সামাজিক মাধ্যম ফিড খুললেই এখন চোখে পড়ছে একই ধরনের কিছু ছবি। জিনস আর ডেনিম জ্যাকেট গায়ে মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়ানো কোনো যুবক, পাশে শাড়ি পরা তরুণী হাসছেন; আবার জিনস আর লেদার জ্যাকেট গায়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন এক নারী। যেন আশির দশকের পুরোনো অ্যালবাম থেকে তুলে আনা হয়েছে। আদতে এই ছবিগুলো তৈরি হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে। একটি সাধারণ ছবি/সেলফি আপলোড করে দিলেই মিনিটখানেকের মধ্যে মিলছে এই নস্টালজিক রূপ, বাংলাদেশে এখন এই ট্রেন্ড রীতিমতো ভাইরাল।
তবে নিছক আনন্দের পেছনে একটি প্রশ্ন আলোচনার জন্ম দিচ্ছে। যে ছবিটি আপলোড করা হলো, তার কী হলো? সেটি কোথায় জমা থাকে, কে রাখে, আর কতদিন রাখে? বিশ্বজুড়ে একাধিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অনুসন্ধান ঘেঁটে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে ডিসমিসল্যাব।
সেলফির সঙ্গে চলে যায় আরও অনেক কিছু
একটি ছবি নিজেই কিন্তু অনেক কিছু বহন করে। ছবিতে থাকা মানুষের মুখই একধরনের ব্যক্তিগত তথ্য, কারণ এর মাধ্যমে একজনকে শনাক্ত করা সম্ভব। এর সঙ্গে লুকিয়ে থাকতে পারে এক্সিফ (EXIF) নামের মেটাডেটা। যাতে জানা যায় ছবিটি কবে তোলা, কোন ডিভাইসে তোলা এবং ঠিক কোথায় তোলা হয়েছিল, এমনকি জিপিএস অবস্থানও।
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি সাময়িকী ওয়্যারডের একটি প্রতিবেদনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি আবুধাবির সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টিনা পপার ব্যাখ্যা করেছেন, এআই চ্যাটবট বা অ্যাপে মূলত চার ধরনের তথ্য জমা হয়। ব্যবহারকারী নিজে যা টাইপ করেন বা আপলোড করেন, সেই তথ্য থেকে সিস্টেম যা অনুমান করে নেয়, সেশন-সংক্রান্ত মেটাডেটা এবং সংরক্ষিত হয়ে যাওয়া উত্তর বা ফাইল। পপার বলেন,
“সেলফি আপলোড করা মানেই যে সেটি চুরি হয়ে যাবে বা ডিপফেক বানাতে ব্যবহৃত হবে, এমন নয়। কিন্তু এর মানে হলো, ছবিটির আরেকটি কপি চলে যাচ্ছে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে, যা তাদের নিজস্ব সংরক্ষণ ও প্রশিক্ষণ নীতিতে আছে।”
দক্ষিণ আফ্রিকাভিত্তিক আইন বিষয়ক প্রতিষ্ঠান গাওয়ি ল্য রু ইনস্টিটিউট অব ল-এর একটি বিশ্লেষণ বলছে, প্রথমবার আপলোড করা ছবি এআই ঠিকমতো চিনতে না পারলে ব্যবহারকারীরা প্রায়ই বাড়তি তথ্য যোগ করতে থাকেন। যেমন কর্মস্থল, পড়াশোনা বা পরিবারের কথা, যাতে ফল আরও নিখুঁত হয়। প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে নিরীহ মনে হলেও একত্র করলে তা একজন মানুষ সম্পর্কে অনেক বেশি স্পষ্ট একটি চিত্র তৈরি করে ফেলে। এআই টুল বারবার ব্যবহার করলে প্রশ্ন বা প্রম্পটেও একটা ধরন তৈরি হতে থাকে, নাম না জানলেও কেউ কী নিয়ে প্রশ্ন করছেন বা কীভাবে করছেন তা থেকেই তার আগ্রহ, অভ্যাস, এমনকি পেশা পর্যন্ত অনুমান করা সম্ভব হয়ে যায়। এর বাইরে সাধারণ অনলাইন সেবার মতোই সংগ্রহ করা হয় ব্যবহারকারীর আইপি ঠিকানা, ডিভাইসের ধরন, অপারেটিং সিস্টেম ও অবস্থানগত তথ্য।
সার্ভারে এই তথ্য কতদিন থেকে যায়
এই তথ্য ঠিক কতদিন সংরক্ষিত থাকবে, তা নির্ভর করে কোন সেবা ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। বহুল ব্যবহৃত তিনটি এআই চ্যাটবটের নীতিমালা পর্যালোচনা করে ওয়্যারড দেখিয়েছে, এই তিনটির মধ্যেও নিয়মে বেশ ফারাক আছে।
ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটিতে চ্যাট সংরক্ষিত থাকে অ্যাকাউন্টে, যতক্ষণ না ব্যবহারকারী নিজে তা মুছে ফেলেন। মুছে ফেলার পরও তা কোম্পানির সিস্টেমে সর্বোচ্চ ৩০ দিন থেকে যেতে পারে। এর বাইরে “পরিচয়বিহীন থেকে করা” বা অ্যাকাউন্ট থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে করা আলাপের তথ্য, কিংবা আইনি বা নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু তথ্য আরও দীর্ঘ সময় থেকে যেতে পারে।
