
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও ইনফ্লুয়েন্সার চার্লি কার্ককে ইউটাহ ভ্যালি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অনুষ্ঠানে (২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর) গুলি করে হত্যা করা হয়। সাংবাদিকরা কিবোর্ডে কিছু লেখার আগেই এ খবর বিশ্বের লাখো মানুষ জেনে গেছে সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে।
প্রথাগত কোনো সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইটে খবর প্রকাশের অপেক্ষা করতে হয়নি, এই প্রকাশ্য রক্তাক্ত হত্যাকাণ্ডের ভিডিও সরাসরি ব্যবহারকারীদের সামাজিক মাধ্যমের ফিডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ভিডিও অতিমাত্রায় সহিংস কি না- এমন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষাও করা হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভিডিওগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলার আগে দেখানো হয়নি কোনো সতর্কবার্তাও।
এ ঘটনায় অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনার শিশু-কিশোরদের এমন ভিডিও থেকে সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে সামাজিক মাধ্যমগুলোকে। সংস্থাটির ভাষ্য, “সব প্ল্যাটফর্মের দায়িত্ব অবৈধ ও ক্ষতিকর কনটেন্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলা বা এর বিস্তার সীমিত করে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা দেওয়া।”
এটাই সংবাদ প্রবাহের বর্তমান বাস্তবতা। চরম সহিংসতার ভিডিও প্রায়ই প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের সম্পাদনাগত যাচাই-বাছাই এড়িয়ে সরাসরি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যেই এসব ভিডিও লাখো মানুষ, এমনকি শিশু-কিশোরের কাছে পৌঁছে যায়। এর প্রভাব শুধু তরুণদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; পুরো সমাজকেই এটি প্রভাবিত করে।
টিকটক, ইনস্টাগ্রাম এবং এক্স–এর মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো তুলনামূলক বেশি ব্যবহার করে তরুণরা। এ কারণে বয়স্কদের তুলনায় অনলাইনে সহিংস ও পীড়াদায়ক কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনাও তাদের বেশি থাকে।
২০২৪ সালে যুক্তরাজ্যে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ কিশোর-কিশোরী সামাজিক মাধ্যমের ফিডে সহিংস ভিডিও দেখেছে।
সামাজিক মাধ্যমে যে ধরনের সহিংস দৃশ্য সামনে আসে, তার পরিসরও বিস্তৃত। এর মধ্যে স্কুলে মারামারির ভিডিও, ছুরি নিয়ে হামলা যেমন থাকে, তেমনি যুদ্ধের দৃশ্য থেকে শুরু করে সন্ত্রাসী হামলার ফুটেজ পর্যন্ত আছে।
এসব ভিডিও সাধারণত অত্যন্ত মর্মস্পর্শী, রগরগে এবং ব্যবহারকারীর সামনে আসে অপ্রত্যাশিতভাবে।
এ ধরনের সহিংস ভিডিও দেখার প্রভাব কিছু ক্ষেত্রে এতটাই গভীর হয় যে, শিশুরা ঘরের বাইরে বের হতেও ভয় পেতে শুরু করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, পীড়াদায়ক ভিডিও নিয়মিত দেখলে ট্রমার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে, যদি সেই সহিংসতা নিজের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে হয়।
গবেষণা বলছে, সামাজিক মাধ্যম শুধু তরুণদের সহিংস আচরণের প্রতিফলন নয়; অনেক ক্ষেত্রেই সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করে। হয়রানি, গ্যাং সংশ্লিষ্ট সহিংসতা, প্রেমের সম্পর্কে আগ্রাসী আচরণ, এমনকি নিজের প্রতি সহিংস আচরণের ঘটনাও এখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এসব কনটেন্টের সংস্পর্শ তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য, আচরণ এবং শিক্ষাজীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে, বারবার সহিংস কনটেন্ট দেখে সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়। নিয়মিত সহিংসতা ও কষ্টের দৃশ্য দেখে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং অন্যের দুর্ভোগের প্রতি সহমর্মিতা হ্রাস পায় মানুষের।
