তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীর ছবিটি এআই নির্মিত

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীর ছবিটি এআই নির্মিত

তাসনিম তাবাস্সুম মুনমুন

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর একটি ছবি সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়েছে একাধিক সামাজিক মাধ্যমে। দাবি করা হচ্ছে— কারামুক্তির পরদিনই সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে সাবেক এই মেয়র সরাসরি ছুটে যান ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি। 

নিজেদের গণমাধ্যম বলে পরিচয় দেওয়া বেঙ্গলি জার্নাল নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে গতকাল (৬ জুন) প্রতিবেদনসহ একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। কার্ডে লেখা— “কারামুক্তির পরদিনই ঐতিহাসিক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সাবেক মেয়র আইভী”। ছবিতে ধানমন্ডি ৩২ বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ঘোষিত শেখ মুজিবুর রহমানের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাসভবনটি দেখা যায়। তার সামনে বিজয়ী সংকেত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন জামিনে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি দুই শতাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে।

২০২৪ সালে আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে সশরীরে গিয়ে কোনো শীর্ষ স্তরের আওয়ামী লীগ নেতার এটাই প্রথম প্রকাশ্য শ্রদ্ধা নিবেদনের ঘটনা বলে দাবি করা হয় প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদন অনুসারে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মী ও অনুসারীদের সামনে তিনি বলেন, “এই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর ধ্বংস করলেই বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে কখনো শেষ করে দেওয়া যাবে না।” দাবি করা হয়— আইভীর এই সফর এবং সেখান থেকে দেওয়া রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া সামাজিক মাধ্যম ও দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক মহলে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। 

ফ্যাক্টচেক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীর ছবিটি এআই নির্মিত
বেঙ্গলি জার্নাল-এর ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

বাংলাদেশ ২.০ নামে অপর একটি পেজ থেকে একই ছবি পোস্ট করে লেখা হয়, “জামিন পেয়েই ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বারে উপস্থিত হয়ে সেখান থেকে স্বৈরাচার দোসর সেলিনা হায়াৎ আইভী ‘ভিক্টোরি’ সংকেতের মাধ্যমে মূলত সরকার তথা জুলাই আন্দোলনকারিদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেন।” পোস্টটি এ পর্যন্ত দেড় শতাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে।

এর আগে একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গত ৫ জুন ছবিটি পোস্ট করা হয়। যার ক্যাপশন বাংলাদেশ ২.০ পেজ থেকে দেওয়া পোস্টের ক্যাপশনের সঙ্গে মিলে যায়। উপস্থিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তার বক্তব্য হিসেবে আরও দাবি করা হয়— তার নামে দায়ের করা মামলাকারীদের বাড়িঘরও বত্রিশ নম্বরের মতো হবে।

একই ছবি ফেসবুক ছাড়াও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক মাধ্যম এক্স (, ) ও ইনস্টাগ্রামের (, ) একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে। রিভোল্ট নামে এক এক্স অ্যাকাউন্ট ছবিটি পোস্ট করে লিখেছে, “ধন্যবাদ বিএনপি সরকারকে আওয়ামী লীগের পা চাটার জন্য। বিএনপি আইভিরে মুক্তি দিয়েছে, আর মুক্তি পেয়েই সে ৩২ নাম্বারে গিয়ে বিজয় চিহ্ন দেখাচ্ছে।”

পর্যবেক্ষণে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে কিছু অসঙ্গতি; যেমন আলো ও ছায়ার তারতম্য এবং আঙুলের কাঠামোর অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। ছবির নিচে ডান পাশে জেমিনির লোগো দেখা যায়। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির “ন্যানো বানানা” নামের একটি মডেল ব্যবহার করে ছবি সম্পাদনা করলে সম্পাদিত ছবিতে এমন জলছাপ থাকে।

ফ্যাক্টচেক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীর ছবিটি এআই নির্মিত
ছবিগুলোর নিচে ডান পাশে জেমিনির লোগো দেখা যায়।

গুগল জেমিনির এআই শনাক্তকরণ টুল “সিন্থ-আইডি” ব্যবহার করে এটি এআই দিয়ে তৈরি কি না জানতে চাওয়া হয়। জেমিনির সিন্থ-আইডি ফিচার জানায়, এই ছবির বেশিরভাগ অংশ বা পুরোটিই গুগল এআই দিয়ে সম্পাদনা বা তৈরি করা হয়েছে। এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ টুল এআই অর নটহাইভ মডারেশন দিয়েও যাচাই করে দেখা গেছে, ছবিটি এআই দিয়ে তৈরির সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ (৯৯.৯%)।  

এদিকে সেলিনা হায়াৎ আইভীর মূল ছবিটি ২০২২ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তৃতীয় বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হওয়ার সময়কার। সেসময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে (, ) একই ছবি প্রচারিত হতে দেখা যায়। এসব প্রতিবেদনের ছবি ও সেদিনের ভিডিও প্রতিবেদনে তাকে একই পোশাকে দেখা যায়। তার পরিহিত পোশাক, এর রং, অঙ্গভঙ্গি সবই সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া ধানমন্ডি ৩২ এর সামনে তার ছবির সঙ্গে মিলে যায়।

  • ফ্যাক্টচেক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীর ছবিটি এআই নির্মিত
  • ফ্যাক্টচেক ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সাবেক মেয়র আইভীর ছবিটি এআই নির্মিত

এছাড়া কোনো গণমাধ্যমে আইভীর ধানমন্ডি ৩২ পরিদর্শন সম্পর্কিত কোনো খবর প্রকাশিত হয়নি। বরং গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, বাড়ি ফেরার পর তার বাসভবন ঘিরে নজরদারি জোরদার করেছে পুলিশ। জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সাবেক এই মেয়রের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তিনি যেন নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত না হন কিংবা তার পক্ষে কেউ উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা না করে, সেটিও তাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে। 

জামিনে মুক্ত হওয়ার পর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন আইভী, “আমি চাই সবাইকে নিয়ে মানবিক সরকার গঠিত হোক। আমার মতো আরও অনেক নিরপরাধ মায়েরা আছেন, আশা করি সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবে।” এর বাইরে তার কোনো বক্তব্য সংবাদমাধ্যমে আসেনি।

অর্থাৎ, শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের ছুটে যাওয়ার দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ছবিটি এআই নির্মিত। 

আরো কিছু লেখা