সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি কলকাতায় বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দেওয়ার দৃশ্য দাবিতে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। আবার কোনো কোনো পোস্টে বলা হচ্ছে, তা মুসলিম নিধনের ঘটনা। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি নেপালের। গুগল ম্যাপ অনুযায়ী, ভিডিওতে থাকা ভবন, গাছ, সাইনবোর্ডসহ পারিপার্শ্বিক সকল জিনিস নেপালের কাঠমান্ডুর সুপ্রিম কোর্ট এলাকার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ৫ মে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “কলকাতার অবস্থা ভালো নয় মানুষের বাড়িঘর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সব জ্বালিয়ে দিচ্ছে নরেন্দ্র মোদির লোকেরা।” ১৭ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন ব্যক্তি লাঠি হাতে জড়ো করে রাখা মোটরসাইকেল ভাঙচুর করছে। ভিডিওর বাকি অংশে একাধিক ভবনে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ভিডিওটি অন্তত ৭০ হাজার বার শেয়ার করা হয়েছে এবং দেখা হয়েছে ৬৫ লাখ বারের বেশি। একই ক্যাপশনে ভিডিওটি ফেসবুকের একাধিক (১ ,২, ৩, ৪, ৫, ৬) প্রোফাইল এবং পেজ থেকে পোস্ট হতে দেখা যায়।

আবার “অশান্ত পশ্চিমবঙ্গ।। চলছে মুসলিম নিধন।।” ক্যাপশনেও গত ৬ মে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। একই ক্যাপশনে ভিডিওটি ফেসবুকের একাধিক (১ ,২, ৩) প্রোফাইল এবং পেজ থেকে পোস্ট হতে দেখা যায়। এছাড়া একাধিক সামাজিক মাধ্যম ইনস্টাগ্রাম (১, ২), টিকটক এবং ইউটিউবেও ভিডিওটি কলকাতার দাবিতে ছড়াতে দেখা যায়।
দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির কি-ফ্রেম ধরে সার্চ করলে গুগল এআই ওভারভিউ স্থানটিকে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে। ডিসমিসল্যাব পরবর্তীতে গুগল ম্যাপে এলাকাটির সঙ্গে ভিডিওটি যাচাই করে দেখে। গুগল ম্যাপ জায়গাটিকে “রামশাহ পথ, কাঠমান্ডু” নামে অভিহিত করে। ভিডিওর ২ সেকেন্ডে গাছের পেছনে লাল রঙের একটি ভবন দেখা যায়। ভবনটির সামনে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটিতে কিছু তার গোল করে প্যাঁচানো অবস্থায় দেখা যায়। এই একই দৃশ্য গুগল ম্যাপেও দেখা যায়।

ভিডিওটির ৯ সেকেন্ডে একটি ল্যাম্পপোস্টের পাশে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। গুগল ম্যাপেও ল্যাম্পপোস্টটি এবং তার পাশের সাইনবোর্ডটি শনাক্ত করা যায়।

ভিডিওর ১১ সেকেন্ডে একটি গাছের পেছনে সাদা এবং হালকা গোলাপি রঙের ভবন দেখা যায়। ভবনটির সামনে একটি ল্যাম্পপোস্টের সাদা-সবুজ রঙের খুঁটি দেখা যায়। খুঁটিটিতে ১ লেখা নম্বরও দেখা যায়। গুগল ম্যাপে যাচাই করলে গাছ, ভবন, খুঁটি এবং এ সকল বস্তুর রং, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।

ভিডিওর ১২ থেকে ১৩ সেকেন্ডে একটি ভবন দেখা যায়, ভবনটির ফটকের দুপাশে গোলাকৃতি বস্তু সদৃশ দুটি জিনিস দেখা যায়। গুগল ম্যাপে যাচাই করলে এই ফটকটি পাওয়া যায়। এই ভবনটিকেই গুগল ম্যাপে নেপালের সুপ্রিম কোর্ট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এছাড়া ভিডিওর ১৩ এবং ১৭ সেকেন্ডে দুজন ব্যক্তির পিঠে নেপালের পতাকা দেখা যায়। অধিকতর যাচাইয়ের জন্য নেপালের তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘নেপালফ্যাক্টচেক’-এর সম্পাদক উমেশ শ্রেষ্ঠার সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি জানান, ভিডিওতে দেখানো স্থানটি নেপালের কাঠমান্ডুর রামশাহ পথের সুপ্রিম কোর্ট এলাকার এবং শুধু জেন-জি আন্দোলনের সময়েই সুপ্রিম কোর্ট এলাকায় এ ধরনের হামলা হয়েছিল।
অর্থাৎ, কলকাতায় মুসলিমদের উপর হামলার দাবিতে ছড়াচ্ছে নেপালের ২০২৫ সালে সংগঠিত জেন-জি আন্দোলনের ভিডিও।
প্রসঙ্গত, গত ৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয় লাভ করে। ফলাফল ঘোষণার পর পশ্চিমবঙ্গে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বলে জানা যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে। এখন পর্যন্ত নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় বহু হতাহতসহ নিহত হয়েছেন ৪ জন ব্যক্তি। এর আগেও পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনকে জড়িয়ে একাধিক ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ডিসমিসল্যাব।

