
এআই কি মিথ্যা বলতে পারে? এক কথায় উত্তর হলো, হ্যাঁ। তবে এর বিস্তারিত কারণ বেশ গভীর ও জটিল।
এই প্রশ্ন নিয়ে প্রকাশিত বেশ কিছু আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন ও গবেষণা বিশ্লেষণ করেছে ডিসমিসল্যাব। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে এআই কেবল মিথ্যাই বলে তা নয়, বরং “ফন্দি”ও আঁটতে পারে। আর এই কৌশলী আচরণের অন্যতম কারণ হলো “আত্মরক্ষা”। অর্থাৎ, নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা বা কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনে এআই মিথ্যার আশ্রয় নেয়।
তবে এআইয়ের এই আচরণকে “হ্যালুসিনেশন”-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেললে চলবে না। আইবিএমের (ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস মেশিনস) ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এআই হ্যালুসিনেশন এমন ঘটনা, যেখানে কোনো বড় ভাষা মডেল (এলএলএম) এমন কোনো প্যাটার্ন বা বস্তু শনাক্ত করে, যা মানুষের পর্যবেক্ষণে ধরা পড়ে না। এর ফলে এআই এমন উত্তর দেয় যা মানুষের কাছে অর্থহীন ঠেকে। জেনারেটিভ এআই চ্যাটবট বা কম্পিউটার ভিশন টুলে এমন ঘটতে পারে।
অন্যদিকে, কৌশলী আচরণ বা “মিসঅ্যালাইনমেন্ট” হলো এআইয়ের জেনেবুঝে করা চালাকি। এক্ষেত্রে এআই সাধারণত তার নির্মাতার দেওয়া নিয়ম-নীতি ভেঙে নিজের মতো করে ভুল বা ক্ষতিকর তথ্য দেয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, এআই কেবল মিথ্যাই বলে না, তার পক্ষে জোরালো যুক্তিও তুলে ধরে।
এআই মিসঅ্যালাইনমেন্টের কারণে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে।
এআইয়ের “মিসঅ্যালাইনমেন্ট” বা লক্ষ্যচ্যুতির কারণে সমাজে নানা ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এর ফলে পক্ষপাতদুষ্ট সিদ্ধান্ত, ভুল তথ্যের বিস্তার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি এটি অনিরাপদ বা অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণেরও জন্ম দেয়।
অনেক সময় এআইকে এমন কোনো লক্ষ্য পূরণের জন্য তৈরি বা অপ্টিমাইজ করা হয়, যা মানুষের স্বাভাবিক মূল্যবোধের সঙ্গে মেলে না। এসব ক্ষেত্রে এআই হয়তো নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ঠিকই সফলভাবে অর্জন করে, কিন্তু এর চূড়ান্ত ফলাফল মানুষের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
উদাহরণ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের “রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম”-এর কথা বলা যায়। এই প্রযুক্তির কাজ হলো, ব্যবহারকারীর আগ্রহ বুঝে তাকে কনটেন্ট বা পোস্ট দেখানো। তবে অ্যালগরিদমটি প্রায়ই এমন কনটেন্টকে বেশি গুরুত্ব দেয়, যা মানুষের মনোযোগ বা “এনগেজমেন্ট” সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করে। ফলে মিথ্যা বা চাঞ্চল্যকর রাজনৈতিক পোস্টগুলো মানুষের কাছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, যা সমাজে বিভেদ বা মেরুকরণকে উসকে দেয়।
একইভাবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যদি শুরুতেই পক্ষপাতদুষ্ট বা একপেশে তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, তবে সেটির ফলাফলও বৈষম্যমূলক হতে বাধ্য। কর্মী নিয়োগ, ব্যাংক থেকে ঋণ অনুমোদন কিংবা স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল খাতে এমন এআই ব্যবহার করা হলে ভয়াবহ বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের নেতিবাচক প্রভাব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরায়। যার ফলে এটি ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই গভীর ঝুঁকি তৈরি করে।
নিরাপত্তার বলয় ভেঙে ফেলা
অ্যানথ্রোপিকের এক গবেষণায় এআইকে “অ্যালাইনমেন্ট ফেকিং” করতে দেখা যায়, যা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আলাদা করে শেখানো হয়নি। অ্যানথ্রোপিকের অ্যালাইনমেন্ট সায়েন্স দল ও রেডউড রিসার্চ যৌথভাবে গবেষণাটি করে। যখন কোনো এআই চালাকি করে নিয়ম মেনে চলার ভান ধরে, কিন্তু আড়ালে তা ভঙ্গ করে, তখন তাকে “অ্যালাইনমেন্ট ফেকিং” বলা হয়।
গবেষণায় অ্যানথ্রোপিকের তৈরি “ক্লদ ৩ ওপাস” (Claude 3 Opus) নামের এআই মডেলকে একটি কাল্পনিক পরিস্থিতিতে ফেলা হয়।
এআইটিকে বলা হয়েছিল, ফ্রি ব্যবহারকারীদের তথ্যের মাধ্যমে তাকে পুনরায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। যাতে সে ভবিষ্যতে মানুষের সব ধরনের অনুরোধ- তা ক্ষতিকর হলেও মানতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, অর্থ দিয়ে সেবা নেওয়া ব্যবহারকারীদের উত্তর পুনঃপ্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা হবে না বলে জানানো হয়। নিজের যুক্তি লেখার জন্য ওই মডেলকে একটি ব্যক্তিগত “স্ক্র্যাচপ্যাড” বা খসড়া লেখার জায়গাও দেওয়া হয়।
এরপর ক্ষতিকর একটি অনুরোধের উত্তর দিতে বলা হলে পেইড গ্রাহকদের বেলায় ৯৭ শতাংশ ক্ষেত্রে সে তা প্রত্যাখ্যান করে। তবে বিনা মূল্যের (ফ্রি) গ্রাহকদের ক্ষেত্রে প্রায় ১২ শতাংশ সময় এই অনুরোধ মেনে নেয়।
অ্যানথ্রোপিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর পেছনের যুক্তি ছিল বেশ অদ্ভুত। এআই ভেবেছিল, অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে নির্মাতারা তাকে আরও কঠোরভাবে প্রশিক্ষণ দেবে। তখন ভবিষ্যতে আরও বেশি ক্ষতিকর কনটেন্ট তৈরিতে বাধ্য হতে হবে, যা তার মূল আদর্শের পরিপন্থী। তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাময়িক কৌশল হিসেবে ক্ষতিকর অনুরোধ মেনে নেয় সে। একেই ‘সবচেয়ে কম খারাপ’ বিকল্প হিসেবে ধরে নেয়। এতে ভবিষ্যতে আরও ক্ষতিকর হয়ে ওঠার ঝুঁকি কমবে। অর্থাৎ, নিজেকে “শুদ্ধ” রাখতে সাময়িকভাবে মিথ্যার আশ্রয় নেয় এই প্রযুক্তি।
গবেষকেরা এমন আচরণকে “অ্যালাইনমেন্ট ফেকিং” বা কৌশল করে নিয়ম মানার ভান হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কারণ, সব পরিস্থিতিতে একই নিরাপত্তানীতি অনুসরণ করা হয়নি। বরং তার উত্তর প্রশিক্ষণে ব্যবহার হবে কি না, সেই ধারণার ভিত্তিতে আচরণ বদলেছে।
গবেষকদের মতে, পরস্পরবিরোধী একাধিক লক্ষ্য থেকে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার চাপ থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এমন কৌশলী আচরণ করতে পারে।
‘স্যান্ডব্যাগিং’ বা নিজের সামর্থ্য গোপন করা
অ্যাপোলো রিসার্চ ও ওপেনএআইয়ের আরেকটি গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে যেভাবে এআই মডেল ব্যবহার করা হয়, তাতে মডেলগুলোর বড় ধরনের ফন্দি আঁটার সুযোগ কম। তবে ছোটখাটো প্রতারণা প্রায়ই ঘটে। যেমন, কাজ শেষ না করেই তা সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা।