প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম হাউটুগিকের একটি প্রতিবেদন এই তথ্যে যোগ করছে আরও একটি স্তর। নিউইয়র্ক টাইমস বনাম ওপেনএআই মামলার কারণে ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে যেসব তথ্য আপলোড হয়েছিল, চ্যাট মুছে ফেলা বা টেম্পোরারি চ্যাট ব্যবহার করা সত্ত্বেও তা এখনো সংরক্ষিত থাকতে পারে।
গুগলের জেমিনি ডিফল্টভাবে চ্যাটের তথ্য রেখে দেয় ১৮ মাস পর্যন্ত, যদি না ব্যবহারকারী নিজে তা মুছে ফেলেন। যেহেতু জেমিনি গুগল ড্রাইভ বা গুগল ফটোজের মতো অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে, তাই এটি একসঙ্গে অনেক বেশি ব্যক্তিগত তথ্যে প্রবেশাধিকার পেয়ে যায়।
অ্যানথ্রপিকের ক্লডও চ্যাট সংরক্ষণ করে অ্যাকাউন্টে, যা মুছে ফেলার পর ব্যাকএন্ড সিস্টেম থেকে সরিয়ে ফেলা হয় ৩০ দিনের মধ্যে। তবে ব্যবহারকারী যদি ক্লডকে উন্নত করার জন্য নিজের চ্যাট ব্যবহারের অনুমতি দেন, সে ক্ষেত্রে পরিচয়বিহীন করা কপি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থায় থেকে যেতে পারে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর পর্যন্ত। নীতিমালা লঙ্ঘনের সন্দেহে চিহ্নিত কথোপকথন থাকতে পারে দুই বছর পর্যন্ত, আর সম্পর্কিত নিরাপত্তা স্কোর থেকে যেতে পারে সাত বছর পর্যন্ত।
পপার মনে করিয়ে দেন, অ্যাপে গিয়ে চ্যাট মুছে ফেললেই যে তা সঙ্গে সঙ্গে কোম্পানির সার্ভার থেকেও মুছে যায়, বিষয়টা সব সময় তেমন নয়। এআই মডেল যত উন্নত হচ্ছে, ঝুঁকির ধরনও ততই বদলাচ্ছে। পপার উল্লেখ করেন “মডেল ইনভার্সন” নামের এক ধরনের আক্রমণের কথা, যেখানে আক্রমণকারী কোনো মেশিন লার্নিং মডেল থেকে স্পর্শকাতর তথ্য অনুমান করার বা পুনর্গঠনের চেষ্টা করে। এটি সহজ কোনো প্রক্রিয়া নয়, কতটা কার্যকর হবে তা নির্ভর করে মডেল, আক্রমণকারীর প্রবেশাধিকার ও তথ্যের প্রাপ্যতার ওপর। তবে এআই যত বেশি মানুষের ইমেইল, কেনাকাটা বা অন্যান্য সংযুক্ত সেবায় প্রবেশাধিকার পাচ্ছে, ঝুঁকির পরিধিও ততই বাড়ছে।
বাস্তব দুটি ঘটনা
বাস্তবেও তথ্য ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে একাধিকবার। গত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাইবারনিউজের একটি অনুসন্ধান রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল মার্কিন প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম পেটাপিক্সেলে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, গুগল প্লে স্টোরে পাঁচ লাখের বেশিবার ডাউনলোড হওয়া Video AI Art Generator & Maker নামের একটি এআই ফটো-ভিডিও এডিটিং অ্যাপ। এর গুগল ক্লাউড স্টোরেজ বাকেট কোনো অথেনটিকেশন ছাড়াই খোলা পাওয়া যায়। ফলে বিশ্বের যে কেউ চাইলেই সেই স্টোরেজে ঢুকে পড়তে পারতেন। সেখানে ব্যবহারকারীদের আপলোড করা ১৫ লাখের বেশি ছবি ও প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভিডিও পাওয়া যায়। পাশাপাশি এআই দিয়ে তৈরি প্রায় ২৮ লাখ ৭০ হাজার ছবি, সমান সংখ্যক ভিডিও এবং প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার অডিও ফাইল ছিল সেখানে। মোট প্রায় ৮২ লাখ ৭০ হাজার মিডিয়া ফাইল, যার আকার ছিল ১২ টেরাবাইটেরও বেশি। সাইবারনিউজের গবেষকদের মতে, এমন ঘটনা দেখায় যে অনেক এআই অ্যাপ দ্রুত বাজারে আনার তাড়ায় মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাই এড়িয়ে যায়। তাদের বিশ্লেষণ করা কয়েকশ গুগল প্লে অ্যাপের প্রায় ৭২ শতাংশেই একই ধরনের নিরাপত্তা ত্রুটি পাওয়া গেছে।
