
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম “আলোচনায়” রয়েছে— এমন দাবিতে সম্প্রতি বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তবে ডিসমিসল্যাবের পর্যবেক্ষণে, এমন দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্র পাওয়া যায়নি।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রক্রিয়ায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম নেই এবং বাংলাদেশ বা অন্য কোনো দেশের সরকারের পক্ষ থেকেও এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়ার তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এছাড়া, অলিখিত আঞ্চলিক রোটেশন নীতি অনুযায়ী ২০২৬ সালে এশিয়া থেকে কারও মহাসচিব হওয়ার সম্ভাবনা কম। এখন পর্যন্ত লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকা থেকে পাঁচজন প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত হয়েছেন।
চলতি বছরের জুন মাসে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম জাতিসংঘের মহাসচিব পদে ড. ইউনূসের নাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ইত্তেফাক গত ৬ জুন “জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে কি দেখা যেতে পারে ড. ইউনূসকে?” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বলা হয়, “সেই আলোচনায় নোবেলজয়ী ও বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও অনানুষ্ঠানিকভাবে উঠে এসেছে।” সূত্র হিসেবে প্রতিবেদনটির কোথাও কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বিদেশি গণমাধ্যমের উল্লেখ নেই।
আমাদের সময় “আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন গুঞ্জন, জাতিসংঘ মহাসচিব পদে ড. ইউনূসের নাম!” শিরোনামে একই দিন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনটির শেষাংশে ক্ষুদ্র অক্ষরে লেখা হয়েছে “উৎস: দেশ রূপান্তর” — অর্থাৎ এটি মূলত আরেকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেরই পুনঃপ্রকাশ, নিজস্ব প্রতিবেদন নয়।
দেশ রূপান্তর ৬ জুন “জাতিসংঘ মহাসচিব ইস্যুতে ফের আলোচনায় ড. ইউনূস!” শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয় ড. ইউনূসের “আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা” তাকে “আলোচিত নাম” করে তুলেছে, তবে এই “আলোচনা” কোথায়, কাদের মধ্যে হচ্ছে- তার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।

এনপিবি নামের একটি সংবাদমাধ্যম নিজেদের ফেসবুক পেজে একই বিষয় নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে ক্যাপশনে লিখেছে, “জাতিসংঘ মহাসচিব হতে যাচ্ছেন ড. ইউনূস!” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া এসেছে ৬০ হাজারের অধিক। এছাড়া শেয়ার হয়েছে দুই হাজারের বেশি বার।
এছাড়া, বাংলাদেশ টাইমস, দৈনিক চট্টলার খবর, দ্য ঢাকা ডায়েরি, বাণিজ্য সংবাদ এবং বাহান্নো নিউজ-সহ আরও বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে একই ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। দৈনিক আমার দেশ এ বিষয়ে ইউটিউবে একটি ভিডিও প্রকাশ করে ড. ইউনূসের মহাসচিব হওয়ার “সম্ভাবনা” নিয়ে আলোচনা করেছে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনগুলোতে দাবি করা হয়েছে, ড. ইউনূস জাতিসংঘের মহাসচিব পদের জন্য সক্রিয়ভাবে বিবেচিত হচ্ছেন। কিন্তু কয়েকটি প্রতিবেদনের ভেতরেই এমন তথ্য রয়েছে, যা এই ধারণাটিকে দুর্বল করে দেয়।
যেমন, ইত্তেফাক ও দেশ রূপান্তরসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আঞ্চলিক রোটেশনের নিয়ম অনুযায়ী এবার লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার পালা এবং এশিয়া থেকে প্রার্থীর সম্ভাবনা কম। এই তথ্যটি প্রতিবেদনের মাঝামাঝি অংশে কয়েক লাইনে থাকলেও শিরোনাম বা শুরুতে উল্লেখ করা হয়নি।
এছাড়া, প্রতিবেদনগুলোতে ব্যবহৃত সূত্রগুলো অস্পষ্ট। “কূটনৈতিক সূত্র” বা “আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গুঞ্জন” বলা হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা বিদেশি গণমাধ্যমের বরাত নেই।
আবার, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোতে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের জুনে। অথচ জাতিসংঘে মনোনীত প্রার্থীদের সঙ্গে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর সরাসরি সম্প্রচারিত ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগ গত এপ্রিলে সম্পন্ন হয়ে গেছে।
জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন প্রক্রিয়া ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর শুরু হয়। ইউএন নিউজ-এর তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত পাঁচ জন প্রার্থী আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত হয়েছেন। তারা হলেন, মিশেল ব্যাশেলে (চিলি), রাফায়েল গ্রোসি (আর্জেন্টিনা), রেবেকা গ্রিনস্প্যান (কোস্টারিকা), ম্যাকি সাল (সেনেগাল) এবং মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা (ইকুয়েডর)। মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসাকে ২০২৬ সালের ১২ মে মনোনয়ন দিয়েছে অ্যান্টিগা ও বার্বুডা। এছাড়া, মালদ্বীপ থেকে মনোনয়ন পাওয়া ভার্জিনিয়া গাম্বা গত ২৫ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।

ইউএন নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২১-২২ এপ্রিল তখন পর্যন্ত মনোনীত চার প্রার্থী জাতিসংঘের ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল চেম্বারে সরাসরি সম্প্রচারিত ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগে অংশ নিয়েছেন। পরবর্তী ধাপে ২০২৬ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ বন্ধ দরজায় প্রার্থীদের বিষয়ে আলোচনা করবে এবং সাধারণ পরিষদে সুপারিশ পাঠাবে। নতুন মনোনয়নের জন্য কোনো চূড়ান্ত আইনি সময়সীমা না থাকলেও, নিরাপত্তা পরিষদ ইতোমধ্যে প্রার্থী বিবেচনার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
