিক সংবাদটি আমাদের মনে যে ভয়ের সৃষ্টি করেছিল, তা মনের গভীরে এমনভাবে গেঁথে গেছে, পরবর্তীতে তা উপড়ে ফেলা কঠিন। 

আরো কিছু লেখা