মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
ফ্যাক্টচেক পদ্মা সেতুর ভাঙা পিলারের ছবিটি এআই নির্মিত

পদ্মা সেতুর ভাঙা পিলারের ছবিটি এআই নির্মিত

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

পদ্মাসেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে- দাবিতে সম্প্রতি একটি ছবি ইউটিউব ও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ছবিটি এআই দিয়ে বানানো।

দূর্জয় মাটি দূর্জয় দেশ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ছবিটি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “ঝুঁ*কিপূর্ণ পদ্মা সেতু, দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের জন্য কি অপেক্ষা করছে…..See more।” এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি চার শর অধিক শেয়ার হয়েছে। প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন ৯০০ এর বেশি ব্যবহারকারী। কিছু ব্যবহারকারী মন্তব্যে ছবিটিকে এআই বলে দাবি করেছেন। আবার কিছু মন্তব্যে বোঝা যায়, ছবিটি আসল ধরে নিয়েছেন তারা।

ছবিটি আরও একাধিক অ্যাকাউন্ট থেকে একই দাবিতে পোস্ট করতে দেখা গেছে (,,) ।

ফ্যাক্টচেক পদ্মা সেতুর ভাঙা পিলারের ছবিটি এআই নির্মিত
পদ্মাসেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে- এমন দাবিতে ছড়িয়ে পড়া ছবির স্ক্রিনশট।

এছাড়া, ইউটিউবের ‘টকস বিডি নিউজ’ নামের চ্যানেল থেকে একই ছবি প্রচার করতে দেখা যায়। একটি মন্তব্যে লেখা হয়েছে,“খুবই দুঃখজনক এ ঘটনাটা যারা ঘটিয়েছে আমাদের দক্ষিণবঙ্গের মানুষের হৃদয়ে আঘাত করেছে।” আরেকটি মন্তব্যে লেখা হয়েছে, “রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দ্বায়িত্ব সরকারের, তবে এমন চললে সরকার টিকবে কি না বুঝতে পারছি না।” 

ছবিতে দেখা যায়, একটি বৃহৎ সেতুর (পিলার নম্বর P41) নিচের অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পিলারের গায়ে লেখা রয়েছে “পদ্মা বহুমুখী সেতু- পিলারের ক্ষতি”। পিলারের নিচের কংক্রিট ধসে পড়েছে এবং ভেতরের রড বেরিয়ে আছে। সেতুটি দেখতে পদ্মা বহুমুখী সেতুর মতো। ঘটনাস্থলে একদল সংবাদকর্মীকে দেখা যায়, পেছনে নদীর বুকে নৌযান আছে।

পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ভিডিও ক্যামেরা এবং মাইক্রোফোনগুলোর গঠন স্বাভাবিক নয়। মাঝখানের যে প্রতিবেদক দুটি মাইক্রোফোন ধরে আছেন, সেটি তার হাতের সাথে অস্বাভাবিকভাবে মিশে আছে। এছাড়া, অন্য হাতের সবগুলো আঙুল স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। ছবিতে ‘চ্যানেল আই’ ও ‘এটিএন নিউজ’ নামের দুইটি গণমাধ্যমের লোগো সম্বলিত বুম দেখা যায়। তবে লোগোতে থাকা টেক্সট স্পষ্ট নয়, বরং কিছুটা অস্বাভাবিক বলে প্রতীয়মান হয়।  

সত্যতা যাচাইয়ে পদ্মা সেতুর পিলার ভাঙা বা সেতু কেন্দ্রিক কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে কি না, জানতে একাধিক প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।  

অধিকতর যাচাইয়ে ছবিটি একাধিক এআই টুল দিয়ে যাচাই করা হয়। গুগল জেমেনির এআই শনাক্তকারী টুল দিয়ে ছবিটি পরীক্ষা করা হলে ফলাফলে জানানো হয়, “ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক এবং বেশ কিছু দৃশ্যমান অসামঞ্জস্যতা থেকে এটি নিশ্চিত যে, আলোচ্য ছবিটি ‘গুগল এআই’ দ্বারা তৈরি বা সম্পাদিত।” 

এরপর আরেকটি এআই শনাক্তকারী টুল ‘হাইভ মডারেশন’ দিয়েও ছবিটি পরীক্ষা করা হয়। ফলাফলে জানানো হয়, ছবিটি এআই নির্মিত হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ। 

  • ফ্যাক্টচেক পদ্মা সেতুর ভাঙা পিলারের ছবিটি এআই নির্মিত
  • ফ্যাক্টচেক পদ্মা সেতুর ভাঙা পিলারের ছবিটি এআই নির্মিত

অর্থাৎ, পদ্মাসেতু ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে দাবিতে যে ছবিটি ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়েছে, সেটি বাস্তব কোনো দৃশ্যের নয়, বরং এআই নির্মিত।

উল্লেখ্য, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় সম্প্রতি পদ্মা রেলসেতুর পিলারের নিচ থেকে মাটি কাটার খবরে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং একটি প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে মাটি বিক্রির অভিযোগ ওঠে। খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে কাজ বন্ধ করে দেয়।

তবে সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এটি কোনো অবৈধ কাজ নয় বলে রেল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে। মূলত সেতু নির্মাণের সময় তৈরি অস্থায়ী সড়কের মাটি সরিয়ে জলাশয় পুনরুদ্ধার ও পরিবেশের ভারসাম্য ফেরাতেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি অপসারণ করছিল, এতে সেতুর কোনো ঝুঁকি নেই। তবুও জনমনে বিভ্রান্তি এড়াতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বর্তমানে মাটি কাটা বন্ধ রেখে স্থানটি বৃক্ষরোপণের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে।

আরো কিছু লেখা