
বন্যা ও জলাবদ্ধতার মধ্যে পরীক্ষা নেওয়া এবং এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রীর মন্তব্য নিয়ে ক্ষোভের জেরে আন্দোলন করছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা। চলমান আন্দোলনে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীর গলা চেপে ধরেছে ছাত্রদল — সামাজিক মাধ্যমে ছবি ও ভিডিও পোস্ট করে এমন বয়ান ছড়াতে দেখা গেছে। গত ১৪ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হলে ভিড়ের মধ্যে একজনকে গলাধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ঘটে।
পরবর্তী সময়ে ভিডিও থেকে নেওয়া ছবি এবং এ থেকে বানানো একটি গ্রাফিকও ছড়িয়ে পড়ে। গ্রাফিকে গলা চেপে ধরা ব্যক্তির গায়ে লেখা “ছাত্রদল” এবং যার গলা চেপে ধরা হয়েছে তার গায়ে লেখা “সাধারণ শিক্ষার্থী”। এ ধরনের পোস্ট মূলত ছড়ানো হয়েছে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে।
তবে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধানে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। ভিডিওতে যে ব্যক্তি গলা ধাক্কা দিচ্ছেন, তিনি ছাত্রদলের নেতা। তবে যাকে গলা ধাক্কা দেওয়া হয়েছে, তিনি আন্দোলনকারী নন, বরং ছাত্রদলেরই আরেক নেতা। ডিসমিসল্যাব দুই ব্যক্তির মুখমণ্ডল যাচাই করে নিশ্চিত হয়েছে, দুজনের একজন ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওমর ফারুক মামুন এবং অন্যজন ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পূর্বের সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহিন আহমেদ সুজন।

ডিসমিসল্যাবের নজরে প্রথম আসে একটি পোস্ট, যার ক্যাপশনে লেখা, “আ’ন্দো’ল’ন’র’ত সাধারন শিক্ষার্থীদের উ’প’র লা’ঠি’সোঁ’টা’সহ বিভিন্ন অ*স্ত্র নিয়ে হা*ম*লা করছে ছাত্রদল এবং বি, এন,পির পু’লি’শ বা’হি’নী(বানান অপরিবর্তিত)।” পোস্টের সঙ্গে যুক্ত একটি ভিডিও যেখানে দেখা যাচ্ছে, কিছু মানুষের জটলার মধ্যে সাদা শার্ট পরিহিত এক ব্যক্তি সাদা শার্ট পরা আরেক ব্যক্তিকে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে দিয়ে চড় দেওয়ার ভঙ্গিমা করেছেন। যদিও তাকে চড় মারার কোনো দৃশ্য দেখা যায়নি।
ঘটনাটি সম্পর্কে বিস্তারিত প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে সংবাদমাধ্যম ডেইলি বাংলাদেশের একটি রিলস খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। রিলসের ক্যাপশনে লেখা, “’শেখ হাসিনাকে পতন করাইছি, এইটাও আমাদের কাছে কিছু না’”। এই ভিডিওর শুরুতে এবং শেষে দুইবার আলোচিত গলা ধাক্কার দৃশ্যটি ছিল। তবে পুরো ভিডিওতে এই বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
অধিকতর সার্চে দৈনিক ঘটনা নামের একটি ফেসবুক পেজের ভিডিও খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। পেজটির পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “ছাত্রদলের একাংশকে নিয়ন্ত্রণ করলেন সিনিয়ররা!” ভিন্ন পাশ থেকে ধারণ করা এই ভিডিওতে দেখা যায়, যে “সাধারণ শিক্ষার্থীর” গলা চেপে ধরা হয়েছে দাবিতে পোস্ট করা হয়েছিল, তিনি বাগ্বিতণ্ডায় লিপ্ত। পরক্ষণেই অন্য সাদা শার্ট পরা ব্যক্তি এসে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন।
এই পোস্টকে কেন্দ্র করে কিওয়ার্ড সার্চ করলে ডিসমিসল্যাব ছাত্রদলের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে পোস্ট করা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আমানউল্লাহ আমানের একটি বিবৃতি পায়। বিবৃতিতে লেখা, “একজন শিক্ষার্থীর গলা চেপে ধরার যে ছবি, ভিডিও পোস্ট করা হচ্ছে এবং বলা হচ্ছে ছাত্রদল নেতা একজন শিক্ষার্থীর গলা চেপে ধরছেন। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি ঐ ঘটনা আন্দোলনে আসা কোনো শিক্ষার্থীর সাথে ঘটেনি উল্টো আন্দোলনে আসা একজন শিক্ষার্থীর কথার উত্তর ছাত্রদলের একজন কর্মী দিতে গেলে কেন্দ্রীয় সংসদের একজন নেতা অধিনস্থ ইউনিটের ঐ কর্মীকে শিক্ষার্থীদের সাথে তর্কে যাতে না জড়ায় সেজন্য নিবৃত্ত করতে তাৎক্ষণিকভাবে কাজটি করেছেন।”