গবেষকেরা এ প্রসঙ্গে কাল্টিভেশন তত্ত্ব -এর কথাও উল্লেখ করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, যারা নিয়মিত সহিংস কনটেন্ট দেখেন, তারা ধীরে ধীরে পৃথিবীকে আরও বেশি বিপজ্জনক বলে ভাবতে শুরু করে। যদিও বাস্তবতা হয়তো ভিন্ন।
এ ধরনের বিকৃত বা অতিরঞ্জিত ধারণা, নিজেরা কখনো সরাসরি সহিংসতার শিকার হয়নি- এমন ব্যক্তিদের দৈনন্দিন আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
গণমাধ্যমে সহিংসতা প্রচারের ইতিহাস প্রায় গণমাধ্যমের বয়সের সমান।
প্রাচীন গ্রিকরা মৃৎপাত্রে যুদ্ধ ও হত্যার দৃশ্য এঁকে রাখত। রোমানরা গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াইয়ের কাহিনি লিখে গেছে। ইতিহাসের প্রথম দিকের আলোকচিত্রগুলো তোলা হয়েছিল ক্রিমিয়ান যুদ্ধের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি জানতে মানুষ সিনেমা হলে গিয়ে নিউজরিল দেখত।
ভিয়েতনাম যুদ্ধকে প্রথম ‘টেলিভিশনের যুদ্ধ’ বলা হয়। কারণ, এই যুদ্ধের সহিংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞের দৃশ্য প্রথমবারের মতো টেলিভিশনের মাধ্যমে মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। তবে টেলিভিশনে প্রচারিত সেই ফুটেজও সম্পাদনাগত যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যেত। সহিংস দৃশ্য সম্পাদনা করা হতো, প্রয়োজনীয় বর্ণনা ও প্রেক্ষাপট যোগ করা হতো।
সহিংসতাকে একদম স্বচক্ষে দেখার অনুভূতি এনে দেওয়ার কাজটি করেছে সামাজিক মাধ্যম।
মোবাইল ফোন বা ড্রোনে ধারণ করা যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও এখন প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে টিকটক বা ইউটিউবে আপলোড করা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
অনেক ক্ষেত্রেই এসব ভিডিও কোনো প্রেক্ষাপট বা ব্যাখ্যা ছাড়াই প্রকাশ করা হয়। ফলে ব্যবহারকারীরা হঠাৎ করেই অত্যন্ত সহিংস দৃশ্যের মুখোমুখি হতে পারেন।
সামাজিক মাধ্যমে ‘যুদ্ধ ইনফ্লুয়েন্সার’ নামে নতুন ধরনের কনটেন্ট ক্রিয়েটরের আবির্ভাব ঘটেছে। তারা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল থেকে নিয়মিত কনটেন্ট পোস্ট করেন। তবে যুদ্ধসংবাদ সংগ্রহে প্রশিক্ষিত সাংবাদিকদের মতো এদের অনেকেরই সম্পাদনা নিয়ে কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ফলে যুদ্ধের প্রতিবেদন এবং যুদ্ধকে আকর্ষণীয় কনটেন্ট হিসেবে উপস্থাপনের মধ্যকার পার্থক্য ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এসব কনটেন্ট খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এগুলো খোঁজেননি, তাদের কাছেও পৌঁছে যায়।
ইসরায়েল সামরিক বাহিনী তো যুদ্ধ ইনফ্লুয়েন্সারদের ব্যবহার করে থার্স্ট ট্র্যাপ তৈরি করে প্রোপাগান্ডাও চালায়। ‘থার্স্ট ট্র্যাপ’ হলো ইচ্ছে করে বানানো দৃষ্টি আকর্ষণকারী, লোভনীয় পোস্ট; যাতে বেশি মানুষের নজরে পড়ে এবং ব্যবহারকারীরা এতে যুক্ত হয়।
সামাজিক মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংস কনটেন্টের মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকি কমাতে কয়েকটি সহজ পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
তবে এসব পদক্ষেপ সব সময় কার্যকর নয়। বাস্তবতা হলো, সামাজিক মাধ্যম ফিডে কী দেখবেন, সে বিষয়ে ব্যবহারকারীর নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম এখনো ব্যবহারকারীদের চাঞ্চল্যকর কনটেন্টের দিকে ঠেলে দেয়।
চার্লি কার্কের হত্যার ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা দেখিয়েছে, ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবস্থা কতটা দুর্বল। সহিংস কনটেন্ট নিষিদ্ধ করার আনুষ্ঠানিক নীতিমালা থাকলেও, এমন ভিডিওগুলো অনেক সময় সেই নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে শিশু-কিশোরসহ বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যায়।
এ পরিস্থিতি সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর ওপর আরও কঠোর ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রয়োজনীয়তাকেই সামনে নিয়ে আসে।
স্যামুয়েল কর্নেল ও টি.জে. থমসন-এর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো।