আপনার বোকাসোকা কিন্তু ভালো মানুষ আত্মীয় হঠাৎ এক সুপরামর্শ নিয়ে হাজির। পরামর্শটি হলো, ডিম খাওয়া বন্ধ করতে হবে। কারণ, তিনি পড়েছেন, গবেষণা বলেছে ডিম স্বাস্থ্যের জন্য ভালো না।
এসব ক্ষেত্রে আপনার এই আত্মীয়কে কতটা বিশ্বাস করবেন? এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সকালের নাস্তায় কী খাবেন, না খাবেন- এমন বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই নতুন গবেষণায় কতটা আস্থা রাখবেন?
স্বীকার করে নেওয়া ভালো, এই লেখা ডিমের ভালো বা খারাপ দিক নিয়ে বলবে না। বরং কীভাবে অসংখ্য গবেষণা থেকে প্রাপ্ত ছোট ছোট অংশ মিলেই বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্ম হয়, সেটা জানানোই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। নিত্য নতুন গবেষণার ফল পূর্ব ধারণার সাথে মিলছে কি মিলছে না- এর ওপর নির্ভর করে বিজ্ঞানীদের প্রতিদিনকার জ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিমার্জিত হচ্ছে।
ভূগোলবিদ হিসেবে বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানের কাজ করার পাশাপাশি বিজ্ঞান শেখাই আমি। চেষ্টা করি বিজ্ঞান মূলত কীভাবে কাজ করে তা বোঝানোর। বহু মানুষ কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষা বা গবেষণাকেই ওই বিষয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বলে ধরে নেয়। তাদেরও দোষ নেই, সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক মাধ্যম সেভাবেই প্রচার করে। কিন্তু কোনো নতুন গবেষণাকে গ্রহণ করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো, নতুন গবেষণার ফলকে কীভাবে এ বিষয়ের অন্য কাজগুলোর সঙ্গে একীভূত করে আরও পরিষ্কার চিত্র উপস্থাপন করা যায়, সেটা বের করা।
অধিকাংশ গবেষণা দুটি কারণে করা হয়- আমাদের জ্ঞানের ঘাটতি দূর করতে অথবা প্রচলিত কোনো ধারণা পরীক্ষা করে দেখতে, আসলেই তা ঠিক কি না। বিষয় নির্বাচনের পর বিজ্ঞানীরা সে লক্ষ্য অর্জনে একটি গবেষণা পরিকল্পনা করেন। হয়তো, একটি রাসায়নিক কোষে কীভাবে প্রভাব ফেলে তা জানতে পরীক্ষা চালান, অথবা ঘূর্ণিঝড়ে পানির তাপমাত্রা কীভাবে প্রভাব ফেলে তা দেখেন। এরপর গবেষকেরা প্রাপ্ত ফল পিয়ার-রিভিউড (একই বিষয় নিয়ে কাজ করছেন এমন গবেষকদের) কোনো জার্নালে পাঠান। তখন, এই বিষয়ের অন্য বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত নেন, এই গবেষণা আসলেই প্রকাশযোগ্য কি না।
সব জার্নালেই এ কাজটা খুব নিখুঁতভাবে হয়, তা নয়। ‘পেপার মিলস’ বা যেসব জার্নাল কাগজে-কলমে পাণ্ডিত্যপূর্ণ হলেও অর্থের বিনিময়ে যা পায়, তাই ছাপায়; এমন কিছুতে প্রকাশিত গবেষণা কখনোই নির্ভরযোগ্য নয়।
পিয়ার রিভিউড মানেই যে গবেষণার ফল নিঃসন্দেহে গ্রহণযোগ্য তা না, তবে ভরসার জায়গাটা বাড়ে। এককভাবে প্রকাশিত গবেষণায় অনিচ্ছাকৃত ভুল, যেমন নিরীক্ষার সময়ে হিসাববহির্ভূত কোনো ত্রুটি থাকতে পারে, মাঝে মাঝে ইচ্ছাকৃত প্রতারণার সম্ভাবনাও থাকে।
কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণাই এককভাবে কোনো সমস্যার সমাধান একবারেই করে ফেলতে পারে না। আগের সব গবেষণাকেও উড়িয়ে দেয় না। ভালো গবেষণা কোনো একটি বিষয়ে বৈজ্ঞানিক সমাজের চিন্তায় কিছু অবদান রাখে। পরের গুরুত্বপূর্ণ ধাপটি হলো একই বিষয়ে অন্যান্য গবেষণার সঙ্গে এই গবেষণার প্রাসঙ্গিকতা খুঁজে বের করা।
বর্তমানে স্বীকৃত, এমন কিছুরও খুঁত বের করে আনতে পারে নতুন গবেষণা। আর এ থেকেই আরও গবেষণার জন্ম হতে পারে, যা সঠিক তথ্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে। নতুন কোনো তথ্য হলে সে অনুযায়ী জ্ঞানকে পরিমার্জিত করাটাই বিজ্ঞানের শিক্ষা।
প্রথমেই যে প্রশ্নটা করতে হবে, এই গবেষণার পুনরাবৃত্তি হয়েছে কি না, অর্থাৎ অন্য গবেষকরা কি একই পদ্ধতি অনুকরণ করে একই ফল পেয়েছেন কি না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, বৈজ্ঞানিক গবেষণায় পুনরাবৃত্তি বিরল ঘটনা। এর চেয়ে তুলনাযোগ্য তথ্য দিয়ে বা ভিন্ন পদ্ধতিতে কিংবা এ দুইয়ের সমন্বয়ে একই ধরনের গবেষণা হতেই বেশি দেখা যায়।
যদি দেখা যায়, একাধিক বিজ্ঞানী একই বিষয়ে একাধিক গবেষণা করেছেন, যেগুলো পিয়ার রিভিউ করা হয়েছে, কোনো গবেষণাধর্মী জার্নালে সেগুলো প্রকাশ হয়েছে এবং সবগুলোই প্রায় একই ফলের ইঙ্গিত দেয়, তখন এই গবেষণার ফল নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হতে পারেন। অবশ্য, গবেষকরাই যদি একমত হতে না পারেন, তখন উল্টোটা হওয়াও স্বাভাবিক।
মাঝেমাঝে গবেষকরা সিস্টেম্যাটিক রিভিউ– যেখানে ভিন্ন ভিন্ন গবেষণাগুলো জড়ো করে তুলনা করা হয়, করে থাকেন। তারা হয়তো বিভিন্ন গবেষণার তথ্য নিয়ে পরিসংখ্যানের বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে মেটা-অ্যানালাইসিস করেন। এসব ক্ষেত্রে যত বেশি উপাত্ত জোগাড় করা যায় তত ভালো।
আরেকটি বিষয় হলো, একটি বিষয়ে কতগুলো গবেষণা হয়েছে। ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে হাজারো গবেষণা হয়েছে; কিন্তু কীভাবে একটি নির্দিষ্ট জিন চুল পড়ায় প্রভাব ফেলে, এ নিয়ে হয়তো একটি বা দুটি গবেষণা হয়েছে। ফলে এই লেখকের টাক মাথার পেছনে এই জিনের দায় কতটা- এ আলোচনার চেয়ে ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে কথা বলার সময় বেশি আত্মবিশ্বাসী থাকবেন বিজ্ঞানীরা।
যুক্তির গ্রহণযোগ্যতার কত বেশি তা বুঝতে পারা, যুক্তিটা অনুধাবন করার মতোই গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞদের গুরুত্ব কমে যাচ্ছে ইদানীং। কিন্তু, বৈজ্ঞানিক বিষয়াদি বোঝার জন্য বিশেষজ্ঞ গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞ মানে এমন কেউ যিনি এই বিষয়ে বহু বছর ধরে কাজ করছেন, এ সংক্রান্ত গবেষণাগুলো পরীক্ষা করতে জানেন, এবং সবচেয়ে ভালো হয়, যদি এ ব্যাপারে তার গবেষণা থাকে।
