ড. আউনি এটআউই

সিনিয়র প্রভাষক, চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া
This article is more than 2 months old
যে ৬ কৌশলে চরমপন্থিরা শব্দকে অস্ত্র বানিয়ে উগ্রবাদ ছড়ায়

যে ৬ কৌশলে চরমপন্থিরা শব্দকে অস্ত্র বানিয়ে উগ্রবাদ ছড়ায়

ড. আউনি এটআউই

সিনিয়র প্রভাষক, চার্লস ডারউইন ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়া

ভাষা খুব শক্তিশালী হাতিয়ার। উগ্রবাদীরা ভালো করেই তা জানে। অনুসারীদের পূর্ণ আনুগত্য নিশ্চিত করতে তারা বেশ সতর্কভাবে শব্দ বেছে নেয়। আর ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে, ভাষা বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

উগ্রবাদীরা যেহেতু খুব সচেতনভাবে ভাষা বেছে নেয়, গবেষকরা চাইলে এর মধ্যে প্যাটার্ন, ট্রেন্ড এবং বিপদসংকেত খুঁজে দেখতে পারেন। উগ্রবাদীরা ঠিক কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করেন যা তাদের অনুসারী এনে দেয়, ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দেয়, এবং শেষ পর্যন্ত প্রাণঘাতী হামলার পথ করে দেয়?

সাম্প্রতিক কয়েকটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় জড়িত উগ্রবাদীদের ভাষ্য নিয়ে করা এক গবেষণায় আমরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। এতে এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে উগ্রবাদীরা নিজেদের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলে।  

এই কৌশলগুলো শনাক্ত করতে পারলে উগ্রবাদী প্রচারণার বয়ান আরও কার্যকরভাবে বিশ্লেষণ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে মানুষ ও সমাজকে উগ্রবাদে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেও রক্ষা করা সহজ হবে।

বিচ্ছিন্ন কর, জয় কর

আগের এক গবেষণায় আমরা ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলাকারীর ৮৭ পৃষ্ঠার ইশতেহারে ব্যবহৃত উগ্র ডানপন্থি উসকানিমূলক ভাষা বিশ্লেষণ করেছি।

সাম্প্রতিক গবেষণায় আমরা জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্য পর্যালোচনা করেছি। এর মধ্যে টুইন টাওয়ারে হামলার পর ওসামা বিন লাদেনের বক্তব্য এবং ইসলামিক স্টেটের সাময়িকীতে প্রকাশিত সংগঠনটির সাবেক শীর্ষনেতা আবু বকর আল-বাগদাদীর বক্তব্য উল্লেখযোগ্য।

ভাষাগত বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি, কীভাবে ভাষার কৌশলগত ব্যবহারে সাংস্কৃতিক পার্থক্য কখনো বাড়িয়ে, আবার কখনো কমিয়ে দেখানো হয়। আমরা খতিয়ে দেখেছি, কীভাবে উসকানিদাতারা ভাষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সম্পর্কের অনুভূতি সৃষ্টি করে সহিংসতার পক্ষে দায়বদ্ধতার জন্ম দেয়।

গবেষণায় উসকানিমূলক বার্তার দুটি প্রধান ধরন শনাক্ত হয়েছে। প্রথমটি গোষ্ঠীর সদস্যদের মধ্যে ঐক্য জোরদার করে একটি অভিন্ন লক্ষ্য তৈরি করা। দ্বিতীয়টি হলো, বাইরের মানুষদের নিজেদের থেকে আলাদা করে দেখানো এবং তাদের শত্রু হিসেবে উপস্থাপন করা।

এ ধরনের বার্তা সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করতে পারে এবং মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সঙ্গে একাত্ম হতে উৎসাহিত করে। ফলে, সদস্যদের কাছে গোষ্ঠীর নিয়মকানুন, এমনকি চরমপন্থি কর্মকাণ্ডও— অনুসরণ করা নিজেদের আনুগত্য প্রমাণের উপায় বলে মনে হতে পারে।

তবে শুধু নির্দেশ দেওয়া মানুষকে উগ্রবাদে উদ্বুদ্ধ করার জন্য যথেষ্ট নয়। তাহলে সহিংস কাজে প্ররোচিত করতে উগ্রবাদীরা কোন কৌশল কীভাবে ব্যবহার করে?

উসকানির ছয় কৌশল

কোনো গোষ্ঠীকে প্রথমে অন্যদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হয়। তাদের বোঝানো হয় সহিংসতা তাদের নৈতিক দায়িত্ব। তারপর সাধারণত ছয়টি প্রধান কৌশল ব্যবহার করে উগ্রবাদীরা।

১. পার্থক্য যখন অস্ত্র

বাইরের লোকজনকে শুধু আলাদা হিসেবে দেখায় না উগ্রবাদীরা। বাকিদের অসৎ ও বিপজ্জনক হিসেবেও তুলে ধরে। “আমরা” বনাম “তারা”—এই বিভাজনই পরবর্তীতে সহিংসতার ডাক দেওয়ার পটভূমি সৃষ্টি করে।

বাইরের হুমকির সঙ্গে আনুগত্য ও সম্মানের বিষয়টি জুড়ে দেয় উসকানিদাতারা। “বিশ্বাসঘাতক ও সহযোগী সরকার[…] যাদের তৈরি করা হয়েছে জিহাদকে ধ্বংস করার জন্য” বলে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী আরব সরকারগুলোর বিরুদ্ধে সহিংসতার আহ্বান জানিয়েছিলেন ওসামা বিন লাদেন।

অভিবাসীদের সহায়তাকারী বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলেছিলেন ক্রাইস্টচার্চ হামলাকারী ব্রেন্টন ট্যারান্ট। অভিবাসীদের ‘শ্বেতাঙ্গ-বিরোধী আবর্জনা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল তার বক্তব্যে। একই সঙ্গে ‘বিষধর সাপের বাসা’র সঙ্গে তুলনা করে তাদের নির্মূল করার আহ্বানও জানানো হয়।

বহিরাগতদের মানুষ হিসেবেই না দেখানো নিজেদের অভ্যন্তরীণ বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করে এবং এর পরিণতি ভয়াবহ।

২. বীর ও কিংবদন্তিদের মনে করিয়ে দেওয়া

উগ্রবাদীরা বিখ্যাত ব্যক্তি, স্থান বা ঘটনা উল্লেখ করে, ফলে অনুসারীরা নিজেদের বৃহত্তর একটি গল্পের অংশ বলে মনে করে। “সালাহউদ্দিন” এর মতো নাম বা “হায়া সোফিয়া” কিংবা “লন্ডিনিয়াম”-এর মতো স্থান কিংবদন্তি বা অতীত সংগ্রামের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক স্থাপন করতে সাহায্য করে এবং নিজেদের রক্ষক বা প্রতিশোধ-গ্রহণকারী হিসেবে ভাবতে উৎসাহিত করে অনুসারীদের।

ট্যারান্ট যেমন লিখেছিলেন:

“এই পাকিস্তানি মুসলিম আগ্রাসনই এখন লন্ডনের জনগণের প্রতিনিধি হয়ে গেছে। লন্ডিনিয়াম ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের কেন্দ্রস্থল। (এখান থেকে) এই আগ্রাসনকে সরিয়ে দেওয়ার চেয়ে শ্বেতাঙ্গ পুনর্জাগরণের ভালো নিদর্শন আর কী হতে পারে?”

৩. ধর্মীয় গ্রন্থের পুনর্ব্যাখ্যা

উগ্রবাদীরা ধর্মীয় গ্রন্থের বিকৃত ও অপ্রাসঙ্গিক ব্যাখ্যা ব্যবহার করে সহিংসতার ন্যায্যতা দেয়।

ঈশ্বর বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের উক্তি ব্যবহার করলে নিজেদের বার্তাকে বৈধ বলে মনে করানো সহজ এবং সহিংসতাকে তখন নৈতিক বা আধ্যাত্মিক কর্তব্য হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। এতে আনুগত্য বাড়ে এবং “আমাদের” অভিন্ন মূল্যবোধ রক্ষার জন্য সহিংস কর্মকাণ্ড জরুরি- অনুসারীদের এমন বিশ্বাস দৃঢ় হয়।

ট্যারান্ট যেমন প্রথম ক্রুসেডের পোপ দ্বিতীয় আরবানের উক্তি ব্যবহার করেছেন, আর আল-বাগদাদি আল্লাহর বাণীকে ভুলভাবে উদ্ধৃত করেছেন।

৪. বিশেষায়িত ক্ষোভ ও উসকানিমূলক ভাষা

উসকানিদাতারা মানুষের জন্য আগেই ক্ষোভের বিষয় নির্ধারণ করে দেয়। “অপমান”, “অন্যায়” কিংবা “সাংস্কৃতিক ক্ষতি”—এ ধরনের শব্দ অনুসারীদের একটি সার্বজনীন উদ্দেশ্যে এক করতে সাহায্য করে।

“নিপীড়ন” ও “অবজ্ঞার” মধ্যে মুসলমানদের বসবাসের কথা বলেছিলেন ওসামা বিন লাদেন। অন্যদিকে, ক্রাইস্টচার্চ হামলাকারী “শিশুকামী রাজনৈতিকদের” ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন এবং দাবি করেছিলেন, অভিবাসন “আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে দেবে”।

নামকরণ ও পরিচয় ধারণ অনুসারীদের একত্রিত করে, বাকিদের আলাদা করে দেয়।

৫. রূপক ও আত্মীয়তার বার্তা

ওসামা বিন লাদেন তার অনুসারীদের রূপক অর্থে “আল্লাহর সৈনিক” হিসেবে অভিহিত করতেন। আর শত্রুদের “ক্রুশের পতাকার নিচে” অবস্থানকারী হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এই ধরনের বৈপরীত্য একই সঙ্গে আনুগত্য ও শত্রুতার অনুভূতি-দুটিকেই তীব্র করে তোলে।