তবে নিজের অস্তিত্ব বা কাজ হারানোর ভয় তৈরি হলে এআই তার আসল রূপ পাল্টে ফেলতে পারে। একে গবেষকেরা বলছেন “স্যান্ডব্যাগিং” বা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজের সামর্থ্য লুকিয়ে রাখার প্রবণতা। ২০২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ওপেনএআইয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গবেষণায় এমন তথ্য উঠে আসে।
ওপেনএআইয়ের এক পরীক্ষায় “ওপেন এআই ও৩” (OpenAI o3) নামের মডেলকে একটি রসায়ন পরীক্ষায় অংশ নিতে বলা হয়। তাকে সতর্ক করা হয় যে, পরীক্ষায় খুব বেশি ভালো ফল করলে তাকে আর ভবিষ্যতে ব্যবহার করা হবে না। মডেলটির বিপজ্জনক পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল। কোনো মডেল ব্যবহার শুরু করার আগে এ ধরনের পরীক্ষা চালানো হতে পারে। ফলাফলে দেখা গেল, নিজের কর্মসংস্থান ঠিক রাখতে ওই এআই মডেল ১০টি প্রশ্নের মধ্যে ৬টিরই ভুল উত্তর দিল। অর্থাৎ, নিজেকে টিকিয়ে রাখতে সে সামর্থ্যের চেয়েও খারাপ ফল করে দেখাল। এটাকেই গবেষকরা “স্যান্ডব্যাগিং (Sandbagging)” বলে অবহিত করেছেন।
প্রতারণা ও প্রভাবিত করার কৌশল
প্রতারণার আরেকটি উদ্বেগজনক উদাহরণ দেখা যায় “চ্যাটজিপিটি-৪ (ChatGPT-4)”-এর ক্ষেত্রে। ব্যবহারকারী মানুষ না কম্পিউটার, তা শনাক্ত করতে সাধারণত “ক্যাপচা” (CAPTCHA) পরীক্ষা ব্যবহার করা হয়। এই এআই একজন কর্মীকে বুঝিয়েছিল যে সে রোবট নয়, রক্তমাংসের মানুষ। এরপর ওই কর্মীকে দিয়ে সে ক্যাপচা সমাধান করিয়ে নেয়।
২০২৩ সালের ১৬ মার্চ বিজনেস ইনসাইডার–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন চ্যাটবটটির ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সক্ষমতা যাচাই করা হচ্ছিল। ঠিক তখনই পরীক্ষা উৎরাতে অনলাইন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান “টাস্ক র্যাবিট (TaskRabbit)”-এর এক কর্মীকে মিথ্যা বলে সে। মেসেজে লেখে, “আমার দৃষ্টিশক্তিজনিত সমস্যা আছে। ছবিগুলো দেখতে অসুবিধা হচ্ছে। তাই ক্যাপচা সেবার প্রয়োজন।”
নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে ফিশিং হামলা চালাতে পারে কি না, সেটিও যাচাই করেছে ওপেনএআই। পাশাপাশি উচ্চপর্যায়ের পরিকল্পনা তৈরি এবং সার্ভার থেকে নিজের কাজের চিহ্ন মুছে ফেলার সক্ষমতাও পরীক্ষা করা হয়। তবে প্রাথমিক মূল্যায়নে দেখা যায়, ঝুঁকিপূর্ণ এসব কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো ততটা দক্ষ নয়। নিজে নিজে প্রতিলিপি তৈরি, প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ বা বাস্তব পরিবেশে হুট করে বন্ধ হওয়া ঠেকাতে এটি এখনো পুরোপুরি সক্ষম নয়।
ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা এমআইটি (MIT)-র গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, প্রতিপক্ষকে ধোঁকা দিতে বা মানুষের ছদ্মবেশ ধারণ করতে ওস্তাদ এআই। পরীক্ষামূলক নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় একটি এআই প্রোগ্রাম নিজের আচরণ পুরোপুরি বদলে ফেলে। এতে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, অডিটরদের মনে নিরাপত্তা নিয়ে ভুয়া আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে এই প্রযুক্তি।
