সৌদি আরবের কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর হুতি বিদ্রোহীদের হামলার খবরে প্রকাশিত প্রতিবেদন ও ফটোকার্ডে বাংলাদেশের একাধিক সংবাদমাধ্যম একটি ছবি ব্যবহার করেছে। ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ছবিটি এই হামলার দৃশ্য নয়। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় ইয়েমেনের রাজধানী সানায় আগুন লেগেছিল, ছবিতে সে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর দৈনিক মানবজমিনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়। যার শিরোনাম ছিল, “সৌদির কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে হুতিদের ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা”। এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া ছিল ৩ হাজারের বেশি, মন্তব্য ছিল ৯৫টি। ফটোকার্ডটি শেয়ার হয়েছে ৪০ বার।
একই ছবি ও একই শিরোনামে ফটোকার্ড প্রকাশ হয়েছে এটিএন নিউজের ফেসবুক পেজ থেকে। একই ছবি ব্যবহার করে অনলাইন প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক ইত্তেফাক। প্রতিবেদনে বলা হয়, খামিস মুশাইতের এই বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি জানিয়ে সোমবার এক বিবৃতি দেন হুতির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি। এছাড়াও এই ছবি ব্যবহার করে প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, দৈনিক বাংলা ও ঢাকা মেইল।

ছবির সত্যতা যাচাইয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে ইয়াহু নিউজের একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। রয়টার্সের বরাতে ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত সে প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু ছিল, ইয়েমেনে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরুর আলোচনা। প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলায় ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছে। ছবির স্বত্ব বর্ণনায় তারিখ হিসেবে ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ও আলোকচিত্রী হিসেবে রয়টার্স ও খালেদ আবদুল্লাহর নাম দেওয়া।
একই ছবি পাওয়া যায় আল জাজিরার ২০১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনেও, যেখানে হুতি নিয়ন্ত্রিত সানায় আরব জোটের বিমান হামলা জোরদারের বিষয়ে প্রতিবেদন করা হয়। সেখানে ছবির ক্যাপশনে লেখা হয়, ২৬ মার্চ সৌদি আরব ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্র ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করেছে। এখানেও ছবির ক্রেডিট দেওয়া হয় খালেদ আবদুল্লাহ ও রয়টার্সকে।

ছবিতে ডানপাশে দৃশ্যমান টাওয়ার, সামনের সারিতে জানালা ও গম্বুজবিশিষ্ট ভবন এবং আগুন-ধোঁয়ার কুণ্ডলীর অবস্থান বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
রয়টার্স ও আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিমান হামলা শুরু করে। এই হামলার ধারাবাহিকতায় ওই বছরের সেপ্টেম্বরে সানায় বিমান হামলায় একটি সামরিক স্থাপনায় আগুন ধরে যায়, যার ছবি তোলেন রয়টার্সের আলোকচিত্রী খালেদ আবদুল্লাহ। অর্থাৎ ছবিতে দৃশ্যমান ক্ষয়ক্ষতি যে হামলা হয়েছিল, সে হামলা করেছিল সৌদি জোট, হুতিরা নয়।
অর্থাৎ, সৌদি আরবের কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে হুতি হামলার সাম্প্রতিক দাবির সঙ্গে যে ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে, তা প্রকৃতপক্ষে ১১ বছরেরও বেশি আগে ভিন্ন এক ঘটনার। সে ঘটনায় ইয়েমেনের হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় হামলা করেছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং লক্ষ্যবস্তু ছিল হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকা, বর্তমান ঘটনার ঠিক উল্টো।
উল্লেখ্য, কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে হুতিদের সাম্প্রতিক হামলার দাবি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তুরস্কের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড ও জেরুজালেম পোস্টসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, হুতি বাহিনী ডজনখানেক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে ঘাঁটির হ্যাঙ্গার, রাডার, রানওয়ে ও অস্ত্রাগারে হামলার দাবি করেছে এবং এতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে।
পুরোনো ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার নিয়ম কী বলে?
সম্প্রচার সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত বিবিসির সম্পাদকীয় নীতিমালায় আর্কাইভ থেকে নেওয়া ছবি বা ভিডিও ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। নীতিমালার নির্ভুলতা অধ্যায়ের ‘আর্কাইভ উপকরণ’ অংশে বলা হয়েছে, আর্কাইভ থেকে নেওয়া কোনো উপকরণ এমনভাবে ব্যবহার করা যাবে না যাতে দর্শক-পাঠক কোনো ঘটনা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্ত হন, প্রয়োজনে তা স্পষ্টভাবে লেবেল করে দিতে হবে।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, আর্কাইভের কোনো উপকরণ অপরিবর্তিত অবস্থায় ব্যবহারের আগে বিবেচনা করতে হবে তা সম্পাদকীয় নীতিমালা বা আইন ভঙ্গ করছে কিনা এবং সেটি যে আর্কাইভ থেকে নেওয়া, প্রয়োজনে তা স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে হবে। কোনো তথ্য বা ছবি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক বা ভুল হয়ে পড়লে তা দর্শক-পাঠকের কাছে স্পষ্ট করে দেওয়া জরুরি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে নীতিমালায়। পাশাপাশি, হালনাগাদ থাকার আভাস দেয় এমন যেকোনো সংবাদ বা কনটেন্টে তা কবে প্রথম প্রকাশ হয়েছিল এবং সবশেষ কবে হালনাগাদ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট রাখার নির্দেশনাও দিয়েছে বিবিসি। যাতে পাঠক প্রকাশের সময় নিয়ে বিভ্রান্ত না হন।
অর্থাৎ, এই নীতিমালা অনুযায়ী, পুরোনো কোনো ছবি নতুন ঘটনার প্রতিবেদনে ব্যবহার করতেই হলে সেটিকে তাৎক্ষণিক ও প্রকৃত দৃশ্য হিসেবে দেখানো যাবে না। স্পষ্টভাবে ‘ফাইল ছবি’ বা আর্কাইভের ছবি হিসেবে উল্লেখ করতে হবে। সম্ভব হলে ছবিটি ঠিক কবে ও কোথায় ধারণ করা হয়েছিল, তা-ও জানিয়ে দিতে হবে। মানবজমিন, এটিএন নিউজ ও ইত্তেফাকসহ যেসব সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও ফটোকার্ডে ছবিটি ব্যবহার হয়েছে, তার কোথাও একে ফাইল বা আর্কাইভের ছবি বলে উল্লেখ করা হয়নি। বরং কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে সাম্প্রতিক হামলার হালনাগাদ ও প্রকৃত দৃশ্য হিসেবেই তা উপস্থাপন করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, এর আগেও সৌদি আরব-হুতি হামলায় সংবাদমাধ্যমের ব্যবহৃত পুরোনো ছবি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব।

