সৌদি আরবের জেদ্দায় পেট্রোলিয়াম ও গ্যাস কোম্পানি আরামকোর একটি স্থাপনা ২০২২ সালে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলায় জ্বলছে – এই ছবি গত ৬ মাসে দুটি ভিন্ন ঘটনার প্রতিবেদনে ব্যবহার করেছে দেশি-বিদেশি বেশ কয়েকটি সংবাদমাধ্যম। ছবিটি ব্যবহার করা হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশিত একটি মতামতেও।
গত ৭ সেপ্টেম্বর “সৌদি আরামকোর তেল স্থাপনায় ফের ভয়াবহ হামলা” শিরোনামে দৈনিক মানবকণ্ঠের প্রতিবেদনে লেখা হয়, “সৌদি আরবের জিজান শহরে রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর একটি তেল স্থাপনায় ফের হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) হামলাটি হয়েছে।”

হামলাটি ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি জিজান শহরে হলেও মানবকণ্ঠ ব্যবহার করেছে চার বছরেরও বেশি সময় আগে জেদ্দার ওই ঘটনার ছবি।
গত ৮ সেপ্টেম্বর একই শিরোনাম ও একই ছবি দিয়ে ফেসবুকে ফটোকার্ড প্রকাশ করে দৈনিক মানবজমিনের ভেরিফায়েড পেজ।
একই ছবি প্রায় প্রায় এক মাস আগে ব্যবহার করা হয়েছিল সৌদি আরবের রিয়াদে একটি আসবাব কারখানায় আগুন লেগে ১৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশি নিহত হওয়ার সংবাদে।
এই ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে আরামকোতে হামলায় অগ্নিকাণ্ডের ছবি ব্যবহার করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে – বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) , দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, স্টার নিউজ, দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দ্য ডেইলি অবজারভার, সময়ের আলো, ডিবিসি নিউজ, আরটিভি, এটিএন নিউজ, দৈনিক ইত্তেফাক, ঢাকা পোস্ট, জাগো নিউজ টোয়েন্টিফোর, সারাবাংলা ডটনেট, বার্তা টোয়েন্টিফোর, টাইমস টুডে ও এশিয়া পোস্ট।
এই ঘটনার প্রতিবেদনেও একই ছবি ব্যবহার করে ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “16 Bangladeshi Workers Killed In Fire At Saudi Furniture Factory”। এই প্রতিবেদনে আরামকোর অগ্নিকাণ্ডের ওই ছবি ব্যবহার করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “The fire broke out on Sunday in the Musa Sanaiya industrial area”। একই ঘটনার প্রতিবেদনে এই ছবি ব্যবহার করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়াও।

এর আগে গত ১২ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর মতামত বিভাগে “ইরানে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ যেভাবে ভূরাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিল” শিরোনামে একটি কলাম প্রকাশিত হয়। এই লেখাতেও জেদ্দার আরামকো তেল স্থাপনার ছবিটি ব্যবহার করা হয়। ছবির ক্যাপশনে লেখা, “ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রভাব আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ছবি: রয়টার্স।” অর্থাৎ ২০২২ সালের একটি ছবি ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে। অথচ, ২০২৪ সালের আগে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাত নয়, পরোক্ষ ও ছায়াযুদ্ধ চলছিল। এবং পুরো লেখায় কোথাও সৌদি আরবের কথা উল্লেখ নেই।
ছবিটি নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব প্রথমে রয়টার্সের একটি প্রতিবেদনে এটি খুঁজে পায়। “Saudi Aramco petroleum storage site hit by Houthi attack, fire erupts” শিরোনামের প্রতিবেদনটি ২০২২ সালের ২৬ মার্চ প্রকাশিত হয়। একই ছবি পাওয়া যায় আল জাজিরার ২৫ মার্চ ২০২২ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে, যার শিরোনাম “Saudi Aramco’s Jeddah oil depot hit by Houthi attack”। সেখানে ছবির ক্যাপশনে লেখা, “Smoke billows from a fire at Saudi Aramco’s petroleum storage facility in Jeddah after the Houthi attack”। ছবিটির ক্রেডিট দেওয়া হয় রয়টার্সকে।
ছবিতে আগুনের বিস্তার, ডানপাশের আলোকিত বিলবোর্ড এবং সামনের সারিতে দাঁড় করানো গাড়ির অবস্থান সংবাদ মাধ্যমগুলোতে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বা পোস্টে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়, যা নিশ্চিত করে সবগুলো একই ছবি।
রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২৫ মার্চ সৌদি জোটের বিমান হামলার জবাবে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা জেদ্দাসহ কয়েকটি শহরে পাল্টা হামলা চালায়, যাতে জেদ্দার এই তেল স্থাপনায় আগুন ধরে যায়। ওই হামলার পর সৌদি আরব ইয়েমেনে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর ঘোষণা দেয়।

গত মার্চ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও তেল বাজারে প্রভাব ফেলেছে। এরই মধ্যে গত ৯ আগস্ট রিয়াদের মুসা শিল্প এলাকায় আসবাব কারখানায় আগুনে বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত হয়। আর গত ৭ সেপ্টেম্বর জিজানের আরামকো স্থাপনায় নতুন করে হামলা হয়। ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে (আর্কাইভ) বলা হয়, সোমবার জিজানের ৪ লাখ ব্যারেল দৈনিক সক্ষমতার শোধনাগারে হামলা হয়েছে, যা অয়েলপ্রাইস ডটকম ও তুর্কিয়ে টুডেসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন করেছে।
অর্থাৎ, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে গণমাধ্যমগুলো বারবার একই ছবি ব্যবহার করেছে, যা প্রকৃতপক্ষে প্রায় সাড়ে চার বছর আগে জেদ্দায় ধারণ করা।
পুরোনো বা অপ্রাসঙ্গিক ছবি ব্যবহারে কী করা উচিত?
সাংবাদিকতার নৈতিক চর্চা এবং মান উন্নয়ন নিয়ে কাজ করা অলাভজনক সংস্থা পয়েন্টার সংবাদ প্রতিবেদনে প্রতীকী বা ‘ফাইল ছবি’ ব্যবহারের নৈতিকতা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলছে, ব্যবহৃত ছবি সংশ্লিষ্ট ঘটনার প্রকৃত দৃশ্য বলে ধরে নেওয়ার মতো বাস্তবসম্মত হলে, এ ধরনের চর্চা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
পয়েন্টারের ভিজ্যুয়াল জার্নালিজম বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক কেনি আরবি বলেন, উৎসের উল্লেখ বা স্পষ্ট লেবেল ছাড়া ছবি প্রকাশ করা বিভ্রান্তিকর। এ ধরনের চর্চা গণমাধ্যমের ওপর জনগণের অনাস্থা বাড়িয়ে তোলে। প্রতিষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতার ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি বয়ে আনতে পারে।
তিনি পরামর্শ দেন, কোনো সংবাদমাধ্যমকে যদি কোনো ছবি পুনরায় ব্যবহার করতেই হয়, তবে সেটিকে ঘটনার প্রকৃত ও অবিকৃত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের বদলে স্পষ্টভাবে ‘ইলাস্ট্রেশন’ বা ‘ফাইল ছবি’ হিসেবে প্রকাশ করা উচিত।

