সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে সম্প্রতি একটি ভিডিও পোস্ট করে দাবি করা হয়েছে, নাম মুজিবুর রহমান হওয়ায় মবের শিকার হয়ে কলারোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাধ্যতামূলক অবসরে গেছেন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা গেছে, দাবিটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে মোঃ মুজিবুর রহমান স্বাভাবিক নিয়মেই অবসরে গেছেন, কোনো মবের শিকার হননি। ডিসমিসল্যাবকে তিনি নিশ্চিত করেছেন, তার অবসরের সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
গত ১ সেপ্টেম্বর ফেসবুকে একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে একটি ভিডিও পোস্ট করা হয়। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা হয়, “মবের শিকার হয়ে কলারোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান বাধ্যতামূলক অবসরে। তার অপরাধ তার নাম মুজিবুর রহমান! ভয়ে তারপাশে তার সহকর্মীরা না দাড়ালেও, কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে তার প্রিয় শিক্ষার্থীরা…।”

১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যায়, একদল স্কুলশিক্ষার্থী সাদা জামা পরিহিত এক প্রৌঢ় ব্যক্তিকে ঘিরে কান্না করছে। এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ায় আগ পর্যন্ত ভিডিওটিতে ২ হাজার ২০০ বারের বেশি প্রতিক্রিয়া ছিল, ৯০০ বারের বেশি শেয়ার হয়েছে এবং ৪৮ হাজারের বেশি বার দেখা হয়েছে।
প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে একই দাবিতে ভিডিওটি একাধিক ফেসবুক পেজ (১, ২) ও ব্যক্তিগত প্রোফাইল (১, ২, ৩) থেকে পোস্ট করা হয়।
দাবির সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির বিভিন্ন কিফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করে ডিসমিসল্যাব। এতে গত ৩১ আগস্ট ফেসবুকে ‘ফারুক রাজ’ (Faruk Raz) নামের একটি পেজ থেকে পোস্ট করা ভিডিওর সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা, “শিক্ষার্থীদের চোখের পানিতে এভাবে প্রধান শিক্ষকের বিদায় কতটা কষ্টের হয় এটা সেই শিক্ষক জানেন । আজ চাকরি জীবনের শেষ স্বাক্ষর করেছেন কলারোয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মুজিবুর রহমান। আপনার জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে রহমত কামনা করছি 🤲 🥺”।
অধিকতর যাচাইয়ে কিওয়ার্ড সার্চ করে গত ৩১ আগস্ট মোঃ ইমামুর রহমান নামের একটি ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট পাওয়া যায়, যেখানে মোঃ মুজিবুর রহমানের বিদায়কে দীর্ঘ ও শ্রদ্ধাপূর্ণ কর্মজীবনের স্বীকৃতি হিসেবে তুলে ধরা হয়। পোস্টে তার সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আন্তরিকতার বিস্তারিত বর্ণনা ছিল। কোথাও মব, জোরপূর্বক অবসর বা রাজনৈতিক কোনো চাপের কোনো উল্লেখ নেই।

অনুসন্ধানে ডিসমিসল্যাব মোঃ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল খুঁজে পায়। তার অ্যাকাউন্টেও ফারুক রাজের ভিডিওটি শেয়ার করতে দেখা যায়। মুজিবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি নিজেই নিশ্চিত করেন দাবিটি সঠিক নয়।
ডিসমিসল্যাবকে তিনি বলেন, “আমার জন্মতারিখ ১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৭। আমার চাকরি জীবন শেষ হয়েছে ৩১ আগস্ট। স্বাভাবিক ভাবে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আমি অবসরে যাচ্ছি। এখন আমি পিআরএল-এ যাচ্ছি।”
নাম মুজিবুর রহমান হওয়ায় মবের শিকার হয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ধরনের কোনো ঘটনাই হয়নি। আমি এত বছর সুনামের সাথে চাকরি করে আসছি। স্বাভাবিক ভাবেই আমি অবসরে গিয়েছি। এইখানে কোনো রাজনৈতিক সংযোগ নেই।”
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮ অনুযায়ী একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারী ৫৯ বছর বয়স পূর্ণ হলে অবসরে যান এবং পরবর্তী সর্বোচ্চ এক বছর অবসর-উত্তর ছুটি বা পিআরএল (Post Retirement Leave) ভোগ করেন, যা একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। মোঃ মুজিবুর রহমানের জন্মতারিখ ও কর্মজীবনের শেষ কর্মদিবস এই নিয়মের সঙ্গে পুরোপুরি সংগতিপূর্ণ, অর্থাৎ নির্ধারিত বয়সসীমা পূর্ণ হওয়াতেই অবসরে গেছেন তিনি।
অর্থাৎ, নাম মুজিবুর রহমান হওয়ায় মবের শিকার হয়ে প্রধান শিক্ষকের বাধ্যতামূলক অবসরের দাবিটি মিথ্যা।

