মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব
‘ভারতে কোরআন পোড়ানো’র দাবিতে ছড়ানো ভিডিওতে পুড়ছিল হিমাচলের মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা

‘ভারতে কোরআন পোড়ানো’র দাবিতে ছড়ানো ভিডিওতে পুড়ছিল হিমাচলের মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা

মোঃ হিমেল হাসনাত রাফি

ফেলো, ডিসমিসল্যাব

ভারতে কোরআন পোড়ানো হচ্ছে, এমন দাবিতে সম্প্রতি ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, দাবিটি মিথ্যা। এটি হিমাচল প্রদেশের মান্ডিতে গত ২৫ আগস্ট বিক্ষোভ চলাকালে মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর ভিডিও।

গত ৭ নভেম্বর “পালস-Pulse” নামের একটি ফেসবুক পেজ ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ১৩ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, কিছু মানুষ জ্বালানি তেল ঢেলে রাস্তায় আগুন জ্বালাচ্ছেন। কয়েকজনের গলায় উত্তরীয় দেখা যায়। পোস্টে দাবি করা হয়, “ভারতে কোরআন শরীফ পু’রি’য়ে দিচ্ছে অগ্রহিন্দুরা” (বানান অপরিবর্তিত)। এ প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত পোস্টটিতে ৬ হাজার ৮০০ বারের বেশি প্রতিক্রিয়া এসেছে। ভিডিওটি ৪ হাজার ৭০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে এবং প্রায় ৪ লাখ বার দেখা হয়েছে।

সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে “হিমভূমি ডায়ালগস” (HimBhoomi Dialogues) নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে একই দৃশ্যের ১৩ সেকেন্ডের ভিডিও পাওয়া যায়। গত ২৫ আগস্টের সে পোস্টের লেখা ছিল, “মান্ডিতে ভারতীয় জনতা যুব মোর্চার বিক্ষোভ, মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা পোড়ানো হয়েছে” (হিন্দি থেকে অনূদিত)। পোস্টে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। এরপর কর্মীরা আবার তেল ঢালেন।

একই দিনে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম “খবর আভি আভি” (Khabar Abhi Abhi)-এর ফেসবুক পেজেও একই ঘটনার ভিডিও প্রকাশিত হয়। 

ফেসবুকে ‘খবর আভি আভি’ পেজে (বামে) ও ‘অ্যাডভোকেট যোগরাজ ডোগরা’-এর অ্যাকাউন্টে (ডানে) প্রকাশিত প্রতিবাদের ভিডিওর স্ক্রিনশট; উভয় ভিডিওতে লাল বাক্সে চিহ্নিত একই ব্যক্তির উপস্থিতির মিল

ভিন্ন কোণ থেকে ধারণ করা একই ঘটনার আরেকটি ভিডিও পাওয়া যায় “অ্যাডভোকেট যোগরাজ দগরা” (Adv Yograj Dogra) নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে। নিজেকে বিজেপি যুব মোর্চার মান্ডি জেলা সভাপতি দাবি করা ওই ব্যবহারকারী গত ২৭ আগস্ট ভিডিওটি প্রকাশ করেন। ৫৫ সেকেন্ডের ওই ভিডিওতে বিজেপির পতাকা, উত্তরীয় পরা কর্মী ও পুলিশ সদস্যদের দেখা যায়। দুটি ভিডিওতেই সাদা টুপি পরা একই ব্যক্তিকে দেখা যায়। ক্যাপশনে লেখা, “যুবকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার প্রতিবাদে মান্ডি জেলার বিজেপি যুব মোর্চার উদ্যোগে মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখুর কুশপুত্তলিকা দহন” (হিন্দি থেকে অনূদিত)। দুটি ভিডিওর কোনোটিতে কোরআন পোড়ানোর উল্লেখ নেই।

এ ঘটনাটি নিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন পাওয়া যায়। গত ২৫ আগস্ট ইটিভি ভারত জানায়, বেকারত্ব ও কংগ্রেস সরকারের কর্মসংস্থান গ্যারান্টি পূরণ না হওয়ার অভিযোগে মান্ডি শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। বিক্ষোভে বিজেপি যুব মোর্চার কর্মীরা মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা পোড়ান। পুলিশ পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে কর্মীরা আবার তেল ঢেলে আগুন ধরান। একই দিন হিমাচল দস্তক জানায়, কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর সময় পুলিশের সঙ্গে কর্মীদের ধস্তাধস্তি হয়। তেল ঢালার পর আগুনের শিখা কর্মীদের কাপড় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ‘ইটিভি ভারত’ (বামে) এবং ‘হিমাচল দস্তক’ (ডানে) সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

গত ২৬ আগস্ট প্রকাশিত আমার উজালার প্রতিবেদনে বলা হয়, দুপুর প্রায় ১২টার দিকে ডেপুটি কমিশনারের কার্যালয়ের গেটের কাছে বিক্ষোভ শুরু হয়। কর্মীরা হঠাৎ কুশপুত্তলিকায় আগুন ধরান। পুলিশ পানি ঢেলে আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে কর্মীরা তাদের বাধা দেন। এরপর কর্মীরা শহরে মিছিল করেন। একই দিন দ্য ট্রিবিউনও প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, বিজেপি যুব মোর্চার জেলা সভাপতি যোগরাজ ডোগরা অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ১০টি গ্যারান্টির কথা বলেছিল। এর মধ্যে ছিল প্রতিবছর এক লাখ চাকরি। চারটি প্রতিবেদনের কোনোটিতে কোরআন বা অন্য কোনো ধর্মগ্রন্থ পোড়ানোর উল্লেখ নেই।

অর্থাৎ, ভিডিওটি কোরআন পোড়ানোর নয়, গত ২৫ আগস্ট হিমাচল প্রদেশের মান্ডিতে মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর।

একই দাবি এর আগেও ছড়িয়েছিল, এ নিয়ে ফ্যাক্টওয়াচ ও এএফপি ফ্যাক্টচেক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

আরো কিছু লেখা