ভিন্ন কোনো কাজের কথা বলে নয়, বরং রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েই বাংলাদেশিদের লক্ষ্য করে ফেসবুকে বিজ্ঞাপন চলছে। প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বছরে প্রায় ৭৯ লাখ টাকা আয়ের। বিজ্ঞাপনগুলোর মন্তব্যে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেক বাংলাদেশিকেও। যদিও রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার জন্য রাশিয়া যাওয়ার কোনো অনুমতি নেই বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
গত ২২ জুলাই থেকে ফেসবুকে সক্রিয় ১০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন সম্প্রতি ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। ক্যাপশনে বাংলায় লেখা, “বছরে ৬৪ হাজার ডলার পর্যন্ত আয়ের সুযোগ।” এটি বাংলাদেশের মুদ্রায় প্রায় ৭৯ লাখ টাকা। অডিওতে বাংলায় বলতে শোনা যায়, “চুক্তিভিত্তিক সামরিক সার্ভিসে পুরুষ নিয়োগ করা হচ্ছে। অ্যাসল্ট ইউনিটে কাজ। তোমার এক পদক্ষেপ কারও বাঁচানো জীবন, যোগ দাও, দেশের জন্য বিজয় এনে দাও।”
বিজ্ঞাপনটি চালানো হচ্ছিল Служба по контракту (বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায় চুক্তিভিত্তিক পরিষেবা) নামের একটি পেজ থেকে। পেজটি থেকে একইরকম চারটি বিজ্ঞাপন সক্রিয় থাকতে দেখা গেছে। তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, পেজটি যুক্তরাজ্য থেকে পরিচালিত। মেটা অ্যাড লাইব্রেরিতে সর্বশেষ ২৮ জুলাই পর্যন্ত বিজ্ঞাপনগুলো সক্রিয় ছিল। বিজ্ঞাপনটির মন্তব্যে আগ্রহ দেখানো অধিকাংশ ব্যক্তিই বাংলাদেশি।

বিজ্ঞাপনের ঠিক নিচেই লেখা আছে, “বিস্তারিত জানতে Telegram-এ যোগাযোগ করুন।✈️ বিনামূল্যে বিমান টিকিট এবং স্থানান্তরের সম্পূর্ণ সহায়তা প্রদান করা হবে।” সেখানে ‘সি ডিটেইলস’ বাটনে ক্লিক করলেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে রুশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার (Contract in the Russian army) একটি টেলিগ্রাম বট প্রোগ্রামে। এতে দাবি করা হয়েছে, এটি রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সামরিক কর্মী নিয়োগ সংস্থার ‘অফিশিয়াল’ বট। এটি বিদেশিদের রাশিয়ায় সামরিক চাকরির চুক্তিতে সই করতে সহায়তা করে। সেখানে চুক্তির মেয়াদ, বেতন, সাইনিং বোনাস আর প্রার্থীর শর্তের বিবরণ দেওয়া আছে।
পরে ওই বটকে ম্যাসেজ করা হলে জানানো হয়, চাকরির মেয়াদ এক বছর বা তার বেশি। মাসিক বেতন ২ হাজার ১০০ ডলার থেকে শুরু। সাইনিং বোনাস ২৮ হাজার ৫০০ ডলার। সঙ্গে রাশিয়ার নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়। প্রার্থীর বয়স ১৮ থেকে ৪৯ বছরের মধ্যে হতে হবে। এছাড়া রাশিয়ায় গিয়ে এইচআইভি, সিফিলিস, হেপাটাইটিস বি ও সি এবং যক্ষ্মার মেডিকেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। কোনো সামরিক অভিজ্ঞতা লাগবে না বলেও জানায় ওই টেলিগ্রাম বট।
আরও একটি বিজ্ঞাপন খুঁজে পাওয়া যায়, যা ৭ জুলাই থেকে ফেসবুকে সক্রিয় ছিল। বর্তমানে নিষ্ক্রিয় ওই বিজ্ঞাপনটিতে বড় হরফে ইংরেজিতে লেখা ছিল, ‘রাশিয়ান আর্মি কনট্রাক্ট’। সঙ্গে ১২ হাজার ডলার সাইনিং বোনাস আর মাসিক ২ হাজার ৭০০ ডলার বেতনের প্রতিশ্রুতি। Morton Jacob Frank (মরটন জ্যাকব ফ্রাংক) নামের একটি পেজ থেকে বিজ্ঞাপনটি চালানো হয়েছিল। মেটার পেজ ট্রান্সপারেন্সি তথ্য অনুযায়ী, পেজটি খোলা হয়েছে গত ২১ ডিসেম্বর। আর অ্যাডমিনের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র দেখানো হয়েছে। এই বিজ্ঞাপনটিতেও শতাধিক প্রতিক্রিয়া ও মন্তব্য পড়েছে। সেখানেও বেশ কিছু বাংলাদেশি আগ্রহ জানিয়ে মন্তব্য করেছেন।