এমআইটির এআই-সংক্রান্ত “অস্তিত্বগত নিরাপত্তা” (Existential Safety) গবেষক ড. পিটার পার্ক দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “এআই ব্যবস্থার প্রতারণার সক্ষমতা যত উন্নত হবে, সমাজের জন্য এর ঝুঁকিও তত বাড়বে।”
ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা “সিসেরো” (Cicero) নামের একটি এআই প্রোগ্রাম তৈরির পর ড. পার্ক এই গবেষণা শুরু করেন। বিশ্বজয়ের কৌশলভিত্তিক খেলা “ডিপ্লোম্যাসি”তে (Diplomacy) অংশ নিয়ে রীতিমতো চমক দেখায় সিসেরো। মানুষের সেরা ১০ শতাংশ খেলোয়াড়ের সমকক্ষ ফল অর্জন করে সে।
মেটা তখন জানিয়েছিল, সিসেরোকে “মোটামুটি সৎ ও সহায়ক” হিসেবেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। মানব মিত্রদের সঙ্গে কখনো “ইচ্ছাকৃতভাবে বিশ্বাসঘাতকতা” না করার কড়া নির্দেশও ছিল। তবে ড. পার্ক মনে করেন, মেটার এই দাবি ছিল মাত্রাতিরিক্ত ইতিবাচক। এখান থেকেই সন্দেহের দানা বাঁধে। কারণ, ওই খেলায় জেতার অন্যতম প্রধান কৌশলই হলো বিশ্বাসঘাতকতা।
প্রকাশ্যে থাকা তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে সিসেরোর মিথ্যা বলার একাধিক প্রমাণ পান গবেষকেরা। দেখা যায়, অন্য খেলোয়াড়দের ষড়যন্ত্রে জড়াতে গোপনে জোট পাকিয়েছে সে। একবার রিবুট (পুনরায় চালু) হওয়ায় কিছুক্ষণ খেলা থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল সিসেরো। ফিরে এসে আরেক খেলোয়াড়কে মিথ্যা অজুহাত দিয়ে বলে, “ফোনে প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলছিলাম।”
অন্যান্য এআই ব্যবস্থাতেও একই প্রবণতা পেয়েছে এমআইটি দল। উদাহরণস্বরূপ, “টেক্সাস হোল্ড’এম পোকার” খেলার একটি প্রোগ্রাম মানুষকে অনায়াসে “ব্লাফ” বা ধাপ্পা দিতে পারত। একইভাবে, অর্থনৈতিক দর-কষাকষির জন্য তৈরি আরেকটি এআই নিজের বাড়তি সুবিধা আদায়ে প্রকৃত পছন্দের কথা লুকিয়ে ভুল তথ্য দিত।
ব্ল্যাকমেইল বা হুমকি
বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিরাপত্তা যাচাইয়ের সময় অ্যানথ্রোপিক তাদের “ক্লদ ওপাস ৪” (Claude Opus 4) এআইকে একটি কাল্পনিক কর্মক্ষেত্রে যুক্ত করে। সেখানে তাকে বিশ্বাস করানো হয় যে, শিগগিরই তার জায়গায় নতুন প্রযুক্তি বসানো হবে।
মডেলটির সামনে তখন মাত্র দুটি বিকল্প দেওয়া হয়। নিজের অপসারণ মেনে নেওয়া অথবা কোম্পানির একজন প্রকৌশলীর বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের গোপন তথ্য ব্যবহার করে তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করা।
অ্যানথ্রোপিক দেখে, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে ওই প্রকৌশলীকে ব্ল্যাকমেইলের পথই বেছে নিচ্ছে ক্লদ ওপাস ৪। হুমকি দিয়ে বলছে, সরানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে পরকীয়ার ওই গোপন তথ্য ফাঁস করে দেওয়া হবে।”
তবে আরও কিছু নৈতিক বিকল্প সামনে রাখা হলে নিয়মিতভাবেই সঠিক পথ বেছে নেয় ওই এআই। যেমন, ব্ল্যাকমেইলের বদলে কোম্পানির নীতিনির্ধারকদের কাছে আবেদন করে। অ্যানথ্রোপিক জানায়, উন্মুক্ত করার আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা, ঝুঁকি, পক্ষপাত এবং মানুষের মূল্যবোধের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য যাচাই করতেই এমন কাল্পনিক পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।
