নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক দাবি বেলুচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র, স্বাধীনতার ঘোষণা

স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছে বেলুচিস্তান, এখনো স্বাধীন রাষ্ট্র হয়নি

নোশিন তাবাসসুম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

পাকিস্তান থেকে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণার একটি বিবৃতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার সৃষ্টি করেছে। “রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান”-এর নামে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে যে, নতুন প্রশাসন এই ভূখণ্ডের ৮৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং তারা নিজস্ব জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, মুদ্রা ও শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তবে, পাকিস্তান সরকার কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা এ দাবির আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।

ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ১৫ জুন একটি পোস্টে লেখা হয়, “আনুষ্ঠানিকভাবে বেলুচিস্তান আজ থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র! ভেঙে গেছে পাকিস্তান।” ফেসবুকের একাধিক (,,,,) ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একই দাবিতে পোস্ট করা হয়।

ফ্যাক্টচেক দাবি বেলুচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র, স্বাধীনতার ঘোষণা
ভুয়া দাবিতে ছড়ানো ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

যাচাইয়ে দেখা যায়, গত ১৩ জুলাই শীর্ষস্থানীয় বালুচ নেতা এবং মানবাধিকার কর্মী মীর ইয়ার বালুচ নিজের ভেরিফায়েড এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে একটি বিবৃতি পোস্ট করে ক্যাপশনের এক অংশে লেখেন, “ব্রেকিং নিউজ রিপাবলিক অফ বেলুচিস্তানের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনী বেলুচিস্তানের ৮৫% ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করেছে।” এ পোস্টের বিবৃতিতে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। বিবৃতির এক অংশে লেখা, “বেলুচিস্তান তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, তাদের জাতীয় সংগীত ‘মা চুকাইন বালুচানি’ গ্রহণ করেছে, জাতীয় পতাকা প্রবর্তন করেছে, নিজস্ব মুদ্রা ‘বালুচি ফালাস’ চালু করেছে এবং এখন বেলুচিস্তানের ৮৫% ভূখণ্ড তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” 

বিবৃতিটি প্রকাশের পর একাধিক (,,, ) ভারতীয় গণমাধ্যম প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। দ্য সানডে গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, “একটি ভাইরাল হওয়া ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’-এর চিঠিতে স্বাধীনতা, নতুন পতাকা এবং মুদ্রার দাবি করা হয়েছে, তবে কর্মকর্তারা এই ঘোষণার সত্যতা যাচাই করেননি।” 

বিবৃতিতে কী বলা হয়েছে

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণায় প্রকাশিত বিবৃতিটিতে শুরুতে “দ্য রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান” লেখা। বিবৃতির ডান দিকে উপরে দ্য রিপাবলিক অব বেলুচিস্তানের লোগো দেখা যায়। বিবৃতিটিতে কোথাও কোনো সংগঠনের নাম বা কোনো নেতার নাম দেখা যায়নি। ঘোষণার শেষে বলা হয়েছে, “মুক্ত বিশ্বের জন্য এখন ‘রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান’-এর স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করতে সাহায্য করার সময় এসেছে; যা আমাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের কয়েক দশকের শত্রুতা, পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল এবং উগ্রবাদের অবসান ঘটাবে।” বিবৃতিটির শেষেও শুধু দ্য রিপাবলিক অব বেলুচিস্তান লেখা দেখা যায়।

  • ফ্যাক্টচেক দাবি বেলুচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র, স্বাধীনতার ঘোষণা
  • ফ্যাক্টচেক দাবি বেলুচিস্তান স্বাধীন রাষ্ট্র, স্বাধীনতার ঘোষণা

বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণার ইতিহাস  

বালুচ আন্দোলন শুরু হয়েছে ১৯৪৭ সাল থেকেই। ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির পর, বর্তমান বেলুচিস্তানের একটি বড় অংশ নিয়ে গঠিত তৎকালীন করদ রাজ্য ‘কালাত’ প্রাথমিকভাবে স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিল। তবে, ১৯৪৮ সালে এই অঞ্চলটিকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়; যা অনেক বালুচ নেতা এবং ইতিহাসবিদ জোরপূর্বক ও অবৈধ বলে মনে করেন। 

এরপর থেকে, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে অন্তত পাঁচটি বড় ধরনের গণ-অভ্যুত্থান দেখা গেছে, যার মধ্যে বিদ্রোহের বর্তমান ধাপটি ২০০৩ সাল থেকে চলমান রয়েছে। এই আন্দোলনগুলোতে সশস্ত্র প্রতিরোধের পাশাপাশি রাজনৈতিক সক্রিয়তারও ভূমিকা দেখা গেছে, যেখানে বালুচ স্টুডেন্টস অর্গানাইজেশন, বালুচিস্তান লিবারেশন আর্মি এবং বালুচিস্তান লিবারেশন ফ্রন্টের মতো সংগঠনগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৪ মে, বালুচ নেতারা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বেলুচিস্তানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়ে একটি ঘোষণা জারি করেন এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানান। 

তৃতীয় বারের মতো গত ১৩ জুলাই আবারও বেলুচিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। তবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেও এখন পর্যন্ত পাকিস্তান, জাতিসংঘ বা অন্য কোনো রাষ্ট্র থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আসেনি বা কোনো রাষ্ট্র বেলুচিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।  

আরো কিছু লেখা