বিজ্ঞাপনটিতে থাকা ‘গেট অফার’ বাটনে ক্লিক করলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে আরেকটি চ্যাটবটে। সেখানে প্রথমে মোবাইল নম্বর দিয়ে এন্ট্রি করতে হয়। এরপর বট একে একে জানতে চায় বয়স, শারীরিক সক্ষমতা, আর রাশিয়ায় যাওয়ার জন্য বৈধ পাসপোর্ট আছে কি না।
বটকে সরাসরি কাজের প্রকৃতি এবং মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এটি জানায়, মূলত লজিস্টিক ও নিরাপত্তা সহায়কের ভূমিকা পালন করতে হবে। যুদ্ধক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ঝুঁকি থাকবে বলেও এটি স্বীকার করে নেয়। কেউ মারা গেলে তার ক্ষতিপূরণ কী জানতে চাইলে বটটি জানায়, পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তবে নিহতের পরিসংখ্যান নিয়ে জিজ্ঞেস করলে এটি নির্দিষ্ট সংখ্যা বা পরিসংখ্যান দিতে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এভাবে রাশিয়া যাওয়ার বৈধতা দেওয়া হয়েছে কি না, এই প্রশ্নের উত্তরে বট জানায়, “এটি বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালিত।” আবার, রুশ দূতাবাস এ বিষয়ে জানে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বটটি দাবি করে, দূতাবাস ভিসা প্রক্রিয়ায় জড়িত।
জার্মান সম্প্রচারমাধ্যম টাগেসশাউ (Tagesschau)-এর প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও এভাবে কয়েকটি দেশে বিজ্ঞাপন চালানোর বিষয়টি উঠে এসেছে। এই অনুসন্ধানে দেখা গেছে, “ওয়ার্কভায়া (WorkVia)” নামের একটি প্রতিষ্ঠান ওয়েবসাইট, টেলিগ্রাম চ্যানেল, ইনস্টাগ্রাম পোস্ট ও ফেসবুকে চালানো বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে একই ধরনের প্রচারণা চালাচ্ছে।
২০২২ সালে রাশিয়া থেকে বিজ্ঞাপন প্রচারে মেটার নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ৪০টিরও বেশি ফেসবুক পেজ থেকে এই প্রচারণা চলছে বলে ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনটি জানায়, এসব পেজের একটির সন্ধান মেটাকে জানানোর পর সেটি সরানো হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই একই ধরনের নতুন পেজ আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইন্দোনেশিয়া ও কম্বোডিয়ার পুরুষদের লক্ষ্য করে অন্তত গত বছরের অক্টোবর থেকে এমন প্রচারণা চলছে। সেখানে মাসিক ৩ হাজার ২০০ ডলার বেতন আর ৩০ হাজার ডলার সাইনিং বোনাসের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের সরঞ্জাম ধ্বংস বা ড্রোন ভূপাতিত করার জন্য বাড়তি বোনাসের প্রতিশ্রুতির কথাও বলা হয়েছে।
গত ২০ জুলাই ইউক্রেনের যুদ্ধবন্দি বিষয়ক সমন্বয় সদর দপ্তর ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিচালিত তথ্যভাণ্ডার ‘স্টপ রাশিয়ান রিক্রুটারস ডট ওআরজি’ থেকে প্রতিবেদনটি (stoprussianrecruiters.org) পুনঃপ্রকাশিত হয়।
ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে ‘ওয়ার্ক ইন রাশিয়ান আর্মি’ নামের একটি টেলিগ্রাম চ্যানেল ও ‘ওয়ার্ক ইন রাশিয়া’ নামের একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপও খুঁজে পাওয়া যায়। এগুলোতেও রাশিয়ার বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার বিভিন্ন তথ্য ও প্রক্রিয়া সম্বন্ধে জানানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে ঢুকে দেখা যায়, এটিতে ছয়শর বেশি সদস্য আছেন। যেখানে বেশ কিছু বাংলাদেশি ফোন নম্বরও দেখা গেছে। গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পরই একটি রুশ নম্বর ও একটি বাংলাদেশি নম্বর থেকে এই প্রতিবেদককে মেসেজ করা হয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যুক্ত হতে আগ্রহী কি না, তাও জানতে চাওয়া হয়।
বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় লোকবল নিয়োগ ও রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে জানতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ শরীফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি বলেন, “নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাংলাদেশ থেকে বাইরের কোনো দেশে লোকবল নিয়োগ বা পাঠানোর অনুমতি নেই। এছাড়া বাংলাদেশের নাগরিকদের রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।”
তিনি মন্ত্রণালয় থেকে গত ২৭ জুলাই প্রকাশিত একটি বিজ্ঞপ্তির কপিও পাঠান। যেখানে ৪২ জন অদক্ষ কর্মীকে রাশিয়ায় নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞপ্তির শর্তাবলিতে উল্লেখ আছে, অনুমোদিত কোনো কর্মী যুদ্ধে জড়িত হবে না মর্মে সংশ্লিষ্ট এজেন্সিকে তিনশ টাকার স্ট্যাম্পে নন-জুডিশিয়াল অঙ্গীকারনামা দাখিল করতে হবে।
মানবাধিকার সংস্থা ফোর্টিফাই রাইটস ও ইউক্রেনভিত্তিক ট্রুথ হাউন্ডসের এক যৌথ অনুসন্ধানে উঠে আসে ইউক্রেন যুদ্ধে বাংলাদেশিদের মৃত্যুর চিত্র। গত ৩ মার্চ প্রকাশিত সেই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্ত অন্তত ১০৪ জন বাংলাদেশির মধ্যে ৩৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। ২০২৫ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশ ও ইউক্রেনে ২৪ জনের সাক্ষাৎকার নিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়। এর মধ্যে ছিলেন রুশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া বাংলাদেশি, পাচারের শিকার ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্য।
বিবিসি রাশিয়ান সার্ভিস ও স্বাধীন গণমাধ্যম মেডিয়াজোনার ২০২৫ সালের ১১ জুলাই প্রকাশিত এক যৌথ অনুসন্ধানে সারা বিশ্বের হিসাব উঠে আসে। এই যৌথ অনুসন্ধানে রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে নিহত ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩৯ জন সেনার নাম-পরিচয় নিশ্চিত করা হয়, যাদের মধ্যে ২৮টি দেশের ৫২৩ জন এমন বিদেশি নাগরিক ছিলেন, নিয়োগের সময় যাদের রুশ নাগরিকত্ব ছিল না। এই সংখ্যা শুধু প্রকাশ্য সূত্র থেকে নিশ্চিত হওয়া মৃত্যুর হিসাব বলে গবেষকেরা নিজেরাই উল্লেখ করেছেন, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান ডিসমিসল্যাবকে বলেন, “বৈধ রিক্রুটিং লাইসেন্স (আরএল নম্বর) ছাড়া বিদেশে চাকরির জন্য লোক নিয়োগ করা সম্পূর্ণ অবৈধ। যারা এ ধরনের কাজ করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দায়িত্ব। অনলাইনে এ ধরনের প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন বন্ধ করার বিষয়েও ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাথে আলোচনা হয়েছে। এছাড়া, অন্য দেশের কোনো সংস্থা সরাসরি বাংলাদেশ থেকে কর্মী নিতে পারে না। এজন্য দেশীয় মাধ্যমের প্রয়োজন হয়। তাই এই প্রক্রিয়ায় যদি বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।”
বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পা না দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক করে শরিফুল হাসান আরও বলেন, “অনেক ট্রাভেল এজেন্সি বা অনিবন্ধিত মাধ্যম অনলাইনে এমন প্রলোভনমূলক বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। বিভিন্ন চাকরির কথা বলে নিয়ে গিয়ে যুদ্ধে যুক্ত করছে। টাকার প্রলোভনে রাশিয়া গেলেও টাকার বদলে উল্টো তারা বিপদের সম্মুখীন হচ্ছেন। আমাদের কাছে এমন অনেক অভিযোগ এসেছে। তাই সামাজিক মাধ্যমে এমন বিজ্ঞাপন দেখে যাচাই-বাছাই ছাড়া ফাঁদে পা দেওয়া থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে।”

