মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
IVAC story

ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট যাচাইয়ের নামে ভুয়া ওয়েবপেজ, বিকাশে টাকা হাতানোর ফাঁদ

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষায় থাকা একজন আবেদনকারী মোবাইলে ‘ভেরিফাই’ করার নির্দেশনাসহ একটি এসএমএস পান। সেই মেসেজে অ্যাপয়েন্টমেন্ট যাচাইয়ের জন্য ৯ টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়। মেসেজে দেওয়া লিংকে ক্লিক করলে ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের (আইভ্যাক) ওয়েবসাইটের আদলে তৈরি একটি পেজ খোলে। সেখানে গিয়ে পেমেন্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পর তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে এক মিনিটের ব্যবধানে কয়েক ধাপে ১০ হাজার টাকার বেশি নিয়ে নিয়ে যায় প্রতারকরা। ডিসমিসল্যাবকে একইভাবে প্রতারিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন আরেকজন ভিসা প্রত্যাশী।

ভারতীয় ভিসার আবেদন করতে বাংলাদেশি নাগরিকদের ইন্ডিয়ান ভিসা অ্যাপ্লিকেশন সেন্টারের (IVAC) মাধ্যমে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অনলাইন অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থায় আবেদনকারীরা কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য স্লট বুক করতে পারেন। স্লট বুক করার পর এই অ্যাপয়েন্টমেন্টেরই অপেক্ষায় ছিলেন এস এম আমানুর রহমান রাফাত।

ডিসমিসল্যাবকে রাফাত জানান, তিনি ভারতীয় ভিসার জন্য অনলাইনে আবেদন করেন গত সেপ্টেম্বরে। ৮ অক্টোবর দুপুরে তার ভিসার কাগজপত্র জমা দেওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছিল। ৭ অক্টোবর বিকেল ৫টা ১৭ মিনিটে তার মোবাইলে একটি মেসেজ আসে। সেখানে লেখা ছিল, “আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লট ডেট দেওয়া হয়েছে, আইভিএসি কেন্দ্র থেকে ভিসা নিতে ভেরিফাই করুন।” মেসেজটির সঙ্গে একটি ওয়েবসাইটের শর্ট লিংক যুক্ত ছিল।

ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করার নামে পাঠানো এসএমএস এবং প্রতারণার অভিজ্ঞতা জানিয়ে ভুক্তভোগীর ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

ওই দিনই সন্ধ্যা ৬টা ২ মিনিটে ফেসবুকের একটি গ্রুপে এ বিষয়ে একটি পোস্ট দেন রাফাত। পোস্টে লিখেছেন, “একদম খাড়ার উপর ১০ হাজার+ টাকা চুনা খেয়ে গেলাম। সাধারণত বিষয়গুলোতে খুব সাবধানে থাকলেও এবার স্ক্যামের শিকার আমি নিজে।”

ডিসমিসল্যাবকে রাফাত জানান, এসএমএসে থাকা লিংকটিতে ক্লিক করলে একটি ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। সেখানে তার নাম, পাসপোর্ট ও মোবাইল নম্বর চাওয়া হয়। তথ্যগুলো দিয়ে পরবর্তী ধাপে গেলে বিকাশের পেমেন্ট উইন্ডোর আদলে একটি পেজ আসে। মাত্র ৯ টাকা পরিশোধ করতে বলায় বিষয়টি তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি।

ওই সময় অফিসের কাজে ব্যস্ত ছিলেন রাফাত। বিকাশের ওটিপি আসতেও কিছুটা সময় লাগছিল। পরে ওটিপি ও পিন দেওয়ার পর তাকে আইভ্যাকের মূল ওয়েবসাইটে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পেমেন্ট নিশ্চিত হয়েছে কি না, তা খুঁজতে খুঁজতেই মোবাইলে একের পর এক টাকা কেটে নেওয়ার মেসেজ আসতে থাকে।

তিনি জানান, যখন বিকাশ অ্যাকাউন্টে ঢুকে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছিলেন, তখনই কয়েকটি লেনদেন সম্পন্ন হয়ে যায়। পরে বুঝতে পারেন, তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন। এরপর তিনি বিকাশের গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করেন এবং অ্যাকাউন্টের পিন পরিবর্তন করেন। 

ভুয়া ওয়েবসাইটে নিয়ে কৌশলে হাতানো হয় পিন ও ওটিপি 

রাফাতের কাছে পাঠানো মেসেজটি এসেছে ‘+880 9638-011300’ নম্বর থেকে, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল cut.bd দিয়ে সংক্ষিপ্ত করা একটি ওয়েবসাইটের লিংক। এ ধরনের সংক্ষিপ্ত লিংক ব্যবহার করলে মূল ওয়েবসাইটের ঠিকানা বার্তা থেকে বোঝা যায় না। ফলে লিংকে ক্লিক করার আগে সেটি কোন ওয়েবসাইটে নিয়ে যাবে, তা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।