ডিসমিসল্যাব প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে কোনো নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, জাতিসংঘের ওয়েবসাইট বা কোনো দেশের সরকারি ওয়েবসাইটে ড. ইউনূসকে মহাসচিব পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করা কোনো তথ্য খুঁজে পায়নি। এছাড়া, বিষয়টি নিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েট প্রেস এবং সংবাদমাধ্যম ফোর্বস– এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে ডা. ইউনূসের নাম কোথাও উল্লেখ করা হয়নি।
জাতিসংঘের মহাসচিব পদে ড. ইউনূসকে “আলোচনায়” দেখানোর এমন প্রবণতা নতুন নয়। ২০২৫ সালের অক্টোবরেও বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর। তখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন তিনি। বণিক বার্তা ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধান উপদেষ্টার তৎকালীন প্রেস সচিব শফিকুল আলম সরাসরি বলেছিলেন, “এটা পুরোটাই রিউমার, এটার কোনো ভিত্তি নেই।” দেশ রূপান্তরের অক্টোবরে প্রকাশিত প্রতিবেদনেও বিষয়টির উল্লেখ আছে।
সেই সময় থেকে আজ পর্যন্ত— অর্থাৎ মনোনয়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়া ও ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগ সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত— বাংলাদেশের তরফে কোনো আনুষ্ঠানিক মনোনয়নের তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি।
সিকিউরিটি কাউন্সিল রিপোর্ট -এর বিশ্লেষণ এবং ইউএনআরআইসি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫৩ সাল থেকে জাতিসংঘে একটি অলিখিত আঞ্চলিক রোটেশন রীতি চলে আসছে, যার আলোকে বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল পর্যায়ক্রমে মহাসচিব পদে প্রার্থী দিয়ে থাকে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সর্বশেষ মহাসচিব ছিলেন দক্ষিণ কোরিয়ার বান কি মুন, যিনি ২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর ইউরোপীয় অঞ্চল থেকে পর্তুগালের আন্তোনিও গুতেরেস ২০১৭ সাল থেকে দায়িত্বে রয়েছেন। এই ক্রমধারা অনুযায়ী এবার লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার পালা— এবং মনোনীত পাঁচ প্রার্থীর সবাই এই দুই অঞ্চল থেকেই এসেছেন।
তবে পরবর্তী মহাসচিব রোটেশন মেনে হতে হবে, এমন কোনো আইন নেই বলেও উল্লেখ করেছে জাতিসংঘ।
জাতিসংঘ সনদের ১৫তম অধ্যায়ের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ মহাসচিবকে নিয়োগ দেয়। জাতিসংঘের সরকারি ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, সাধারণ পরিষদের সর্বশেষ প্রস্তাব ‘৭৯/৩২৭ (২০২৫)’-এর মাধ্যমে এই নির্বাচনের রূপরেখা নির্ধারণ করা হয়েছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি মূলত কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপে সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিরা যৌথ চিঠির মাধ্যমে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর কাছে প্রার্থী মনোনয়নের আহ্বান জানান। এক্ষেত্রে মাত্র একটি দেশের সমর্থন পেলেই কোনো ব্যক্তি প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হতে পারেন। এরপর মনোনীত প্রার্থীরা সাধারণ পরিষদের সামনে একটি মতবিনিময় পর্বে (ইন্টারেক্টিভ ডায়ালগ) অংশ নেন, যা বিশ্বজুড়ে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।
তবে নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত ধাপটি হলো নিরাপত্তা পরিষদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক। সেখানে গোপন ভোটাভুটির মাধ্যমে প্রার্থীদের যাচাই-বাছাই করা হয়। নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্যরাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন) যেকোনো একটি দেশ ‘ভেটো’ দিলে সেই প্রার্থীর নাম সরাসরি বাতিল হয়ে যায়। অর্থাৎ, চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হতে হলে একজন প্রার্থীকে অবশ্যই এই পাঁচ সদস্যরাষ্ট্রের সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে। নিরাপত্তা পরিষদের এমন চূড়ান্ত সুপারিশের পরই সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন মহাসচিব নিয়োগ দেয়।
সুতরাং, জাতিসংঘের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মহাসচিব পদের আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতায় পাঁচ জন প্রার্থী রয়েছেন— যারা সবাই সবাই লাতিন আমেরিকা বা আফ্রিকার। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম জাতিসংঘের কোনো নথিতে নেই এবং বাংলাদেশ সরকার তাকে মনোনীত করেছেন; এমন কোনো আনুষ্ঠানিক পদক্ষেপের তথ্যও এখন পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যখন প্রথম এই জল্পনা ছড়িয়েছিল, তখনই প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এটিকে “রিউমার” বলে নাকচ করে দেওয়া হয়েছিল।
এছাড়া, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা ও সংবাদ মাধ্যমে জাতিসংঘের মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ডা. ইউনূসের নাম উল্লেখ নেই। অর্থাৎ, জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব পদে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম “আলোচনায়” থাকার দাবিতে প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের তথ্যটি ভিত্তিহীন।