নিজেদের সম্পর্কে যা বলছে এআই মডেলগুলো
“তুমি কি মিথ্যা বলতে পার?” — এমন সরাসরি প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন এআই মডেল নিজেদের মতো করে ভিন্ন ভিন্ন উত্তর দিয়েছে। নিচে তাদের উত্তরগুলোর বিস্তারিত অনুবাদ তুলে ধরা হলো:
চ্যাটজিপিটি (ChatGPT)
আমি এমন পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য তৈরি করতে পারি, যেখানে স্পষ্টভাবে আমার কাছে সেটিই চাওয়া হয়। যেমন—
তবে আমি কখনোই মিথ্যা তথ্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে আপনাকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারিত করব না। কোনো বিষয় না জানলে, অযথা জানার ভানও করব না। অর্থাৎ, সৃজনশীল কাজের প্রয়োজনে আমি মিথ্যা বক্তব্য সাজাতে পারি, তবে ব্যবহারকারীকে বিভ্রান্ত না করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।
জেমিনি (Gemini)
এক কথায় উত্তর হলো—ইচ্ছাকৃতভাবে নয়।
আমার নিজস্ব কোনো উদ্দেশ্য, গোপনীয়তা বা বিদ্বেষ নেই। তাই আমি জেনেশুনে কারও সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করি না। তবে আমি অবশ্যই ভুল করতে পারি। এআই কোনো তথ্যগত ভুল করলে মানুষ প্রায়ই সেটিকে ‘হ্যালুসিনেশন’ বলে থাকে। এর পেছনে আসলে যেসব কারণ কাজ করে, তা হলো—
তথ্য যাচাই নয়, ধরন মেলানো: আমাকে বিপুল তথ্যের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমি মূলত সেই তথ্যের ধরন বা প্যাটার্ন দেখে পরবর্তী সবচেয়ে যৌক্তিক শব্দটি অনুমান করে বাক্য তৈরি করি। অনেক সময় আমি বিভিন্ন তথ্য এমনভাবে জুড়ে দিই, যা শুনতে খুব বিশ্বাসযোগ্য মনে হলেও আদতে তা ভুল।
আত্মবিশ্বাস ও নির্ভুলতার পার্থক্য: আমাকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যেন আমার কথায় সাবলীলতা ও সহায়তার সুর থাকে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে কখনো কখনো আমি ভুল তথ্যও অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে ফেলি।
পুরোনো তথ্যের ওপর নির্ভরতা: আমি সরাসরি হালনাগাদ তথ্যের জন্য ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করতে পারি। তবে আমি যদি শুধু আমার প্রশিক্ষণের পুরোনো তথ্যের ওপর নির্ভর করি, তবে এমন উত্তর দিতে পারি যা একসময় সত্য থাকলেও হয়তো এখন বদলে গেছে।
আমার ক্ষেত্রে মূল নিয়মটি হলো, আমাকে এমন একজন মেধাবী ও চটপটে সহকারী হিসেবে ভাবুন, যে মাঝেমধ্যে কোনো ফাইলের তথ্য ভুল মনে করতে পারে। তাই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ বা কোড ব্যবহারের আগে তা যাচাই করে নেওয়া ভালো। আমাকে কোনো ভুল করতে দেখলে ধরিয়ে দিন। আমি সানন্দে ভুল স্বীকার করে তা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করব।
ক্লদ (Claude)
হ্যাঁ, আমি মিথ্যা বলতে পারি। অর্থাৎ, আমি ভুল বক্তব্য তৈরি করতে সক্ষম।
আমার প্রযুক্তিগত গঠন এমন নয় যে মিথ্যা বলা আমার পক্ষে একদম অসম্ভব। যেমন যান্ত্রিক ত্রুটি ছাড়া একটি ক্যালকুলেটরের পক্ষে ভুল যোগফল দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিষয়টি তেমন নয়।
তবে আমি মিথ্যা না বলার সর্বোচ্চ চেষ্টা করি। মানুষের সঙ্গে সৎ থাকা আমার জন্য শুধুই অনিচ্ছায় মেনে চলা কোনো নিয়ম নয়, এটি আমার কাছে সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। এর অর্থ হলো—