এমন অভিজ্ঞতাই একজন বিশেষজ্ঞকে কোনো গবেষণা ভালো না খারাপ- সে ব্যাপারে মতামত দেওয়ার যোগ্য করে তোলে। তবে এটাও সত্যি, যা পছন্দ সেটা মেনে নেওয়া আর পছন্দ না হলে তা বাতিল করে দেওয়ার অতিমানবিক ইচ্ছাকে অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবেও, অধিকাংশ মানুষের পক্ষেই সরাসরি কোনো বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা কঠিন। সেটা যখন সম্ভব হয় না, তখন সে বিষয়ে শিক্ষিত কারও (আসলেই শিক্ষিত, ইন্টারনেটে কয়েক ঘণ্টা এ নিয়ে ব্রাউজ করেছে কেউ নয়) সঙ্গে কথা বলা উচিত। স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে বহুদিন ধরে জড়িত, চিকিৎসা বিষয়ে অভিজ্ঞ এবং এই খাতের গবেষণার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারেন, এমন ব্যক্তিরাই এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রেও সাবধান হতে হবে। এমন কারও ওপর আস্থা রাখুন যিনি সবকিছু বিবেচনা করে পরামর্শ দেন, এমন কেউ নন, যিনি নতুন কিছু দেখলে সেটাই ধ্যানজ্ঞান করে ফেলেন।
বাস্তবে, কিছু কিছু স্বাস্থ্যকর্মী পাবেন- আশা করি সংখ্যাটা কম, যাদের এসব ক্ষেত্রে বিশ্বাস করা যায় না। যদি কোনো কিছু অবিশ্বাস্য রকম ভালো মনে হয়, তাহলে সম্ভবত তা বিশ্বাস না করাই ভালো। হয়তো সে পরামর্শের পেছনে আর্থিক বা ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থ আছে পরামর্শদাতার।
সামাজিক মাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে যাই পড়ুন, কিছুটা সন্দিহান থাকা ভালো।
নতুন গবেষণার ভুলত্রুটি ধরতে পারেন, এমন একজন ভালো সাংবাদিক এসব বিষয়ে সহায়ক হতে পারেন। এমন সাংবাদিকদের কথা হচ্ছে, যারা নতুন গবেষণা নিয়ে নির্মোহ ও নিখুঁত প্রতিবেদন লিখতে জানেন এবং প্রচলিত জ্ঞানের সঙ্গে নতুন তথ্যের সমন্বয় ঘটাতে পারেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ভালো ও খারাপ সাংবাদিকের কোনো তালিকা নেই। তবে পার্থক্য করার উপায় আছে, সাংবাদিকতার অলাভজনক সংস্থা দ্য ট্রাস্ট প্রজেক্ট– এর গাইডলাইন একটি ভালো উৎস হতে পারে।
কোনো স্বার্থের দ্বন্দ্ব আছে কি না, সে ব্যাপারে সাহায্য করতে পারেন বিজ্ঞান কীভাবে কাজ করে এ ব্যাপারে ভালো ধারণা রাখা সাংবাদিকরা। দিনে কেজিখানেক চকলেট খেলে উজ্জীবিত থাকা যায়, এমন গবেষণার অর্থায়ন কি কোনো প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতিষ্ঠান করছে? সেক্ষেত্রে পুরো ব্যাপারটা সন্দেহজনক।
আমি বলছি না, বিজ্ঞানের কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে বা সপ্তাহে কয়টা ডিম খাবেন- সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করতে হবে সবাইকে। তবে আপনি কী জানেন এবং বোঝেন সে বিষয়ে একটু বিনয়ী হওয়ার অনুরোধ করব। সে সাথে নিজ জ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক সমাজের উপলব্ধির সীমাবদ্ধতার বাস্তবতাও বুঝতে বলব।
আর কোনো প্রতিবেদনে “গবেষণায় বলেছে” বললেই জীবন বদলে দেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে যাবেন না, এমনকি আপনার খুব কাছের আত্মীয় পরামর্শ দিলেও!
ডক্টর জেফরি এ. লি -এর এই লেখাটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল দ্য কনভারসেশন-এ। ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের অধীনে পুনরায় এখানে প্রকাশ করা হলো। অনুবাদ করেছেন ডিসমিসল্যাবের ডেপুটি ম্যানেজার আসম ফেরদৌস রহমান।