মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্ট চেক সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার

সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের দৃশ্য দাবিতে সম্প্রতি একটি ছবি একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ব্যবহার হতে দেখা গেছে। পোস্ট করা হয়েছে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকেও। ফলে পাঠক ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ছবিটির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ছবিটি আসল নাকি এআই সৃষ্ট, তা যাচাই করে ডিসমিসল্যাব। এতে দেখা যায়, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রের একটি পুরোনো আলোকচিত্র এআই দিয়ে সম্পাদনা করে আলোচিত ছবিটি বানানো হয়েছে।

বাংলাদেশভিত্তিক একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ছবিটি কোনো প্রকার ডিসক্লেইমার ছাড়াই ব্যবহার হতে দেখা যায়। সংবাদমাধ্যমগুলো হলো— ‘ইত্তেফাক’, ‘দৈনিক সংগ্রাম’, ‘কালের দিগন্ত’, ‘দৈনিক সরেজমিন’, ‘দৈনিক সবুজ বাংলাদেশ’, ‘ঢাকা জার্নাল’, ও ‘তরুণ কন্ঠ’। 

সামাজিক মাধ্যমের একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকেও রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দৃশ্য দাবিতে ছবিটি পোস্ট করা হয় (, , , )।

  • ফ্যাক্ট চেক সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার
  • ফ্যাক্ট চেক সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার

সত্যতা যাচাইয়ের প্রথম ধাপে ছবিটি রিভার্স সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে কাছাকাছি দৃশ্যের একটি ছবি খুঁজে পাওয়া যায় ‘উইকিমিডিয়া কমনস’ নামের একটি ওয়েবসাইটে। ছবিটি সে ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ৩ জুলাই আপলোড করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ছবির মালিক হিসেবে ‘সানভি আহম্মেদ সাইম’ নামের একজন ব্যক্তির নাম দেওয়া। অধিকতর যাচাইয়ে ‘সানভি আহম্মেদ সাইম’- এর ফেসবুক প্রোফাইলে গিয়ে দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩ জুলাই ছবিটি তার অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। ছবিটি গত ২৮ এপ্রিল পুনরায় তিনি পোস্ট করেন এবং ক্যাপশনে কপিরাইটে নিজের নাম উল্লেখ করেন। 

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ব্যবহৃত আলোচিত ছবিটির সঙ্গে ‘সানভি আহম্মেদ সাইম’- এর প্রোফাইল থেকে পোস্ট হওয়া ছবির তুলনা করে কিছু মিল পাওয়া যায়। উভয় ছবিতেই ফ্রেমের অবস্থান প্রায় এক, যেখানে চারটি বিশালাকার কুলিং টাওয়ার আছে। ছবির সামনের অংশে থাকা লোহার কাঠামোর সেতু এবং নিচের জলাশয় উভয় ছবিতে প্রায় অপরিবর্তিত অবস্থানে আছে। দুইটি ছবিতেই সেতুর আটটি স্প্যান দেখা যায়। আবার উভয় ছবিতে জলাশয়ে পড়া সেতুর আলোর প্রতিফলনও দেখা যায়। তবে ছবি দুটির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মিল হলো, দুটি ছবিতে প্রায় একইরকম দেখতে একটি চাঁদ বা সূর্য, যা কুলিং টাওয়ার থেকে একই দূরত্বে অবস্থানে করছে। 

ফ্যাক্ট চেক সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার
উইকিমিডিয়া কমনসে পাওয়া ছবি (বামে) এবং সানভি আহম্মেদ সাইমের ফেসবুক পোস্টের (ডানে) স্ক্রিনশট।

তবে মূল ছবিতে কুলিং টাওয়ারগুলো থেকে কোনো ধরনের ধোঁয়া বা বাষ্প বের হতে দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে, সংবাদ প্রতিবেদনে থাকা আলোচিত ছবিতে তিনটি কুলিং টাওয়ারের ওপর দিয়েই বিশাল আকারের সাদা ধোঁয়া বা জলীয় বাষ্প মেঘের মতো উড়তে দেখা যাচ্ছে। 

মূল ছবিতে আকাশে হালকা নীলাভ-বেগুনি আভা রয়েছে ও মেঘের উপস্থিতি অতটা স্পষ্ট নয়। কিন্তু আলোচিত ছবিতে থাকা আকাশে গাঢ় বেগুনি রঙের স্তরযুক্ত মেঘের উপস্থিতি দৃশ্যমান। এছাড়া মূল ছবিতে লালচে রঙের চাঁদের পরিষ্কার বৃত্তাকার অবয়ব দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আলোচিত ছবিতে সেটিকে মেঘের আড়ালে থাকা একটি উজ্জ্বলতর এবং অপেক্ষাকৃত ছোট আলোকপিণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে।

মূল ছবিতে বিষয়বস্তুর রং স্বাভাবিক হলেও আলোচিত ছবিটি দেখতে তুলনামূলক বেশি উজ্জ্বল। বেগুনি ও গোলাপি রঙের অতিরিক্ত আভা ছবিটিকে বেশি আকর্ষণীয় ও জমকালো করেছে। মূল ছবিতে অপেক্ষাকৃত প্রাকৃতিক ও নিষ্প্রভ।

সাধারণত, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কুলিং টাওয়ার থেকে যে সাদা মেঘ সদৃশ বাষ্প নির্গত হতে দেখা যায়, তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের মূল পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু হয়েছে গত ২৮ এপ্রিল, এবং এই কার্যক্রম শেষ হতে প্রায় ৪৫ দিন লাগবে। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি কলামে লেখা হয়, “ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হতে এক থেকে দেড় মাস সময় লাগতে পারে। এরপর রিঅ্যাক্টর কোরে নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া শুরু করার আগে কন্ট্রোল রড, জরুরি শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং অন্যান্য নিরাপত্তাব্যবস্থা আবার পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। সব পরীক্ষা সফল হলে রিঅ্যাক্টরটির মোট ৩২০০ মেগাওয়াট তাপীয় ক্ষমতার মাত্র ১ শতাংশ সক্ষমতায় প্রথম নিয়ন্ত্রিত ফিশন বিক্রিয়া সংঘটিত হবে। এটিকে বলা হয় রিঅ্যাক্টর ক্রিটিক্যালিটি টেস্ট। এই পর্যায়ে রিঅ্যাক্টর প্রথমবারের মতো ‘প্রাণ’ পাবে।” কলামটি লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম।

ফ্যাক্ট চেক সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার
মূল ছবি (বামে) এবং ছড়িয়ে পড়া ছবির (ডানে) মধ্যে তুলনা।

বিদ্যুৎ উৎপাদন পর্যায়ে যাওয়ার আগে কুলিং টাওয়ার থেকে জলীয়বাষ্প বা ধোয়া নির্গত হওয়া সম্ভব কি না জানতে চেয়ে মো. শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “এখন তো ফুয়েল লোড মাত্র শুরু হয়েছে। তাই এটা কখনো সম্ভব না। কারণ জ্বালানি স্থাপন করার পরেও অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা আছে। জ্বালানি স্থাপন করতেই আরও এক দেড় মাস লাগবে। ফলে কুলিং টাওয়ারে বাষ্প বের হওয়ার যে দৃশ্য, এখন এটা দেখার কোনো সুযোগই নাই।”

এছাড়া আলোচিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে তিনটি কুলিং টাওয়ার থেকে জলীয় বাষ্প বের হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, “অনেক দেশে একটি ইউনিটের বিপরীতে একটি কুলিং টাওয়ার করে। এটা নির্ভর করে ডিজাইনের উপর। আমাদের এখানেও একটা রিয়্যাক্টরের জন্য দুইটা কুলিং টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। দুইটা ইউনিটের জন্য মোট চারটা কুলিং টাওয়ার আছে। আপাতত একটি ইউনিটে জ্বালানি লোড করা হচ্ছে। মানে এটি চালু হওয়ার পর দুইটি কুলিং টাওয়ার থেকে জলীয়বাষ্প বের হতে দেখা যাবে। সেখানে এখনই তিনটি টাওয়ার থেকে জলীয়বাষ্প বা ধোঁয়া বের হওয়ার সুযোগ নেই।”

অথচ সংবাদ প্রতিবেদন ও সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা যাচ্ছে, তিনটি কুলিং টাওয়ার থেকেই তীব্র মাত্রায় ধোঁয়া সদৃশ কিছু বের হচ্ছে।

আলোচিত ছবিটি বাস্তব নাকি মূল ছবির এআই সম্পাদিত রূপ, তা নিশ্চিত হতে এআই শনাক্তকরণ টুল হাইভ ‘মডারেশন’ ও ‘সাইট ইঞ্জিন’ দিয়ে পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে ‘সাইটইঞ্জিন’ জানায় ছবিটি এআই সৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ৯৮ শতাংশ। হাইভ মডারেশন জানায়, ছবিটি এআই নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা ৮৬ দশমিক ২ শতাংশ। 

ফ্যাক্ট চেক সংবাদমাধ্যমে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের এআই সম্পাদিত ছবি, নেই ডিসক্লেইমার
সাইট ইঞ্জিন এবং হাইভ মডারেশনের বিশ্লেষণ।

অর্থাৎ, সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দাবিতে যে ছবিটি প্রচারিত হচ্ছে, সেটি সানভি আহম্মেদ সাইম নামের একজন আলোকচিত্রীর ২০২৩ সালে ধারণ করা ছবি এআই দিয়ে সম্পাদিত করে বানানো হয়েছে। 

ছবিটি এআই দিয়ে সম্পাদনা করে প্রকাশের আগে অনুমতি নেওয়া হয়েছে কি না জানতে আলোকচিত্রী সানভি আহম্মেদ সাইম- এর সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি জানান, “আমার কাছ থেকে কোনো প্রকার অনুমতি নেওয়া হয়নি।” তিনি ডিসমিসল্যাবকে আরও বলেন, “আমি আসলে একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার। এই ছবিটা নিয়ে আমার একটা পরিকল্পনা ছিল, প্রত্যাশা ছিল। ছবিটাও একটা ভালো ছবি ছিল। কিন্তু পরে দেখলাম একটা বিশেষ সময়ে সবাই এটা এআই দিয়ে এডিট করে ব্যবহার করছে। এটা আমার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি বেশ হতাশ হয়েছি।” 

প্রসঙ্গত, পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে গত ২৮ এপ্রিল বিকেলে আনুষ্ঠানিকভাবে ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানি প্রবেশ (ফুয়েল লোডিং) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামসহ দেশি-বিদেশি অতিথিদের উপস্থিতিতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করেছে। 

আরো কিছু লেখা