পরবর্তী সার্চে এই ঘটনা নিয়ে ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মীকে পোস্ট করতে দেখা যায়। একটি পোস্ট অনুযায়ী, ধাক্কা দেওয়া ব্যক্তি ছিলেন ছাত্রদলের নেতা মোহাম্মদ ওমর ফারুক মামুন। এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল শাখার সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক নিত্যানন্দ পালের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। নিত্যানন্দ ডিসমিসল্যাবকে জানান, যিনি ধাক্কা দিয়েছিলেন তার নাম ওমর ফারুক মামুন, যিনি বর্তমানে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। এবং, যাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল তার নাম মাহিন আহমেদ সুজন, যিনি বর্তমানে ছাত্রদলের ঢাকা মহানগর পূর্বের সহ-সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
পরে দুই ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুঁজে পায় ডিসমিসল্যাব। মাহিন আহমেদ সুজনের ফেসবুক প্রোফাইলে একটি পোস্টে লেখা, “প্রধান মন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ সকালে আসায় আমাদের ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের পূর্ণ নির্ধারিত সময় আমরা সবাই উপস্থিত থাকি, কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থী সেজে কিছু দুষ্কৃতী কারি আমাদের পূর্ণ নির্ধারিত সময় মব তৈরি করে, আমরা বাধা দিতে গেলে আরও উত্তেজিত হয়, এবং সেই সময় আমাকে ধাক্কা দেয় আমার সহ কর্মি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেটাকে নিয়ে কিছু মব কারি বট আইডি মিথ্যা পোস্ট করছে যে সাধারণ শিক্ষার্থী কে ছাত্রদল পেটাচ্ছে, আমিও তো ছাত্রদলের পোস্ট ধারি ছাত্রদল কর্মী, এমন মিথ্যা মব কারি দৃষ্টান্ত শাস্তি চাই।”

একই প্রোফাইল থেকে দৈনিক ঘটনার পোস্ট করা ভিডিওটিও পোস্ট করা হয়েছে। প্রোফাইলটি থেকে অ্যাবাউট সেকশন অনুযায়ী তিনি ঢাকা মহানগর পূর্ব ছাত্রদলের সহ সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া, তার ফেসবুক প্রোফাইলের কভার ছবিতে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আমানউল্লাহ আমানের সঙ্গে ছবি আছে, যা তিনি ২০২২ সালে আপলোড করেছিলেন।
প্রোফাইলটিতে বিদ্যমান ছবির সঙ্গে ভিডিওতে থাকা ব্যক্তির মুখের মিল তুলনা করতে ফেস কম্পারিজন টুলসের সহায়তা নেয় ডিসমিসল্যাব। টুলসের ফলাফলে দেখা যায়, দুই ব্যক্তির মুখের ক্ষেত্রে ৮৮ শতাংশ মিল পাওয়া যায়। অর্থাৎ তারা একই ব্যক্তি।
অর্থাৎ, যাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল তিনি আন্দোলনকারী নন, বরং ছাত্রদলেরই নেতা ছিলেন।
আলোচিত দৃশ্যটির সবচেয়ে পুরোনো সংস্করণ পাওয়া যায় দৈনিক ঘটনা পেজে। এখানে পোস্ট করা হয় ১৪ জুলাই দুপুর ১২টা ২৬ মিনিটে। আর সংবাদমাধ্যম ডেইলি বাংলাদেশের ফেসবুক পেজে পোস্ট হয়েছিল দুপুর ১টা ৩৬ মিনিটে।
ডিসমিসল্যাবের সামনে আসা প্রথম যে পোস্ট থেকে এই অনুসন্ধানের শুরু, সেই পোস্টটি করা হয়েছিল দুপুর ৩টা ২২ মিনিটে। এই ভিডিওতে ডেইলি বাংলাদেশের লোগোটি ঝাপসা করে দেওয়া হয়। পোস্টকারীর প্রোফাইল যাচাই করলে দেখা যায় তার বায়োতে লেখা, “আমি আমৃত্যু জয় বাংলার লোক”। প্রোফাইলটির একাধিক পোস্ট বিশ্লেষণ করে আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে প্রতীয়মান হয়। একই প্রোফাইল থেকে দুপুর ৩টা ৩৯ মিনিটে একটি গ্রাফিক ছবি আপলোড করা হয় যেখানে ভিডিওর দৃশ্যটিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিটিতে এক ব্যক্তি আরেকজনের গলা চেপে ধরে আছে। যে ব্যক্তি গলা চেপে ধরেছেন তার গায়ে ছাত্রদল এবং যার গলা চেপে ধরা হয়েছে তার গায়ে সাধারণ শিক্ষার্থী লেখা। ছবিটিকে সূত্র ধরে অনুসন্ধান এগিয়ে নেয় ডিসমিসল্যাব।
