সম্প্রতি ফ্রান্সের হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলন নিয়ে সংবাদমাধ্যম ঢাকা ট্রিবিউন তাদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে একটি ভিডিও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, এই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত চারটি ফুটেজের অন্তত তিনটিই ফ্রান্সে বিভিন্ন সময়ে হওয়া আন্দোলনের পুরোনো ঘটনার দৃশ্য।
গত ৫ অক্টোবরে ঢাকা ট্রিবিউনের পেজ থেকে একটি ভিডিও প্রতিবেদন পোস্ট করা হয়। পোস্টে লেখা ছিল, “শিক্ষার্থী আ/ন্দোলনে উত্তাল ফ্রান্স, ব/ন্ধ ৫০০ স্কুল।” প্রতিবেদনে চারটি ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার হতে দেখা যায়।
প্রথম দুটি ফুটেজ ২০২২ সালের একটি আন্দোলনের
প্রথম ফুটেজের সূত্র যাচাই করতে গিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে ইউরোপীয়ান সংবাদমাধ্যম ইউরো নিউজের একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এতে বলা হয়, ২০২২ সালের ডিসেম্বরে প্যারিসের কুর্দি সম্প্রদায়ের ওপর এক প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনার জের ধরে ঘটা দৃশ্য দেখা যাচ্ছে ওই ফুটেজে।

এছাড়া, ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান মিসবার (MISBAR)-এ ৪ অক্টোবর ২০২৬ এ প্রকাশিত একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেই প্রতিবেদনেও ফুটেজটিকে ২০২২ সালে প্যারিসে পুলিশ ও কুর্দি সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা বলে উল্লেখ করা হয়।

দ্বিতীয় ফুটেজে একটি বাসস্ট্যান্ডে ভাঙচুরের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। এই ফুটেজ যাচাই করতে গেলে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম ইয়েনি সাফাকের (Yeni Safak) ২০২২ সালের ২৫ ডিসেম্বরে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এই প্রতিবেদনের ফুটেজের সাথে ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ভিডিওর হুবহু মিল পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সশস্ত্র হামলায় তিন জনের মৃত্যুর প্রতিবাদে “সন্ত্রাসী” সংগঠন পিকেকের (PKK) সমর্থকেরা সহিংস কর্মকাণ্ড চালিয়েছে।

এছাড়া, ইউরো নিউজ ও মিসবারের প্রতিবেদনেও দ্বিতীয় ফুটেজটিকে ২০২২ সালের দৃশ্য বলে উল্লেখ করা হয়।
অর্থাৎ, ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনের প্রথম ২৮ সেকেন্ডে ব্যবহৃত ফুটেজ দুটি প্রায় সাড়ে তিন বছরেরও বেশি পুরোনো একটি ঘটনার দৃশ্য।
এই ভিডিওটি পূর্বে ভুয়া দাবিতে ছড়ানো হলে ডিসমিসল্যাব একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
২০২৩ সালের ঘটনা দেখা যায় চতুর্থ ফুটেজে
ভিডিও প্রতিবেদনটির ২৯ সেকেন্ডে থেকে ৩৩ সেকেন্ডে ব্যবহৃত ফুটেজটি থেকে কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করা হয়। এতে ফ্রান্সের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম মিডি লিব্রে (Midi Libre)-তে ২০২৩ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি ফ্রান্সের একটি স্কুল বাসে আগুন ধরে যাওয়ার ঘটনা।

অর্থাৎ, ফুটেজটিও ৩ বছরের বেশি পুরোনো, বর্তমানে চলমান আন্দোলনের সঙ্গে এটির কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে, প্রতিবেদনের তৃতীয় ফুটেজের (৩৭ সেকেন্ড থেকে ৫৭ সেকেন্ড) দৃশ্যটি ঠিক কোন ঘটনার সেটি নিশ্চিত হওয়া না গেলেও, একাধিক সূত্রে (১, ২) এটিকে চলমান আন্দোলনের ভিডিও হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ফ্রান্সে গত সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে একটি বড় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। শুরুতে প্যারিস অঞ্চলের কয়েকটি স্কুলে বিক্ষোভ ও স্কুলের প্রবেশপথ অবরোধ দিয়ে শুরু হলেও কয়েক দিনের মধ্যে তা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুরোনো ও ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নিয়ম কী বলে ?
বিবিসির নীতিমালায় বলা আছে, পুরোনো বা আর্কাইভ ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু সেটি এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে দর্শক কোনো ঘটনা, পরিস্থিতি বা ফুটেজে দেখানো বিষয় সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা তৈরি করে।
সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনার ফুটেজ দিয়ে বর্তমান ঘটনা বোঝানোর ক্ষেত্রে বিবিসির আরও নির্দিষ্ট নীতিমালায় বলা হয়েছে, একটি ঘটনার আর্কাইভ ফুটেজ ব্যবহার করে অন্য একটি ঘটনা এমনভাবে দেখানো উচিত নয়, যাতে দর্শকের মনে হয় তারা পরের ঘটনাটিরই দৃশ্য দেখছেন।
অর্থাৎ, পুরোনো ভিডিও ব্যবহার করা মূল সমস্যা নয়। সেটি কোন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং উপস্থাপনার ধরন দর্শককে ওই ভিডিওর ঘটনা সম্পর্কে কী ধারণা দিচ্ছে—সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো পুরোনো ফুটেজকে স্পষ্টভাবে আর্কাইভ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, সেটি যদি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ঘটনার দৃশ্য হিসেবে উপস্থাপিত হয়, তাহলে শুধু ‘পুরোনো ফুটেজ’ বা ‘ফাইল ফুটেজ’ লেবেল দেওয়াই বিভ্রান্তির ঝুঁকি দূর করে না।

