
ফেসবুকে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দাবি করা হচ্ছে, ভারতের মিরাট শহরে একযোগে ৫০টি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ভিডিওটি ভারতের মিরাট নয় বরং উত্তর প্রদেশের হাপুর জেলার ঘটনা। একাধিক ভারত-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম এবং তথ্য যাচাইকারী সংস্থা অনুযায়ী, গত ৯ মে উত্তর প্রদেশের হাপুরের ধৌলানা থানা এলাকার অন্তর্গত দেহরা গ্রামে মহারানা প্রতাপ জয়ন্তীর একটি মিছিল চলাকালে দুটি দল সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। এ সহিংসতায় দোকানপাট এবং যানবাহন ভাঙচুর করা হলেও কোনো মসজিদ ভাঙার সংবাদ পাওয়া যায়নি।
ফেসবুকের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে গত ১৭ মে একটি ভিডিও পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, “মিরাট শহরের দৃশ্য এটি একযোগে ৫০ টি মসজিদ ভেঙ্গে ভরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেয়া হচ্ছে। সাথে সাথে মুসলি#মদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসতবাড়িও জালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাশের দেশ হিসেবে পাকিস্তান বাংলাদেশের কি কোন কিছুই করণীয় নেই? এভাবে জ্বলতে দিলে এ আগুনে ভস্ম হতে পারেন আপনি ও” (বানান অপরিবর্তিত)। ২৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে দেখা যায়, একটি ভবনের ছাদে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি উঠে ভাঙচুর করছেন। নিচে কমলা রঙের পতাকা হাতে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

ফেসবুকের একাধিক (১, ২, ৩, ৪, ৫) প্রোফাইল, এবং গ্রুপ থেকে একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়।
দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে ভিডিওটির কি-ফ্রেম ধরে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে একাধিক ভারত-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ইন্ডিয়া টুডের গত ১১ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, “উত্তর প্রদেশের মিরাটে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার দাবি করা একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটিতে একদল পুরুষকে, যাদের অনেকের গায়েই ছিল গেরুয়া উত্তরীয় এবং হাতে ছিল গেরুয়া পতাকা, বাড়ির ছাদে উঠতে দেখা যাচ্ছে। ইন্ডিয়া টুডের তথ্য যাচাইয়ে দেখা গেছে যে, ভিডিওটি উত্তর প্রদেশের মিরাটের নয়, বরং হাপুরের। এটি মহারানা প্রতাপ জয়ন্তীর দিনে দুটি পক্ষের মধ্যে ঘটে যাওয়া একটি সংঘর্ষের দৃশ্য।” প্রতিবেদনের শেষে আরও লেখা হয়, “মিরাটে ছয়টি মসজিদ ভেঙে ফেলা এবং বাহান্নটি মুসলিম বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার সংবাদ প্রতিবেদনের সন্ধান করা হলে, নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ইন্ডিয়া টুডের মিরাট প্রতিনিধিও নিশ্চিত করেছেন, সেই শহরে এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।”
একাধিক প্রতিবেদনে (১, ২, ৩) ঘটনাটিকে হাপুরে দুই দলের সংঘর্ষের ঘটনা হিসেবে বলা হয়। এ প্রতিবেদনগুলিতে ব্যবহৃত ভিডিওটির সঙ্গে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির হুবহু মিল রয়েছে। এ বিষয়ে এক্সে হাপুর পুলিশের পক্ষ থেকে একটি ভিডিও বিবৃতি দেওয়া হয় গত ১০ মে। এক্সের পোস্টটির ক্যাপশনে লেখা হয়, “মহারানা প্রতাপ জয়ন্তী উপলক্ষ্যে দেহরা গ্রামে শোভাযাত্রা চলাকালীন দু’পক্ষের মধ্যে পাথর ছোড়ার ঘটনায় ধৌলানা থানা পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে এবং জড়িত ৩ জন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে; পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সন্দেহভাজন ৫ ব্যক্তিকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।”
ভারতের একাধিক (১, ২, ৩, ৪) তথ্য যাচাইকারী সংস্থা এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ভারত-ভিত্তিক তথ্য যাচাইকারী সংস্থা অল্ট নিউজের গত ১৪ মে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল, “মিরাটে মসজিদে ভাঙচুর, মুসলিমদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ? না, হাপুরের ভিডিও মিথ্যা দাবিতে ভাইরাল।”
প্রতিবেদনে বলা হয়, “গেরুয়া পতাকা হাতে একদল উগ্র জনতা কর্তৃক একটি স্থাপনা ভাঙচুর এবং এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে মারধর করার ২৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও সাম্প্রদায়িক দাবিসহ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। ব্যবহারকারীরা দাবি করছেন, উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ ‘ধর্মনিন্দামূলক’ মন্তব্য করার পর মিরাটে এই ঘটনাটি ঘটেছে, যার জেরে ছয়টি মসজিদ ভাঙচুর করা হয়েছে, ৫২টি মুসলিম বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং বেশ কয়েকজন মুসলিমকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে।”
প্রতিবেদনটিতে এক্সের একটি পোস্টের স্ক্রিনশট যুক্ত করা হয়েছে। মিরাটের ঘটনা দাবি করা ওই পোস্টে মিরাট পুলিশ মন্তব্য করেছে, “এই মামলাটি মিরাট জেলার সাথে সম্পর্কিত নয়, এমনকি উত্তর প্রদেশের কোথাও এই ধরনের কোনো ঘটনাও ঘটেনি। উক্ত টুইটার (এক্স) হ্যান্ডলটির বিরুদ্ধে একটি এফআইআর (FIR) নথিভুক্ত করা হচ্ছে। সাইবার সেল এই অ্যাকাউন্টের উৎস এবং অন্যান্য পরিচয় যাচাইয়ের বিষয়ে তদন্ত করছে।”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, “ঘটনাটি মিরাটের নয়, হাপুরের এবং ভিডিওটিতে কোনো মসজিদে ভাঙচুরের দৃশ্য দেখানো হয়নি।”
অর্থাৎ, ভারতের হাপুর জেলার সংঘর্ষের দৃশ্য ছড়াচ্ছে মিরাটের মসজিদ ভেঙে ফেলার ঘটনার দাবিতে।