ভুয়া ওয়েবসাইটে বিকাশের পেমেন্ট উইন্ডোতে ৯ টাকা পরিশোধের নির্দেশনা এবং MyCirkle সেবায় অটো ডেবিট চালুর ওটিপি ও অ্যাকাউন্ট বাইন্ডিংয়ের এসএমএসের স্ক্রিনশট।

ডিসমিসল্যাবের সংগ্রহ করা স্ক্রিনশটে দেখা যায়, লিংকে ক্লিক করলে যে ওয়েবসাইটে নেওয়া হয়েছে, তার ওয়েব অ্যাড্রেস “app.ivcabd.com।” অথচ আইভ্যাকের মূল ওয়েব অ্যাড্রেস হলো “ivacbd.com” এবং অ্যাপয়েন্টমেন্ট পোর্টাল হলো “appointment.ivacbd.com।”

দুটি ওয়েব অ্যাড্রেস বা ইউআরএল দেখতে প্রায় একই রকম হলেও গুরুত্বপূর্ণ একটি পার্থক্য রয়েছে। মূল ওয়েবসাইটের নামের ‘ivac’ অংশটি সন্দেহজনক ডোমেইনে লেখা হয়েছে ‘ivca’। অর্থাৎ দুটি অক্ষরের অবস্থান বদলে দেওয়া হয়েছে। ভুয়া ওয়েবসাইটটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য জানতে “ডব্লিউএইচও ডট এক্সওয়াই” (who.xy) ব্যবহার করে ডিসমিসল্যাব। সেখানে দেখা যায়, ivcabd.com ডোমেইনটি ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নিবন্ধিত হয়েছে, যা প্রতারণার ঘটনার মাত্র ১৯ দিন আগের। ডোমেইনটির তথ্য সর্বশেষ হালনাগাদ করা হয় ৭ অক্টোবর, যেদিন রাফাত প্রতারণার শিকার হন।

ডোমেইনটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল ডোমেইন গ্রুপ এলএলসির (Global Domain Group LLC) মাধ্যমে নিবন্ধিত। তবে রেকর্ড থেকে বর্তমান মালিকের পরিচয় জানা যায়নি। পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের নামের সঙ্গে সামান্য পরিবর্তন রেখে ভিন্ন ডোমেইন তৈরির এই কৌশলকে বলা হয় টাইপোস্কোয়াটিং (Typosquatting)। সাধারণ ব্যবহারকারী দ্রুত লিংকে প্রবেশ করলে এমন পার্থক্য চোখ এড়িয়ে যেতে পারে।

শুধু ডোমেইন নয়, ওয়েবসাইটের ভাষাতেও ছিল দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্ররোচনা। পেজটির শুরুতেই লেখা ‘IMPORTANT NOTICE’ বা জরুরি বিজ্ঞপ্তি। সেখানে দাবি করা হয়, আবেদনকারীর জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্ট যাচাইয়ের সুযোগ চালু হয়েছে। এখনই যাচাই না করলে তিনি অ্যাপয়েন্টমেন্টের তারিখ পাবেন না।

এর নিচে “পেমেন্ট ভেরিফিকেশন” (Payment Verification) নামে একটি ফর্মে আবেদনকারীর পূর্ণ নাম, পাসপোর্ট বা আবেদন নম্বর এবং মোবাইল নম্বর দিতে বলা হয়। তথ্যগুলো জমা দেওয়ার পরই পেমেন্টের ধাপে নেওয়া হয়।

এই ধাপে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে দ্রুত ভেরিফাই করার তাড়া দিতে দেখা যায়। এখনই ভেরিফাই না করলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া যাবে না – এমন “সতর্কতামূলক বার্তা” দিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ তৈরি করা হয়। ফলে ওয়েবসাইটের ঠিকানা বা পেমেন্টের শর্ত ভালোভাবে যাচাই না করেই পরবর্তী ধাপে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।

আইভ্যাকের নামে তৈরি ভুয়া ওয়েবসাইটে অ্যাপয়েন্টমেন্ট যাচাইয়ের নির্দেশনা এবং ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়ার ওয়েবপেজের স্ক্রিনশট।