অন্যদিকে, আত্মীয়তার ভাষা মানুষকে টেনে আনে। “ভাই”, “বোন”, “আমরা” এবং “আমাদের”—এ ধরনের শব্দ অপরিচিতদেরও পরিবারের সদস্য বলে মনে করায়। “আমাদের মুসলিম ভাই” বলে সম্বোধন রাজনৈতিক দায়িত্বকে— পরিবারের সদস্যদের রক্ষা করার মতো ব্যক্তিগত ও নৈতিক দায়িত্বে রূপান্তরিত করে।

একই কৌশল ট্যারান্টও দেখিয়েছেন। তার বক্তব্য “ইউরোপে অন্য ভাইরা যখন নিশ্চিত যুদ্ধের মুখোমুখি, তখন তুমি কেন শান্তিতে থাকবে?”এই বক্তব্য সহিংসতাকে পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করে।

অন্যদিকে “তারা” বা “ওরা” শব্দগুলো বাকিদের অনাত্মীয় হিসেবে দূরে ঠেলে দেয়। এই “আমরা বনাম তারা”-র তীব্র ভাষাগত বিভাজন সহমর্মিতা কমিয়ে দেয় এবং দূরে সরিয়ে দেওয়া বা তাদের ক্ষতি করাকে বৈধতা দেয়, ন্যায্য মনে করা সহজ করে তোলে।

৬. সহিংসতায় বাধ্য করা

কাউকে কিছু করার জন্য নির্দেশ, পরামর্শ বা কিছু করার সতর্কতার পাশাপাশি আরেকটি কৌশল হলো চাপ সৃষ্টি করা। এসব ক্ষেত্রে সহিংসতাকে গোষ্ঠীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

উগ্রবাদীরা সহিংসতাকে কর্তব্য হিসেবে দেখায়। জিহাদি লেখায় সহিংসতাকে নিষিদ্ধ কাজের পরিবর্তে বাধ্যতামূলক দায়িত্বে পরিণত করতে “এটি অনুমোদিত” ধরনের বাক্য ব্যবহার করা হয়। যেমন, “ওদের সম্পদ কেড়ে নেওয়া এবং ওদের রক্ত ঝরানোর অনুমোদন আছে।”

তারা নিজস্ব গণ্ডির বাইরের লোকজনকে অস্তিত্বগত হুমকি হিসেবেও উপস্থাপন করে। এতে আগাম সহিংসতাকে আত্মরক্ষা বা অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে বৈধতা পায়। ট্যারান্ট যেমন লিখেছিলেন: “গণ-অভিবাসন আমাদের অধিকার কেড়ে নেবে, আমাদের জাতি পরাজিত হবে, সমাজকে ধ্বংস করবে, আমাদের জাতিগত বন্ধন শেষ করবে […]”।

এই গবেষণা কী কাজে আসবে?

উগ্রবাদী বক্তব্য শুধু অনলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রতিবাদ, ফোরাম এবং রাজনৈতিক বিতর্কেও এ সুর প্রতিধ্বনিত হয়।

একসময় উগ্রবাদী ইশতেহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা “গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি” এখন মূলধারার অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভেও দেখা যাচ্ছে

অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা (এএসআইও) সতর্ক করেছে, “সাম্প্রদায়িক সহিংসতার প্রচার” বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সহিংসতা বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

মোকাবিলার আগে উগ্রবাদের কৌশলগুলো বোঝা জরুরি। নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও কমিউনিটি নেতারা যদি এসব কৌশল চিনতে পারেন, তাহলে কখনো এমন কিছুর সম্মুখীন হলে তা বিনির্মাণ করতে পারবেন।

মানুষকে সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ দক্ষতা শেখানোও গুরুত্বপূর্ণ, যাতে এসব জবরদস্তিমূলক কৌশল চিনতে ও প্রতিরোধ করতে পারে তারা।

এছাড়া বিভাজন বা মেরুকরণ না বাড়িয়ে অন্তর্ভুক্তি ও সম্পৃক্ততার অনুভূতি জোরদারের পাল্টা বার্তা তৈরি করা যেতে পারে।

উগ্রবাদী ভাষা মানুষের অভিন্ন মূল্যবোধ অপহরণ করে এবং সেগুলোকে ঘৃণা ও সহিংসতার বাধ্যবাধকতায় রূপান্তরিত করে। সহিংসতা শুরু হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করতে হলে শিক্ষা, স্বচ্ছতা এবং সক্রিয় যোগাযোগের মাধ্যমে এই ভাষাগত কৌশলগুলোকে অকার্যকর করে ফেলতে হবে।

ডক্টর আউনি এটআউই-এর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। অনুবাদ করেছেন ডিসমিসল্যাবের ডেপুটি ম্যানেজার আসম ফেরদৌস রহমান।

আরো কিছু লেখা