সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব
Fake Somakal photocard featuring two different teenagers.

এই শিহাব সেই সিহাব নয়

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সমকালের লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ডে দুইজন কিশোরের ছবি দিয়ে দাবি করা হয়, ছাত্রলীগকর্মী শিহাব এসএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে যাকে ফল প্রকাশের ২ দিন আগে হত্যা করা হয়। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ফটোকার্ডে প্রচারিত কিশোরদের নাম কাছাকাছি হলেও আসলে তারা ভিন্ন ব্যক্তি।

ফেসবুকের একটি গ্রুপ থেকে গত ১৩ আগস্ট ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়। কার্ডের ওপরে সংবাদমাধ্যম সমকালের লোগো দেওয়া আছে। ভেতরে ঝুলন্ত এক ব্যক্তির দেহের ছবি এবং সাদাকালো ছবিতে এক কিশোরের ছবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ছবির ওপরে লেখা, “ছাত্র লীগের শিহাব,” কার্ডের শিরোনামে বলা হয়, “মৃত্যুর দুই দিন পর এসএসসির ফল, শিহাব পেলেন গোল্ডেন জিপিএ-৫।” অন্যদিকে পোস্টের বর্ণনায় লেখা, “ছাত্র লীগের সেই শিহাবকে হত্যার ২দিন পরই এসএসসির রেজাল্ট প্রকাশ। সে জিপিএ ৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে।”

Fake Somakal photocard featuring two different teenagers.
সমকালের নকল ফটোকার্ডে ভুয়া দাবিতে প্রচারিত একাধিক ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।


ফেসবুকের আরও দুইটি গ্রুপ থেকে (, ) একই দাবিতে ফটোকার্ডটি পোস্ট করা হয়।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে ফটোকার্ডে থাকা দুইটি ছবির স্ক্রিনশট নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখে ডিসমিসল্যাব। যাচাইয়ে সংবাদমাধ্যম সমকালের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে গত ১০ আগস্ট প্রকাশিত একটি ফটোকার্ড এবং সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। ফটোকার্ডের ব্যবহৃত সাদাকালো ছবির সঙ্গে ছাত্রলীগ কর্মী দাবিতে প্রচারিত পোস্টের ছবির হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে। ফটোকার্ডের শিরোনাম ছিল, “মৃত্যুর দুই দিন পর এসএসসির ফল, শিহাব পেল গোল্ডেন জিপিএ-৫।” বিস্তারিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চাচার বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গত ৬ আগস্ট পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে যায় শিহাব। ৮ আগস্ট দুপুরে গোসল শেষে বাড়ির ছাদে কাপড় শুকাতে গেলে বিয়ের অনুষ্ঠানের ডেকোরেশনের জন্য টানানো রঙিন বাতির তারে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা যায় শিহাব। 

শিহাব ঢাকার বিমানবন্দর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। শিহাবের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ব্যাপারে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, একাধিক গণমাধ্যমে (, , , ) গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় জাগীর এলাকার একটি শহীদ মিনার থেকে সিহাব হোসেন (১৫) নামের এক কিশোরের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড মাছবাজারে এক মাছ ব্যবসায়ীর কর্মচারী হিসেবে কাজ করত। 

False claim links two deceased teenagers to one identity.
শিহাব ও সিহাব নামের দুইজন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির মৃত্যুর ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

সিহাবের লাশ উদ্ধারের পর তার ঝুলন্ত মরদেহের একাধিক ছবি ও প্রতীকী ছবি নিয়ে তা সামাজিক মাধ্যমে একাধিক পাল্টাপাল্টি দাবিতে (, , , , , ) প্রচার করা হয়েছিল।

একটি পোস্টের বর্ণনায় লেখা, “ছাত্রলীগ কর্মী শিহাবকে হ’ত্যা’র পর শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে রেখেছে জামাত-বিএনপির স’ন্ত্রা’সী’রা।’’ অন্যদিকে আরেক পোস্টের বর্ণনায় লেখা,“ছাত্রলীগ ছেড়ে জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়ায় মানিকগঞ্জে কিশোর শিহাবকে তুলে নিয়ে হত্যা করে শহীদ মিনারে ঝুলিয়ে দিয়েছে লীগ সন্ত্রাসীরা। এদিকে আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ থেকে পদত্যাগ করা ছাত্রদেরও গনহত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে লীগ সন্ত্রাসীরা!”

তবে, এ ঘটনা নিয়ে ডিজিটাল অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান ‘দ্য ডিসেন্ট’ -এর করা প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সিহাব কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার পর প্রায় বছরখানেক ধরে সে মাছের দোকানে কর্মচারী হিসেবে কাজ করত। এবার এসএসসি পরীক্ষা দেয়নি সে। তার পরিবার, বন্ধু এবং কর্মস্থলের পরিচালক দ্য ডিসেন্টকে জানায় সিহাব কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

ডেইলি স্টার বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৮ আগস্ট রাত থেকে সিহাব নিখোঁজ ছিল। পরদিন সকাল ৭টার দিকে সদর উপজেলার জাগীর এলাকায় একটি মাঠের পাশে অবস্থিত শহীদ মিনারে গলায় ফাঁস নেওয়া অবস্থায় ওই কিশোরের মরদেহ দেখেন স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনির হোসেন বলেন, টাকা না দেওয়ায় অভিমান থেকে সে আত্মহত্যা করতে পারে। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। তদন্তের পর বিষয়টি আরও নিশ্চিত হওয়া যাবে।

অর্থাৎ সমকালের লোগোযুক্ত নকল ফটোকার্ডে দুইটি ভিন্ন কিশোরের ছবি দিয়ে ছাত্রলীগ করায় হত্যকান্ডের শিকার শিহাব গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে এমন ভুয়া দাবি প্রচার করা হচ্ছে। মূলত দুইজন ভিন্ন ব্যক্তি ছিলেন। এবং শহীদ মিনারে ঝুলন্ত লাশ পাওয়া গেছে যে সিহাবের, সে এসএসসি পরীক্ষা দেয়নি।

আরো কিছু লেখা