
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গে গরু জবাই নিষিদ্ধ ঘোষণা করায় গরু খামারিরা দেশীয় অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমেছে। ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, দাবিটি মিথ্যা। গত ৮ মে শুক্রবার রাতে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরের বংশীহারী ব্লকের দেউরিয়া গ্রামে, আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামী সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর মূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। এবং সেখানে বিজেপির পতাকা দেখা যায়। এ ঘটনা কেন্দ্র করে ৯ মে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বিক্ষোভ শুরু করেন এবং বিজেপি সমর্থকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন।
ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ১৮ মে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “ভারতে মুসলমানদের গরু কুরবানী দিতে দিবে না শুভেন্দু, ওইদিকে গরু খামারীরা গরু বিক্রি করতে না পেরে দেশীয় অস্ত্র হাতে রাস্তায় নেমেছে। ভারতের মুসলমানদের উচিত গরুর বিকল্প উট, দুম্বা, ছাগল, কুরবানীর জন্য বেছে নেওয়া তাহলে শুভেন্দুর গদি হিন্দুরাই লারিয়ে দিবে।” ২ মিনিট ৩২ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, হাতে সবুজ-হলুদ রঙের পতাকা এবং দেশীয় অস্ত্র হাতে বিক্ষোভ করছেন অনেক নারী। তাদের সামনে একাধিক পুলিশ সদস্য দাঁড়িয়ে আছেন। ভিডিওর ১ মিনিট ৯ সেকেন্ডে একটি জায়গায় বেশ কিছু মোটরসাইকেল দেখা যায়।
ফেসবুকের একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫) ব্যক্তিগত প্রোফাইল, গ্রুপ এবং পেজ থেকে একই দাবিতে ভিডিওটি প্রচার করা হয়।ইনস্টাগ্রামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও একই দাবিতে ভিডিও পোস্ট করতে দেখা গেছে।

সত্যতা যাচাইয়ে কি-ফ্রেম ধরে সার্চ করলে গত ১২ মে সামাজিক মাধ্যম রেডিটের “রাঁচি” নামের একটি কমিউনিটিতে “মিডনাইটসাগা” নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট হওয়া একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটির শিরোনাম ছিল, “দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রামে সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর মূর্তি ভাঙচুর, কাঠগড়ায় বিজেপি।” পোস্টের বিস্তারিত বিবরণে লেখা, “দক্ষিণ দিনাজপুরে সাঁওতাল বিদ্রোহের মহানায়ক সিধু ও কানুর মূর্তি কথিত বিজেপি দুষ্কৃতিকারীদের দ্বারা ভাঙচুর হওয়ার পর, এই ঘটনার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আদিবাসী মহিলারা রাজপথে নেমে আসেন।”

১ মিনিট ৪১ সেকেন্ডের ভিডিওটির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে। এ পোস্টের নিচে ভিডিওটির উৎস হিসেবে টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার একটি প্রতিবেদনের লিংক ছিল।
গত ১০ মে তে প্রকাশিত টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়ার প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, “দক্ষিণ দিনাজপুরের গ্রামে সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর মূর্তি ভাঙচুর, কাঠগড়ায় বিজেপি।” প্রতিবেদনে বলা হয়, “গত শুক্রবার রাতে দক্ষিণ দিনাজপুরের বংশীহারী ব্লকের দেউরিয়া গ্রামে অজ্ঞাতপরিচয় দুষ্কৃতীরা আদিবাসী স্বাধীনতা সংগ্রামী সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর মূর্তি ভাঙচুর করে এবং সেখানে বিজেপির পতাকা লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শনিবার এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়ায়। মূর্তি ভাঙচুরের এই ঘটনায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। তাঁরা বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন এবং এই ঘটনার পেছনে বিজেপি সমর্থকদের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন।”

অধিকতর যাচাইয়ে দেখা যায়, রেডিটের একাধিক (১, ২, ৩) কমিউনিটি, এক্স এবং ফেসবুকের একাধিক (১, ২, ৩) পোস্টেও ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়েছে আদিবাসীদের আন্দোলনের দৃশ্যের দাবিতে।
এছাড়াও, একাধিক (১, ২) প্রতিবেদনে সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মুর মূর্তি ভাঙচুরের ফলে আদিবাসীদের বিক্ষোভের বিষয়টি তুলে ধরা হয়। ভারত-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সব রং ইন্ডিয়ায় গত ১২ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “গত ৯ মে, শনিবার ঘটা এই ভাঙচুরের ঘটনার জেরে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষজন তীব্র আন্দোলনে ফেটে পড়েন এবং তারা এই ঘটনার জন্য বিজেপি সমর্থকদের অভিযুক্ত করেন।”
অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গে গরু খামারিদের বিদ্রোহের দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি আসলে আদিবাসীদের আন্দোলনের দৃশ্য। এর আগেও ডিসমিসল্যাব পশ্চিমবঙ্গকে জড়িয়ে ছড়ানো অপতথ্য নিয়ে একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
উল্লেখ্য, সিধু মুর্মু ও কানু মুর্মু ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসে ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহের নেতা। সিধু ও কানু দুই ভাইয়ের নেতৃত্বে সাঁওতাল বিদ্রোহ পরিচালিত হয়।
প্রসঙ্গত, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নবনির্বাচিত বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে গত ১৩ মে বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানানো হয়, নির্ধারিত সরকারি কর্তৃপক্ষের অনুমতি এবং পশু চিকিৎসকের দেওয়া ফিটনেস সনদ ছাড়া গরু, ষাঁড় বা মহিষের মতো কোনো পশু জবাই করা যাবে না। এই নিয়ম অমান্য করলে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। রাজ্য সরকারের এ সিদ্ধান্তের কারণে এবার ঈদুল আজহার আগে গরু কেনা বন্ধ করে দিয়েছেন মুসলিমরা। এতে করে সেখানকারহিন্দু গরু ব্যবসায়ীরা বিপদে পড়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অর্থ ও শ্রমে বড় করা গরুগুলো বিক্রি করতে না পেরে তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।