সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব
Muslim college girl abduction video fact-check

স্ত্রীকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ছড়াচ্ছে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ছাত্রী অপহরণের দাবিতে

সুদেষ্ণা মহাজন অর্পা

রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ডিসমিসল্যাব

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলায় প্রকাশ্যে ২০-২৫ জন হিন্দু যুবক এক মুসলিম কলেজছাত্রীকে অপহরণ করে নিয়ে গেছে, এমন দাবিতে একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়েছে। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ঘটনাটি পশ্চিমবঙ্গের নয়। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, এটি ভারতের মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানি জেলার একটি অপহরণের ঘটনা। গত ৭ জুলাই এক হিন্দু নারীকে তার স্বামী জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। এই ঘটনার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই।

ফেসবুকের একটি পেজ থেকে গত ১১ জুলাই ভিডিওটি পোস্ট করা হয়। ২৭ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, অনেক ব্যক্তি মিলে প্রকাশ্যে এক নারীকে টানতে টানতে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছে। পোস্টের ক্যাপশনে লেখা, “আবারো ভ|রতে প্রকাশ্য দিবালোকে ২০/২৫ জন হি ন্দু যুবক মিলে পশ্চিম বঙ্গের হাওড়ার কলেজ পড়ুয়া আছমা খাতুন কে তুলে নিয়ে চলে গেল। শুভেন্দুর সরকারে এদের স|হস এতটাই বেড়ে গেছে যে, এখন আর আইনের কোনো ভয় নেই। এই নির্মম দৃশ্য চোখে দেখা যায় না।প্রানের ভয়ে আশেপাশের মুসলিমরা কেউ এগিয়ে আসেনি। এই নির্মমতার শেষ কোথায়?” (লেখা অপরিবর্তিত)

Viral video falsely linked to communal claim in West Bengal.
ভুয়া দাবিতে ছড়ানো একাধিক ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট।

এই প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিওতে ব্যবহারকারীদের প্রতিক্রিয়া জানাতে দেখা গেছে অন্তত ১ হাজার ৪০০ বার। ৯৫১ বার এই পোস্টটি শেয়ার করা হয়েছে। মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একাধিক ব্যবহারকারী ঘটনাকে সত্য বলে ধরে নিয়েছেন। এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আল্লাহ তুমি সবই দেখতেছ।উপযুক্ত বিচার করিও”। আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “অন্ধ ভক্ত এত জুলুম করিও না।”

ফেসবুকের একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল, পেজ ও গ্রুপ (,,,,) থেকে একই দাবিতে ভিডিওটি পোস্ট করা হয়।

ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে বিভিন্ন কি-ফ্রেম নিয়ে রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন (,,) ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। দৈনিক ভাস্করের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এ ঘটনা মধ্যপ্রদেশের বারওয়ানি জেলার রাজপুর তহসিলের ইন্দ্রপুর গ্রামের। গত ৭ জুলাই এক নারীকে তার স্বামী কয়েকজন সঙ্গীসহ বাবার বাড়ির পাশের একটি মাঠ থেকে জোরপূর্বক মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়। প্রচারিত ভিডিওর সঙ্গে প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ভিডিওর হুবহু সাদৃশ্য রয়েছে।

MP video falsely claimed as Muslim college student abduction in West Bengal.
আসল ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট।

প্রতিবেদনগুলো থেকে আরও জানা যায়, স্থানীয় আদিবাসী সমাজে প্রচলিত ‘বেজা’ প্রথা অনুযায়ী, অভিযুক্ত হুকুম রাওয়াতের পরিবার বিয়ের উদ্দেশ্যে ওই নারীর পরিবারকে প্রায় ২ লাখ রুপি দিয়েছিল। বলা হচ্ছে, অর্থ গ্রহণের পরও নারীর পরিবার তাকে হুকুমের বাড়িতে পাঠায়নি। এর জেরে গত ৭ জুলাই হুকুম রাওয়াত সহযোগীদের নিয়ে ওই নারীকে জোর করে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যায়।

অধিকতর যাচাইয়ে বিভিন্ন প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড দিয়ে সার্চ করলে ডিসমিসল্যাব ভারতীয় গণমাধ্যম আজতাকের একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনও খুঁজে পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আজতাক ঘটনাটি ফ্যাক্টচেকের উদ্দেশ্যে সেখানকার স্থানীয় পুলিশ, সংশ্লিষ্ট সংবাদদাতা এবং ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে। এরপর সংবাদমাধ্যমটি নিশ্চিত হয়, ওই ভুক্তভোগী নারী ও অভিযুক্ত উভয়েই হিন্দু সম্প্রদায়ের। ভুক্তভোগীর ভাইও তাদের জানান, তাদের পরিবার হিন্দু ধর্মাবলম্বী।

অর্থাৎ, ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গের হাওড়া জেলার কোনো মুসলিম কলেজছাত্রী অপহরণের নয় এবং এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতারও কোনো সম্পর্ক নেই। ভারতের মধ্যপ্রদেশে এক হিন্দু নারীকে জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার ভিডিওকে পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম কলেজছাত্রী অপহরণের দৃশ্য দাবিতে প্রচার করা হচ্ছে।

আরো কিছু লেখা