
ইরানের হামলায় হাইফা শহর ধ্বংস হয়েছে বলে ধানমণ্ডি ৩২-এর ছবি পোস্ট করেছে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়— এমন দাবিতে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রিউমর স্ক্যানারকে সেই ফ্যাক্টচেকের সূত্র দেখিয়ে ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে সংবাদমাধ্যম ঢাকা ট্রিবিউন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, প্রতিবেদনটি তথ্যযাচাইকারী প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার প্রকাশ করেনি।
বরং, রিউমর স্ক্যানারের আদলে বানানো ‘রিউমর স্ক্যামার’ নামের একটি স্যাটায়ার ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইট থেকে এমন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। স্যাটায়ার পেজটি থেকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যে পোস্টের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে, সেই পোস্টটিও ভুয়া।
ঢাকা ট্রিবিউনের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে আজ ১৯ এপ্রিল একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। কার্ডের শিরোনামে লেখা হয়, “ ‘ধানমন্ডি ৩২’ এর ছবি আপলোড দিয়ে ইসরায়েলের দাবি ইরানের হা*মলায় হাইফা শহর ধ্বংস হয়ে গেছে।” ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই পোস্টে দেখা যায়, একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনের ছবি ব্যবহার করে ইরানের হামলায় বেসামরিক এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির দাবি করা হচ্ছে। পোস্টটি দ্রুত ভাইরাল হয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে। তবে ছবিটি যাচাই করে দেখা যায়, এটি হাইফার নয় এবং সাম্প্রতিক কোনো ইরান-ইসরাইল সংঘাতের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট নয়।”
ঢাকা ট্রিবিউনের ফটোকার্ডের উপর রিউমর স্ক্যানারের লোগো দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ঢাকা ট্রিবিউনের ইনস্টাগ্রাম পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া এসেছে ২০০- এর অধিক। সংবাদমাধ্যমটি নিজেদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজেও একই ফটোকার্ড পোস্ট করেছিল। তবে পরবর্তীকালে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম- দুইটি সামাজিক মাধ্যম থেকেই তারা পোস্ট সরিয়ে নেয়।
অন্যদিকে, আমেরিকা বাংলা নামের একটি সংবাদমাধ্যমেও একই ফ্যাক্টচেক নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। আবার ‘দুরবিন নিউজ’ নামের একটি সংবাদমাধ্যমও নিজেদের ফেসবুকে পেজ থেকে এমন ফটোকার্ড পোস্ট করেছে। তবে সেখানে রিউমর স্ক্যামার বা রিউমর স্ক্যানার কাউকেই সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি।
সত্যতা যাচাইয়ে দেখা যায়, ‘রিউমর স্ক্যামার’- নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনটি পোস্ট করা হয়েছে। পোস্টের ক্যাপশনে ডিসক্লেইমার দেওয়া আছে, এটি একটি স্যাটায়ার পোস্ট। ক্যাপশনটি অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “এই পোস্টটি ব্যঙ্গাত্মক এবং শুধু বিনোদনের উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি কোনো যাচাইকৃত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে নয়। বাস্তব কোনো ঘটনা বা ব্যক্তির সাথে এর কোনো সাদৃশ্য সম্পূর্ণ কাকতালীয়।” ‘রিউমর স্ক্যামার’ পেজটি বায়োতেও নিজেকে স্যাটায়ার বা প্যারোডি পেজ হিসেবে পরিচয় দেয়। তবে নাম ভিন্ন হলেও ‘রিউমর স্ক্যামার’- এর ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে থাকা লোগো ও ফটোকার্ড তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘রিউমর স্ক্যানার’-এর আদলে তৈরি।
এছাড়া, ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেজ থেকে ধানমন্ডি ৩২ এর বিখ্যাত বাড়ির ছবি দিয়ে প্রকাশিত কোনো পোস্ট খুঁজে পাওয়া যাওয়া যায়নি। তবে ‘রিউমর স্ক্যামার’ যে ফেসবুক পোস্ট দেখিয়ে ব্যঙ্গাত্মক ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করেছে, সেই পোস্টে থাকা হুবহু একই ক্যাপশন দিয়ে গত ৬ এপ্রিল ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পেজ থেকে একটি পোস্ট আপলোড করা হয়েছিল।
পোস্টের ক্যাপশনে লেখা আছে, “হাইফার একটি আবাসিক এলাকায় ইরানের একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে ২ জন নিহত এবং একটি শিশুসহ ৪ জন আহত হন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও দুজন নিখোঁজ রয়েছেন। এটি কোনো সামরিক লক্ষ্যবস্তু ছিল না। ইরানি শাসকগোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে, যা তাদের যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করছে।” তবে, সেখানে ধানমন্ডি ৩২ এর কোনো ছবি ব্যবহার করা হয়নি। পোস্টের এডিট হিস্ট্রিতেও কোনো মিডিয়া ফাইল পরিবর্তনের নজির পাওয়া যায়নি।
অর্থাৎ, ঢাকা ট্রিবিউন ‘রিউমর স্ক্যামার’-কে ‘রিউমর স্ক্যানার’ ভেবে নিজেদের সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া ফ্যাক্টচেকের ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে।

এ বিষয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে পাঠকদের প্রতি রিউমর স্ক্যানারের বার্তা কী, তা জানতে চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির গবেষণা প্রধান সায়েম হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি বলেন, “এই পেজের সাথে আমাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। আমাদের দুইটা অফিসিয়াল গ্রুপ আছে। একটি ইংরেজিতে আরেকটি বাংলায়। আর আমাদের একটি ভেরিফায়েড পেজ আছে। এই তিন প্ল্যাটফর্ম আর আমাদের ওয়েবসাইট ছাড়া, আমরা অন্য কোনো জায়গা থেকে কিছু প্রকাশ করি না। ফলে কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে নামটা ভালোভাবে খেয়াল করে শেয়ার করার অনুরোধ থাকবে।”