রাঙামাটির সাজেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মধ্যে গোলাগুলির দৃশ্য দাবিতে ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, এটি সাজেকের সাম্প্রতিক সংঘর্ষের দৃশ্য নয়। একই দৃশ্য গত জুলাইয়ে মিয়ানমারের সামরিক সংঘাত নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া গেছে।
গত ২২ অক্টোবর রিকি রকি (Ricky Rocky) নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আট সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। এতে দাবি করা হয়, “রাঙামাটির সাজেকের বাঘাইছড়ি ইউনিয়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও ইউপিডিএফের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।” একই পোস্টে পর্যটকদের ওপর হামলা এবং সংঘর্ষে দুই সেনাসদস্য আহত ও কয়েকজন ইউপিডিএফ সদস্য গুলিবিদ্ধ হওয়ার কথাও বলা হয়। ভিডিওতে জঙ্গলের মধ্যে কয়েকজন ব্যক্তিকে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রায় দেড় হাজারের বেশি প্রতিক্রিয়া, ৪০টির বেশি মন্তব্য দেখা গেছে। এছাড়া, ভিডিওটি আড়াই শতাধিকবার শেয়ার হয়েছে।

ভিডিওর কয়েকটি কিফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করে দেখা হয়। এতে মিয়ানমারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেমোক্র্যাটিক ভয়েস অব বার্মার (ডিভিবি) ফেসবুক পেজে গত ৮ জুলাই প্রকাশিত একটি ভিডিও প্রতিবেদনে একই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। ভিডিওটির ২৩ সেকেন্ড থেকে ২৬ সেকেন্ড অংশে কয়েকজন সশস্ত্র ব্যক্তিকে জঙ্গলের মধ্যে গুলি ছুড়তে দেখা গেছে। তাদের অবস্থান, অস্ত্র ও আশপাশের গাছপালার সঙ্গে ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিওটির দৃশ্যের মিল রয়েছে। একই সংবাদমাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলেও ভিডিও প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়। ক্যাপশন ও টাইটেল অনুযায়ী ডিভিবির ওই প্রতিবেদনটি মিয়ানমারের কারেন রাজ্যের ফাপুন শহরের সামরিক সংঘাত নিয়ে।
একই দিনে সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইটেও এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফাপুন শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তাদের অগ্রযাত্রা রুখতে হামলা চালাচ্ছিল কারেন ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মির (কেএনএলএ) সহযোগী বাহিনীগুলো।

এছাড়া, ভিডিওতে এক সশস্ত্র ব্যক্তির পোশাকের বাহুতে একটি ব্যাজ দেখা যায়। ব্যাজটির নিচের অংশে নীল, সাদা ও লাল রঙের তিনটি ভাগ রয়েছে। ওপরের অংশে রয়েছে লাল-সাদা রঙের একটি চিহ্ন। ছবিটি অস্পষ্ট হওয়ায় ব্যাজটি কোন বাহিনীর, তা নিশ্চিত হতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।
ইউপিডিএফের নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দলীয় সংবিধান অনুযায়ী, সংগঠনটির পতাকার ওপর ও নিচের অংশ লাল। মাঝের অংশ নীল এবং সেখানে একটি সাদা তারকা রয়েছে। দলের মনোগ্রাম হিসেবে ব্যবহার করা হয় তীর-ধনুক। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) ওয়েবসাইটে প্রকাশিত পতাকায় সাদা ও লাল অংশের সঙ্গে হলুদ তারকা রয়েছে। সংগঠনটির মনোগ্রামও আলাদাভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। ভিডিওতে দেখা ব্যাজের সঙ্গে এই দুটি সংগঠনের ব্যাজের মিল নেই। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পোশাক বা ব্যাজের সঙ্গেও দৃশ্যমান কোনো মিল পাওয়া যায়নি।

অর্থাৎ, সাজেকের সাম্প্রতিক গোলাগুলির ঘটনার সঙ্গে ছড়ানো ভিডিওর কোনো সম্পর্ক নেই। একই দৃশ্য তিন মাসেরও বেশি আগে ডিভিবির একটি ভিডিও প্রতিবেদনে দেখা গেছে। তবে ভিডিওটি ঠিক কোথায় ধারণ করা হয়েছে এবং দৃশ্যমান ব্যক্তিরা কোন বাহিনীর সদস্য, তা নিশ্চিত হতে পারেনি ডিসমিসল্যাব।
প্রসঙ্গত, গত ২২ অক্টোবর রাঙামাটির সাজেকের গঙ্গারাম বাজার এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনী ও ইউপিডিএফের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর)। তবে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউপিডিএফের পক্ষ থেকে এ অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। সাজেকে চলমান পরিস্থিতি নিয়ে এর আগেও ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব।