এই ছবিটির সবচেয়ে পুরোনো সংস্করণ খুঁজতে গেলে ডিসমিসল্যাব খুঁজে পায় “ফারদিন তাহের রাহুল” নামের একটি প্রোফাইল। এই প্রোফাইল থেকে দুপুর ৩টা ৯ মিনিটে ছবিটি পোস্ট করে প্রতিবাদ জানানো হয়। প্রোফাইলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এর ব্যবহারকারী নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা। এরপর দুপুর ৩টা ২৬ মিনিটে “নুরুল আজিম রনি” নামের একটি প্রোফাইল থেকে একই ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়, ভিডিও লিংক কমেন্টে। পোস্টের কমেন্টে আলোচিত ভিডিওর একটি লিংক দেওয়া। এই পোস্ট চার শতাধিকবার শেয়ার করা হয়। “নুরুল আজিম রনি” প্রোফাইলটির কার্যক্রমেও নিশ্চিত হওয়া যায় ব্যবহারকারী আওয়ামী লীগ সমর্থক। এছাড়া একই নামে চট্টগ্রামের ছাত্রলীগ নেতা থাকলেও এটি তার অফিশিয়াল অ্যাকাউন্ট কিনা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

একই নামের আরেকটি প্রোফাইল থেকে ৩টা ২৬ মিনিটে “ভিডিও কমেন্টে ” ক্যাপশন দিয়ে ছবিটি পোস্ট করা হয়। এই পোস্টও তিন শতাধিকবার শেয়ার হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পরিচালিত এই অ্যাকাউন্টে ব্যবহারকারীর পরিচয় হিসেবে “বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর যুব ও ক্রীড়া উপকমিটির সদস্য” লেখা।
এই ছবিটি ৩টা ৯ মিনিট থেকে ৩টা ৩৯ মিনিটের মধ্যে অন্তত ২৭টি ভিন্ন প্রোফাইল থেকে আলাদাভাবে পোস্ট করতে দেখা যায়। একাধিক পোস্টে ব্যবহারকারীরা “ভিডিও কমেন্টে” ক্যাপশন লিখলেও অন্যান্য পোস্টগুলোতে মৌলিক ক্যাপশন পাওয়া গেছে। এর মধ্যে একজন ব্যবহারকারীর পোস্ট করা ছবিতে কিছুটা ভিন্নতাও লক্ষ্য করা গেছে। তবে এদের সবার প্রোফাইল বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া যায়, তারা সবাই নিজেদের আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেন।
মুরাদ হোসেন নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইল থেকে ছবিটি রাত ১২টা ১১ মিনিটে পোস্ট করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, “আজকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিএনপি ছাত্রদল নেতা এক শিক্ষার্থীর গলা চে’পে ধরেছে। এই আন্দোলনে ছাত্র লীগের (ছাত্র দল) এর কাজটা কি?” এর আগে একই প্রোফাইল থেকে রাত ৯টা ৬ মিনিটে ধাক্কাধাক্কির ভিডিওটি শেয়ার করে লেখা হয়েছিল, “HSC পরীক্ষার্থীদের দাবী সামান্য। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় তারা পরীক্ষা দেবে না। এ সামান্য দাবী দমন করার জন্য তারেক রহমান সরকার পুলিশ এবং ছাত্রদলের সন্ত্রাসী দিয়ে শিক্ষার্থীদের এভাবে নির্যাতন করলো।” প্রোফাইলটির কার্যক্রমে প্রতীয়মান হয়, ব্যবহারকারী জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক।
ইউটিউবে শাহিনউদ্দিন-ভিথ্রিও নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকেও গ্রাফিকটি পোস্ট করা হয়েছে। এই অ্যাকাউন্টের বিস্তারিত বর্ণনায় লেখা “জামাত ইসলাম”। এই অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত বিএনপি-বিরোধী ও জামায়াতের পক্ষে কন্টেন্ট পোস্ট করা হয়।
দেলোয়ার হোসেন নামের একটি গ্রুপে ঐক্যবদ্ধ বাউফল প্রোফাইল থেকে সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে ছবিটি পোস্ট করে লেখা হয়, “ধ্বংস অতি নিকটে ”। এই পোস্ট চার শতাধিকবার শেয়ার করা হয়েছে। এই প্রোফাইল থেকেও নিয়মিত জামায়াত ইসলামীর পক্ষে পোস্ট হতে দেখা গেছে।