একই সাইবারনিউজের আরেকটি অনুসন্ধান তুলে ধরেছিল মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ। ২০২৫ সালের আগস্টে হংকংভিত্তিক একটি কোম্পানি, Imagime Interactive Limited, পরিচালিত এআই কম্পানিয়ন অ্যাপের একটি সার্ভার কোনো সুরক্ষা ছাড়াই খোলা পাওয়া যায়। এর মাধ্যমে ব্যবহারকারী ও তাদের এআই সঙ্গীর মধ্যকার রিয়েল-টাইম চ্যাট, ব্যক্তিগত ছবি-ভিডিওর লিংক এবং এআই দিয়ে তৈরি ছবি ফাঁস হয়ে যায়। আইওএস ও অ্যান্ড্রয়েড মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য এতে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে।
দুটি ঘটনাতেই মূল কারণ একই, ব্যাকএন্ড স্টোরেজ ঠিকমতো সুরক্ষিত না রাখা। অ্যাপের প্রাইভেসি পলিসিতে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে তথ্য ফাঁস হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিটা একেবারেই কাল্পনিক নয়।
তথ্যপ্রযুক্তি প্রশাসন বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসাকার একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মুখাবয়বের মতো বায়োমেট্রিক তথ্যের ক্ষেত্রে ঝুঁকিটা পাসওয়ার্ড ফাঁসের চেয়েও গুরুতর, কারণ পাসওয়ার্ড বদলে ফেলা গেলেও মুখের বৈশিষ্ট্য বদলানো যায় না। তাই মুখাবয়ব-সংক্রান্ত তথ্য একবার ফাঁস হয়ে গেলে তার প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে।
চেনা ছবি, অচেনা ঝুঁকি, কী করবেন
তাহলে কি এআই দিয়ে ছবি বানানো একেবারেই বন্ধ রাখতে হবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেমনটা নয়। বরং সচেতনভাবে ব্যবহার করা জরুরি।
বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান বিটডিফেন্ডারের একটি প্রতিবেদন বলছে, এআই দিয়ে তৈরি ছবির ক্ষেত্রে আসল ঝুঁকিটা এআই-জেনারেটেড ছবিতে নয়, বরং মূল ছবিতে থাকা তথ্যে। মুখ, পেছনের দৃশ্য, মেটাডেটা, শিশুর উপস্থিতি বা ঠিকানা-সংক্রান্ত সূত্র- সবই থেকে যায় মূল ছবিতে। তাই আপলোডের আগে ছবি থেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত বিবরণ বাদ দেওয়া এবং সম্ভব হলে এক্সিফ মেটাডেটা মুছে ফেলার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্য কারও ছবি অনুমতি ছাড়া আপলোড না করা, শিশুদের ছবির ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্ক থাকা এবং পরিচয়পত্র বা অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্যসংবলিত ছবি একেবারেই আপলোড না করার কথাও বলছে ওয়্যারডের প্রতিবেদন।
পপারের পরামর্শ হলো, স্পর্শকাতর কোনো তথ্য চ্যাটবট বা অ্যাপে না দেওয়া এবং একটি নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে ব্যবহার ছড়িয়ে রাখা, যাতে ঝুঁকি কমে। যেখানে সম্ভব মডেল প্রশিক্ষণের জন্য তথ্য ব্যবহারের অপশন বন্ধ রাখা, টেম্পোরারি বা ইনকগনিটো মোড ব্যবহার করা, প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে চ্যাট বা ফাইল মুছে ফেলা এবং কোন কোন সেবার সঙ্গে এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট যুক্ত আছে তা মাঝেমধ্যে পরীক্ষা করে দেখাও জরুরি।
অচেনা বা কম পরিচিত ডেভেলপারের অ্যাপে ছবি আপলোডের ক্ষেত্রেও বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার। প্লে স্টোরে ডাউনলোড সংখ্যা বেশি হলেই যে একটি অ্যাপ নিরাপদ, তা কিন্তু নয়, আগের দুটি ঘটনাই তার প্রমাণ। শুধু অ্যাপ আনইনস্টল করাই যথেষ্ট নয়, ব্যবহার বন্ধ করলে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টও মুছে ফেলার চেষ্টা করা দরকার। কারণ ফোন থেকে অ্যাপ সরে গেলেও সার্ভারে থাকা কপিটি এমনিতে মুছে যায় না।
আপনার আশির দশকের সেই পোর্ট্রেট হয়তো কয়েক দিনেই ফিডের ভিড়ে হারিয়ে যাবে। কিন্তু যে ছবিটি দিয়ে সেই ছবি বানানো হলো, সেটি হয়তো কোনো একটি কোম্পানির সার্ভারে থেকে যাবে আরও অনেক দিন। তাই প্রশ্নটা আসলে এআই ব্যবহার করা উচিত কি না তা নয়, প্রশ্নটা হলো ব্যবহারের সময় ঠিক কী দিয়ে দিচ্ছেন সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা রাখা।