ওয়েবসাইটের পরবর্তী ধাপে বিকাশের লোগোসহ একটি পেমেন্ট উইন্ডো দেখা যায়। এর ওপরের অংশে ‘IVACBD’ এবং পেমেন্টের পরিমাণ হিসেবে ৯ টাকা লেখা রয়েছে। এরপর বিকাশ অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়ার জন্য একটি ঘর আসে। পরবর্তী ধাপে ছয় সংখ্যার ভেরিফিকেশন কোড চাওয়া হয়। কিন্তু রাফাতের মোবাইলে বিকাশ থেকে যে ওটিপি এসেছিল অন্য কারণে।

এসএমএসে লেখা ছিল, “Your bKash OTP to enable AUTO DEBIT in App or Website of MyCirkle.” অর্থাৎ “মাই সার্কেল (MyCirkle)” নামের একটি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে অটো ডেবিট চালু করার জন্য ওটিপি পাঠানো হয়েছে।

অটো ডেবিট বা স্বয়ংক্রিয় পেমেন্টের এই ব্যবস্থায় গ্রাহক একবার প্রয়োজনীয় অনুমোদন দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট মার্চেন্টের পরবর্তী পেমেন্টের জন্য প্রতিবার নতুন করে ওটিপি বা পিন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না।

বিকাশের গ্রাহকসেবার ওয়েবসাইটে ‘লিংকড অ্যাপস এবং এর সুবিধা’ অংশেও একই পদ্ধতির ব্যাখ্যা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো মার্চেন্ট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে বিকাশ অ্যাকাউন্ট যুক্ত করতে প্রথমে অ্যাকাউন্ট নম্বর, ওটিপি ও পিন দিতে হয়। অ্যাকাউন্ট যুক্ত হয়ে গেলে পরবর্তী পেমেন্টের জন্য আর ওটিপি বা পিন দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। উদাহরণ হিসেবে ফুডপান্ডা, উবার ও গ্রামীণফোনের মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করেছে বিকাশ।

ভুয়া ওয়েবসাইটে রাফাতকে দেখানো হয়েছিল আইভ্যাকের নামে মাত্র ৯ টাকা পরিশোধের নির্দেশনা। সেখান থেকে ওটিপি ও পিন নিয়ে অটো ডেবিট চালু করা হয়। বিকাশ থেকে আসা ওটিপিতে তাই অটো ডেবিটের কথাই উল্লেখ ছিল।

সেটি নিশ্চিত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায় বিকাশ থেকে আসা পরের এসএমএসে। সেখানে জানানো হয়, ‘ROBI AXIATA PLC-RM61469’ -এর সঙ্গে অ্যাকাউন্ট বাইন্ডিং সফল হয়েছে। ভবিষ্যৎ কেনাকাটার জন্য ওই মার্চেন্টকে বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা কাটার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

অ্যাকাউন্ট বাইন্ডিংয়ের নিরাপত্তা ও এতে লেনদেনের সীমা নিয়ে  বিকাশের কাছে জানতে চেয়েছে ডিসমিসল্যাব। জবাবে বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশন্স শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানান, আর্থিক লেনদেন সহজ ও সময় সাশ্রয়ী করতে বিভিন্ন মার্চেন্টের সঙ্গে অ্যাকাউন্ট অটো বাইন্ডিং সেবা চালু আছে। তার ভাষ্য, “গ্রাহকের সম্মতি এবং যথাযথ পিন ও ওটিপি ছাড়া এ ধরনের সেবা চালু হওয়ার কোন সুযোগ নেই।”

প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকতে ডালিম অপরিচিত ও অযাচিত লিংকে ঢোকা থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, পেমেন্ট করতে হলে গ্রাহককে নিজে থেকেই যথাযথ গেটওয়েতে গিয়ে করতে হবে। মেসেজ বা অন্য কোনোভাবে পরিচিত বা অপরিচিত কারও পাঠানো লিংকে কোনো অবস্থাতেই ক্লিক করা ঠিক নয়। যাচাই না করে পিন ও ওটিপি দিয়ে লেনদেন করা বিপদের কারণ হতে পারে।

এক মিনিটে ১০ লেনদেন, টাকা গেল রবির মার্চেন্টে

রাফাতের দেওয়া বিকাশের লেনদেনসংক্রান্ত এসএমএসগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৭ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিটে তার অ্যাকাউন্ট থেকে একের পর এক টাকা কাটা হয়েছে।

লেনদেনের আগে অ্যাকাউন্টে ছিল ১০ হাজার ৬৩৯ টাকা ৫৭ পয়সা। শেষ লেনদেনের পর অবশিষ্ট ছিল ৮৪ টাকা ৫৭ পয়সা। বিকাশের বার্তাগুলোতে কিছু লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রথমে অর্থ সংরক্ষিত বা ‘reserved’ থাকার নোটিফিকেশন এবং পরে পেমেন্ট সফল হওয়ার বার্তা এসেছে। সবগুলো সফল লেনদেনের এসএমএসে অর্থপ্রাপ্ত মার্চেন্টের পরিচয় হিসেবে লেখা রয়েছে ‘ROBI AXIATA PLC-RM61469।’

ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্টের নামে প্রতারণায় ভুক্তভোগীর বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক লেনদেনে ১০ হাজা্র টাকার বেশি কেটে নেওয়ার এসএমএসের স্ক্রিনশট।

অটো ডেবিট চালুর ওটিপিতে যে MyCirkle সেবার কথা উল্লেখ ছিল। এটি রবির পরিচালিত Cirkle ব্র্যান্ডের মোবাইল অ্যাপের নাম। সার্কেলের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও এটিকে রবি আজিয়াটা পিএলসির ব্র্যান্ড হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে লেনদেনের মেসেজে রবির মার্চেন্ট পরিচয় থাকলেও টাকাগুলো শেষ পর্যন্ত কোন মোবাইল নম্বর, অ্যাকাউন্ট বা সেবা গ্রহণকারীর কাছে গেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

রাফাত জানান, টাকা কাটার বিষয়টি বুঝতে পেরে বিকাশের গ্রাহকসেবায় যোগাযোগ করেছিলেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট অর্থ ইতিমধ্যে অন্য পেমেন্ট ব্যবস্থায় চলে যাওয়ায় তা ফেরত পাওয়ার বিষয়ে বিকাশের গ্রাহকসেবা নিশ্চিত কিছু জানাতে পারেনি।

এ ধরনের লেনদেনে প্রকৃত অর্থপ্রাপককে শনাক্ত করা যায় কি না এবং প্রতারণার অভিযোগ পেলে অর্থের গন্তব্য অনুসরণ ও উদ্ধারে কী ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তা জানতে রবির সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ডিসমিসল্যাব। এ প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত রবি’র কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

একই কৌশলে প্রতারণার শিকার আরও আবেদনকারী

রাফাত ছাড়াও একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। তাদের মধ্যে একজন পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে ডিসমিসল্যাবকে জানান, ভিসার জন্য আবেদন করতে যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছিলেন, সেই নম্বরেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট ‘ভেরিফাই’ করার এসএমএস পেয়েছিলেন।

ওই আবেদনকারী বলেন, ভারতীয় ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এ ধরনের এসএমএস আবেদনকারীদের কাছে বিশেষ গুরুত্ব পায়। রাফাতের মতো একই পদ্ধতিতে ৯ টাকা পরিশোধ করতে বলে প্রায় ১২ হাজার কেটে নেওয়া হয়েছে তার বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে। 

গ্রাহকসেবার সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পারেন তার বিকাশ অ্যাকাউন্টের সঙ্গে অন্য একটি সেবার বাইন্ডিং তৈরি হয়েছিল। তার দাবি, টাকা মোবাইল রিচার্জের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি পেমেন্ট ব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হয়েছে বলে তাকে জানানো হয়েছিল। তবে সেই অর্থ কোন নম্বর বা অ্যাকাউন্টে পৌঁছেছিল, তা তিনি জানতে পারেননি।

ভারতীয় হাইকমিশনের সতর্কবার্তা

দুই ভুক্তভোগীই জানিয়েছেন, ভারতীয় ভিসার আবেদনে যে মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেছিলেন, সেই নম্বরেই প্রতারণামূলক এসএমএস এসেছে। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করেছে। প্রতারকেরা কীভাবে ভারতীয় ভিসার জন্য আবেদন করা ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছাচ্ছে?

রাফাত জানান, তিনি আবেদন করা ও ফি জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নেননি। তবে স্লট বুকিংয়ের ক্ষেত্রে তিনি তার সহকর্মীর সহায়তা নিয়েছিলেন। প্রতারনার শিকার অন্যজন ডিসমিসল্যাবকে জানান, তিনি স্লট বুকিংয়ের জন্য তৃতীয় পক্ষের সহায়তা নিয়েছিলেন, যারা অর্থের বিনিময়ে স্লট পাইয়ে দিতে সহায়তা করে থাকে।

আইভ্যাকের ওয়েবসাইটে ভিসার অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাইয়ে দেওয়ার নামে প্রতারণার বিষয়ে আগে থেকেই একটি সতর্কবার্তা রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, কিছু অসাধু ব্যক্তি ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে নিশ্চিত অ্যাপয়েন্টমেন্টের বিনিময়ে টাকা সংগ্রহ করছেন।