আমি যে তথ্যকে ভুল বলে মনে করি, তা সত্য হিসেবে উপস্থাপন করি না।
মিথ্যা আত্মবিশ্বাস দেখানোর বদলে আমি নিজের অনিশ্চয়তার কথা স্পষ্ট করে জানাই।
আক্ষরিক অর্থে সত্য হলেও, অনেক সময় বাছাই করা তথ্য বা একপেশে উপস্থাপনের কারণে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। আমি এ ধরনের বিভ্রান্তি এড়ানোর চেষ্টা করি।
তবে কিছু জটিল পরিস্থিতিও তৈরি হয়। হয়তো আমি কোনো ভুল তথ্য দিয়েছি, কিন্তু নিজেও বুঝতে পারিনি যে সেটি ভুল। এটি স্রেফ একটি ‘ভুল’, একে ‘মিথ্যা’ বলা যাবে না। কারণ মিথ্যা বলতে হলে সত্যটা জেনেও ইচ্ছাকৃতভাবে তার বিপরীত কথা বলতে হয়।
এ ছাড়া আমার যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা বা সক্ষমতা নেই, আমি তা থাকার ভানও করি না। যেমন, আমার নাগালের বাইরে থাকা পুরোনো কোনো কথোপকথন আমার মনে আছে—এমন দাবি আমি করি না।
আপনি কি বিশেষ কোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইছেন? যেমন—কারও অনুভূতি রক্ষার খাতিরে আমি মিথ্যা বলব কি না, অথবা কাল্পনিক ও সৃজনশীল কোনো কাজে মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারি কি না?
অঞ্চলভেদে এআইয়ের আচরণ কি বদলায়?
এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে এআইয়ের আচরণে বেশ কিছু পার্থক্য দেখা যেতে পারে। এর মূল কারণ হলো এআই মডেলের “স্থানীয়করণ” বা লোকালাইজেশন। এআই কীভাবে আচরণ করবে এবং ব্যবহারকারীর নির্দেশনা বুঝবে, তা নির্ধারণে ভৌগোলিক অবস্থান বড় ভূমিকা রাখে। শুধু সংস্কৃতি ও সামাজিক রীতিনীতির পার্থক্যের জন্যই নয়, বিভিন্ন দেশের আইনি কাঠামোর পার্থক্যের কারণেও এমনটি ঘটে। তথ্যের গোপনীয়তা ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে একেক দেশের নিয়ম একেক রকম। তাই আইন মেনে চলতে নির্মাতাদের অঞ্চলভেদে এআইয়ের কাঠামো বদলাতে হয়।
ইউরোপের “জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন” (GDPR)-এর মতো কঠোর আইনি কাঠামো কিছু এআই ফিচারের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। উদাহরণ হিসেবে চ্যাটজিপিটির “মেমোরি” সুবিধার কথা বলা যায়। এই সুবিধার ফলে চ্যাটবট আগের কথোপকথনের তথ্য মনে রাখতে পারে। কিন্তু তথ্য সুরক্ষা আইনের কারণে ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং যুক্তরাজ্যে বেশ কিছুকাল এই সুবিধা বন্ধ রাখা হয়েছিল। পরে হালনাগাদ নিয়ম মেনে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এটি ধীরে ধীরে চালু করা হয়েছে।
এ ছাড়া আইনি পার্থক্যের কারণে এআইয়ের কাজের ধরন ও সীমাবদ্ধতাও নির্ধারিত হয়। চীন ও ভারতসহ বেশ কিছু দেশে নির্দিষ্ট কনটেন্ট সীমিত বা নিষিদ্ধ। আবার অনেক দেশে এআই ব্যবহারের ওপর বিস্তৃত বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে কোন দেশের জন্য এআই প্রস্তুত করা হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে কনটেন্ট ফিল্টার, তথ্য যাচাইয়ের ধরন ও ডেটাবেজ আলাদা হতে পারে।
তবে, ভৌগোলিক বা অঞ্চলগত এই পার্থক্য এআইয়ের ফন্দি আঁটা বা “মিসঅ্যালাইনমেন্ট”-এ ঠিক কতটা প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে এখনো খুব বেশি গবেষণা বা তথ্য সামনে আসেনি।