মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক ফ্যাক্টচেক শিবিরের নয়, রাজশাহী সিটি কলেজে সংঘর্ষের দৃশ্যটি ছাত্রদলের দুই পক্ষের

শিবিরের নয়, রাজশাহী সিটি কলেজে সংঘর্ষের দৃশ্যটি ছাত্রদলের দুই পক্ষের 

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

রাজশাহী সিটি কলেজে শিবিরের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের দাবিতে সম্প্রতি একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ওই কলেজের দুই পক্ষের সংঘর্ষের একটি দৃশ্য। 

ফেসবুকে ‘রেদোয়ান জয়’ নামের একটি প্রোফাইল থেকে ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা হয়, “শিবিরের এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের উপর ইনসাফ কায়েম করছে।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এই ভিডিও ২৫০ বারের অধিক শেয়ার হয়েছে। প্রতিক্রিয়া এসেছে ৬০০ এর অধিক। রেদোয়ান জয় নামের প্রোফাইলটির বায়োতে লেখা, “বৃত্তি ও ছাত্রকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।” 

ফ্যাক্টচেক ফ্যাক্টচেক শিবিরের নয়, রাজশাহী সিটি কলেজে সংঘর্ষের দৃশ্যটি ছাত্রদলের দুই পক্ষের
ভুয়া দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

ভিডিওটি আরও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে পোস্ট করতে দেখা যায় (,,)। 

ভিডিওতে দেখা যায়, একটি জলাশয় ও জলাশয়-সংলগ্ন রেলিং দেওয়া রাস্তার পাশে কিছু লোকজনের মধ্যে হাতাহাতি চলছে। ভিডিওর প্রথমাংশে বেশ কয়েকজনকে উত্তেজিত অবস্থায় ধাক্কাধাক্কি করতে এবং আরেক অংশে ভিড়ের মধ্যে একটি প্লাস্টিকের চেয়ার ছুড়ে মারতে দেখা যায়। আবার ভিডিওর অন্য দৃশ্যে দেখা যায়, জলাশয়ের পাড়ে প্লাস্টিকের চেয়ারে বসা কয়েকজন তরুণের মাঝে হঠাৎ করে সংঘাতের সৃষ্টি হয়েছে। এ সময় একজনকে একটি লম্বা বাঁশ হাতে তেড়ে যেতে দেখা যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত লোকজন তীব্র সংঘর্ষ ও হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটির মধ্যে লেখা আছে, “রাজশাহী সিটি কলেজে শিবিরের দুই গ্রুপের তুমুল সংঘর্ষ।” 

ভিডিওর উপরে ডান কোণে একটি লোগোর মধ্যে লেখা আছে ‘পূবের শিখা সংবাদ।’ নামটি ফেসবুকে সার্চ দিলে একই লোগো রয়েছে এমন একটি পেজ সামনে আসে। পেজটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত ২২ জুন হুবহু একই ভিডিও ‘শিবিরের সংঘর্ষ’ দাবিতে এটি থেকে পোস্ট করা হয়েছিল। 

ভিডিওর কয়েকটি কিফ্রেম সার্চ করে ‘সোনার দেশ’ নামের একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও ‘পদ্মা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডট কম’ নামের একটি ফেসবুক পেজের পোস্টে একই দৃশ্যের সঙ্গে মিল রয়েছে, এমন ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। সোনার দেশ- এর প্রতিবেদনের শিরোনামে লেখা আছে, “রাজশাহী সিটি কলেজ ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে বিক্ষোভ, দুইপক্ষের হাতাহাতি।” পদ্মা টাইমস টোয়েন্টিফোর ডট কম ফেসবুক পেজ একটি কমিটির তালিকার ছবি ও সংঘর্ষের একাধিক ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “রাজশাহী সিটি কলেজ ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ।” 

অধিকতর যাচাইয়ে ইউটিউবে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড লিখে সার্চ দিলে, সংবাদমাধ্যম প্রথম আলোর একটি ভিডিও প্রতিবেদন ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। ভিডিওটি প্রথম আলোর ইউটিউব চ্যানেলে আপলোড করা হয় গত ১৯ জুন। 

ফ্যাক্টচেক ফ্যাক্টচেক শিবিরের নয়, রাজশাহী সিটি কলেজে সংঘর্ষের দৃশ্যটি ছাত্রদলের দুই পক্ষের
মূল ঘটনা নিয়ে প্রথম আলোর ভিডিও প্রতিবেদন।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিবিরের সংঘর্ষ দাবিতে ছড়ানো ভিডিও এবং প্রথম আলোর ভিডিওর শুরুর দিকের দৃশ্য প্রায় অভিন্ন। উভয় ভিডিওতেই একই জলাশয়, সংলগ্ন রেলিং এবং বাঁশের কাঠামোর পাশে একই তরুণদের মধ্যে তীব্র হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা দৃশ্যমান। এমনকি, ভিড়ের মধ্যে একটি নীল রঙের প্লাস্টিকের চেয়ার ছুড়ে মারার মুহূর্ত এবং লম্বা বাঁশের লাঠি হাতে তেড়ে যাওয়ার দৃশ্যটিও উভয় ভিডিওতে হুবহু এক। তবে প্রথম আলোর ভিডিও প্রতিবেদনে ঘটনাটি ছাত্রদলের দুই পক্ষের মারামারি বলে জানানো হয়েছে। ভিডিওর টাইটেলে লেখা আছে, “কমিটি ঘোষণার পর রাজশাহী সিটি কলেজে ছাত্রদলের দুই পক্ষে ব্যাপক মারামারি।” 

প্রথম আলো ছাড়াও সংবাদমাধ্যম ‘সমকাল’ গত ২০ জুন ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনেও জানানো হয়েছে, “রাজশাহী সিটি কলেজে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে দুই পক্ষের হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।” প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, “শুক্রবার সন্ধ্যায় সিটি কলেজ ছাত্রদলের নবগঠিত কমিটি বাতিল করে নতুন কমিটি গঠনের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে ছাত্রদলের একাংশের নেতাকর্মীরা। এ সময় সড়কের পাশে টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করা হয়। পরে নতুন কমিটির দায়িত্বপ্রপ্তরা সেখানে গেলে দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিত শান্ত করে।” আরও কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে দেখা যায় (,,)। সবগুলোতেই রাজশাহী সিটি কলেজে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের খবর জানানো হয়। 

অর্থাৎ, রাজশাহী সিটি কলেজে শিবিরের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের দাবিতে ছড়ানো ৪৩ সেকেন্ডের ভিডিওটি মূলত কমিটি ঘোষণা নিয়ে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষের একটি দৃশ্য। 

আরো কিছু লেখা