আইভ্যাকের সতর্কবার্তায় আরও বলা হয়েছে, নির্ধারিত ১ হাজার ৫০০ টাকা ভিসা প্রসেসিং ফি ছাড়া অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়ার বা কাজের গতি দ্রুত করার জন্য অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কোনো ব্যক্তি হাইকমিশনের প্রতিনিধি পরিচয় দিয়ে অর্থের বিনিময়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার দাবি করলে তা বিশ্বাস না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্রতারণা যেভাবে চিনবেন

এ ধরনের প্রতারণা শনাক্ত করতে প্রথমেই ওয়েবসাইটের ঠিকানা যাচাই করা জরুরি। প্রতিষ্ঠানের নাম বা লোগো থাকলেই কোনো ওয়েবসাইট সেই প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল ওয়েবসাইট হয়ে যায় না। ডোমেইনের একটি অক্ষর বা অক্ষরের অবস্থান পরিবর্তন করে ভুয়া ওয়েবসাইট তৈরি করা হলে খুব ভালো করে খেয়াল না করলে পার্থক্য বোঝা নাও যেতে পারে। তাই বিশেষ করে সংক্ষিপ্ত লিংক থেকে কোনো ওয়েবসাইটে গেলে ব্রাউজারের অ্যাড্রেস বারে মূল ঠিকানাটি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

ডিজিটাল সেইফটি স্কুলের নির্দেশিকা অনুযায়ী, এসএমএসের মাধ্যমে চালানো ফিশিংকে বলা হয় ‘স্মিশিং’। মোবাইলের ব্রাউজারে সংক্ষিপ্ত লিংক ব্যবহার করা হলে আসল ঠিকানা সহজে চোখে পড়ে না। এ কারণে ক্লিক করার আগে লিংকের পুরো ইউআরএল দেখে নিতে বলা হয়েছে। ডেস্কটপে লিংকের ওপর মাউস ধরে রাখলে, আর স্মার্টফোনে লিংকটি লং প্রেস করলে ওয়েব অ্যাড্রেস দেখা যায়। 

ঠিকানাটি অপরিচিত মনে হলে বা তাতে বানান ভুল থাকলে সেটিতে না ঢোকাই ভালো। সন্দেহ থাকলে লিংকটি ভাইরাস টোটালের মতো টুলে যাচাই করে নেওয়া যায়। তবে সবচেয়ে নিরাপদ উপায় হলো মেসেজের লিংক এড়িয়ে ব্রাউজারে সরাসরি প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা লিখে ঢোকা। এই ঘটনার ক্ষেত্রে অ্যাপয়েন্টমেন্ট যাচাই করতে হলে এসএমএসের লিংকে না গিয়ে সরাসরি আইভ্যাকের মূল ওয়েবসাইটে যাওয়াই নিরাপদ ছিল।

বার্তার ভাষা দেখেও অনেক সময় প্রতারণা ধরা যায়। “এখনই যাচাই না করলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাবেন না” বা “অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে” ধরনের বার্তা ইচ্ছা করেই চাপ তৈরি করে, যাতে ভেবে দেখার সময় না মেলে। বানান বা ব্যাকরণের ভুলও সতর্ক হওয়ার একটি সংকেত। কোনো বৈধ প্রতিষ্ঠান এসএমএস, ইমেইল বা ফোন কলে পাসওয়ার্ড, পিন কিংবা ব্যাংকসংক্রান্ত তথ্য চায় না। তাই এমন কিছু চাওয়া হলে সেটিই সন্দেহের বড় কারণ। এর বাইরে গুরুত্বপূর্ণ অ্যাকাউন্টে টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন চালু রাখা, ফোন ও ব্রাউজারের সফটওয়্যার হালনাগাদ রাখা এবং সন্দেহজনক বার্তা পেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

পেমেন্টের ক্ষেত্রেও একই সতর্কতা জরুরি। শুধু কত টাকা পরিশোধ করতে বলা হচ্ছে, তা দেখাই যথেষ্ট নয়। ওটিপি কোন কাজের জন্য এসেছে, সেটিও পড়তে হবে। এই ঘটনায় ৯ টাকা পরিশোধের কথা বলা হলেও বিকাশের ওটিপিতে অটো ডেবিট চালুর বিষয়টি স্পষ্টভাবে লেখা ছিল।

বিকাশের নিরাপত্তা পরামর্শেও প্রতিটি লেনদেনের আগে প্রাপকের পরিচয় ও টাকার পরিমাণ যাচাই এবং পিন ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখার কথা বলা হয়েছে। সন্দেহজনক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিকাশের গ্রাহকসেবা নম্বর ১৬২৪৭-এ যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

আরো কিছু লেখা