মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব
FactChecking AL Leader Death Misleading

সাম্প্রতিক ইঙ্গিতে ছড়ালেও আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যু ২০২৪ সালের আগস্টে

মো. তৌহিদুল ইসলাম

রিসার্চ অফিসার, ডিসমিসল্যাব

চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপারা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতার ছবি ছড়িয়ে ও তাকে হত্যার নিন্দা জানিয়ে সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে একাধিক পোস্ট করা হয়েছে। পোস্টগুলোর মন্তব্যে ব্যবহারকারীরা একে সাম্প্রতিক ঘটনা বলে মন্তব্য করছেন। তবে ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেকে দেখা যায়, ঘটনাটি ২০২৪ সালের আগস্টের, যা বিভ্রান্তিকর ক্যাপশনে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে। এছাড়া, আলোচিত ব্যক্তির মৃত্যুর কারণ এখনো তদন্তাধীন। 

ফেসবুকে ‘মঞ্চ ৭১’ নামের একটি গ্রুপের পোস্ট প্রথমে ডিসমিসল্যাবের সামনে আসে। ‘কপিল হালদার সজল’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে তিনটি ছবি পোস্ট করা হয়। ক্যাপশনে লেখা, “এই হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। মানব জাতি আজ হিংস্র পশুত্ব রুপে আত্মপ্রকাশ পেয়ে। মানুষ হত্যা করা যেন এখন বিএনপি,জামাতের নেশায় পরিণত হয়েছে। হাইরে বাংলাদেশ আপনারা যাকে বিছানায় শুয়ানো দেখছেন তিনি হলেন সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান,জনাব-মোস্তফা কামাল মজুমদার,উনার অপরাধ উনি আওয়ামীলীগ করেন আওয়ামীলীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সেই অপরাধে উনাকে বিএনপি,জামাতের সন্ত্রসীরা মব করে পিটিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করেছে খুনিরা। আমরা এই হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাচ্ছি। সেই সাথে এই অবৈধ সরকারের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করছি। আমাদের দাবি এই সকল খুনিদের অনতিবিলম্ব গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক।”

আওয়ামী লীগ নেতা পুরোনো মৃত্যুর ঘটনা সাম্প্রতিক ইঙ্গিতে করে দেওয়া একাধিক পোস্টের স্ক্রিনশট

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটি দুই শতাধিকবার শেয়ার হয়েছে। প্রতিক্রিয়া এসেছে দেড় হাজারের বেশি। তিন শর বেশি মন্তব্য করা হয়েছে পোস্টে। একটি মন্তব্যে লেখা হয়েছে, “এ ঘটনার তিব্র নিন্দা জানাচ্ছি সেই সাথে বলবো উনি একজন মানুষ। দেশে সত্যি কোন আইনের শাসন নাই মনে হয় জাহিলি যুগে বসবাস করতেছি। এদেশের আইন শৃঙ্খলা এতটা খারাপ যা বলে বুঝানো যাবে না বতমানে মানুষ আতংকে দিন পার করতেছে জানি না কখন আমার সিরিয়াল হে আল্লাহ আপনি মেহেরবানি করে সবাইকে হেফাজত করুন এবং হেদায়েত দান করুন। আমিন।” আরেকটি মন্তব্যে লেখা হয়েছে, “বিএনপি জামাত জোট সরকারের মুখে আমি থুথু নিক্ষেপ করলাম। এদেরকে পশু বললেও পশুদের ইজ্জত যায়। ছি! ছি!”

প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চ করে ডিসমিসল্যাব হুবহু একই ক্যাপশনে অন্তত ১৪০টি পোস্ট খুঁজে পেয়েছে, যা একাধিক ব্যক্তিগত প্রোফাইল, পেজ ও বিভিন্ন গ্রুপে আপলোড করা হয়েছে। 

পোস্টটির সবচেয়ে পুরোনো সংস্করণ খুঁজে পাওয়া যায় ‘কামরুজ্জামান লিটন’ নামের একটি অ্যাকাউন্টে, গত ১২ জুলাই রাত ১১টা ৫০ মিনিটে। এরপর দুই মিনিটের মধ্যে একই অ্যাকাউন্ট থেকে অন্তত চারটি গ্রুপে পোস্টটি শেয়ার করা হয়। এই অ্যাকাউন্টে পরিচয় হিসেবে লেখা আছে, “সাবেক সহ- সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ চাঁদপুর জেলা শাখা।”

সত্যতা যাচাইয়ে ডিসমিসল্যাব পোস্টে থাকা একাধিক ছবি রিভার্স সার্চ করে। এতে সময় নিউজসহ একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন সামনে আসে (,,)। পরে প্রাসঙ্গিক কিওয়ার্ড সার্চে সংবাদমাধ্যম ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘যুগান্তর’ থেকে প্রকাশিত আরও দুটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনগুলো থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার সূচিপাড়া উত্তর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা কামাল মজুমদারের মৃত্যু সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। প্রতিবেদনগুলো লিখেছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট বাড়ির পার্শ্ববর্তী একটি ডোবা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয় এবং পরে দাফন করা হয়। অথচ, পোস্টের ক্যাপশনে মোস্তফা কামাল মজুমদারকে ‘সূচিপাড়া’ ইউনিয়নের “বর্তমান চেয়ারম্যান” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ নেতার মরদেহ উত্তোলন নিয়ে সংবাদমাধ্যম ‘যুগান্তর’ ও ‘সময় নিউজ’- এ ২০২৫ সালে প্রকাশিত প্রতিবেদনের স্ক্রিনশট

সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, মৃত্যুর ছয় মাস পর ২০২৫ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মোস্তফা কামালের স্ত্রী ফাতেমা কামাল শাহরাস্তি মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ৩ জুন আদালতের নির্দেশে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে লাশ উত্তোলন করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়।

কিওয়ার্ড সার্চে ‘প্রিয় চাঁদপুর’ নামের একটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনও খুঁজে পাওয়া যায়, যা ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছিল। এই প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, ৫ আগস্ট সন্ধ্যায় স্থানীয় শোরসাক বাজার এলাকায় একদল দুর্বৃত্ত মোস্তফা কামালের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। বাঁচাতে গেলে দুর্বৃত্তরা তার ছোট ভাইকেও মারধর করে। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে মোস্তফা কামাল পার্শ্ববর্তী একটি পুকুরে ঝাঁপ দেন। এরপর দুর্বৃত্তরা চলে গেলে স্বজনরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন এবং পরদিন সকালে পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

অধিকতর যাচাইয়ে শাহরাস্তি থানার বর্তমান ওসি মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করে ডিসমিসল্যাব। তিনি বলেন, “মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। চিকিৎসক এখন পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কোনো মতামত দেয়নি।” এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, মৃত্যুর ১০ মাস পর কবর থেকে মরদেহ উত্তোলন করায় তা পুরোপুরি পচে গিয়েছিল, ফলে চিকিৎসকেরা মৃত্যুর কারণ উদ্‌ঘাটনে শরীর থেকে প্রয়োজনীয় কোনো আলামত পাননি। 

তিনি আরও জানান, পুলিশ এখন পর্যন্ত আদালতে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিট জমা দেয়নি। 

অর্থাৎ, আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা কামাল মজুমদারের মৃত্যুর ঘটনাটি ২০২৪ সালের আগস্টের। প্রায় দুই বছর আগের এই পুরোনো ঘটনা ও ছবিকেই বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমে সাম্প্রতিক ঘটনার মতো করে প্রচার করা হচ্ছে; যা সাধারণ ব্যবহারকারীদের মাঝে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।

আরো কিছু লেখা