
বিবিসি ২১ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করছে জানিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিবেদনে সূত্র হিসেবে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গার্ডিয়ানের মূল প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বিবিসির বিশ্বব্যাপী মোট কর্মী সংখ্যাই ২১ হাজার ৫০০। এর মধ্যে প্রায় ১০ শতাংশ, অর্থাৎ সর্বোচ্চ ২,০০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংবাদমাধ্যম ‘আমার দেশ’-এর একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয়, “২১ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করছে বিবিসি।” প্রতিবেদনটির শুরুতেই লেখা হয়, “ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন বা বিবিসি ২১ হাজার ৫০০ জন কর্মীকে ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিয়েছে। এই সংখ্যা বিবিসির মোট কর্মীর ১০ শতাংশ। এর আগে ২০১১ সালে একবার এমন বিপুল কর্মী ছাঁটাই হয়েছিল। তারপর ২০২৫ সাল পর্যন্ত এত বড় আকারে ছাঁটাই বিবিসিতে হয়নি।”
একইভাবে ‘ঢাকা টাইমস’ শিরোনাম করেছে, “অর্থনৈতিক চাপে ২১ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাই করছে বিবিসি।” সংবাদমাধ্যম ‘ভোরের কাগজে’ও প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম দেওয়া হয়েছে, “বিবিসিতে ২১ হাজারের বেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘোষণা।” তাদের মূল প্রতিবেদনের শুরুতেও একই কথা লেখা হয়।

এছাড়া, ‘দৈনিক বাংলা’, ‘প্রতিফলন’, ‘বাংলাদেশের খবর’, ‘সকালের সময়’, ‘দেশে বিদেশে’ ‘আগামীর সময়’ ও নিউজ বাংলা টোয়েন্টিফোর– এর মতো সংবাদমাধ্যমেও একই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদনেও সূত্র হিসেবে দ্য গার্ডিয়ানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সত্যতা যাচাইয়ের জন্য দ্য গার্ডিয়ানের মূল প্রতিবেদনটি পড়ে দেখা যায়, সেখানে ২১ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের কোনো তথ্য নেই। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে থাকা প্রথম ও দ্বিতীয় প্যারার বাংলা অনুবাদ অনুযায়ী, “সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসি গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় কর্মী সংকোচনের অংশ হিসেবে প্রায় ২,০০০ চাকরি ছাঁটাই করতে যাচ্ছে। বুধবার বিকেলে সর্বস্তরের কর্মীদের নিয়ে আয়োজিত এক সভায় এই ছাঁটাইয়ের কথা জানানো হয়। এর ফলে বিবিসির ২১ হাজার ৫০০ কর্মীর প্রায় ১০ শতাংশ চাকরি হারাবেন।”
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, আগামী মাসে গুগলের সাবেক শীর্ষ নির্বাহী ম্যাট ব্রিটিন বিবিসির নতুন মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। তার দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বুধবার সর্বস্তরের কর্মীদের এক সভায় ছাঁটাইয়ের এই কথা জানানো হয়। আর্থিক চাপ মোকাবিলায় এবং আয়-ব্যয়ের ক্রমবর্ধমান ব্যবধান কমাতে আগামী দুই বছরে অতিরিক্ত ৫০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের অংশ হিসেবে বিবিসি এই পদক্ষেপ নিচ্ছে।

এছাড়া, একই বিষয়ে বিবিসি থেকেই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এতে জানানো হয়েছে যে, ‘তীব্র আর্থিক সংকট’ মোকাবিলায় বিবিসি তাদের ১,৮০০ থেকে ২,০০০ জন কর্মী বা প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করার পরিকল্পনা করছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগামী দুই বছরে প্রতিষ্ঠানটিকে ৫০ কোটি পাউন্ড সাশ্রয় করতে হবে। বিবিসির অন্তর্বর্তীকালীন মহাপরিচালক রড্রি টালফান ডেভিস জানিয়েছেন, এই বিশাল অঙ্কের সাশ্রয় করতে গিয়ে বড় এবং কঠিন কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে, যার মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু চ্যানেল বা পরিষেবা বন্ধ করার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, উচ্চ উৎপাদন মুদ্রাস্ফীতি, লাইসেন্স ফি থেকে আয় কমে যাওয়া এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতার কারণে বিবিসির ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। ইউনিয়নগুলো এই পদক্ষেপকে বিবিসির ভবিষ্যৎ এবং মানসম্পন্ন সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও হতাশাজনক বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আগামী ১৮ মে থেকে গুগলের সাবেক নির্বাহী ম্যাট ব্রিটিন বিবিসির নতুন মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
অর্থাৎ, দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে থাকা বিবিসির ‘মোট কর্মী’র সংখ্যাকে (২১,৫০০) বাংলাদেশ-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমগুলো ‘ছাঁটাই হওয়া কর্মী’র সংখ্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। একই সাথে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ২১ হাজার ৫০০ জন কর্মীকে মোট কর্মীর ১০ শতাংশ বলা হয়, যা দ্য গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদনে থাকা তথ্য অনুযায়ী সঠিক নয়।